একাকী এবং অন্যজন

মিলন বনিক

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ
245

যৌবনের প্রথম ভালোলাগা। প্রথম প্রেম। প্রথম নিবেদন। বড় একতরফা হয়ে গেলো মুকুল মাহমুদের। অসম প্রেম বলেই কি এমনটা হলো? কে জানে? হয়তো তাই হবে। সমুদ্রের বীচকেদারায় শুয়ে মুকুল মাহমুদ চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে যখন সানবাথ নিচ্ছিলো, তখন এই একটি কথাই বার বার মনে হচ্ছিলো। মুকুল মাহমুদের জীবনের মতো সুর্যটাও তখন মধ্য গগনে।

গনগনে সূর্যের তেজ। উত্তপ্ত বালুচর। লু হাওয়া বইছে সমুদ্রের কোলজুড়ে। একের পর এক সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি প্রকাণ্ড গর্জনে আঁচড়ে পড়ছে বালুচরে। বালুচরে একটি নাম লেখা হয়েছিলো। সে কখন? কত সময় গড়িয়ে গেলো। সমুদ্রের কত গর্জন মনের দরোজায় হাতুড়ির মতো আঘাত করলো। সমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়ালে জীবনের জটিল সমীকরণগুলো না কি সহজে মিলে যায়। সমুদ্রের কাছে গেলে নাকি মনের বিশালত্ব বাড়ে। অথচ মুকুল মাহমুদের জীবনের হিসেব নিকেশ কিছুই মিলছে না।

বড়লোকের আদরের দুলাল মুকুল মাহমুদ। হরিরামপুর সরকারি কলেজের বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সোনার চামচ মুখে নিয়ে যার জন্ম, তার জগৎটা সাধারণের চাইতে একটু ভিন্ন তো হবেই। এটাই স্বাভাবিক। পরিপাটি জামা জুতো। গঙ্গারামের ধোলাই করা শার্টপ্যান্ট। একদিনের বেশি দুদিন পরার অভ্যাস নেই। পুরনো, আধময়লা মনে হয়। জুতোয় ধুলোর আস্তর পরলে জুতো পুরনো হয়ে যায়।

লাইফ স্টাইলটা ওরকমই। সকালে সাড়ে নয়টায় নীল রঙের মার্সিডিস বেঞ্চ নিজে ড্রাইভ করে কলেজ ক্যাম্পাসে আসবে। তারপর বন্ধুরা মিলে সিরু মামার দোকানে আড্ডা। চা সিগারেট। হৈ হল্লা। যৌবনের উম্মাদনা। ভয়কে জয় করার অদম্য স্পৃহা। জীবনে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। মাঝে মধ্যে লং ড্রাইভে যাওয়া। ক্লাসে যাওয়া হয় কালেভদ্রে। ইচ্ছে করলে, একঘন্টা করবে। না করলেও কিছু যায় আসে না। সময় কাটে কলেজ ক্যান্টিনে। কোনো কোনো দিন কমনরুমে টেবিল টেনিস কিংবা ক্যারাম খেলা। এই বয়সটাই এমন দুরন্ত, দুর্বার।

সেদিনের ঘটনাটা মনে হলে আজও মুকুল মাহমুদের গা শিউড়ে উঠে। নিজেকে ধিক্কার দেয়, কেন সেদিন হাবিবা ম্যাডামকে কথাটা বলতে পারলো না? কী এমন ক্ষতি হতো? এই একটি কথা, জীবনে আর কোনোদিন কাউকে বলা হবে না।

বাংলার ম্যাডাম হাবিবা হক। নতুন জয়েন করেছে। স্মার্ট। সুন্দরী। সুদর্শনা তো বটেই। গায়ের রঙ শ্যামলা। আঙ্গিক অবয়বে আর দশটা বাঙ্গালি নারীর মত মনে হলেও হাবিবা হকের বিশেষত্ব অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ব্যক্তিত্বপূর্ণ তেজোদীপ্ত চেহারা।

যা যা গুনাবলী থাকলে একজন নারীকে প্রকৃত সুন্দরের সংজ্ঞায় বিশেষায়িত করা যায় তার সব বিশেষত্বই বিদ্যমান। কী পোষাক, কী রুচি? পায়ের নখ থেকে মাথার চুল। সবকিছু একটা শৈল্পিক ধাঁচে গড়া। সুন্দর পরিপাটি। সবকিছুতেই মুগ্ধতার ছোঁয়া। চলনে বলনে পুরো শরীরটাই একটা আর্ট। একটা তৈলচিত্র। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকতেই উপস্থিত জনা তিরিশেক ছাত্রের চক্ষু একবারে ছানাবড়া।

