এক হতভাগ্য মায়ের আর্তি

ডা. মহসিন জিল্লুর করিম

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:২১ পূর্বাহ্ণ
151

বাবা আবরার,
এ লিখা যখন অন্যরা পড়ছে, তুই তখন অনেক দূরে । বহু দূরে। অন্য এক জগতে। যেখানে তোর যাওয়ার কোন কথাই ছিল না কিন্তু ওরা তোকে মেরে পাঠিয়ে দিলো ওখানে। নিজেকে কিছুতেই সামলে রাখতে পারছি না। চোখের জলে বুকের কান্নায় অবাধ্য অবুঝ মনটাকে দমিয়ে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে রে বাবা। রাত এখন অনেক গভীর। যতবার চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে চেষ্টা করছি বার বারই কেবলই তুই আমার সামনে চলে আসছিস্‌। বলছিলি, কি করে ছিলাম আমি, সবার মতো কিছু একটা লিখতে চেষ্টা করছি মাত্র। এই অপরাধের জন্য এমন ভাবে মারলো আমাকে। বিশ্বাস করো কত করে বললাম আর মেরো না, মরে যাবো। হাসতে হাসতে ওরা বলছিলো, মরতে তো তোকে হবেই। তোকে দিয়েই শুরু। আরো অনেককে যেতে হবে। কি সাহস তোর এমন লিখা লিখলি। আর সহ্য করতে পারছিলাম না। শেষ নিঃশ্বাসের আগে শুনলাম যেন ওরা বলছে লাশটা নিচে ফেলে রাখ সবাই দেখুক কি শাস্তি দেয়া হবে এ ধরনের অপরাধের জন্য। আমি বলতে চেয়েছিলাম এ দেশের নদীর পানির ভাগা ভাগির কথা, মানুষের দুঃখ কষ্টের গল্প আর বাক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার কথা। সারাদিন তো পড়া শুনায় কেটে যায়। যে সামান্য সময়টুকু নিজের জন্য পাই তাতে অনেক কিছুই লিখতে মন চায়। মাঝে মাঝে মনটা বড় বিদ্রোহী হয়ে উঠে। কেন এমন হচ্ছে, এসব তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে কি আমি কোন কথাই বলতে পারবো না, লিখতে পারবো না, আমার নিজস্ব বলে কিছুই থাকবে না। শিকল বাঁধা পশুর মতো কি শুধু গুমড়ে গুমড়ে থাকবো,ওদের পদদলিত হয়ে। আমার খুব শখ ছিল ছেলে ডাক্তার হবে। সবাই তো বলতো ছেলেটা খুব বিদ্বান। ভালো করে পড়াশোনা করলে বড় কিছু হতে পারবে। কিন্তু খুব ইচ্ছে ওর ইঞ্জিনিয়ার হবে। শেষ পর্যন্ত ওর জেদের কাছে হার মানতে হলো। বুয়েটে যখন পড়তে চলে যায় বার বার বলছিলাম ঢাকা বড় শহর, তুই কুষ্টিয়া থেকে যাচ্ছিস, খুব সাবধানে থাকিস বাবা। সারাক্ষণ তোকে মনে পড়বে চিন্তায় থাকবো। কারো সাথে ঝগড়াঝাটি কখনো করবি না। ওরা বড়লোক,কত কিছুইতো করতে পারে। বাবারে মার কথা সব সময় মনে রাখিস। আমি তোকে রাত দিন স্বপ্নে দেখবো। তোর গলার আওয়াজ শুনলে, মনে রাখিস তবেই মার মন শান্ত হবে। ভালো করে পড়াশুনা করবি। খাওয়া দাওয়াটাও ঠিক মত করিস বাবা। তুই না খেলে আমার যে গলায় ভাত ওঠবে না। জানিস তোর বাবা কত সব অদ্ভুত কথা বলে। দেখে নিও আমার ছেলেকে একদিন জগত জানবে। এত ভালো পড়া লিখায়, নিজের ছেলে বলে বলছি না, সবাই বলে একথা। সেদিনতো হাটে মাস্টার মশাইয়ের সাথে দেখা হতেই জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদেই দিলেন। বলছিলেন জানতাম আমি, আবরার একদিন অনেক বড় হবে। ওর যে মেধা আজ অব্দি আমি কারো মধ্যে তা দেখিনি। এমন ছেলে লাখে এক হয়।