কঠোর নজরদারির অওতায় আসছে আবাসিক হোটেল

অপরাধ দমনে কঠোর নির্দেশনা ।। খুলশীতে অসামাজিক কাজের দায়ে গ্রেপ্তার ২৯

ঋত্বিক নয়ন

রবিবার , ২৬ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
1276

আবাসিক হোটেলগুলোতে বাড়ছে অপরাধ কর্মকাণ্ড। খুন ও ধর্ষণের নিরাপদস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে অনেক আবাসিক হোটেল। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট নগরীর ফয়স লেকস্থ একটি আবাসিক হোটেল থেকে মোহাম্মদ মাঈনুদ্দীন প্রকাশ শাহরিয়ার শুভ নামে এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নগরীর আবাসিক হোটেল ও বোর্ডিংয়ের ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে পুলিশ। অন্তত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তাই প্রতিফলিত হয়েছে। অচিরেই সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান নগরীর আবাসিক হোটেল মালিকদের সাথে বৈঠক করে কিছু নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করে দেবেন বলে জানা গেছে। তবে এ কথাও ঠিক যে এ ধরনের নির্দেশনা বিগত সময়গুলোকে বহুবার বহুভাবে দেওয়া হলেও অধিকাংশ হোটেল মালিক তা পালন করছেন না। একইভাবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশেরও যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, পুলিশকে ম্যানেজ করেই আবাসিক হোটেলগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গত ১৭ আগস্ট হোটেল থেকে যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধারের ঘটনা সংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম বলেন, আগামীতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলগুলোতে নজরদারি বাড়ানো ও রুম ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না মানলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়ে উঠছে কিছু আবাসিক হোটেল। ভুয়া নামপরিচয় ও ঠিকানা ব্যবহার করে হোটেলকক্ষ ভাড়া নিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। পরিকল্পনামাফিক টার্গেট ব্যক্তিকে হত্যা করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে খুনিরা। অপরাধীদের জন্য এসব আবাসিক হোটেল এখন নিরাপদ কিলিং জোনে পরিণত হয়েছে। হোটেল মালিকদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, রুম ভাড়া দিতে হলে অবশ্যই নাম পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে এবং প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট থানায় তা জমা দিতে হবে। কিন্তু দেখা যায়, মাস শেষে থানায় বোর্ডারদের পূরণকৃত ফরম জমা দেওয়া হয় ঠিকই, তবে তার অধিকাংশই হোটেল কর্মচারীদের পূরণ করা। পুলিশও এ ব্যাপারে গরজ দেখায় না। কোন ঘটনা সংঘটনের পর হৈ চৈ শুরু হলে তবে কিছুদিন দৌঁড় ঝাঁপ চলতে থাকে। একসময় থিতিয়ে যায় সকল প্রক্রিয়া। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট ফয়সলেকস্থ লেকসিটি আবাসিক হোটেলে মাঈনুদ্দিন প্রকাশ শাহরিয়ার শুভ নামে এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ আগস্ট নিহত ব্যক্তি ও চীন ফেরত শিক্ষানবিশ চিকিৎসক রোকসানা আক্তার স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলে উঠেছিলেন। পরে জানা যায় স্ত্রী পরিচয় দেওয়া রোকসানার সাথে তার চার বছর আগেই ডিভোর্স হয়ে গেছে এবং খুনী তিনি নিজেই। এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। আবাসিক হোটেলগুলোতে খুন ছাড়াও অসামাজিক কার্যকলাপ, প্রতারণার মাধ্যমে নগ্ন ছবি ধারণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন রকম অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। গতকালও নগরীর খুলশী এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারীসহ ২৯ জনকে আটক করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। সন্ধ্যার পর মোটেল সিঙ স্বর্ণালী নামে ওই আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায় পুলিশ।

