এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুুরী : একজন ভাবযোগী ও কর্মযোগীমানুষ

ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী

রবিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী জননন্দিত নেতা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি চট্টগ্রাম সিটিকর্পোরেশনে তিনবারের নির্বাচিত সফল মেয়র মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার রূপকার আলহাজ্জ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আজ দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তিনি ৭৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর আত্মার প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা। চট্টগ্রামের এই অবিসংবাদিত প্রয়াত নেতার প্রতি ভালোবাসা হিসাবে এই নিবন্ধের অবতারণা। সাধারণভাবে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুর দিক বিবেচনা করলে ৭৪ বছর পরিণত বয়স। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামের লাখো লাখো গণ-মানুষের হৃদয়ে যেন অতৃপ্তি। কোথায় যেন একটি শূন্যতা। কোথায় যেন হাহাকার। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সমগ্র চট্টলবাসী যেন অভিভাবকহীন হয়ে গেলেন। কেননা তিনি স্বপ্ন দেখান, স্বপ্নের ফেরি করেন, আর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেন। সর্বপরি তিনি একজন ভাবযোগী ও কর্মযোগী মানুষ ছিলেন।
ঊ. ঝ. ঈৎবধংু তাঁর ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব ঙঃঃড়সধহ ঞঁৎশং গ্রন্থে লিখেছেন, একজন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি একটি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হবেন এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হবে। কারণ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চায়। চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ঠবৎড়হরপধ গরপযধবষ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎধফঁধঃব পবৎবসড়হু-তে বলেছিলেন, স্বপ্ন দেখা ছাড়া মানুষ এগুতে পারে না। একজন সঠিক স্বাপ্নিক মানুষ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবেই। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামও বলেছিলেন, আমরা ঘুমিয়ে যা দেখি তা স্বপ্ন নয়, যা আমাদের ঘুমাতে দেয় না তাই স্বপ্ন। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের যুবরাজ ওসমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। তিনি সত্যিই একটি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং তাঁর বংশধরেরা একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পৃথিবীতে যে সকল মানুষ বিখ্যাত হয়েছেন; তাঁদের স্বপ্ন, ভাবনা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেগুলো তাঁরা বাস্তবায়নও করতেন। কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা একাধারে ভাবনা করতে পারে, পরিকল্পনা করতে পারে, কর্মী হতে পারে, নেতা হতে পারে, জননেতা হতে পারে, যারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে, যারা নগরের স্বপ্ন দেখে, যারা মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখে। এ রকম ক্ষণজন্মা মানুষ আমরা খুব কমই দেখি; যারা দেশ, জাতি, সমাজ, অঞ্চল, সম্প্রদায়, গণতন্ত্র, মুক্তির অগ্রদূত হন। আবার কখনও কখনও সমাজ, দেশ এবং জাতির ক্রান্তিকালে তাঁর নেতা যখন উদাত্ত আহ্বান জানান; তখন নিজের জীবনবাজি রেখে যুদ্ধেও যেতে পারেন। সেরকম একজন মানুষ হচ্ছেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া এ মানুষটি কৈশোরোত্তরণের লগ্নেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। শোষণমুক্ত দেশ ও বাঙালির মুক্তির স্বপ্নকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন তিনি। তিনি একজন অবিসংবাদিত জননন্দিত নেতা। তিনি কখনও শ্রমিক নেতা, কখনও প্রকাশক, কখনও কর্মী, কখনও নেতা, কখনও জননেতা। আবার কখনও পিতা, কখনও অভিভাবক, কখনও কঠোর, কখনও নির্মল, কখনও মানব, কখনও মহামানব এর মত। সাগর, নদী, পাহাড় এবং সমতলে গড়া চট্টগ্রামের প্রকৃতি যেন তাঁকে নিজ হাতে তৈরি করেছে। আমরা তাঁর মধ্যে দেখি চিরন্তনী শক্তি। সত্তরোর্ধ্ব এই মানুষটার মধ্যে আমরা শেঙপিয়র এবং কাজী নজরুল ইসলামের মত যৌবন দেখি যেখানে বার্ধক্য স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সবসময় বার্ধক্যকে মোকাবেলা করেছেন। তিনি কাজ-কর্ম এবং মানসিকতায় সর্বদা নবীন এবং অচিন্তনীয় পরিশ্রমী। মৃত্যুঞ্জয়ী এই বীর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াও দেশমাতৃকার প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বা বাক পরিবর্তনে জনগণকে নিয়ে রাজপথে থেকেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। বারংবার জেল, জুলুম ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রায় দু’দশকের মেয়র হিসেবে নির্বিত্ত-মানুষের কল্যাণে বহু প্রকল্প তিনি গ্রহণ করেছিলেন। জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি মানুষের মঙ্গল, কল্যাণ, দেশের চিন্তা, মানুষের চিন্তা, সমাজের চিন্তা বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতির জন্য কাজ করেছেন। