এ জার্নি বাই ট্রেন

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
30

দু’মাস আগের কথা। ট্রেনে চড়ে ঢাকা যাচ্ছি। আমার পাশের সহযাত্রী এক বৃদ্ধ। বয়স আনুমানিক সত্তুর। যাত্রার প্রথমেই তিনি আমাকে বললেন, ‘বাবা, আমার সিটটা জানালার পাশে পড়েছে’।
আমি সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিলাম। তিনি জানালার পাশে বসলেন। একটু পর নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। জানালার পাশের সিটটা আসলে আমার। আমি গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ট্রেন জার্নিতে আমাকে বিবিধ কাজে ক্যান্টিনের আশেপাশে থাকতে হয়। কাজেই উনার এই ভুলের ব্যাপারটা আমি প্রথম থেকেই জানি। বৃদ্ধ মানুষ বলে ভুল ভাঙাইনি।
আমি তাকে বললাম, ‘কোনো ব্যাপার না। আপনি জানালার পাশেই বসুন। তাছাড়া আমি জানালার পাশে বসলে আপনার তকলিফ হবে’।
এরপর তিনি কিছু বললেন না। একটু খুশি হলেন মনে হলো। তারপর সঙ্গে থাকা ঝোলা খুললেন। ঝোলার মধ্যে পানের আয়োজন দেখা গেলো। তিনি পান বানিয়ে মুখে দিলেন। অনেকদিন পর জর্দার সুন্দর গন্ধ পেলাম। আমি বললাম, ‘হাকিমপুরী জর্দা নাকি?’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। বাবা, আপনি কি পান খেতে চান?’
আমি হেসে ফেললাম। আমার এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে ‘ডন’ মনে হলো। বললাম, ‘ডন পান নেহি খাতা’।
‘বাবা, কী বললেন বুঝিনি’।
‘এটা অমিতাভ বচ্চনের একটা সিনেমার ডায়ালগ। আপনি তাকে চিনেন?’
‘না।’
পান খাওয়া শেষে বৃদ্ধ আবার ঝোলায় হাত দিলেন। তিনি বাড়ি থেকে রুটি আর সবজি নিয়ে বের হয়েছেন। খেতে-খেতে তিনি আমাকে বললেন, ‘বাবা, ডন কি রুটি সবজিও খায় না?’
আমি বললাম, ‘জী, না। ভিলেন কখনো রুটি-সবজি খায় না’।
এর মধ্যে ট্রেনের ভেতর হকার দেখা গেলো। আমি এক কপি প্রথম আলো কিনলাম। আমাকে পত্রিকা কিনতে দেখে তিনি বললেন, ‘বাবা, এই পত্রিকায় ফিলিস্তিনের খবর ভালো দেয় না। আপনি এটা বদলে নয়া দিগন্ত নেন’।
আমি ফিলিস্তিনের খবর পড়ার জন্য রাজি হলাম না। এজন্য আখাউড়া পর্যন্ত আমাকে টানা বকবক শুনতে হলো। তিনি মুসলিম দেশগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলা শুরু করলেন। একটু পর বললেন, ‘এই যে আপনি নয়া দিগন্ত নিলেন না, এর পেছনে আছে ইসরাইলের চাল। দুনিয়াটা তাদের হাতে চলে যাচ্ছে। আফসোস।’

এই পর্যায়ে আমি আফসোস কাটাতে ক্যান্টিনের দিকে গেলাম। সেখানে বেশি দামে কফি বিক্রি হচ্ছে। কিছু টাকা খরচ করলাম। ফেরার পর বৃদ্ধকে দেখলাম, ঝোলার ভেতর হাত দিচ্ছেন। আবারো পান বানাবেন। এর মধ্যে ইমাম গাযযালীর একটা বই দেখা গেলো। আমি বিনীতভাবে বইটা চাইলাম।
বৃদ্ধ পান মুখে নিয়ে আবারো বকবক শুরু করেছেন। কিন্তু কী যেন হলো। আমি বইয়ের ভেতরে ঢুকে গেছি। তার কথা শুনতে পাচ্ছি না। বইটার প্রতিটি পাতায় মৃত্যুর বর্ণনা। কীভাবে শরীর থেকে আত্মা বের হয়ে যায় এসবের বর্ণনা। প্রচুর কোলাহলের ভেতর একা হয়ে গেলাম। অস্বস্তি হতে লাগল। ক্রিসমাসের আগের রাতের নাইটমেয়ারের মতো।
বৃদ্ধের সঙ্গে ট্রেন জার্নি সেদিনই শেষ। কিন্তু ইমাম গাযযালীর লেখার সঙ্গে আমার এই ট্রেন জার্নিতেই পরিচয়। পরে তার ‘কিমিয়ায়ে সা’আদাত’ আমি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। তবে আমাকে এক গুণীজন বলেছেন, কার্ল মার্কস এবং ইমাম গাযযালী কখনোই গুরু ছাড়া পড়তে নেই।

x