একেতো বাংলা ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি কম থাকে। ক্লাসে মোট একশ ষাট জন ছাত্রছাত্রী। উঠতি বয়সের তরুণ ছাত্রীদের চোখও কপালে উঠলো সেদিন। দিনের পর দিন বাংলা ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বাড়ছে। একেবারে হানড্রেড পার্সেন্ট। কলেজের যে সকল ছাত্রীরা নিজেদের সুন্দরী বলে আলাদা মূল্যায়নের প্রত্যাশা করতো তারাও কেমন যেন চুপসে গেলো।

এতদিন ব্যাচে সবচেয়ে সেরা সুন্দরীর কেতাবটা ছিলো সুমির দখলে। সুমি ফর্সা, গৌরবর্ণ। ম্যাডাম শ্যামবর্ণ। দুজনের হালকা পাতলা ছিপছিপে গড়ন। চোখ দুটো টানা টানা। হাবিবা ম্যাডামের অনিন্দ্য সুন্দর দু’টো চোখ। নীলনয়না। হরিণী আঁখি। তার চেয়েও বেশি মনোমুগ্ধকর চোখের গভীরতা। সেই সাথে নজরকাড়া অনন্যসাধারণ ব্যাক্তিত্ব।

কলেজে হাবিবা হকের কাছে অন্য যে কারও সোন্দর্য্য একবারেই নস্যি। কোথায় কি, পান্তা ভাতে ঘি। হাবিবা হকের উপস্থাপনা, পড়ানোর স্টাইল, বাচনভঙ্গি, বোঝানোর দক্ষতা সবকিছুই যেন ছাত্রদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সবাই অপলক মন্ত্রমুগ্ধের তাকিয়ে থাকে।

হাবিবা হক কলেজে জয়েন করার পর শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্যেও মৃদু আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে যখন ডাক পরে, তখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষার অস্বস্তি পোহাতে হয়। অন্য শিক্ষকশিক্ষিকাদের মধ্যে শুরু হয় মৃদু গুঞ্জন।

বার বার হরি দপ্তরির ডাক পড়ে। এই বললো তো জল দিয়ে যাও, আবার এই বলে তো চা নিয়ে আসো। হরি চা নিয়ে আসে। আড়ালে চোখ বুলিয়ে নেয় হাবিবা হকের বসার ভঙ্গিতে। কুদৃষ্টি নয়, সৌন্দর্যটাকেই সবাই শ্রদ্ধার সাথে অবলোকন করতে চায়। এমন সৌন্দর্যের প্রতি অশালীন দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে সুন্দরের গভীরতা উপলব্দি অনেক আনন্দের। অনেক বেশি স্বস্তিকর। কিন্তু দুভার্গ্য, ও চোখে ডুব দিয়ে গভীরতা পরিমাপ করা দুঃসাধ্য, এবং দুরহও বটে।

আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, কলেজের ছাত্রদের মধ্যেও একটা পরিবর্তন এসেছে। যারা হাবাগোবা, গোবেচারা, তারাও স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করছে। নিয়মিত ক্লিন শেভ করছে। কাপড় আয়রন করছে। চুলদাড়ি কাটছে। কলারের পেছনে যাদের কালো চিটচিটে দাগ জমে, তারাও চেষ্টা করছে সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও পরিপাটি হয়ে কলেজে আসতে।

কলেজের স্যারদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে সকল স্যারেরা একটা শার্ট দুতিনদিন পরে আসতো, তারাও নিয়মিত ধোলাই করা শার্টপ্যান্ট পরে ফিটফাট হয়ে কলেজে আসছে। এ এক আমুল পরিবর্তন। সবার মনের মধ্যেই কোথায় যেন এক অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। অলৌকিক পরিবর্তনের পালে হাওয়া লেগেছে।

যে সকল ছাত্রছাত্রীদের রাজনীতির নামে মিছিল মিটিংএ সময় কাটতো, তারাও ভদ্রসভ্য হয়ে রীতিমতো ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে। কলেজে এসে ক্যাম্পাসে কোথাও না কোথাও উকিঝুকি দিচ্ছে। তারা সালাম দিয়ে কলেজ করিডোরে হাবিবা হকের হেঁটে যাওয়া দেখে।