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন, জনগণকে দারিদ্রের ভেড়াজাল থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হচ্ছে তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ঋদ্ধ করা। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হয়েও মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষাকে তাদের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করেছেন। দলের দায়িত্বশীল নেতা কিংবা ক্ষমতাশীন দলের সদস্য হয়েও দলের কর্মসূচির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় অনেক উদ্যোগের বিপক্ষেও তিনি অবস্থান নিয়েছেন। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে চট্টগ্রামের পোর্টকে বিদেশি শক্তির নিকট হস্তান্তর ঠেকাতে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। শ্রমিক, কর্মচারী, স্থানীয়দের অধিকার আদায়ের জন্য এবং বেনিয়া শক্তি তথা আন্তর্জাতিক শক্তির হাত থেকে তিনি চট্টগ্রামের পোর্টকে রক্ষা করেছেন। চিন্তক এবং পরিকল্পক হিসেবেও তিনি সমভাবে খ্যাতিমান। যেমন: ব্রিজের পিলারগুলোর কারণে নদীতে পলি জমে যে চরের সৃষ্টি হয় এবং নদীর নাব্যতা নষ্ট হয় সে কারণে তিনি টানেলের চিন্তা করছেন। তিনি সিটি গভর্নমেন্টের চিন্তা করেছেন। পরিচ্ছন্নকর্মী তথা মেথরদের তিনি সেবকের মর্যাদা দিয়েছেন। তাদের পড়ালেখার ব্যবস্থা তিনি করেছেন। এমনকি তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি নিজে উপস্থিত হতেন। অথৈ-শূন্যতাবোধ নিমজ্জিত, শোষকের হাতে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত শ্রমিকদের আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য দেশীয় সব শোষক ও ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন কঠোর আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতেও তিনি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হন নি। হজ্বে গমনকালে কোন হজ্বযাত্রী অসুস্থ হয়ে গেলে তিনি তাদের সেবা করতেন। বৃদ্ধ হজযাত্রীদের কলেরা বা ডায়রিয়া হলে তিনি তাঁদের কাপড় পর্যন্ত ধুয়ে দিতেন। তাঁদের রান্না করে খাওয়াতেন। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বহু বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও সৎকারের ব্যবস্থা করেছেন। ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার জন্য ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছেন। নগরীর মুসলিম হলে রোগীদের জন্য স্যালাইন তৈরি করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। কালুরঘাটে গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকান্ডে অনেক কর্মীর পুড়ে যাওয়া লাশ দাফন ও সৎকার করেছেন। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। বন্দরটিলায় নৌবাহিনীর সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষে নিহতদের দাফন ও সৎকারে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে। এইসব করুণাঘন মানবরূপই চট্টগ্রামের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, সহায়-সম্বলহীন মানুষের বন্ধু করেছে তাঁকে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে ১৯৭৬ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে গ্রেফতার হয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জাতি বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিল, তখন মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রামে অভাবনীয় বিজয় মেলার আয়োজন করেছিলেন। ’৯০ পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা-মুক্তি তথা বিজয়ের গান, জনতার মঞ্চ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চট্টলবাসীর হৃদয়ে প্রোথিত করেছিলেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে অনেকটা গোপনে ঢাকায় তাঁকে দাফন না করে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। আমৃত্যু টুঙ্গিপাড়ায় চট্টগ্রামী মেজবানের আয়োজন করে মানুষকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। ১৯৯৫ সালে যখন স্বৈরাচারী কায়দায় অন্যায়ভাবে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তখন চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে চট্টগ্রামকে অচল করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের সকল শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় তিনি সেদিন প্রধান শিরোনাম হয়েছিলেন। সেদিন থেকেই তিনি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের কীর্তিমান পুরুষ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিলেন। যতবার সমরিক শাসক তথা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে, ততবারই তাঁর স্থান হয়েছে কারাগারে। অকারণে ২০০৭-২০০৮ সালে ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলার যাঁতাকলে জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার মত মহিউদ্দিন চৌধুরীও গ্রেফতার হন। যার জন্য দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত প্রিয় কন্যাকে তার জীবদ্দশায় দেখেও যেতে পারেন নি। কারাজীবনেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা টুম্পাকে। মন্ত্রীত্ব না নিয়ে, আওয়ামী লীগের মত দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য না হয়ে কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটিতে না গিয়ে একজন আঞ্চলিক নেতা হিসেবে তিনি জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে বিজয়মেলা পরিষদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণসামগ্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ বস্ত্র প্রভৃতির ব্যবস্থা করেছিলেন। মহিউদ্দিন চেীধুরী শুধু চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং চিন্তাকে কাজে পরিণত বা সম্পাদন করে তা মানুষকে দেখিয়েছেন। কেউ চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে চাইলে ভিসার ব্যবস্থা বা চিকিৎসকের সাক্ষাৎকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তিনি করে দিতেন। মাসব্যাপী হাজার হাজার রোজাদারদের ইফতারের ব্যবস্থা তিনি করতেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে ওঠে মানুষের ভালোবাসাকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। যা সত্যিই অভাবনীয় এবং বিরল।
১৯৩০ এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন তথা শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম পথিকৃত আব্দুল অদুদকে বলা হত ভাবযোগী এবং আবুল হোসেনকে বলা হত কর্মযোগী। অর্থাৎ একজন মানুষের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী যেটা ভেবেছেন, সেটাকে কর্মে রূপ দিয়েছেন এবং সফল ও সার্থক হয়েছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে আসা, ছয় দফার সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী একজন বাস্তবধর্মী রাজনীতিবিদ। চারিত্রিক দৃঢ়তা, আপোষহীন মানসিকতা, সম্মোহনী শক্তি, কোমলতা-কঠোরতার সংমিশ্রণ তাঁকে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষে পরিণত করেছিল।
তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তিনি অনেক প্রতিকূলতা, চক্রান্ত এবং বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেছেন। দলীয় নির্বাচনে অতন্দ্র প্রহরীর মত ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়েছেন। একটা মানুষের মধ্যে সবগুলো কাজ করার সামর্থ্য না থাকলেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর মধ্যে তা ছিল। তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মহামানব। তিনি শুধু হুকুম দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না, নিজেও সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সশরীরে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর বাসা থেকে খালি মুখে ফিরে এসেছেন এমন কোন নজির নেই।
চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার আয়োজন তাঁর অসামান্য কীর্তি। ৭৫’ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎপরবর্তী জাতীয় চার নেতাকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ৭১’ এর পরাজিত শক্ররা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ও অসম্প্রদায়িক চেতনাকে ভুলুণ্ঠিত করে অনেকটা পাকিস্তানি ধারায় দেশ পরিচালিত করেছিলেন। এই গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ার প্রত্যয়ে চট্টগ্রামের মুক্তিকামী অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার বীর বাঙালির অহংকার নামে ১৫ দিনের আলোচনা স্মৃতিচারণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আবহমান বাঙালির লোকজ মেলার আয়োজন করেন। এখন তাঁর সুযোগ্য পুত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মহীবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এম.পি. এর নেতেৃত্বে বিজয় মেলা পরিষদের উদ্যোগে এই বছরও অত্যন্ত তাৎপর্যসহ বিজয় মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী দিনের যুবসমাজকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও অপসংস্কৃতি রক্ষা করার প্রয়াসে তিনি উদ্বোধনী দিনের ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায় বিখ্যাত দার্শনিক কবি ইয়ং বেঙ্গল আলোচনায় খ্যাত ডিরোজিওর উক্তিটি উচ্চারিত হয়। ডিরোজিওর ভাষায় –
্তুঊীঢ়ধহফরহম ষরপব ঃযব চবঃধষং ড়ভ ুড়ঁহম ভষড়বিৎং
ও ধিঃপয ঃযব মবহঃষব ড়ঢ়বহরহম ড়ভ ুড়ঁৎ —–,
(যুবসমাজ হচ্ছে ফুলের না ফোটা পাঁপড়ির মতো ু
যাদের স্বপ্ন অসম সাহস বদলে দিতে পারে সমাজ মনোবৃত্তিকে। )
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাদের মোল্লার যেদিন ফাঁসি হচ্ছিল, সেদিনও মহিউদ্দিন চৌধুরী বিজয় মেলার মঞ্চে কিছু কর্মীসহ হাতে লাঠি নিয়ে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান চালিয়ে অসম্ভব সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে অনন্যসাধারণ যোগ্যতা ও কর্মস্পৃহা ছিল। নেতৃত্বের সকল গুণাবলীর অধিকারী মহিউদ্দিন চৌধুরী স্বাপ্নিক পুরুষ ছিলেন। তাই তাঁকে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা বলেও আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর স্বপ্ন, চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের মধ্যে এক গভীর মেলবন্ধন পরিলক্ষিত হয়।
২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পূর্বেও তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি দিয়েছিলেন এবং চট্টগ্রামকে নিয়ে ভেবেছেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি ছিল। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, জনতা, রাজনৈতিক কর্মী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সংস্পর্শে আসলে তাঁর প্রদত্ত সিদ্ধান্ত সবাইকে আকর্ষণ করত । শিক্ষক, গুণী ব্যক্তি, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের তিনি খুবই সম্মান করতেন। শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থতার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁর ভাবনা, আরাধ্য ও স্বপ্নের শহর চট্টগ্রামের মাটিতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। চট্টগ্রামেই তাঁকে দাফন করা হয়। চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে তিনি আমৃত্যু ভালোবেসেছেন। তিনি এক অসাধারণ কর্মবীর, ভাবযোগী ও কর্মযোগী মানুষ। এ ধরনের চিন্তা-চেতনা-কর্ম মানুষকে অবিস্মরণীয় করে রাখে। এ সকল কারণেই আমরা আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মত একজন ক্ষণজম্মা মানুষের মধ্যে ভাবযোগী ও কর্মযোগী উভয় গুণে গুণান্বিত মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।
তাঁর জানাজায় লাখো লাখো মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে তিনি কি রকম জনপ্রিয় ছিলেন এবং গণ-মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম বিশেষ করে চট্টগ্রামের অধিকার আদায়ে গণমানুষের ভালোবাসা-আস্থা-নির্ভরতা ও নেতৃত্বে সাফল্যের চরম শিখড়ে (তবহরঃয ড়ভ যরং ঢ়ড়বিৎ) পৌঁছে গিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ল্যাবরেটরী ছোটগল্পে লিখেছেন, ‘জীবনের কাহিনী সুখে-দুঃখে বিচলিত হয়ে চলে। শেষ অধ্যায়ে কলিশন লাগে, অকস্মাৎ ভেঙ্গেচুড়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। বিধাতা তাঁর গল্প গড়েন ধীরে ধীরে, গল্প ভাঙ্গেন এক ঘায়ে।’ মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনের গল্প অনেকটা সেরকম। একটি পরিণত বয়স, দীর্ঘদিনের ঘাত-প্রতিঘাত-সংগ্রামে গড়ে ওঠা জীবনের প্রদীপ যেন সামান্য ঘায়ে নিভে গেল, যেটি চট্টগ্রামের মানুষ কোনদিন ভুলতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মৃত্যুঞ্জয় কবিতায় লিখেছেন, “তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও, আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়ো-”। তাঁর চিন্তা ও কর্মে বিকশিত হয়েছেন নবজাগরণের গন্ধে, নব বিকাশের বলে এবং মৃত্যুর চেয়ে বড় হয়ে রইলেন আমাদের মহিউদ্দিন চৌধুরী।
লেখক: ডিন, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ এবং অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x