একাত্তরে দুই কিশোর

সাঈদুল আরেফীন

বুধবার , ১৩ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সকাল হতে বাকি নেই। গাঢ় অন্ধকার কেটে গেছে একটু আগে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটছি আমি আর বাবা । হাতে হারিকেনের টিম টিম আলো জ্বলছে। ভয়ে কাঁপছি পাছে মিলিটারি এসে পথ রুখে না দেয়। কতোটা পথ হাঁটছি তার কোন হিসেব নেই। গতরাতে আমাদের বাড়িতে মিলিটারি এসে তছনছ করে দিয়ে গেছে। পাশের গ্রামে আগুন লাগিয়েছে। শুনেছি ওখানে আরমানদের বাড়ি ছিলো। শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। আরমান আর আমি একই ক্লাশে পড়ি। ক্লাশ সিক্সে। এইসব ভাবতে না ভাবতেই বাবা বললো, মাহিন, জলদি চল বাবা, পথ ফুরাতে হবে। আর বেশি দূরে নেই ঘাট। মাইল খানেক হাঁটলেই লঞ্চ ঘাটে এসে পৌঁছুবো। বাবা আর আমার পথ চলা চলছে তো চলছেই। দূরে কোন গাঁয়ে গুলীর শব্দ। আর কোন কোন গ্রামে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। কোন কোন ঘর থেকে ছেলেমেয়েদের কান্না ভেসে আসছিলো। আমারও বুক কেঁপে উঠছিলো বারবার। মনে পড়ছিলো ছোটবোন মণির কথা আর মায়ের কথা। কীভাবে আছে ওরা কে জানে? ক’দিন আগেই তো বাবা ওদের রেখে এসেছিলো পাহাড়ের অদূরে পলাশডাঙা গ্রামে। পাক হানাদার বাহিনীর নাগালের বাইরে থাকায় নিরাপদের মধ্যেই ছিলো ওরা। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে ঘাটের কাছে এসে পৌঁছাই। পড়ি কী মরি করে লঞ্চে ওঠে পড়ি আমরা।
লঞ্চের মধ্যে বসে আছি ঘুম ঘুম চোখে। একটু পরেই সারেং লঞ্চ ছাড়বে। যাত্রীদের ঠাসাঠাসিতে ভরে গেছে পুরো লঞ্চ। লোকের সাড়া শব্দে আর ওঠানামায় লঞ্চ দুলছিলো বারবার। আমি কখনো বাবার বুকে মাথা চেপে রাখি। আবার এদিক সেদিক তাকাই। এতো লোকের সমাগমে একসময় সারেং লঞ্চের হুইশেল বাজিয়ে দেয়। লঞ্চ ছেড়ে আসে এ ঘাট থেকে ও ঘাটে। কোন ঘাটে লোকজন ভীড়বে কোনো ভরসা করতে পারছে না। এদিকে রাত ফুরোয় না। রাতের আধারে অজানা ভয়ে আতংকে যাত্রীরা সব আমরা ছুটছে নানা ঘাটে। ঘাটে ঘাটে নোঙর করতে করতে লঞ্চের যাত্রীদের মধ্যে আমরা বাপ ছেলেই ছিলাম শেষ যাত্রী। সকালের আলো ফুটবার আগেই লঞ্চ ভীড় করে আমতলী ঘাটে। লোক নেই, জন নেই। চারিদিকে ফাঁকা। কাদা মাটিতে পা ফেলে আমরা বাপ ছেলে কোনমতে কুলে উঠি। ভয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি। পায়ে হাঁটা পথে গন্তব্যে ছুটছি গাঁয়ের মেঠাপথ ধরে। বাবা জেনে গিয়েছিলো এই গ্রামগুলোর আশে পাশে এখনো মিলিটারি আসেনি। এই একটা নিরাপত্তার কারণে আমাদের দূর অজানায় ছুটে আসা।
অনেকটা দৌড়াদৌড়ি করতে করতে পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে এসে পড়েছি, এমন সময় পেছন থেকে একটা হাতের স্পর্শে চমকে উঠি। আমাকে কে আবার পিছন থেকে ধরলো? আচমকা হাতের স্পর্শে শরীরটাও কেঁপে উঠলো। বাবার হাত শক্ত করে ধরি। সকালের আলো এসে পড়েছে চোখে মুখে। মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছি।
ভয়ে পড়ি কী মরি উল্টো দিকে তাকাতেই হতবাক হয়ে যাই-
-আরে আরমান তুই ? এখানে কী করে এলি তুই ?
