একুশের সুখবর এবং…

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
65

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে চট্টগ্রামের অবদান বিরাট। চট্টগ্রামের অনেক ত্যাগী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা ও গুণী বাংলা ভাষা আন্দোলনে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। আবার স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরির লড়াই-সংগ্রামেও চট্টগ্রামের অবস্থান শীর্ষে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রথম আধুনিক প্রেস কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরবর্তীতে বহুল প্রচারিত দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক এর অবদান ভাষা আন্দোলনের বারুদ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ইতিহাসে সোনার কালিতে লেখা থাকবে। প্রয়াত মাহবুব উল আলম চৌধুরীর রচিত ভাষা শহীদদের নিয়ে অমর কবিতা “কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি” ছাপা হয় কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেস থেকে। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে শহীদদের নিয়ে ঘটনার পর পরই এমন আগুনের ফুলকি ছড়ানো কবিতা প্রকাশ ওই সময়ের বিবেচনায় সবচে’ দুঃসাহসী কাজ। এমন দুঃসাহস ও ”চ্যালেঞ্জ” ভাষা ও দেশের স্বার্থে হাসিমুখে গ্রহন করেন ইন্‌িজনিয়ার আব্দুল খালেক। এরজন্য প্রচুর মূল্য গুণতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু তিনি হাসিমুখে স্বৈরাচারী সরকারের সব নিপীড়ন ও হলাহল গিলেছেন। এক পা-ও পিছু হটেননি। মাহবুব উল আলম চৌধুরী কবিতাটির জন্য রাষ্ট্রীয় পদকে সম্মানিত হলেও বৈরি সময়ে কবিতাটি ছাপা ও প্রচারের ঝুঁকি মাথায় নেন সময়ের সাহসী অভিযাত্রী ইন্‌িজনিয়ার আব্দুল খালেক। দুঃখজনক, এখনো তিনি রাষ্ট্রীয় বা একুশে পদক থেকে বঞ্চিত। ভাষা আন্দোলনের সবচে’ অসম সাহসী ব্যাক্তির প্রতি অবহেলা পুরো চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি অবহেলা। আশা করি, চট্টগ্রামের এই মহান ভাষা সংগ্রামীর মূল্যায়ন হবে দ্রুত।
ফেরা যাক বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে। ১৯৫২ থেকে ২০২০। দীর্ঘ ৬৮ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলা ভাষা এখনো দেশে তার মর্যাদার আসনটি পোক্ত করতে পারেনি। বিশ্বে বহুল ব্যবহ্নত ৬ষ্ট বৃহত্তম ভাষা হয়েও! ফেব্রুয়ারি আসলেই মাসভর ভাষা নিয়ে আবেগ ও উৎসবের সুনামি বয়ে যায় দেশজুড়ে । রাজধানী, বড় নগর, সরকারি বেসরকারি সব সংস্থা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষালয়, সামাজিক সংগঠনও বাংলা ভাষার জন্য মাতম শুরু করে। ফেব্রুয়ারি শেষ তো সবকিছু আবার থেমে যায়। আশ্চর্য এক নির্লিপ্ততার পর্দা নেমে আসে বাংলা ভাষার উপরে। বাস্তবে ফেব্রুয়ারির এটা একটা নিয়মিত উচ্ছ্বাস মাত্র। যেখানে নেই প্রাণের টান, ভাষার প্রতি দরদ বা ভাষাকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়নের কোন উদ্যোগ। বাংলা একাডেমিও এ-ব্যাপারে সরকারি বিধিবদ্ধ অন্যান্য সংস্থার চেয়ে আলাদা কিছু না। যদি হতো বৃটিশ বেনিয়ার তৈরি বাংলা ভাষার প্রশাসনিক ভুল ব্যবহার বা ভুল অনুবাদ এখনো প্রচলিত থাকার কথা না। প্রমাণ হিসাবে কলকাতার পোর্ট উইলিয়ামে কেরি সাহেবের মুন্সিদের দিয়ে তৈরি ‘ডি সি’র ভুল অনুবাদ জেলা প্রশাসক’ এর মত একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ভাষা উন্নয়ন ও গবেষণায় বাংলা একাডেমির অবদান নিজের অজানা। অথচ দায়িত্বটা তাদের নেয়ার কথা।
গেল একটা দিক। আসুন শিক্ষা ব্যবস্থায়। জগাখিচুড়ি অবস্থা এই সেক্টরের। পরিবারের দাদাজান চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ‘চাটগাঁইয়া ভাষা” চর্চার সংগঠন দাঁড় করিয়েছেন। তিনি কারা যেন চাটগাঁইয়া ভাষাকে বিশ্বের শততম আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা দেয়ায় খুশিতে বগল বাজাচ্ছেন। আবার বাবা বাংলা ভাষার মর্যাদা সুরক্ষায় ২১ ফেব্রুয়ারি শূন্য ঘন্টায় শহীদ বেদিতে খালি পায়ে ফুল দিতে ছুটে যাচ্ছেন। আবার সকালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে। কিন্তু তাঁর পুত্রকন্যা পড়ে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে। একদিনের জন্য সবাইকে বাঙালি বানান তাঁরা। উচ্চবিত্ত এমনকী মধ্যবিত্ত পরিবারেও শিক্ষা ও রুচির জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি ভয়াল সংক্রমণ ছড়িয়েছে। কোন মিডিয়া যদি শিক্ষা ও পাঠক্রম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে করে, তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার দুর্গতির ভয়াল ক্ষতগুলো ভেসে উঠবেই। সবচে’ মারাত্মক হচ্ছে, শিক্ষিত এমনকী উচ্চ শিক্ষিত দাবিদার জনগোষ্ঠীর ৮০% শতাংশই শুদ্ধ বাংলা লিখতে জানেন না! প্রমাণের জন্য দূরে যাওয়ার দরকার নেই। আপনার ফেবু এ্যকাউন্টে সক্রিয় বন্ধুদের লেখায় মনোযোগ দিন। এমনকী স্বঘোষিত কবি, সাহিত্যিকরাও ভাষা দুষণ করছেন সমানে! আবার তাঁর কাব্য বা সাহিত্যসুধা ভোক্তার তীব্র অভাবের জন্য দোষ চাপান পাঠকের ঘাড়ে! তো, কী হবে বাংলা ভাষার? কারা এর মর্যাদা- সম্মান সমুন্নত রাখবে? আমলা, পেশাজীবি সবখানেই শুদ্ধ ভাষা চর্চাকারীর তীব্র খরা। অবিশ্বাস্য! প্রশাসনিক আইন বা আদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়নি, হবেওনা। কারণ প্রশাসনিক নির্দেশদাতারও বিশুদ্ধ বাংলায় দখল সীমিত। সব নির্দেশনামা যাচাই করলে প্রমাণ মিলবে হাতেনাতে। তো ভাষার এই দুর্গতি কী কখনো ঘুচবেনা? অবশ্যই ঘুচবে, যদি আমরা প্রিয় মাতৃভাষা ব্যবহার ও চর্চায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দেই। ভুল ইংরেজি বা অন্য ভাষার প্রতি আমরা বড়ই স্পর্শকাতর। মনে করি, ভুল ইংরেজি চর্চা বা লিখা মানেই ক্ষেত, আমার ঝকঝকে- তকতকে আভিজাত্যের উপর অমোচনীয় কালির কলঙ্ক! আর বাংলা ভুলভাল লেখা-চর্চা কিছুইনা, হতেই পারে! এত যুক্তাক্ষর,এত শ, ষ,স কী অন্য কোন ভাষায় আছে! নাই। কী বলবেন, এমন সংস্কৃতি ও রুচিবানদের? তারাই আবার ফেব্রুয়ারি আসলে মাতম তোলে, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে সামনের কাতারেও! আসলে আমাদের মননের গিটে গিটে বিজাতীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। শীর্ষ থেকে অধঃ সবখানে। শুধুমাত্র ভাষার প্রতি কৃত্রিম দরদ ঝালাই করতে আমরা ফেব্রুয়ারিজুড়ে আলিশান চুনকাম আয়োজনে কোমরে লুঙি পেঁচিয়ে নেমে পড়ি মাত্র। এটা স্রেফ এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র।
আসুন বইমেলায়। গত দু’বছর ধরে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের উদ্যোগ ও আয়োজনে চট্টগ্রামে একক বইমেলা আয়োজন হচ্ছে। স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম চত্বরে বিশাল এই আয়োজন এক কথায় চমৎকার। এ’ বছর ‘আল্লাহর ঘরে আগন্তুক’ নামে আমার ছোটগল্প, অণুগল্প, ছড়া-কবিতা, কলাম, চট্টগ্রামের স্মরণীয় কয়েক মনিষীর জীবনের রেখাচিত্র নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী একটা বই বের করেছে বলাকা প্রকাশন। যারা নিয়মিত পাঠক তারা জানেন, প্রতিটি লেখায় বিশেষ বার্তা থাকেই। কারণ সাংবাদিকতা শুধু পেশা না, এটা সমাজের অসঙ্গতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার একটা ব্রতও। যতই কর্পোরেট ঘরানায় মোড় পাল্টাক ব্রতে অটল আমি। তাই বই মানেই সন্তান। অনেক বছর পর তাড়াহুড়োর প্রসব। কিন্তু মান ও স্বাদে আপস করার কোন চেষ্টা হয়নি। স্বাভাবিক কারণে সন্ধ্যায় এক চক্কর মেলায় ঘুরে আসি। কিছু পাঠকের আব্দারও সামলাতে হয়। মেলার ব্যাবস্থাপনা,পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তদের মননশীলতার ঘাটতি খুবই অস্বস্তিকর ঠেকেছে। এতবড় বইমেলা পরিচালনার অনভিজ্ঞতা সম্ভবত এই ঘাটতির মূল কারণ। বিশ্বাস, লব্ধ অভিজ্ঞতা তাদের ভুল থেকে আগামীতে ভাল কিছু করার শিক্ষা দেবে। কিন্তু ২০/২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ও রাতে বইমেলা পুরোপুরি ‘সেল্ফিমেলায়’ রূপ পাল্টে ফেলে! কেন এমন হচ্ছে, ভেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ সৃজনশীলতার রক্ষাকবজ দিয়ে আমাদের তারুণ্যের বিপুল ক্ষয়ে বাঁধ দিতে না পারলে সামনে আরো বড় বিপদ অপেক্ষমান।
সবশেষে সুখবর হচ্ছে, অনেক অনেক বিলম্বে হলেও আমাদের উচ্চ আদালতের দু’ বিচারপতি পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়েই সব মামলার আদেশ ও রায় বাংলায় লেখার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা হলেন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান। এরমাঝেই তাঁরা দু’হাজারের কাছাকাছি আদেশ ও রায় বাংলায় দিয়েছেন। আশা করি, চর্চাটি থেমে যাবেনা, চলমান থাকবে। সুপ্রিম কোর্টসহ উচ্চ আদালতের সব বিচারপতি এই মহান উদ্যোগে যুক্ত হবেন বলেও বিশ্বাস রাখি।