কঠিন নিষ্ঠুর সেই সপ্তাহ

কলম থেকে অশ্রু ঝরে - ৬

রেফায়েত ইবনে আমিন

মঙ্গলবার , ২৮ নভেম্বর, ২০১৭ at ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
110

আজ শুক্রবার, ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি। সারারাত টেনশানের মাঝে, গাড়ি চালিয়ে শরীর একদম ভেঙ্গে পড়ছিলো। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম করে নিয়ে, গোসল সেরে জুম্মায় গেলাম। টলিডোর মসজিদগুলোতে আমার আম্মার নাম করে দোয়া করতে অনুরোধ করা হলো। জুম্মা শেষেই দৌড়ে গেলাম হাসপাতালে। আমাদের এই রিজিওনের এটা একটা নামকরা হাসপাতাল। শুধু হাসপাতালই নয়, এটা মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি (UTMC, ইউনিভার্সিটি অফ টলিডো মেডিক্যাল সেন্টারের)। চিকিৎসাও যেমন ভালো, যন্ত্রপাতি সবই অত্যাধুনিক, সব ডাক্তাররাও নামকরা ও প্রসিদ্ধ। আমি যখন পৌঁছলাম, তখন ডাক্তারের রাউন্ড চলছে। ডাক্তার যখন আসেন, ওনার সঙ্গে জনা দশবারোজন স্টুডেন্ট বা ইন্টার্নী ডাক্তার থাকে। আরো হয়তো রেসিডেন্ট ডাক্তারও থাকে। প্রথমে তারা রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রায় আধা ঘন্টার মত রোগীর সবকিছু নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। রোগীর চার্ট এবং হিস্ট্রি সবকিছুসহ একটা বাইন্ডার থাকে, ডাক্তার সেটা দেখে দেখে সকলকে বুঝাতে থাকেন, শিক্ষা দেন এবং উনি কি কি করবেন, কেন করবেন সেই ব্যাপারেও বলেন। এরপরে সকলে রুমে ঢুকে রোগীকে পরীক্ষা করে দেখে। ডাক্তারের নির্দেশ মত একেকজন একেকটা কাজ করে। সবশেষে, আবার সকলে বাইরে বের হয়ে দ্বিতীয় দফায় আলাপআলোচনা করতে থাকেন। প্রয়োজনমত ওষুধপত্রের মাত্রা অ্যাডজাস্ট করে দেয় বা বদলে দেয়, নার্সদের নির্দেশ দেয় কি করতে হবে ইত্যাদি। এরই মাঝে রোগীর বা রোগীর পরিবারের কোন প্রশ্ন থাকলে, ডাক্তার সেগুলোরও উত্তর দেন।

UTMC-র অধিকাংশ ডাক্তারই হয় মধ্যপ্রাচ্যের নয়তো আমাদের উপমহাদেশের। পাকিস্তানি, ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান, লেবানিজ, মিশরীয়, সিরিয়ান অনেক অনেক দেশের। আর এদের অধিকাংশই মুসলিম। আম্মার ডাক্তার শাফি আহমেদ, মধ্যপ্রাচ্যের। খুবই ধীরস্থির প্রকৃতির। সবকিছু ভালমত দেখে শুনে, পর্যবেক্ষণ করে তারপরে কথা বলেন। ডাক্তার আম্মার রিফ্লেক্স পরীক্ষা করে দেখলেন, চোখের মনি আলোর প্রতি কোন সাড়া দেয় কিনা পরীক্ষা করলেন। ওনার সঙ্গে কয়েকটা ছাত্র মনে হলো পাকিস্তানি, আবার হিজাব পড়া মেয়ে স্টুডেন্ট/ইন্টার্নীও আছে কয়েকজন। এরা সকলেই আমাকে দেখে খুবই যত্ন করে সব বুঝাতে লাগলো। আম্মার কি হয়েছে, তারা কি করছে, বা কি কি করবে। বিশেষ করে আম্মার বয়স, আম্মার ব্যাকগ্রাউন্ডফ্যামিলি হিস্ট্রি, ইত্যাদি নিয়ে আলাপ আলোচনা করলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে, এবং সে সঙ্গে অন্যান্য অসুখের জটিলতাও একটা বড় ফ্যাক্টর ডায়াবেটিস, এজ্‌মা, আর্থারাইটিস, প্রেসার আরো অনেক অনেক কিছুই আম্মার ছিলো। সেগুলো সব মিলিয়ে বর্তমানের সমস্যা একটু বেশি জটিল ও দুরূহ করে ফেলেছে।