-আরে কী বলবো তোকে? পালিয়ে এসেছি আমরা। মা বাবা সহ সবাই আমাদের গ্রাম ছেড়ে প্রাণে বেঁচেছি। পলাশডাঙায় এসে কোনমতে কষ্ট করে থাকার জায়গাটা করে নিয়েছি আমার ফুফুর বাড়িতে। ফুফুদের বাড়িতে গাদাগাদি করে দিনটা কেটে যাচ্ছে। জানিস, আমাদের লেখাপড়াটা বন্ধই হয়ে গেলো। কতোদিনে স্কুল আবার খুলবে। কবে বাড়ি ফিরবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না রে কামরান! আর কতোদিনই বা আমরা পলাশডাঙায় থাকবো?
এক নিঃশ্বাসের ওপর আরমান তার পলাশডাঙার কাহিনী বলে গেলো আমাকে।
সেদিনের মতো হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ী পথ বেয়ে আমরা বাবাসহ পলাশডাঙায় ফিরি। আমাকে পেয়ে আরমানও জোঁকের মতো লেগে থাকে। বেশ ক’দিন পরে মা আর ছোট বোনটাকে কাছে পেয়ে আমার মনে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। মা তো বলেই ফেললো-
-আমার জাদুরে, তুই এসেছিস! আমার কী যে ভালো লাগছে, তোকে বোঝাতে পারবো না। যতোক্ষণ না পর্যন্ত দেশ স্বাধীন হয় আমরা এ পলাশডাঙা ছেড়ে কোথাও যাবো না। এখানে অনেক সুখে-শান্তিতে আছি আমরা।
– মা তোমরা চলে আসাতে অনেক ভালো হয়েছে। আমাদের গ্রামে যে কতো অত্যাচার হয়েছে। ঘর-বাড়ি পুড়েছে দেশের শত্রুরা। মানুষের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালিয়েছে। সত্যিই বলছো মা এখানেই শান্তি! আমি ও তাই বলি।
গতরাতে বেশ ভালো ঘুম হয় আমাদের। পরদিন সকাল বেলা। পলাশডাঙার পাশেই নিমতলি গ্রাম। সেখানে গভীর জঙ্গলে নিরাপদে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলারা ট্রেনিং নিচ্ছে। আরমানই আমাকে কাকডাকা ভোরে এখানে নিয়ে আসে এখানে। ছোট দুই কিশোর ছেলের উঁকি মারা দেখে মুক্তিযোদ্ধারা ওদের ক্যাম্প নিয়ে সবকিছু জেনে নেয়। পরে আমরা দেশের জন্য দুইবন্ধু ওদের সহায়তা করার শপথ নিই। কাল থেকেই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থেকে ওদের কাজে সহায়তা করতে প্রস্ততি নিই। এরপর প্রতিদিনই আমরা পাকিস্তানী সৈন্যরা কোনদিকে টহল দিচ্ছে, কোন গ্রামে ক্যাম্প বসিয়েছে, সব খবরাখবর জোগাড় করি আর পাহাড়ের বুকে নিমতলি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছাই। এ গ্রামে আসতে গেলে অনেক ঝরণা টিলার ওপর দিয়ে যেতে হয়। সাঁতরিয়েও পার হতে হয় কোন কোন জায়গা। খুব গভীর জঙ্গলে ক্যাম্প হওয়াতে শত্রুরা এখানে আসতে সাহস পায় না।
সুযোগ বুঝে আমাদের গ্রামেরই লাবু কাকার মাধ্যমে আমরা দু’জন এ পাকিস্তানী ক্যাম্পে ফাই ফরমায়েশ খাটার চাকরিটা নিয়ে নেই। লাবু কাকা মনে প্রাণে যদিও দেশের পক্ষে। কিন্তু গ্রামের অসহায় অবস্থার কারণে বেগতিক হয়ে হানাদার বাহিনীতে যোগ দেয়। একদিন সকালের নাশতার টেবিল। পাকিস্তানী সৈন্যরা ক্যাম্পে বসে পরিকল্পনা করছে। ওদের খাবার আনা নেয়ার কাজে ব্যস্ত আছি আমরা দুই বন্ধু। আমি আরমানকে বললাম, তুই মনোযোগ দিয়ে ওদের কথা শুনবি। ওরা কোন কোন জায়গায় কোথায় যায়, কখন আমাদের জনগণের ওপর হামলা করবে? এই খবর গুলো আবার নিমতলি ক্যাম্পে খুব দ্রুত গোপনে পৌঁছাতে হবে।
