এলিজি-শাম্মী আখতারের জন্য

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
87

কিছু শিল্পী থাকেন যারা ক্রমশঃ শ্রোতাদের কাছে ঘরের প্রিয় মানুষের মতো হয়ে ওঠেন। দূর আকাশের তারা মনে হয় না তাদের। শাম্মী আখতার ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী। মায়াবী কক্তসুধা, ধীরস্থির ব্যক্তিত্ব আটপৌরে বাঙালিয়ানা নিয়ে তিনি ছিলেন আপামর বাঙালির প্রিয় শিল্পী। তার শান্ত ও নিরহংকার স্বভাবের গুনে তিনি সংগীত জগতের কলাকুশলীদের কাছেও ছিলেন অত্যন্ত সমাদৃত।

শাম্মী যখন প্লেব্যাকে গাইতে আসেন তখন রুনা সাবিনা শাহনাজ এঁদের দাপুটে সময়। ফেরদৌসী রহমান গাইছেন তখনো। এরকম এক চ্যালেঞ্জিং সময়ে তিনি সিনেমায় গাইতে এসেই যে কেবল মাত করলেন তা নয়, প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলেন। এটা সম্ভব হলো তার সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত গায়কী এবং মৌলিক কক্তস্বরের গুণে। শাম্মীর এই মৌলিক কক্তস্বর ছিল একই সাথে সুরমাধূর্যে পরিপূর্ণ এবং অত্যন্ত প্রশিক্ষিত। যে কারণে সুরের পর্দার উঁচু থেকে খাদ সকল স্তরে অনায়াস উঠানামা ছিল তার আয়ত্বে। চমৎকার মডিউলেশন এবং ইম্প্রোভাইজেশন ছিল তার কক্তে যা তার মীড়গুলোতে ধরা পড়তো। এত অনায়াস চলনের গায়কী খুব কম শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। সহজিয়া গায়নভঙ্গি, কিন্তু শতভাগ সচেতনতা। এটা কেবল শিক্ষা প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে হয় না। সহজাত একটা ব্যাপার থেকেই এটা হয়। যা শাম্মী আখতারের মধ্যে ছিল। সাথে ছিল শুদ্ধ স্বর ও সুর যা হয়তো প্রশিক্ষিত এবং নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়ে অধীত।

শাম্মীর প্রকৃত নাম শামীমা আখতার। জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ তে যশোরে। বেড়ে ওঠা খুলনায়। সরকারী কর্মকর্তা বাবা শামসুল করিমের বদলির চাকুরীর কারণে বিভিন্ন জেলায় থেকেছেন এবং এসব জেলার প্রথিতযশা সংগীত শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। ছয় বছর বয়েসে তার সংগীত জীবনের শুরু বরিশালে ওস্তাদ গৌরবাবুর কাছে হাতে খড়ির মধ্য দিয়ে। এরপর তালিম নেন রাজবাড়ির ওস্তাদ বামনদাস গুহরায় এবং খুলনার সাধন সরকার, রনজিৎ দেবনাথ, নাসির হায়দার ও প্রাণবন্ধ সাহার কাছে। মূলতঃ খুলনাতেই তার সংগীত শিল্পী হয়ে গড়ে ওঠা। ১৯৭০ সালে তিনি খুলনা বেতারে গাইতে শুরু করেন ১৫ বছর বয়েসে। এখানে আধুনিক ও নজরুল সংগীত পরিবেশন করতেন। ১৯৭৫ সালে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের আমন্ত্রণে ঢাকা বেতারে গাইবার সুযোগ পান। ১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাম্মীর বিয়ে হয় সংগীত শিল্পী আকরামুল ইসলামের সঙ্গে যিনি আজীবন শাম্মীকে প্রেরণার ছায়া দিয়ে গেছেন গাইড কাম ফিলোজপার এর মতো। বিয়ের পর স্থিত হন ঢাকায় এবং তখন থেকেই তার সংগীত জীবনের তুঙ্গ সময়ের শুরু।

১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে পরবর্তী এক দশক ঢাকা বেতারের একটি সান্ধ্যকালীন আয়োজন ছিল ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস। অনেকেরই আশা করি সে আয়োজনের ‘রঙধনু’ অনুষ্ঠানটির কথা মনে আছে। এ অনুষ্ঠানে নিত্য নতুন আধুনিক দেশাত্ববোধক গান পরিবেশন করা হতো, কথা ও সুরের চমৎকারিত্বে প্রতিটি গান ছিল অসাধারণ। প্রথিতযশা গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীরা ছিলেন সে সব গানের স্রষ্টা। এসব গানের অনেকগুলিই পরবর্তী সময়ে সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে। শাম্মী আখতার ছিলেন ঢাকা বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের অপরিহার্য শিল্পী। অনেক গান গেয়েছেন। কয়েকটি গান অবিস্মরণীয়। যেমন আধুনিক ‘সবাই তো বাঁচতে চায়’ ‘ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না’, ‘দুঃখই ওরা শুধু পায়’ কিংবা রফিকুল ইসলামের সাথে দেশাত্ববোধক ‘আমার বাউল মনের একতারাটা’।

