ওসমান-নাছিরে অস্থির চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
3273

হাইকোর্টের রিট জালিয়াতি ও চেক জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় দুইবার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা ওসমান গণি (বর্তমানে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা) ও কর্মচারী সংগঠনের নেতা হিসেবে দাপট দেখিয়ে বেড়ানো মো. নাছিরে (নাছির উদ্দিন) অস্থির হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুজনের মধ্যে কর্মচারী নেতা মো. নাছিরের দাপট সবসময় থাকলেও বর্তমানে কিছুটা বেকায়দায় এই কর্মচারী। অন্যদিকে, সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় দীর্ঘসময় ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা কর্মকর্তা ওসমান গণি সমপ্রতি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। এই দুজনের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। কিন্তু সমপ্রতি সময়ে দুজনের বিরোধ চরম আকার রূপ নিয়েছে। ফলে শিক্ষাবোর্ড জুড়ে অস্থিরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সবমিলিয়ে শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ার উপক্রম বলে জানান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ওসমান ও নাছির দুজনেই নামে-বেনামে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়েছেন দুদকে (দুর্নীতি দমন কমিশনে)। সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে তা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ বিষয়ে অনুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদকের পক্ষ থেকে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর পৃথক দুটি চিঠিও দেয়া হয়েছে। দুদকের উপ-পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মো. হাফিজুল ইসলাম কর্তৃক ২৬ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত অভিযোগের অনুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশন কর্তৃক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই অবস্থায় উক্ত সিদ্ধান্তের আলোকে প্রেরিত অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে চিঠিতে। পৃথক দুটি চিঠিতে অভিযোগের ছায়ালিপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষাবোর্ড প্রশাসন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) বোর্ডের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। বোর্ডের সচিব প্রফেসর আবদুল আলীমকে আহ্বায়ক করে গঠন করা কমিটিতে উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. আবুল বাসার ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আবুল কাশেম মো. ফজলুল হককে সদস্য করা হয়েছে। দুদকের চিঠি পাওয়া ও এর প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী।
দুদকে প্রদত্ত অভিযোগ ছাড়াও ওসমান গণির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট (নং- ১৪৬৭৯/২০১৯) দায়ের করেছেন কর্মচারী নেতা মো. নাছির উদ্দিন। অভিজ্ঞতা সনদ জালিয়াতি করে চাকরি গ্রহণ ও চেক জালিয়াতির ঘটনায় শাস্তি না হওয়া এবং হাইকোর্টের রিট জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পরও গুরু দণ্ডের স্থলে তাকে লঘু শাস্তি দেয়ায় এ রিট করেন মো. নাছির। গঠিত তিন সদস্যের কমিটি ওসমান গণির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটের বিষয়টিও তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী।
এখনো চিঠি না পেলেও তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি শুনেছেন বলে জানিয়েছেন ওসমান গণি ও মো. নাছির উদ্দিন। তবে দুজনই নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন। আর এসব কর্মকাণ্ডে যথারীতি দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলছেন।
দুদকে প্রদত্ত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দাখিলের মাধ্যমে চাকরি গ্রহণ, চেক জালিয়াতি ও হাইকোর্টের রিট জালিয়াতিসহ ৯টি অভিযোগ করা হয়েছে ওসমান গণির বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৭ সালের সেকশন অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৪ বছরের সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক চাওয়া হয়। ওই সময় কঙবাজার পৌরসভায় চাকুরি করেছেন মর্মে একটি অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করেন ওসমান গণি। পরবর্তীতে একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির নিকট অভিজ্ঞতা সনদটি ভুয়া প্রমাণিত হয়। ওসমান গণি নামে কোনো ব্যক্তি তাঁর পৌরসভায় কোনোদিন চাকুরী করেননি মর্মে লিখিত ভাবে জানান কঙবাজার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান।