-বুঝতে পারছি বন্ধু, কোন সমস্যা হবে না। আমার কথায় জবাব দেয় আরমান। বলে, ঠিকমতো সব খবর আমি নিয়ে নেবো। তোকে চিন্তা করতে হবে না। এদিকে পাকিস্তানি সেনা কমান্ডাররা নাশতা খেতে খেতে খোশ মেজাজে বেশ সুন্দর করে মুক্তিযোদ্ধাদের দমনের ব্যাপারে নানা ছক আঁটে। পাকিস্তানি সৈন্যদের গুপ্ত সব খবরই নাশতা দেয়ার ছলে আরমান শুনে নেয়। পাকিস্তানি সেনারা নাশতা সেরে চলে গেলে ধীরে ধীরে আরমান এসে আমাকে জানায়। আমরা দু’জনই তখন মনে মনে ভাবতে থাকি কখন যাবো মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে? কখন পাকিস্তানি সেনাদের পরিকল্পনা জানাবো মুক্তিবাহিনীর কাছে। আমরা নিজেরাও মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে একটু সহায়তা করতে পারবো ? সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ফিরে আসবো বলে আমরা দু’বন্ধুই পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে ছুটি নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নিমতলী ক্যাম্পে এসে হাজির হই। আমাদের দু’জনকে পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সবাই মহাখুশী। আমাদের ঘিরে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদারদের হামলার ব্যাপারে জানলো। মুক্তিযোদ্ধারা ওইদিনই বসে পাক হানাদারদের প্রতিরোধে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কমান্ডার নিজাম ভাই, আমাদের দুই কিশোরকে আলাদা করে ডেকে বলে, মাহিন তোমাদের একটু কষ্ট করতে হবে। ঝুঁকি নিতে হবে অনেক। পাক হানাদার বাহিনীর লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তোমাদের পাকিস্তানি ক্যাম্প ছাড়া পালিতে আসতে হবে। ওরা যেনো কোনমতে বুঝতে না পারে? আমি হ্যাঁ বললে আরমান মাথা নাড়তে থাকে। অর্থাৎ আরমান কমান্ডার নিজামের কথায় পুরোপুরি সায় দিয়ে ফেলে। মনে হচ্ছে সে ও যেনো অনেক বড়ো যোদ্ধা। আর কী করা সেদিনের মতো আমরা দুইবন্ধু সময়মতোই আমাদের ক্যাম্পে ফিরে আসি। রাতে পাক সেনা ক্যাম্পে সবাইকে খাবার দাবার ঠিকমতো দেই। ওরা ঘুমোতে যাবার আগে ফিরে আসি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে।