প্রথম থেকেই, ইমার্জেন্সির ডাক্তার থেকে শুরু করে সকলেই আম্মার কিডনী কেমন সেটার ব্যাপারে নাজমাকে বারেবারে প্রশ্ন করছিলো। আমাদের জানামতে আম্মার কিডনীতে কোন অসুবিধা ছিলো না। কিন্তু ডাক্তাররা মনে হয় কিডনীকেই সন্দেহ করছে বেশি। ডাক্তার শাফি যা বললেন, ওনারা ধারনা করছেন আম্মার কিডনী ফেল (Renal Failure) হয়েছিলো। আর কিডনী ফাংশান না করার ফলে আম্মার কার্ডিয়াক এরেস্ট (Cardio-pulmonary arrest) হয়েছিল। তার ফলে হয়তো, ব্রেনেও রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ওনারা নানারকম ল্যাবটেস্ট করে দেখছেন; আর আম্মাকে মেশিন দিয়ে আর্টিফিশিয়ালি শরীরের সব কাজকর্মগুলো করাচ্ছেন।

স্যালাইন চলছে, ওষুধ চলছে নল দিয়ে, সেই সঙ্গে নিউট্রিশানও চলছে। ক্যাথেটার দিয়ে শরীরের ময়লা বের করে নিচ্ছে। রক্ত চলাচল সচল রাখছে, বিশেষ করে দেখলাম, দুই পায়ে প্যাডে মুড়ানো একটা ম্যাসেজার দেওয়া আছে, সেটা কিছুক্ষণ পরপর ম্যাসেজ করে করে পায়ের রক্ত সচল রেখেছে। কিছু পরপর এসে আম্মাকে পাশ ফিরিয়ে দেয়, চাদরবালিশ বদলে দেয় এরকম করে যাতে ক্রমাগত একপাশে শুয়ে থেকে থেকে রক্ত চলাচলে অসুবিধা না হয়, বা ঘা (বেডসোর) না হয়ে যায়। তবে আমি যা বুঝলাম, শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য ভেন্টিলেটার মেশিনটা একটু বেশি কষ্টের। একটা মোটা নল মুখের ভিতর ঢুকিয়ে সরাসরি ফুস্‌ফুসে বাতাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। নলটা বেশ মোটা, তাই সেটা মুখ এবং গলা দিয়ে ঢুকাতে ভীষণ কষ্ট হয়, অস্বস্তি লাগে। সেজন্য রোগীকে খুবই কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে তারপরে সেই নল ঢুকানো হয়। ওষুধ একটু কমালেই রোগী ঘুমের মাঝেই অবচেতন অবস্থাতেই বারেবারে নলটা সরাবার চেষ্টা করে। ডাক্তার শাফি জানালেন ল্যাবটেস্টের রিপোর্ট আসলে ওনারা পরবর্তীতে কি করবেন সেটা আলোচনা করবেন। কাল আর পরশু শনিরবিবার। যেহেতু আম্মার কন্ডিশান স্ট্যাবল আছে, তাই তেমন দুশ্চিন্তার কিছুই নাই। উইকএন্ড হলেও, ডাক্তার এই দুদিনই আসবেন। কিন্তু ল্যাবরিপোর্ট মনে হয় সোম বা মঙ্গলের আগে পাওয়া যাবে না। ইমার্জেন্সি হলে, ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন হলে, অবশ্যই শনিরবি’তেও রিপোর্টের ব্যবস্থা করতো। কিন্তু আম্মার ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন নেই এখন।