জোর করে মিষ্টি খাওয়ালেন বুড়ো লোকটা। কিছুতেই শুনলেন না। কেবল বলছিলেন বড় আনন্দ লাগে ওর কথা শুনলে। আমাদের এ গাঁ থেকে কখনো আর কেউ বুয়েটে চান্স পায়নি,কত বড় কথা ভাবতেও ভালো লাগে আমি ওকে পড়িয়েছি। আরো কত কথা বলছিলেন উনি। তোকে নিয়ে বাবার যেন গর্বের শেষ নেই মনে হয় আমার থেকেও তোকে বেশি আদর উনিই করেন। আমার হাসি আসে, আমার এইটুকুন ছেলেকে কোলে পিঠে করে আমি এখনও বড় করছি মার হাতে ছাড়া যে ছেলে খায় না, পারলে কোলে ওঠে বসে থাকে তাকে নাকি উনিই বেশি পছন্দ করেন। কি যে বলেন কোন ঠিক নেই। এখনও বাড়ি এলে মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে যায়, মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তুই ঘুমিয়ে গেলে আমি ও ঘরে যাই। সকালে উঠেই তোর কি রাগ, কেন একা তোকে রেখে গেলাম। বাবারে, সেই তোকে যখন ঢাকা পাঠিয়ে ছিলাম মনে হতো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চারদিকে সব কেমন খালি খালি মনে হতো। বার বার দুয়ারের দিকে আসতাম। এই বুঝি তুই এলি বলে। কিছুতেই কান্না চাপিয়ে রাখতে পারতাম না। নিজে নিজে কেবলই কাঁদতাম। আমার ছোট্ট বাবুটা কেমন আছে কি জানি। সেই পুকুরের কথাটা তোর মনে পড়ে, কত বয়স হবে তোর, ৭ বা ৮ বছর। নানা বাড়ি গিয়ে সবার সাথে খেলছিলি। আমরা সবাই এটা সেটা আলাপ করছিলাম নিজেরা। কোন ফাঁকে তুই সোহেলকে নিয়ে পুকুর পাড়ে চলে গিয়েছিলি।পানি নিয়ে খেলতে গিয়ে তুই পুকুরে পড়ে যাস। রাবেয়া সে সময় ওখান দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ ওর চিৎকারে সবাই দৌড়ে গেলাম। কে যেন বললো আবরার পুকুরে ডুবে গেছে। আমি কোন চিন্তা না করে সটান পুকুরে ঝাঁপ দেই। দেখাদেখি অন্যরা ও। মিনিট দুয়ের মধ্যেই তোকে আমি কোলে করে উপরে উঠে আসি। আমার চিৎকার আর কান্নায় সম্ভবত সমস্ত গ্রামটাই ওখানে এসে পড়ে ছিলো। যে যেভাবে পারছে তোকে সুস্থ করতে চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুই কেঁদে উঠলি। আমার কান্না যেন আর থামছিলই না। তোর বাবা আসার পর তো যুদ্ধ ক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিলো। আমাকে ফাঁসিতে দিবেই। তার অমন হীরের টুকরো ছেলেকে কিভাবে আমি এমন অযত্ন করলাম। সেই থেকে আজ অব্দি তোকে আমি কখনো একা থাকতে দেইনি। একা ছাড়িনি। স্কুলে নিয়ে গিয়ে তোকে সারাক্ষণ বসে থাকতাম। ছুটি হলে কোলে করেই ফিরতাম, অন্যরা হাসতো, বলতো এতো বড় ছেলেকে কোলে নিলো কেন। কিছু বলতাম না, বলবোই বা কি। কিভাবে ওরা জানবে যে তোকে আমি কিছুতেই কাছ ছাড়া করতে পারি না। যদি কখনো কিছু হয়ে যায়। রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করলে হঠাৎ পড়ে গেলে বা রিকশা টেক্সি যদি ধাক্কা দেয়। ও বাবা, ভাবতে গেলেও আমার মাথা ঘোরায়। ঢাকা পড়তে যাবি বলে যখন ঠিক করে ফেললি তোর বাবাও মত দিলো, কেউ না দেখে মতো আমি সারাদিন কাঁদতাম। কিভাবে তুই ঐ ভিন শহরে থাকবি। কে তোর দেখাশুনা করবে,কোথায় খাবি,চিন্তা করতে করতে আমি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলাম। যে