সকাল ১০ টার মতো হবে। আমরা দুইবন্ধু পাহাড়ের গা বেয়ে উঠছি আর নামছি। পলাশ ডাঙা-নিমতলি সড়কের পাশে অনেক উঁচুতে লম্বা সেতুটি লক্ষ্য করছি। কখন অস্ত্র গোলা বারুদ পাক সেনাদের গাড়ি নিমতলি অভিযানে যাচ্ছে সে আশায় আমরা অপেক্ষা করছি। আমাদের পেছন পেছন মুক্তিযোদ্ধারা পজিশন নিয়ে বসে আছে। সেতুর আশে পাশে ঝোপ-ঝাড়ে মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশলে হামলার জন্য ওঁত পেতে থাকে। রাস্তার দু’ধারে ধান খেতের ভেতরে লুকিয়ে থাকে মুক্তিযোদ্ধারা। আমরা দু’বন্ধু অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে পাহাড়ের মধ্যে রাস্তার অনেক কাছে বটগাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছি। হঠাৎ দূর থেকে ধুলাবালি ছড়িয়ে ট্রাকের আওয়াজ শুনতে পাই। একটি দু’টি নয় অনেক গুলো ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র সহ ছুটে চলেছে একযোগে। হঠাৎ দেখি হামাগুড়ি দিতে দিতে কমান্ডার নিজামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যেতে থাকে ধানক্ষেতের ভেতর। যেই ট্রাক সামনে আসে মাটির সাথে গড়াগড়ি দিয়ে আমরা দু’বন্ধুও দ্রুত ট্রাকের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়ি। ওরা ও আমাদের দেখে ট্রাক থামায়। সেনা কমান্ডারদের একজন বলে ওঠে, তুম লোগ ইহাপেঁ ক্যায়সে? কাহাঁ যাতে হো ? তখন আমরা কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দিতে না দিতেই দু’জনের হাতে থাকা থলের ভেতর বিষধর কেউটে সাপগুলো ঝটপট পাক সেনাদের গায়ে ছুড়ে মারি। এই ফাঁকে অস্ত্র বোঝাই ট্রাক দু’টিকে ধানক্ষেত সহ ঝোঁপ-ঝাড় থেকে মুক্তিসেনারা এসে হ্যান্ডস আপ বলে ঘিরে ধরে। ততক্ষণে এক দু’জনের মতো প্রাণ যায় যায় অবস্থা। অনেকটা বিনা বাধায় অপারেশন শেষ করে ফেলায় নিজাম কমান্ডার হাত উঁচিয়ে লাল সবুজের পতাকা নিয়ে বিজয় উল্লাস করতে থাকে। আমাদের দু’জনকে মাথায় তুলে ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে উল্লাস করতে থাকে। পলাশডাঙা পাক হানাদার মুক্ত করতে পেরে মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল উঁচিয়ে মহা উল্লাসে মেতে ওঠে। আমাদের দু’জনকে মাথায় তুলে নাচতে থাকে। কমান্ডার নিজাম তো আমাকে জিজ্ঞেস করে বসে, মাহিন তোদের মাথায় যে এতো বুদ্ধি ছিলো, তোরা তো আমাকে বলিসনি?
– আমাদের জানাবার কোন সুযোগ ছিলো না। মুক্তিযোদ্ধারা যখন অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত হয়ে চলে যায়। তখন আমরা গগন কাকার কাছ থেকে কেউটে সাপগুলো নিয়ে আসি। মাহিন জবাব দেয়।
– মাহিনের কথা কেড়ে নিয়ে আরমান বলে ওঠে আমরা তো আপনাদের কাজে সহায়তা করতে পেরেছি এরচেয়ে বড়ো সত্যি আর কিছু নেই।
দু’বন্ধু কথা বলতে বলতে মুক্তিসেনার দল বন্দী পাক হানাদারদের ধরে নিয়ে যায়। জয়বাংলা স্নোগান দিয়ে লাইন ধরে পলাশ ডাঙা ক্যাম্পের দিকে যেতে থাকে লাল সবুজের বিজয় পতাকা উঁচু করে আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালোবাসি গান গেয়ে…..

x