আমার চোখের সামনে আম্মা নিশ্চিন্তে শুয়ে ঘুমাচ্ছেন। এর মাঝে আমাদের আর বেশি কিছু করার নাই। আমি পাশে বসে বসে সুরাকালামদোয়া পড়তে থাকলাম। মাঝে মাঝেই আম্মার দিকে তাকিয়ে আম্মার সঙ্গে কথা বললাম, হাতে হাত রাখলাম, মুখে চোখে হাত বুলিয়ে দিলাম। আম্মাকে জানালাম, আমরা সবাই দেশেবিদেশে সব জায়গায়, ওনার জন্য দোয়া করছি। আম্মার কোন রিএকশান হয় কিনা বুঝার চেষ্টা করলাম। শুনেছিলাম, এরকম কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধে থাকলেও, রোগী নাকি অবচেতন মনে অনেক কিছুই শুনতে পারে, বুঝতে পারে। মনে আছে, বছর সাতেক আগে, ভাইয়ের acute pancreatitis-এর জন্য তাকেও দশবারোদিনের জন্য ঠিক এই একই ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলো। কিন্তু ওনাকে ঘুম থেকে আস্তে আস্তে তোলার পরে উনি আমাকে দেখে একটুও আশ্চর্য হন নাই। এত হাজার মাইল দূর থেকে আমি কীভাবে ওনার বিছানার পাশে, সেটা ওনার কাছে প্রশ্ন ছিলো না, কারণ উনি ঘুমের ঘোরেই ভাবীর সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুনতে পেয়েছিলেন। এখনও সেই কথা মনে রেখেই আমি আম্মার সঙ্গে ক্রমাগত সাধারণ দৈনন্দিন কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকলাম নাজমা কোথায়, কখন আসবে, ঝোরাআরাফার স্কুলের খবর, আজকে বাসায় কী রান্না হয়েছে, ইত্যাদি সব কিছুই।

ইতোমধ্যেই টলিডোর পরিচিতজনের মাঝে আম্মার খবর চলে গিয়েছে। বিকাল থেকেই উদ্বিগ্ন সকলে হাসপাতালে ছুটে আসতে থাকলো। কে কি ভাবে সাহায্যের হাত বাড়াবে, তার চেষ্টাই সকলের। আমার সামনে কী আছে জানি না, কিন্তু আমার পাশে যে একটা সুদৃঢ় কমিউনিটি আছে, সেটার অনুভব আমাকে অনেক শক্ত করে রাখলো। ইতিমধ্যে আমি ফোনে পরিবারের সবাইকে আপডেট জানালাম। সেইন্ট লুই থেকে ডা. ইকবাল আমিন ভাইতুহীন ভাবী বললেন ওনারা চলে আসছেন। ওয়াশিংটনের অলিম্পিয়া থেকে প্রিন্স ভাইদীনা ভাবীও আসবেন। আমার জন্য অনেক অনেক বড় সহায় ওনাদেরকে পাশে পাওয়া।