দিন চলেই গেলি আমি সারাদিন জানালা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কেন জানি মনে হচ্ছিলো এই বুঝি এসে বলবি মা কোথায় তুমি। নিজের অজান্তে হাত বাড়িয়েছি তোকে জড়িয়ে ধরবো বলে। দুষ্টুমি করে যেন তুই বলবি এই তো আমি। তোকে বলনি কখনো জানিস কতরাত ঘুমুইনি, ঘুমুতে পারতাম না,কেবলই তোর কথা মনে পড়তো। বার বার তোর খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম । হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলে যেতাম যাদুরে ভালো থাকিস। কোন সময় যে তোর বাবাও আমার পাশে এসে দাঁড়াত বুঝতেই পারতাম না। পিছন ফিরে চাইলেই দেখতাম ওনার চোখে জল। সেই তুই কিনা মাকে না বলে চলে গেলি না ফেরার দেশে। বাবারে আরতো পারি না। চোখের জলতো শুকিয়ে গেলো বোধহয়। বুকের পাজর গুলো মনে হয় ভেঙে গেছে। শ্বাস ও নিতে পারিনা। তার পরও তো দম বন্ধ হয়ে যায় না। কত আশা ছিলোরে বাপ জান, তুই ইঞ্জিনিয়ার হবি,আরো পড়াশুনা করবি, দেশে বিদেশে তোর কত নাম হবে। মানুষ আমাদের দেখলে বলবে ওইতো আবরারের মা যায়। আনন্দে আমার বুকটা এততো বড় হয়ে যাবে। লাল টুকটুকে একখান বউ আনবো, বলবো মারে আমার যাদুরে আদর যত্নে রেখো। বড় সোহাগের ছেলে আমার। মায়ের শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে বড় হয়েছে। এতো টুকু যেন কষ্ট না হয়। এমন বিদ্বান ছেলে পাবে কই গো মা।কিন্তু স্বপ্নতো আর সত্য হলোনারে বাপ। আমাদের আগেই তুই চলে গেলি, না-তোকে বিদায় করে দিলো ওরা। বাবার কাঁধে চড়ে চলে গেলি কবরে। এমন তো হওয়ার কথা ছিলোনারে। তুই তো কোনদিনও রাজনীতি করতিনা। নিজে ও বলিসনি, কারো মুখেও শুনিওনি। সারাজীবন তো কেবল পড়াশোনা নামাজ রোজা করেই কাটালি। তবু্‌ও ওরা এমন কেন করলো। কার কাছে যেন শুনলাম অনেক মেরেছে তোকে। এমন মার যে শেষ পর্যন্ত আর সহ্যই করতে পারলি না। নরম আদুরের শরীরটাতে কালো কালো দাগে ভরে গিয়েছিল। কোনো জায়গা বাদ রাখেনি। বাবারে আমি আর দেখতে পারিনি। আমার কলিজাটা ছিঁড়ে গেছে। ওরা আমাকে মারতে পারতো রে,বয়স হয়ে গিয়াছে চলে গেলেও তো অসুবিধা ছিলো না। কিন্তু তোকে কেন এমনটা করলো। কী দোষে এই শাস্তি হলো তোর। আমার সোনার সংসারটাকে এমন তছনছ করে দিলো। ওদেরতো আমরা চিনিও না,জানিও না, ওদের কোন ক্ষতিতো আমরা কেউ করিনি। বাবারে, বাবা, বাবা, এ বুকের কষ্ট যে আর সহ্য হয় না। কবে মরণ হয়ে তোকে আবার দেখবোরে বাপ। জানিস দুনিয়াতে থেকেও আমি সারাক্ষণ তোকে জড়িয়ে আছি। আর কাউকে কোনদিন তোকে মারতে দিবো না। বুকের মাঝে নিয়ে তোকে শুয়ে থাকবো। কেও তোর আর নাগাল পাবেনা। কাঁদিস না বাপ খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো তোর কাছে। যারা তোকে মেরে ছিলো ওদের ও তো মা আছে ওরা হয়তো বুঝতে পারবে ছেলে হারানোর ব্যথা কি। তাইতো ওদের কোন বদদোয়া দিবোনা। আমিও তো মা। কিভাবে ছেলেদের খারাপটা ভাবি। ওরাও যেন ভাল থাকে। মন থেকে দোয়া করি। আমিন।
ইতি-
তোর অভাগা মা
লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক

x