সেদিন এর বাইরে কিছু একটা করে বসল মুকুল মাহমুদ। ব্লাক বোর্ডে অনিন্দ্য সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে রেখেছে “হাবিবা হক, তুমি আমার হৃদয় সাথী”। মুকুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। বড় লোকের ছেলে। সাহস তো থাকবেই। কলেজের অনেক তরুনীরাই ক্যান্টিনে মুকুলের সবসময়ের সঙ্গী। সে কিনা সাহস করে এমন কাণ্ডটা করে বসলো? যে মুকুল সপ্তাহে একটা ক্লাস করতো না, সেই মুকুল ইদানীং একটা ক্লাসও মিস করেনি। সবার আগে ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে ওর আসনটা একেবারে পাকা পোক্ত করে নিয়েছে। সাথে রায়হান, আবীর, দীপ, মোমিন ও রবি। সারাক্ষণ পাশে পাশে থাকে। আজও সবাই সামনের বেঞ্চে বসে আছে।

ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকলেন।

আড়চোখে তাকালেন বোর্ডের দিকে। একেবারে নিরুদ্বেগ। কোনো ধরনের ভাবাবেগ নেই। ব্যাকুলতা নেয়। অস্থিরতা নেয়। যেন ুিকছুই হয়নি। প্রতিদিনের মতো আজ আর চেয়ারে বসলেন না। টেবিলের এক কোণায় পা ঝুলিয়ে বসলেন। হাতে অ্যটেনডেন্স রেজিষ্টার। রোল কল করলেন।

একেবারে স্বাভাবিক। মাঝে মধ্যে মিটিমিটি হাসছেন। বুঝি ভালোই লাগছে। একজন সুন্দরী শিক্ষিতা নারীর জন্য এটা এমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। রোল কল শেষে কিছুটা সময় ব্লাকবোর্ডের দিকে তাকালেন। তাতে মেজাজ খারাপ করার মত কোন লক্ষণ নেয়। সকালের সেই চির নবীণার মতোই সতেজ, প্রাণবন্ত।

রোল খাতাটি টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। বাংলা বইটা হাতে নিয়ে বললেনআজ আমি পড়াব রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তি। প্রেমের গল্প। আসলে এই বয়সটাই হচ্ছে প্রেমের বয়স। প্রেমের বয়সটাতে পড়াশুনা নিয়ে এত ব্যাস্ত ছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি কখন ওই বয়সটা পেরিয়ে এসেছি। প্রথমত আমি একজন মানুষ। তারচেয়েও বড় কথা আমি একজন নারী। আমারও তো মন আছে। ভালোবাসার অধিকার আছে। আমারও ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। আমিও চাই, আমাকে কেউ ভালোবাসুক। আমারও ইচ্ছে করে প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে সুখের ভাবনা ভাবতে। আজ আমি তাই ভাববো। আজ আমার সবচাইতে আনন্দের দিন।

তোমরা তো জান আমি একজন বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষক। আমি আমার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারি। বাবা মা কিংবা অন্যকারও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয় না। আজ আমাকে একজন প্রেম নিবেদন করেছে। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে? আমার মনে হচ্ছে, আজকের দিনটাই আমার জীবনে সবচেয়ে আনন্দের দিন। পরম প্রাপ্তির দিন। মনে হচ্ছে, কতযুগ আমি এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম।

আমি জানি, যে ছেলেটা ব্লাকবোর্ডে লিখে আমাকে প্রেম নিবেদন করেছে সে অত্যন্ত সাহসী এবং মেধাবী। আমি তার সাহসের তারিফ করছি। আমার জীবনে এমন একজন প্রেমিকের বড় প্রয়োজন। বিশ্বাস করো, আমার সাহস ছিলোনা বলে, প্রেম করতে পারিনি। কতজন কতভাবে আমাকে বোঝাতে চেয়েছে। আমার ওসব নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশ হয়নি। একেবারে ভাবিনি বললে মিথ্যা বলা হবে। আকাশ নামের একটা ছেলেকে ভালো লাগতো। ছেলেটা ছিলো বাউণ্ডুলে। প্রায়শই কথা হতো। একবার ক্যাম্পাসে কথা বলতে বলতে ওর হাত ধরে অনেকটা পথ হেঁটেছি। তখন কেবলি মনে হয়েছিলো, আকাশই প্রথমে আমাকে ভালোবাসার কথাটা বলুক। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সে হেসে উড়িয়ে দিতো। সে কিছু বলেনি। আমারও মনে হতো, সে কিছু বলতে চাইছে, অথচ বলতে পারছে না।