শুক্রবার রাত আমি আম্মার বিছানার পাশেই চেয়ারে বসেই কাটালাম। হাসপাতালের ICU ডিপার্টমেন্টের আলাদা ওয়েটিং এরিয়া, বেশ বড় হলরুম। সেখানে বাথরুম, চাকফির ব্যবস্থা সব আছে। চেয়ারটেবিলসোফা এমনভাবে দেওয়া আছে, যে কম্বলবালিশচাদর নিয়ে এসে অনায়াসে রাত কাটানো যায়। অনেক অনেক পরিবারই এইরকম অস্থায়ী আস্তানা করে ওয়েটিং রুমে রাত কাটায়। রোগীর কেবিনে বিছানাবালিশ নিতে দেয় না; কিন্তু আবার রাতে থাকতে মানাও করে না। রোগীর কেবিনটাও বিশাল বড় এবং আধুনিক হোটেলের মতই সবকিছুই আছে সেখানে। দুই তিনটা চেয়ারটেবিলও পাতা আছে। সেগুলোর মাঝে একটা চেয়ার আছে, যেটার লিভার টেনে একদম ফ্ল্যাট বিছানাই বানানো যায়। আমি আম্মার বিছানার পাশে, সেটাতেই কাটালাম। চোখের পাতা এক করতে তো পারছি না। চোখ ঘুরছে মনিটরের স্ক্রিনে স্ক্রিনে, আম্মার মুখের উপরে, নিশ্বাসের দিকে, কিছু পরপর এলার্ম বাজে সেগুলোর দিকে আমার চোখ আর মন। হয়তো স্যালাইনের ব্যাগ বদলাতে হবে, বা ওষুধ দেওয়ার সময় হয়েছে। নার্স এসে যন্ত্রের মত সব করে দেয়, কিন্তু তারপরে আবার আমার সঙ্গে কথা বলে, আম্মার ব্যাপারে জানায় কী হচ্ছে না হচ্ছে।

হাসপাতালের দোতালায়, সকলের জন্য উন্মুক্ত একটা উপাসনালয় আছে। এখানে যে যার নিজের নিজের ধর্মমতে উপাসনা করতে পারে। হাসপাতালের মত জায়গায়, এর প্রয়োজনীয়তা খুবই গুরুত্বের। আমি আমেরিকার সব হাসপাতালেই এটা দেখেছি, কোথাও কোথাও হয়তো চ্যাপেল বলে। অনেক অনেক এয়ারপোর্টেও এরকম আছে। আমি সুযোগ পেলেই, নামাজের সময় হলে সেখানে গিয়ে নামাজ পড়ে নিই। এই হাসপাতালের দোতালার সেই রুমেও জায়নামাজ আছে, ওয়াক্তের সময় দেখা যায় দুইতিনজন এসেছে, এবং জামাতে নামাজ পড়ছে। ডাক্তারইন্টার্ণস্টুডেন্টরোগীরোগীর আত্মীয় সকলেই এখানে উপাসনা করে। আমিও আমার নামাজ এখানে এসেই পড়ে নিলাম।

শনিবারে সেইন্ট লুই থেকে ডাক্তার ভাই ইকবাল আমিন ও তুহীন ভাবী পরিবার নিয়ে চলে এলেন। ওয়াশিংটনের অলিম্পিয়া থেকে প্রিন্স ভাই ও দীনা ভাবীও আসলেন। ওনারা পাশে আসায়, আমার আরো কিছুটা ভরসা বাড়লো। টলিডোর সক্কলে তো আছেনই, এখন নিজের ভাইদের পেয়ে আরো শক্তি এলো বুকে। ডাক্তার ভাই আম্মাকে নিজে দেখে ডাক্তারনার্স সকলের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করলেন। উনি geriatric স্পেশালিস্ট, মানে বয়স্কদের ডাক্তার, তাই আমরাও ভরসা পেলাম উনি আসাতে। আমাদেরকে উনি বুঝাতে লাগলেন, আম্মার কী হয়েছে, বা কী হতে পারে। টেস্ট রিপোর্ট কিরকম আসতে পারে এবং তার মানেটা কি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মাথায় কিছুই ঢুকে না। আমি আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করি এই তিন ভাইয়ের উসিলায়ও যদি আম্মা ওনার ঘুম থেকে উঠে বসেন। ভাই আম্মার পায়ের পাতায় আঙুল টেনে সুড়সুড়ির মত দিলেন আর আম্মাও মনে হলো পা’টাকে নাড়ালেন। বেশ কয়েকবার করলেন। আমার মাথায় ধপ করে মনে হলো, তাহলে তো আম্মা রেস্পন্স করছেন। ইনশাআল্লাহ্‌? উনি আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার। ভাইও ডাক্তারদের মতই বন্ধ চোখের পাতা খুলে টর্চের আলোয় চোখের মনির ভিতর দেখলেন। আমরা তো কিছুই বুঝি না, শুধু মনে হয়, আমাদের আম্মা কই?