বোর্ডের পরীক্ষকদের সম্মানির চেক জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়, এ ঘটনায় ওসমান গণিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা কতিপয় শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার প্রলোভনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন ওসমান গণিসহ বোর্ডের একটি চক্র। নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা এসব শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের জন্য হাইকোর্টের ভুয়া একটি রিট বোর্ডে দাখিল করে চক্রটি। যা পরবর্তীতে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। এই চক্রে ওসমানগণিসহ মোট তিনজনের সম্পৃত্ততা পায় বোর্ডের তদন্ত কমিটি। অভিযোগ উঠার পরপরই তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তিনজনকেই শাস্তি দেয়া হয়। শাস্তি হিসেবে ওসমান গণিকে বেতন স্কেলের নিম্নতর গ্রেডে নামিয়ে দেয়া হয়। যদিও এটি গুরু দণ্ডে লঘু শাস্তি বলে মনে করে বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরেও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে ওসমান গণির বিরুদ্ধে।
যদিও সব অভিযোগই আগের এবং নিষ্পত্তিকৃত বলে দাবি করেছেন ওসমান গণি। তার দাবি- রিট জালিয়াতির ঘটনায় প্রথমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং পরবর্তীতে গ্রেডের নিন্মতর ধাপে নামিয়ে দেয়ার মাধ্যমে একই ঘটনায় তাকে দুবার শাস্তি দেয়া হয়েছে। আর চেক জালিয়াতির ঘটনায় আরো অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কেবল তাকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাবি ওসমান গণির। আর নতুন করে এসব অভিযোগ উত্থাপনে কর্মচারী নেতা মো. নাছিরের হাত রয়েছে বলে দাবি তার। মো. নাছিরও চারবার সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন বলে জানান ওসমান গণি। তবে নাছির কোন ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন, সেটি তাৎক্ষণিক মনে করতে পারছেন না বলে জানান বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অত্মসাতসহ ১২টি অভিযোগ করা হয়েছে কর্মচারী নেতা মো. নাছিরের বিরুদ্ধে। অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে- তথ্য গোপন করে অফিস সহকারী পদ থেকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে পদোন্নতি, স্টেনোটাইপিস্ট পদ থেকে স্টেনোগ্রাফার পদে পদোন্নতির সময় ১১-তম গ্রেডের স্থলে বিধি বহির্ভূতভাবে ১০ম গ্রেড গ্রহণ, স্কুল-কলেজের স্বীকৃতি প্রদানের তদবির করে কোটি টাকা কামাই, টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে বোর্ডের বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, ফলাফল জালিয়াতি করে অর্থ সম্পদের মালিক, বোর্ডের কাজে ফাঁকি দিয়ে অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার বাণিজ্য, বোর্ড চেয়ারম্যানের পুরনো গাড়ি বিক্রিতে দুর্নীতি, স্ত্রীর জন্য কোটি টাকা দামের গাড়ি ক্রয়, বোর্ডের পুরাতন কাগজ বিক্রিতে দুর্নীতি, চেয়ারম্যানের কক্ষ সাজানোর কাজে দুর্নীতি, প্রচারপত্র বিলি এবং বোর্ডের জায়গায় ক্যান্টিন তৈরি করার অভিযোগ উল্লেখযোগ্য।
যদিও তার বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগও সত্য নয় বলে দাবি করেছেন মো. নাছির। ওসমানসহ বোর্ডের একটি দুষ্টচক্র এসব ষড়যন্ত্র করছে জানিয়ে নাছিরের দাবি, তার বিরদ্ধে আনা একটি অভিযোগও সত্য নয়। জালিয়াতি ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় একাধিকবার সাময়িক বরখাস্ত থাকা ওসমান গণি আমার বিরুদ্ধে এসব করছেন। নতুন যোগ দেয়া বোর্ডের কয়েকজন বিসিএস কর্মকর্তার ইন্ধনে চিহ্নিত এই দুর্নীতিবাজ ও জালিয়াত কর্মকর্তা ফের মাথা চাড়া দিয়ে উঠছেন। ৩/৪ জনের চক্রটি অবৈধ ভাবে অর্থ কামানোর পাঁয়তারায় রয়েছে। বোর্ডকে তারা টাকা কামানোর উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। দুর্নীতি করে টাকা কামাতে গিয়ে একাধিকবার সাময়িক বরখাস্তও হয়েছেন ওসমান গণি। এখন তাকে ২/৩ জন বিসিএস কর্মকর্তা ইন্ধন দিচ্ছেন। যার কারণে দুর্নীতিবাজ ওসমান আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছেন। এসব কারণে বোর্ডের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে জানিয়ে সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যানের নিকট কয়েকজন বিসিএস কর্মকর্তাসহ এই চক্রটির বিষয়ে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন মো. নাছির উদ্দিন।
দুজনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো পুরনো জানিয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বোর্ডের সচিব প্রফেসর আবদুল আলীম আজাদীকে বলেন, তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। তবে এখন পরীক্ষা চলছে। তাই কম-বেশি সকলেই ব্যস্ত। যার কারণে এখনো তদন্ত কাজ শুরু করতে পারিনি। তবে খুব শীঘ্রই তদন্ত কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছেন বোর্ড সচিব।