আমারও আর কিছু বলা হয়নি। কেবল নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভেবেছি। আজ বড্ড মনে হচ্ছে, জীবনে প্রেমই যদি না আসে, তাহলে এ সৌন্দর্যের কোনো মানে হয় না। জীবনটাই বৃথা। আজ ক্লাসে তোমরা সবাই আছো। তবে ছাত্র হিসেবে কিছুটা সৎসাহসের অভাব তোমাদো আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। আফটার অল, আমি শিক্ষক, তোমরা আমার ছাত্রছাত্রী। যার জন্য সামনা সামনি কিছু বলতে সাহস পাচ্ছো না। ।

আমি হলেও তাই করতাম। তবে আমি যেহেতু শিক্ষক, তাই এখানে দাঁড়িয়ে আমি তোমাদের সামনে প্রতিজ্ঞা করছি, যে এই কথাটি বোর্ডে সবার অগোচরে লিখেছে সে যদি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে বলতে পারে, “হাবিবা হক, তুমি আমার হৃদয় সাথী” আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এই আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। সে যদি আমাকে প্রপোজ করতে পারে, আমি তাকে এই মুহূর্তে সবার সামনে বিয়ে করবো। আমার বিশ্বাস, যে মনের এই গোপন কথাটি সবার অগোচরে লিখে রেখেছো, সে নিশ্চয় তার ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে পাবার জন্য এতটুকু সৎসাহস দেখাতে পারবে। নয়তো ভাববো সে কাপুরুষ। লেখাপড়া শিখে ভদ্রতার আড়ালে সুন্দরী মেয়েদের টিজ করতে শিখেছে। যা রাস্তার ছেলেরা করে থাকে। আর বয়স! বয়স কোন ফ্যাক্টর নয়। আমি এখনও অবিবাহিতা। যথেষ্ট সুন্দরী কি না জানি না। তবে আমার নিজস্ব সুন্দরের একটা অহংকার আছে। পারিবারিক বংশ মর্যাদাও কোনো অংশে কম নয়। বাবা ডাক্তার। মা কলেজ শিক্ষিকা।

সারা ক্লাসে নিশ্চল নীরবতা। কারও মুখে রা শব্দটি নেই। মেয়েরা কেউ কেউ কানাঘুষা করছে। কেউ মুখ টিপে হাসছে। ছেলেরা কেউ কেউ হা করে তাকিয়ে আছে। কেউ মাথা নিচু করে আছে। ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে প্রপোজ করার সাহস কারও নেই। ম্যাডামের ব্যাক্তিত্বই হচ্ছে প্রধান অস্ত্র। যে কেউ চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। যে লিখেছে সেও মাথা তুলতে পারছে না। কথা বলা দূরে থাক। দুরু দুরু বুকে একবার ভাবল বলেই ফেলিম্যাডাম আমি লিখেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি ভূল করেছি।

এ তো ভালোবাসা নয়। এ ক্ষণিকের আবেগ। যদি ভালোবাসাই হতো তবে নিশ্চয় সাহস করে বলে ফেলতে পারতো। ভালোবাসার মানুষটিকে পাবার জন্য কতজন কত নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়। আর এত সহজে যে মানুষটি নির্দ্ধিধায় বলছে আমি রাজী। তার এই সহজ সরল কথাটি সবাই বিশ্বাস করে। বিয়ে করবে। মালা পরাবে। সংসার করবে। তারপর সব হবে।

একজন ছাত্রও দাঁড়িয়ে বলতে পারলো না। দাঁড়িয়ে পড়লো দীপ। সবার দৃষ্টি দীপের দিকে। খুব সহজ সরল ছেলে দীপ। ম্যাডাম বিশ্বাস করতে পারছে না দীপ এমন কথা লিখতে পারে। অথচ সেই দীপই কি না দাঁড়িয়ে গেলো। মুকুল চোখ লাল করে দীপের দিকে তাকিয়ে ইশারা করছে। দাঁত খড়মড় করছে। এই বুঝি গিলে খাবে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করে। ক্ষমতা এবং দাপট দুটোই আছে মুকুলের। মেরেও ফেলতে পারে। চুপচাপ চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিল দীপ। ম্যাডাম ফোডিয়াম থেকে নেমে দীপএর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ম্যাডামের পেছন থেকে মুকুল হাত উঁচিয়ে খবরদারি সংকেত দিল। এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। মুখ ফসকে কথা বেরিয়ে গেলে নিশ্চিত মার খেতে হবে। মাথা নিচু করে বলল,

ম্যাডাম।

গুড। ভেরি গুড। তোমার সাহস আছে। নিশ্চয় তুমি লিখেছ?