রবিবারদিন ঝোরাকে কলম্বাসে ওর ডর্মে নামিয়ে দিতে হবে। ভাইপো রাহীন থাকায়, আমার সেই দুশ্চিন্তা চলে গেলো। তাহলে, আমাকে চারপাঁচ ঘণ্টা ড্রাইভ করতে হতো। আমি চাইছিলাম, যতক্ষণ পারি আম্মার পাশে পাশে থাকি। আম্মা যদি জেগে উঠেন, ওনার যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়। ডাক্তারভাই অবশ্য বলছেন, এত তাড়াতাড়ি আম্মাকে ওরা ঘুম থেকে তুলবে না। আগে পুরাপুরি অবস্থা বুঝে নিয়ে তারপরে ডিসিশান নিবে। কিন্তু আমার মন তো আর মানে না। কেন আমি এই সপ্তাহেই পিট্‌স্‌বার্গে গেলাম? ভাইরাও দেখে শুনে, আম্মার জন্য অনেক অনেক দোয়া করে, ফিরে গেলেন।

সোমমঙ্গলবুধ তিনদিন, আমি বাসাহাসপাতাল এই দুই জায়গা ছাড়া আর কোথায়ও গেলাম না। বাসায় রান্নার কোন দরকারই পড়ছে না। টলিডোর প্রতিটা পরিবার আমাদের তিনবেলার খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। সুলতান আহ্‌মেদলুবনা, সাত্তার ভাইকিম ভাবী, ওনাদের পুরা পরিবার, বৌদিদের পরিবার, সকলেই আমাদের পাশে। এমনকি টলিডো ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা পর্যন্ত হাসপাতালে ছুটে এসেছে। তারাও খাবার নিয়ে এসেছে। আমাকে ধরে ধরে, হাসপাতালেই নিজেরা পাশে বসিয়ে খাওয়ালো। ওদের এই মমতার প্রতিদান কি আমি কোনদিন দিতে পারবো? মসজিদের ইমাম নিজে হাসপাতালে এসে দোয়া করে গেলেন। মসজিদের অন্যান্য আরো অনেকে এসেছিলো। হযরত মুহাম্মাদ (.)-এর এক সুন্নাহ হলো, অসুস্থ রোগীকে দেখতে যাওয়া। টলিডোর মসজিদগুলোতে তাই এরকম একটা ট্র্যাডিশান বা সিস্টেম চালু আছে, কমিউনিটির কেউ অসুস্থ হলে, সকলে এসে তার দেখভাল করে। আম্মার ব্যাপারেও তাই হলো।

