এলপি গ্যাসের সিন্ডিকেটে দাম বেড়েছে নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি

রবিবার , ১৪ অক্টোবর, ২০১৮ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
206

গত মাসেও সাড়ে ১২ কেজি প্রতি সিলিন্ডার লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ছিল এক হাজার টাকা। ৩০ কেজি ওজনের সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছিল সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকায়। কোন কোন কোম্পানি এর চেয়ে কম দামেও এলপি গ্যাস বিক্রি করেছিল। কিন্তু ১ অক্টোবর থেকে ছোট বড় সব সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এখন ১ হাজার ২৫০ এবং ৩০ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকায়। দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে কোম্পানিগুলো বলছে, এতদিন তারা লোকসানে এলপি গ্যাস বিক্রি করত। লোকসান কমাতেই গ্যাসের দাম কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে। দেশে এলপি গ্যাস বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ওমেরা ফুয়েলস লিমিটেড। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দাম বাড়ানো হয়েছে। তাঁরা গ্যাস সিলিন্ডারের বিপরীতে লোকসান দিয়ে আসছিলেন। এখন এটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দর না বাড়িয়ে উপায় নেই। তারপরও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এখনো তাঁদের লোকসান হবে। তবে পরিমাণটা একটু কমে আসবে। এলপি গ্যাসের হঠাৎ এ দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছে ভোক্তারা।
সরকার এলপি গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক আগে থেকেই দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আসছে। সে লক্ষ্যে এলপি গ্যাসের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণের জন্য প্রায় দুই বছর আগে সরকার একটি কমিটিও গঠন করেছিল। পরবর্তী সময়ে কমিটির কোন সুপারিশ পাওয়া যায় নি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের যে পদ্ধতি চালু আছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা মোটেই কঠিন কিছু কাজ নয়। দাম নির্ধারণের বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) দিয়েও শুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বাজারে ক্রয় ও বিক্রয় করা হচ্ছে দাম নির্ধারণের কোন ধরনের নীতিমালা ছাড়াই। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, সরকার যখনই পাইপ লাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করে বা বাড়ায়, এলপিজি কোম্পানিগুলো মূল্য বৃদ্ধির জন্য এ সময়কেই বেছে নেয়। দেশে এলপিজি গ্যাস খাত যেহেতু অনেক বড় হচ্ছে, সেহেতু এ খাতের জন্য কিছু বিধি বিধান (রেগুলেশন) দরকার। দাম, শুল্ক ও কর, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় সংযুক্ত করে এ নীতিমালা করতে হবে।
সরকার গ্যাস সম্পদ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যের কারণে লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাসা বাড়িতেও চুলা জ্বলছে না। অন্যদিকে গ্যাসের মজুদ ক্রমেই কমে আসছে। এ অবস্থায় বাসা বাড়িতে নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে তো রান্না করে খেতে হবে। শহরের বহুতল ভবনে লাকড়ি দিয়ে রান্না করাও অসম্ভব। এ অবস্থায় একমাত্র বিকল্প হচ্ছে সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস। কিন্তু এ গ্যাস ব্যবহারে মানুষের আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অত্যধিক দাম। সরকারের নীতি নির্ধারকদের গ্যাসের এ সংকট দূর করতে একটি উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। গত ৬ অক্টোবর ওরিয়ন এলপি গ্যাসের সৌজন্যে একটি দৈনিকের আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এমন দাবিই করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁরা এলপি গ্যাস আরো সহজলভ্য, সুলভ ও নিরাপদ করার ওপর জোর দিয়েছেন। আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় আরো অনেক কারণেই এলপি গ্যাসের ওপর জোর দেওয়া দরকার। শহরের কয়েক শতাংশ মানুষ জ্বালানি হিসেবে গ্যাস পাবে, দেশের বেশির ভাগ মানুষ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে- এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। সেটি পাইপলাইন দিয়েও করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইপলাইনের গ্যাসের দাম নির্ধারণ করলেও এলপিজির ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখছে না। সর্বশেষ ২০০৯ সালে তারা সরকারি খাতে উৎপাদিত এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৭০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু বেসরকারি খাতের বিষয়ে সংস্থাটির কোন সাড়া শব্দ নেই। বিপিসি বাজার তদারক করলেও স্বল্প জনবল ও কোম্পানিগুলোর চাপের কাছে তারা অসহায় আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে। এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া থাকা দরকার। এক্ষেত্রে নীতিমালা বা আইনের দুর্বলতা থাকলে তা দূর করে শক্তিশালী কমিশনের অধীনেই এর সমাধান নিশ্চিত করাই কাম্য। কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে জোর দেওয়া।

x