না ম্যাডাম। বলছিলাম কী?

বলো। এত ভয় পাচ্ছো কেন?

বলছিলাম কী, যদি একটা দিন সময় দেন তাহলে যে লিখেছে সে একটু স্বাভাবিক হতে পারতো।

ম্যাডাম হাসলেন। বললেন, তোমার বুদ্ধি আছে। প্রস্তাবটা মন্দ নয়। তোমার সাহসও আছে। আমি আবারও বলছি, তোমরা যেই লিখ না কেন, আগামীকাল এই ক্লাসে যদি কেউ সাহস করে বলতে পারো তাহলেও আমি আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবো। সেদিন আর হৈমন্তি পড়ানো হয়নি। ঘন্টা বাজলো। যাওয়ার সময় সেই চিরচেনা গর্বের হাসি দিয়ে বলে গেলো, সবাই ভালো থেকো। আশা করি আগামীকাল ক্লাসে সবাই উপস্থিত থাকবে।

পরের দিন সামনের সারির সবাই অনুপস্থিত। তর্ক হয়েছে দীপের সাথে মুকুলের। দীপ বলতে চেয়েছিল সে নিজেই লিখেছে। এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলো। এমন সুযোগ জীবনে বার বার আসে না। ম্যাডামকে নয়, মুকুলের চোখ রাঙ্গানীর ভয়ে সাহস করে বলতে পারেনি। মুকুল পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তোর কিছুই বলার দরকার নেই। পরদিন কলেজেও আসবি না।

সেদিন আর কারোরই কলেজে যাওয়া হয়নি।

আজ এতদিন পর হাবিবা হক ম্যাডামকে চিনতে এতটুকু কষ্ট হয়নি। মুকুল সৈকতের বিচবেডে শুয়ে আছে। হাবিবা হক সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে অস্তাচলে নুইয়ে পরা সুর্যের রক্তিম আভাটুকু দেখছিলো মন ভরে। চোখে হালকা বাদমি রঙের সানগ্লাস। আশে পাশে কেউ কোথাও নেই। পড়ন্ত বিকেলের এমন রূপটা হাবিবা হকের খুব ভালো লাগে। প্রতি উইকএণ্ডে ঘন্টা দুয়েকের জন্য বালুচরে এসে ঘুরে যায়। এই সময়টাতে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। জীবনের কতটা বছর পেরিয়ে গেলো। যেটুকু বয়স, তাতে মনে হয় না শরীরে ভাঙন ধরেছে। এতটুকু সৌন্দর্য কমেনি। ব্যাক্তিত্ব আর রুচিবোধ দুয়ের সমন্বয়ে নিজেকে আরো বেশি পরিপক্ক মনে হচ্ছে।

মুকুল বড় টাওয়েলটা গায়ে জড়িয়ে সানগ্লাসটা মাথার উপর তুলে ম্যাডামের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সালাম জানিয়ে বললো

ম্যাডাম, আমাকে চিনতে পেরেছেন?

হাবিবা হক চশমাটা হাতে নিয়ে একবার দেখলেন। ক্লাসে ফাস্ট বেঞ্চের ছাত্র হিসেবে একেবারে মন থেকে মুছে যায়নি। এতবছর পর মুকুল নামটাও মনে পড়ে গেলো। বয়সে ভারিক্কি মনে হলেও চেহারার আদলটা তেমনই আছে। হঠাৎ করে পুরনো ছাত্রকে তুমি করে বলতেও বিবেকে বাঁধছে।

ম্যাডাম আমি হরিরামপুর কলেজের সাতানব্বই ব্যাচের ছাত্র—-

মুকুল।

ইয়েস ম্যাডাম।

কি করছো এখন? নিশ্চয় বেড়াতে এসেছো।

রথ দেখা আর কলা বেচা, দুটোই করছি, ম্যাডাম। ইউএসএ থেকে এমবিএ শেষ করে বাবার ব্যাবসা দেখছি। কঙবাজারে পাঁচতারকা মানের তরুছায়া রিসোর্টটা লঞ্চ করবো এই মাসে। সেই সুবাধে প্রায়ই আসা হয়। একটু সময় নিয়ে সমুদ্র দেখে আবার কাজে ফিরি।

ওহ। বেশ ভালো।

আপনি এখানে? আই মিন, আর কেউ?