আম্মাকে দেখতে হাসপাতালে এতজন আসছে দেখে আমেরিকানরা আশ্চর্য হতো। এখানে রোগীকে দেখতে শুধুমাত্র তাদের নিকটাত্মীয়রাই আসে। অনেক অনেক রোগী আছে, তাদের কাছে কেউই কখনোই আসে না বা আসবার নাই। যাদের আত্মীয়স্বজন আছে, তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় মাঝে মাঝে এসে দেখা করছে। তাই বলে এটাও না যে, তারা সকলেই তাদের আত্মীয়দের দেখভাল করে না। অনেক অনেক ফ্যামিলিই আছে, হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে, তাদের রোগীর জন্য। আমাদের বেলাতেও তাই। আর আম্মার কেবিনে তো সারাক্ষণই কেউ না কেউ আছেই। ডাক্তারনার্সরা জিজ্ঞেস করতো, উনি কি দেশে বড়সড় কোন সরকারি ইম্পর্ট্যান্ট পজিশানে ছিলেন? আমি বলি, না। উনি আমার মা, এবং ওনাকে সবাই ভালবাসে বলেই সকলে এসে দেখা করে যাচ্ছে। সোমবার থেকে একে একে টেস্ট রেজাল্ট আসা শুরু করলো। ডাক্তার শাফি সেগুলো দেখে দেখে, ধীরে ধীরে একটা কেসহিস্ট্রি খাড়া করবার চেষ্টা করছেন। কোনো রেজাল্টে একটা কিছুর ইঙ্গিত পেলে, সেটাকে কনফার্ম করার জন্য আরো টেস্ট করার নির্দেশ দিচ্ছেন। প্রয়োজন মত স্পেশালিস্ট ডাক্তার ডেকে এনে আম্মাকে দেখিয়ে, সকলে মিলে কন্সাল্ট করছেন। কোন কিছুরই কমতি নাই। ইতোমধ্যে আমরা ডাক্তারনার্সইন্টার্নরেসিডেন্ট সবার কাছেই বেশ পরিচিত হয়ে উঠলাম। ডাক্তার আমাকে জানালেন, হ্যাঁ আসলেই আম্মার কিডনী ফেল করেছিলো। শরীরে পটাশিয়াম এবং অন্যান্য কেমিক্যাল বেড়ে গিয়ে হার্টকে অ্যাটাক করায় Cardio-pulmonary arrest হয়েছিল। এর ফলে ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এবং ব্রেন ড্যামেজ হয়েছে। কতটুকু ড্যামেজ তা প্রাথমিকভাবে বুঝা যাচ্ছে না। আরো পরীক্ষা করতে পাঠালেন। ব্রেনের কোন অংশে ড্যামেজ সেটাও ধরতে হবে, কারণ ব্রেনের এক এক অংশ, শরীরের এক এক অঙ্গের পরিচালনা করে। হার্টলান্স, হাতপা, চোখ, শ্বাসপ্রশ্বাস সবই তো ব্রেনের কন্ট্রোলে। এখন যেই অংশ ড্যামেজ হয়েছে, সেটার অঙ্গগুলোও অচল হয়ে যাবে। যেমন ডান পাশের ব্রেন নষ্ট হলে, বাম হাতপা অবশ হয়ে যায়, আর বামব্রেনের জন্য ডান হাতপা। তাছাড়াও বার্ধক্যজনিত কারণ ও আম্মার ডায়বেটিস, প্রেসার, এজমা ও অন্যান্য আগের অসুখগুলোর জন্যও জটিলতা আরো অনেক বেশি। ডাক্তার আরো নিউরোলজিক্যাল টেস্ট করতে দিলেন। তারপরে ঠিক করলেন, আস্তে আস্তে কড়া ঘুমের ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে, আম্মাকে চেতন করে তুললে কি হয় সেটা দেখবেন। আমি ডাক্তারকে, ইন্টার্নদের রেসিডেন্টদের সকলকে বললাম, তোমরা যেটা ভালো মনে করো করবে। পরিবারের তরফ থেকে আমাদের কোন বাধা নিষেধ বা কুসংস্কার নাই। চিকিৎসা দরকার, চিকিৎসা হবে। বাকিটুকু আল্লাহ্‌র হাতে। এর মাঝে সোমবারে আর একটা জিনিস হলো। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আম্মার ইমিগ্রেশান অনুমোদনের কাগজ চলে এলো। আম্মা এখন আমেরিকার সিটিজেনশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারবেন। এই অন্তিম মুহূর্তে, এটা কেমন যেন একটা ironic ব্যাপার। আজীবন চেষ্টা করেও আমরা আম্মাকে আমেরিকার সিটিজেনশিপের জন্য রাজী করাতে পারি নাই। শেষমেশ যখন রাজী করালাম, তখন সেই লেটার আর আম্মা দেখতে পেলেন না।

টলিডো, ওহাইও, ২০১৭

x