একটি প্রাণকে বাঁচাবো বলে…

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২০ at ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
92

চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। গহীন ঘন জঙ্গল। কোথাও কোনো রাস্তা নেই। গাড়িঘোড়া কিচ্ছু নেই। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পায়ে হাঁটার পথ। তাও অতি দুর্গম। উঁচু-নিচু। কোথাও ছড়া পার হয়ে, আবার কোথাওবা সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়া পার হয়ে করতে হয় চলাচল। একটি বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে বেশ সময় লাগে। পাহাড় টপকে যেতে হয় এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। ভয়ংকর এক দুর্গম জনপদ। রাঙামাটির সাজেক থেকে অন্তত ২৫ কিলোমিটার দূরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা গহীন জনপদ। মিয়ানমার সীমান্তের কাছে। মাটির একেবারে কাছাকাছিতে থাকা জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষগুলো গত এক মাসের বেশি সময় ধরে কঠিন বিবর্ণ এক সময় পার করছিল। হামের আঘাতে ছোট্ট এই জনপদে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছিল। মাত্র দিন কয়েকের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে আটটি শিশু। অসুস্থ হয়ে কাহিল হয়ে উঠা মানুষগুলোর মাঝে দেখা দেয় তীব্র আতংক। চারটি পাড়ার আট শতাধিক আবালবৃদ্ধবনিতার জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। ঘরে ঘরে আক্রান্ত হচ্ছিল শিশু। এই বাড়িতে কান্নার রোল থামলে পাশের বাড়ি থেকে বিলাপ ভেসে আসছিল। নানা ধরনের কুসংস্কারে আচ্ছন্ন উপজাতীয় মানুষগুলো নিজেদের মতো করে চিকিৎসা করিয়ে শিশু মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারছিল না। হামে আক্রান্ত ১২০ শিশু-কিশোর ভয়াবহ রকমের আতংকের মাঝে মৃত্যুর প্রহর গুণছিল। হাসতে ভুলে গিয়েছিল তাদের মা-বাবা। পুরো পরিবার। দুর্গম এই জনপদের আট শতাধিক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
সেনাবাহিনীর মানবিকতায় জঙ্গলবাসী উপজাতীয় মানুষগুলো গত দুইদিনে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তাদের পাঁচ শিশুকে সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে উড়িয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এনে ভর্তি করিয়েছে। আজকালের মধ্যে যে পরিবারে কান্নার রোল উঠতো সেই পরিবারের মানুষগুলোর মুখে ভুলে যাওয়া হাসি ফিরতে শুরু করেছে। শিশুদের জীবন বাঁচাতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ উপজাতীয় মানুষগুলোকে ৫ম পৃষ্ঠার ১ম কলাম
বিমোহিত করেছে।
সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাজেক থেকে অন্তত দুইদিনের পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে যেতে হয় লুথিয়ানপাড়া, অরুনছড়ি পাড়া, কমলাপুর পাড়া এবং শেয়ালদহ পাড়ায়। সেখানে আধুনিকতার কোন ছোঁয়া নেই। প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির মতো করেই বেঁচে থাকা উপজাতীয় মানুষ। নিজেদের মতো করে তারা থাকে। মাস খানেক আগে ওই চার পাড়ায় দেখা দেয় হাম। ঘাতক ব্যাধি হামের আঘাতে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানার পর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এসএম মতিউর রহমান অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারের সংস্থান করে সেনাবাহিনীর একটি চিকিৎসা টিম পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। টিমে সেনাবাহিনীর তিনজন এবং সিভিল চারজন মিলে মোট সাত জন চিকিৎসককে হেলিকপ্টারযোগে সাজেক পাঠান। সেখান থেকে চিকিৎসকদল কিছুপথ গাড়িতে এবং কিছুপথ পায়ে হেঁটে উক্ত পাড়াগুলোতে পৌঁছান। পথিমধ্যে একটি স্কুলে রাত কাটাতে হয় চিকিৎসক টিমকে। দ্বিতীয়দিন পাড়াগুলোতে পৌঁছে রোগাক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা শুরু করতে গিয়ে চিকিৎসক টিম নিশ্চিত হন যে, তীব্র অপুষ্ঠিতে থাকা শিশুগুলো শুধুমাত্র হাম-এ আক্রান্ত নয়, একই সাথে কঠিনভাবে নিউমোনিয়ায়ও গ্রাস করছে তাদের। মোট ১২৪জন রোগাক্রান্ত শিশুকে পরীক্ষা করে টিমের সদস্যরা একই পরিবারের পাঁচটি শিশুকে ভয়াবহ অবস্থায় দেখতে পান। চিকিৎসক টিম এই পাঁচটি শিশুকে বাঁচাতে হলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে বলে জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমানকে জানান। শিশুদের দুরবস্থার খবর পেয়ে জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমান গতকাল আবারো হেলিকপ্টার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ উক্ত পাঁচ শিশুকে উড়িয়ে আনা হয় চট্টগ্রামে। পাঁচ শিশুকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একই পরিবারের এই পাঁচ শিশু হচ্ছে প্রতিল ত্রিপুরা (০৫), রোকেন্দ্র ত্রিপুরা (০৬), রোকেদ্র ত্রিপুরা (০৮), নহেন্দ্র ত্রিপুরা (১০) ও দিপায়ন ত্রিপুরা (১৩)। হাম এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত পুষ্ঠিহীন এই পাঁচ শিশুর অবস্থা খুবই সংকটজনক বলেও চিকিৎসকদের উদ্বৃতি দিয়ে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান। তাদেরকে চমেক হাসপাতালে নিবীড়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
অপরদিকে লোকালয় থেকে বহু দূরের দুর্গম গহিন অরণ্যের উক্ত বাসিন্দাদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় ঔষধপথ্যসহ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার দাবারও দেয়া হয়েছে। একের পর এক শিশু সন্তানদের হারিয়ে চরমভাবে অসহায় হয়ে উঠা মানুষগুলো সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতে হাতে যেন জীবন প্রদীপ ফিরে পেয়েছে। উপজাতীয় অসংখ্য নারী পুরুষ সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতে আপ্লুত হয়ে উঠে। এদের কেউ কেউ সেনা সদস্যদের দেবদূত হিসেবে আখ্যায়িত করে ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও সহায়তা অব্যাহত রাখার আকুতি জানিয়েছে।