না, আর কেউ নেই। আমি একা। এই শহরেই থাকি।

আপনি কি প্রতিদিন বিকেল সমুদ্র দেখতে আসেন?

না। প্রতিদিন সম্ভব হয় না।

মুকুলের আরো অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। চোখের সামনে ব্লাক বোর্ডের লেখাটা বার বার ভেসে উঠছে। কিভাবে কি বলবে বুঝতে পারছে না। বয়স এবং সময় দুটোই পাল্টিয়েছে। মুকুল মাহমুদ এখন দেশের নামকরা বিজনেস ম্যাগনেট। মাহমুদ গ্রুপ অব কোম্পানীজ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। মুকুল জিজ্ঞাসা করতে চাইলো, বিয়ে শাদি করেছেন কি না? এমন প্রশ্ন করা আদৌ সমীচিন হবে কি না তাই ভাবছে। ব্যাপারটা সহজ করলো হাবিবা হক নিজে। জিজ্ঞাসা করলো,

তোমার ফ্যামিলি আসেনি?

হাসলো মুকুল। কোনো উত্তর দিলো না।

দু’জনেই সমুদ্রের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। একটা ঢেউ এসে দু’জনের পা ভিজিয়ে দিলো। হাবিবা হকের শাড়িটা গোড়ালি অব্দি ভিজলো। ভেজা শাড়িটা লেপ্টে আছে পায়ের সাথে। চোখের দৃষ্টিটা স্থির ছিলো হেলে পড়া সুর্যের দিকে। দু’জনের ভাবনার অর্ন্তজালে হেলে পড়া সুর্যের লুকোচুরিটা কতটা দাগ কাটছিলো কে জানে।

আবারো একটা প্রকাণ্ড ঢেউ আচড়ে পড়লো পায়ে। এবার নোনাজল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইলো হাবিবা হক। তড়িঘড়ি করে নিজেকে গুটাতে গিয়ে পায়ের সাথে লেপ্টে থাকা শাড়িতে টান লাগলো। পড়তে গিয়ে অবলীলায় মুকুলের হাতটি ধরে বসলো। মুকুলের হাত ধরে ম্যাডাম স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বার একই প্রশ্ন করলো

তোমার ফ্যামিলি আসেনি?

না।

ওরা কি ঢাকায় না চট্টগ্রামে?

কোথাও না ম্যাডাম।

মানে?

বিয়ে করিনি।

বিয়ে করলে না কেনো?

মুকুল মাহমুদ চুপ করে আছে। ইচ্ছে করছে এখনিই কলেজের ব্ল্যাক বোর্ডে লেখা কথাটা সাহস করে বলে ফেলতে। বলতে পারছে না। জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে আসছে। ম্যাডামকে সেই আগের মতোই ভয় হচ্ছে। এতদিন পর ম্যাডাম কিভাবে নেবেন কথাটা? ম্যাডাম আবার জিজ্ঞাসা করলেন

কই কিছু বললে না তো?

মুকুল মাহমুদ কোনো উত্তর না দিয়ে চোখের সানগ্লাসটা হাতে নিয়ে বললো,

ম্যাডাম আমাদের কি আবার দেখা হবে?

হতেও পারে। আমি প্রতি উইকএণ্ডে সমুদ্রের কাছাকাছি আসি। বিকেলটা কাটিয়ে সূর্যাস্ত দেখে আবার ফিরে যায়। ভালোই লাগে।

সূর্য ডুবে গেছে। দু’জন পাশাপাশি অনেকটা বালুপথ পায়ে হেঁটে মূল সড়কে উঠলো। দু’জনের গন্তব্য দু’দিকে। মুকুল মাহমুদ কিছু বলার আগে হাবিবা হক হাত নেড়ে বললো, আবারো দেখা হবে কোনো উইকএণ্ডে। আজ আসি। দু’দিকে বেঁকে গেলো দুটি পথ। বালুচরে আঁকা পদচিহ্নগুলো থেকে গেলো। সমুদ্রের ফেনিল ঢেউয়ের গর্জনটা তখনও কানে বাজছে।

মুকুল মাহমুদ নিজের মনে ভাবছে, ব্ল্যাকবোর্ডে কথাটা আমি লিখেছি বললে ম্যাডাম কি তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবেন?

x