ঢাকায় আসার পর রেডিওর পাশাপাশি টিভিতেও যুক্ত হন শাম্মী। তবে তার ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তির শুরু ১৯৭৯ সালে। এ বছর সত্য সাহা তাকে প্লে ব্যাকের সুযোগ দেন অশিক্ষিত ছবিতে। ‘আমি যেমন আছি তেমন রবো’ এবং ‘ঢাকা শহর আইস্যা আমার’ (খন্দকার ফারুক আহমেদের সঙ্গে দ্বৈত কক্তে) এ দুটি গান প্রথম ছবিতে শাম্মী আখতারকে প্লে ব্যাকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয় এবং অপরিহার্য করে তোলে যা অব্যাহত ছিল জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। প্রায় ৪০০ টি ছবিতে প্লে ব্যাক করেছেন তিনি। ২০১০ সালে ‘ভালো বাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’ ছবিতে একই শিরোনামের গানের জন্যে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান (কথা মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, সুর শেখ সাদী খান)। শাম্মী আখতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটির সংগীত বোর্ডের সদস্যও ছিলেন যা একটি বিরল সম্মান। শাম্মী গত ছয় বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি গেয়ে গেছেন যা একজন শিল্পীর জন্যে শ্লাঘার বিষয়।

প্লে ব্যাকে শাম্মী সত্য সাহা, আলম খান ও শেখ সাদী খানের সুরে বেশী গেয়েছেন, বিশেষ করে সত্য সাহার, যিনি ছিলেন তার ম্যানটর। আর এই তিন সুর স্রষ্টার সুরে আমাদের লোকজ সুরের প্রভাব ছিল লক্ষনীয়। শাম্মী আখতারের কক্তে লোকসুর ভিত্তিক গানগুলি খুলতো বেশী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় অশিক্ষিত ছবির দুটি গান, উজান ভাটি ছবিতে ‘বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইলো না’ খেলিব প্রেমের পাশা (বিরহ ব্যথা), আমার নায়ে পার হইতে লাগে ষোল আনা (মাটির ঘর)। তেমনি তার আর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্লে ব্যাক; ঐ রাত ডাকে ঐ চাঁদ ডাকে, মনে বড় আশা ছিল, আমি তোমার বধূ, ঝিলমিল ঝিলমিল করছে রাত, তুমি আমার বন্ধু, ফুলে ফলে বাসর আমি সাজিয়ে গেলাম। দেশাত্ববোধক গানেও তিনি অত্যন্ত সফল ছিলেন। এর নেপথ্যে ছিল লোক সংগীতে তার দক্ষতা। বেশ কিছু ছবিতেও তিনি দেশাত্ববোধক গান করেছেন। এর মধ্যে লাল সবুজের পালা ছবিতে ‘এই বাংলার মাটি শ্যামলিমায়’ গানটি খুব উল্লেখযোগ্য। বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসেও বেশ কিছু স্মরণীয় দেশাত্ববোধক গান রয়েছে তার।

পশ্চিমবঙ্গেও যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন এই শিল্পী। সেখানে তিনি কোনো গান না করলেও প্রচুর অনুষ্ঠান করেছেন। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার প্রয়াণের খবর যথেষ্ট গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সাথে পরিবেশন করা হয়েছে।

শাম্মী আখতারের জীবন যাপনও ছিল তার অনায়াস গায়কীর মতো সাধারণ হয়েও অসাধারণ। সাধাসিধে ছিমছাম জীবন চর্চায় অভ্যস্ত এই শিল্পীর ধ্যানজ্ঞান ছিল সংগীত। প্রতিনিয়ত চেষ্টা থাকতো বাংলা সংগীতে আরো দক্ষতা অর্জনের। এ বিষয়ে প্রায়শই বলতেন।

জীবনের শেষ ছয়টি বছর দুরারোগ্য ক্যান্সারে কষ্ট পেয়ে গেলেন যা কেবল তার জন্যেই নয়, আমাদের জন্যেও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বামী সংগীতশিল্পী আকরামুল ইসলাম ও একমাত্র সন্তান পুত্র কোমলকে রেখে নিতান্তই স্বল্প বয়সে বিদায় নিলেন ১৬ জানুয়ারি বিকেল ৪ টায়। শেষ সক্ষম দিনটি পর্যন্ত গান গেয়ে গেছেন যা ছিল তার অবিরত প্রার্থনা। দীর্ঘদিন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন গানের পাখি শাম্মী আখতার তার শ্রুতিস্নিগ্ধ গীতিসুধার মধ্য দিয়ে।

x