অভিযানে ১৩ জন নারী ও হোটেলের ম্যানেজারসসহ ১৬ জন পুরুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ইলিয়াছ খান। তিনি বলেন, হোটেলে জড়ো হয়ে বেআইনি কর্মকান্ড ঘটানোর অপরাধে তাদের আটক করা হয়েছে। তবে হোটেলের মালিক এবং সাত কর্মকর্তা পালিয়ে যায়। আটক ব্যক্তিদের নামে মামলা দায়ের করা হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, নগরে আবাসিক হোটেল ও বোর্ডিংয়ের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ১১০টি এবং ডবলমুরিং থানায় ৬২টি রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়তলীতে ১৩, পাঁচলাইশে ১০ এবং খুলশী এলাকায় আটটি হোটেল আছে। কিছু হোটেলে অসামাজিক কার্যকলাপ চলছে। বিষয়টির সঙ্গে স্থানীয় থানার কিছু পুলিশ সদস্য জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে অধিকাংশ আবাসিক হোটেল। এ প্রসঙ্গে সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপ পুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো: শহীদুল্লাহ আজাদীকে বলেন, আবাসিক হোটেলে অসামাজিক কার্যকলাপ, জুয়ার আড্ডা ও মাদকের আড্ডা এ তিনটি বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর নির্দেশ আছে কমিশনার স্যারের। প্রতিনিয়ত আমরা অভিযান চালাই। তিনি বলেন, একটি অভিযান চালাতে আমরা যতোটা পরিশ্রম দিই, তা বিফলে যায়, যখন দেখি পরদিনই দুই চার পাঁচশ টাকা দিয়ে তারা জামিনে বের হয়ে যায়। এতে মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের মধ্যে অনেক সময় উৎসাহে ভাটা পড়ে। তবে ইনফরমেশন পেলে আমরা অভিযান চালাই। এ সংক্রান্ত অভিযান চালালে এডিশনাল কমিশনার (ক্রাইম) স্যারও অফিসারদের উৎসাহিত করেন নানা ভাবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর বড় ও নামীদামী হোটেলগুলো ছাড়া মাঝারি ও ছোট মানের হোটেলগুলোতে নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। নেই সিকিউরিটি গার্ড, হোটেলের ভেতরে প্রবেশে কোনো কড়াকড়িও নেই। বোর্ডার ছাড়াও বাইরের লোকজন অবাধে হোটেলে যাতায়াত করতে পারে। ফলে এসব হোটেলে যেকেউ যে কোনো সময় ঢুকে অঘটন ঘটিয়ে চলে যেতে পারে। তবু আর্থিক সামর্থ্যের দিকে তাকিয়ে এসব হোটেলেই থাকতে হয় সাধারণ মানুষকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আবাসিক হোটেলে সংঘটিত হত্যাকান্ডের নেপথ্যে থাকে পরকীয়া, মাদক ব্যবসা, আর্থিক দ্বন্দ্ব। পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকান্ড ঘটানো হয় বলেই দুর্বৃত্তরা প্রকৃত নামঠিকানা গোপন রেখে বোর্ডার হিসেবে রুম ভাড়া নেয়। বোর্ডারদের নামঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্যসংবলিত ফরম পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও আলোকচিত্র ধারণের নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ হোটেলে এসব নিয়ম না মেনে বোর্ডারদের কক্ষ ভাড়া দেয়া হয়। এ কারণে এসব হোটেলে নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

সিএমপি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের মার্চ মাস থেকে আবাসিক হোটেলের বোর্ডারদের নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। অপরাধ সংঘটনের পর পালিয়ে গেলে অপরাধীকে শনাক্ত করতে সিসি টিভি ক্যামেরা ও বোর্ডারদের ছবিও তুলে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। মোবাইল ফোন নম্বর সঠিক কি না তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে নিতে বলা হয়। পূরণ করা তথ্য ফরমের ফটোকপি প্রতিদিন স্থানীয় থানায় পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়। সর্বশেষ পূরণ করা তথ্য ফরমের ফটোকপি প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানোর নির্দেশ থাকলেও হোটেল মালিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কোনোটাই অনুসরণ করেন না। ফলে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলেও পুলিশ সদস্যদের পক্ষে অপরাধী শনাক্ত করা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে সাধারণ বোর্ডারদের নিরাপত্তার বিষয়টিও থেকে যায় ঝুঁকির মুখে। তবে এ ক্ষেত্রে হোটেল মালিকদের আইনি নির্দেশনা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই শুধু নয়, হোটেলগুলোর প্রতি সংশ্লিষ্ট থানার সঠিক তদারকি না থাকাও অনেকাংশে দায়ী বলে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (বন্দর) আবু বকর সিদ্দিক আজাদীকে জানান, ‘কমিশনার স্যার আবাসিক হোটেল মালিকদের নিয়ে অচিরেই মিটিং করবেন এবং নির্দেশনাগুলি জানিয়ে দেবেন। তার আগে আবাসিক হোটেলগুলোতে খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিএমপির পক্ষ থেকে বোর্ডারদের বায়োডাটা ও ছবি তুলে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোটেলের ভেতর ও বাইরে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগাতে বলা হয়েছে। এটা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি।’

x