এ কে এম আবদুল মন্নান : পিতা ও নেতা

শ্রদ্ধাঞ্জলি

ইয়াসমিন ইউসুফ

শুক্রবার , ২২ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

এ. কে. এম আবদুল মন্নান ছিলেন দক্ষিণের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনকারী আলোকিত এক চরিত্র। নিজ দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা ও মেধার চরম উৎকর্ষ সাধনে ব্রতী এই মানুষটি ছিলেন বহুলাংশেই নিভৃতচারী মানুষ।
জীবনের শুরু থেকেই বুঝতে শেখা আমাদের জীবন এক সূত্রে বাঁধা নেই। বারবার তাল কেটেছে। উত্তেজনা অস্বাভাবিক পরিবেশ পরিস্থিতি, কষ্টের মধ্যেও আমার ছোট ছোট আনন্দ ভাললাগা ছিল। যদিও ঘটনা, পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রতিটি মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় চিন্তা-চেতনায় স্বাতন্ত্র্যের বিভিন্নতা এনে দেয়। আমার কাছে আমার বাবা ছিলেন স্বপ্নের রাজপুত্র। আকাশের অসংখ্য জ্বলজ্বলে তার মাঝে প্রতিনিয়ত আমি তাঁকে খুঁজে বেড়াই। কেন জানি মনে হয় আকাশের জ্বলজ্বলে তারার কোন একটির রূপ ধারণ করে আশির্বাদের দুই হাত বাড়িয়ে তাকিয়ে আছেন আমার মাতৃভূমির দিকে। তারা ভরা আকাশের জ্বলজ্বলে তারাটি আরো শক্তিশালী দ্যুতি নিয়ে ফিরে আসবে এই মাটিতে। ফিরে তাকে আসতে হবে। তার রেখে যাওয়া কর্মের মধ্য দিয়েই ফিরে আসবেন বারবার বহুবার।
আমার বাবার মত লোকদের বলা হয় ছালেহীন। ছালেহীন লোকেরা এই যুগে জন্মায় না। তারা জন্মাতো বড় বড় নবীর আমলে। বড় বড় মনীষীর আমলে। বাবাকে আমি যে সময়টুকু দেখেছি তাতে আমার সব সময় মনে হতো তিনি যা কিছু করেন, যা বলেন, সেখানে অবধারিত কিছু না কিছু শিক্ষ্যণীয় অনুকরণীয় উপাদান থাকেই। এমন যদি হতো, সময়কে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত পেছন দিকে। বাবার কাজ কর্ম, ব্যস্ততা সব যেন ছিল মানুষের জন্যই। মানুষগুলো পছন্দ করা শুরু করলাম। কিন্তু এদিকে বাবার দেখাই পাওয়া যায় না। এই দেখতাম আছে, পর মুহূর্তেই নেই, অথবা লোকজনের মাঝে তিনি। মিটিং, মিছিল, শ্লোগান, আন্দোলন আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত শব্দ। আমার বাবা ভালবাসতে আর ভালবাসা বিলিয়ে দিতেই শুধু জানতেন। আমার বাবার ব্যক্তিত্ব, কোন রকম বাহুল্য ছাড়া জীবনাচার, সংযম, বাবার সরলতা, ধৈর্য আমাকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষণ করতো। বাবার ভেতরে অচেনা গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করতো। এই গভীরতাকে খুঁজতে আমি শিশুকাল থেকে আকাশকে ভালবাসতে শিখেছি। মনে হত আকাশের সীমাহীন বিশালতা শুধু আমার বাবাকেই মানায়। এই দক্ষিণ জেলা হল আমার বাবার সন্তান। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর লালন পালনও করেছেন কিন্তু সন্তান প্রসবের যে যন্ত্রণা উনি সহ্য করেছেন তা আমি একেএম আবদুল মন্নান স্মারক গ্রন্থ বের করতে গিয়ে তাঁকে সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। তাকে জানার চেষ্টায় যতটুকু জেনেছি তার চেয়ে বহুগুণে বিস্মিত হয়েছি। বাবা যেখানে ঘুমিয়ে আছেন মানে আমাদের বাড়ি। সে জায়গাটি আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান। বাড়িতে যাওয়ার আগেরদিন আমার মনে কেমন যেন ঈদ ঈদ ভাব আসতো।
আমার বাবা ছিলেন পাহাড়ের মত উঁচু, সাগরের মত বিশাল, আকাশের মতো অসীম। আজ বাবাকে বড় বেশি মনে পড়ছে। আমার এমন দিন যায় না যেদিন আমি তাকে স্মরণ করি না। তিনি আমার কাছে এতবেশি পবিত্র, এত বেশি শ্রদ্ধার, এত বেশি ভাবনাগার যে সারাজীবন তাকে মনে করলেও আমার মন এতটুকু ভরবে না। বাবা ছিলেন আমার বিস্ময়। আমি জানি এই জীবনে তাকে জানান আমার শেষ হবে না। বাংলাদেশের ভূ-খন্ডের সমস্ত ধূলোবালি কাদায়, চিরগৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ভাজে, গর্বিত বিজয়ে। পরবর্তীর আশা-নিরাশা-হতাশা-সম্ভাবনা সবকিছুতেই তিনি থাকবেন। অন্যায় অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তির পথ দেখাতে আলোর মশাল হাতে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের সেদিন যে মানুষগুলো এগিয়ে এসেছিলেন আমার বাবা মানুষটি তাদেরই একজন। আমার বাবা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোন কাজে কোন কিছুতেই নিজে কৃতিত্ব দাবি করেননি। কর্তব্য বিবেচনায় রেখে নিঃস্বার্থভাবে শুধু কাজই করে গেছেন যা কি না দক্ষিণ জেলার ইতিহাসে বিরল। তাই হয়তো মুক্তিযুদ্ধের উত্থান-দিনগুলোতে তিনি তার সহকর্মীদের বলতেন আসুন আমরা এমনভাবে কাজ করি ভবিষ্যতে যখন ঐতিহাসিকেরা দক্ষিণ জেলার ইতিহাস রচনা করবে তখন আমাদের খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। জীবনে ভাললাগা যে কত রকমের হতে পারে কোনটার সাথে কোনটার যে তুলনা চলে না তার যে একটি সুন্দর উদাহরণ বাড়িতে স্থাপিত আমার বাবার ম্যুরালটি। এই অনুভূতি লিখতে বসে আমার স্বপ্ন আর বাস্তবের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তখন আমার দুচোখের পানি কিছুতেই বাঁধ মানতে চায় না। আমি আশ্রয় খুঁজি আকাশে। আগামীকাল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে জানাই শ্রদ্ধা।
লেখক : সহ সম্পাদক, দৈনিক আজাদী

x