একটি নিভৃত মৃত্যুদৃশ্য ও প্রবীণ টিকটিকি

সাদিকা রুমন

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
44

রতন ঘোরের ভেতর চোখ মেলে। নিস্তেজ ঘোলাটে চোখ। শীতের রোদের মতো। মায়ের বহুব্যবহৃত ছাপা শাড়ির মতো। ত্যানা ত্যানা। ঘরের কোণায় তাকায়। আছে। টিকটিকিটা আছে। নরম চামড়ার তুলতুলে টিকটিকি নয়। পুরু চামড়ার প্রবীণ টিকটিকি। গায়ের রঙটাও চামড়ার পুরুত্বের সাথে গাঢ়তা পেয়েছে। প্রবীণ বলে ওর সঙ্গটাও উপভোগ্য। ছটফটানি কম। এক জায়গায় দীর্ঘ সময় বসে থাকে। কম বয়সিদের মতো প্রেম কামনায় সঙ্গীর পেছনে ছোকছোক করে ছুটে যায় না। ওরকম তরুণ টিকটিকিরও দেখা মেলে মাঝে মাঝে। প্রাণান্ত চেষ্টায় সঙ্গীকে বশ করে প্রেম নিবেদন করে। সঙ্গী বার কয়েক আপত্তি জানিয়ে রাজি হয়। এই তরুণ টিকটিকিদের সাথে রতনের কখনো সখ্য গড়েনি। গড়ার কথাও নয়। কারণ একই প্যারেডে সচল আর নিশ্চল কিংবা প্রায় নিশ্চলের সহ-অবস্থান পৃথিবীর নিয়মের মধ্যে পড়ে না। তাই ক্ষিপ্রগতির তরুণ টিকটিকির ভ্রুক্ষেপহীনতায় রতনের আফসোস নেই। যেখানে মানুষই থাকেনি। থাকেনি বউ, ভাই এমনকি মা। ‘বউ’ শব্দটা মাথায় আসতেই রতন তার নিস্তেজ চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়-শব্দটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে কিংবা শব্দটার ভেতর আরো মগ্নভাবে ডুবে যেতে। বউ বলে রতন যাকে ভাবনার জমিনে এক টুকরো জমি ছেড়ে দেয় সেই শিউলিকে সে একইসঙ্গে মনে করতে চায় এবং চায় না। আজ কেন কে জানে তার চাওয়া না চাওয়ার তোয়াক্কা না করে মন পরিত্যক্ত অতীত ছেনে বিষ তুলে ফেলছে।
রতনের মন যখন এরকম ছানাছানিতে ব্যস্ত তখন আধখোলা জানালার বাতাস বয়ে নিয়ে আসে সচল মানবজীবনের একটুকরো বাক্যালাপ:
-আহারে আল্লা যে কার কপালে কী রাখছে! এত কামাই করল জীবন ভইরা আর এহন একমুঠ ভাতও জুটে না!
অপর কণ্ঠ: হ গো হাসিনা বু মানুষটার কতা মুনে অইলে খুব কষ্ট লাগে। যহন ভাত ছিটাইয়া পারছে কাকের অভাব অয় নাই। আর এহন ইট্টু পানি দেওনের মানুষডাও নাই।
প্রথম কণ্ঠ: শুনছ না হারামজাদী বউডার বুলে বিয়া ঠিকঠাক। খালি রতনের মরার জন্যেই বুলে বইয়া রইছে। হাজার অইলেও বাড়ির সাতেই তো। নাকের উপুর দিয়া বউ সাইজা যায় কেম্নে!
অপর কণ্ঠ: আরে বিয়া তো করছে আগেই। এহন ময়মুরুব্বি নিয়া ফয়সালা করবার চায় আরকি। আহারে মানুষটা বেকুবের মতো কামাই কইরা ব্যাক ট্যাহা বউয়ের নামে পাঠাইছে। আর বউ লাইন মারছে আরেকজনের সাতে! আহারে…মানুষের কপাল!
এরপর বাক্যালাপ অস্পষ্ট হয়ে যায়। আলাপচারীরা হাঁটতে হাঁটতে দূরে চলে যায়। রতনের এখন আর গায়ে লাগে না। তবু ক্লান্ত মনের ভাবনার শ্রমটুকু মেনে নিতে হয় : শিউলি বজলুলের গরে উটপো! বিয়া তো করছে আগেই খালি আগের জামাইয়ের গরের উফরে আরেকজনের গরে উঠা পারে নাই।
হাসিটাও পরিশ্রমসাধ্য রতনের জন্য। তবুও বিদ্রুপের মতো তিক্ত এক ঝলক হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোণায় : আমার বাইচা থাকাডা তাইলে তার কাছে বিষয়! বাইচা থাকাডারে হে অস্বীকার করার পারতাছে না!
আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। তাই চোখ খুলে টিকটিকিটাকে খোঁজে। হ্যাঁ আছে। জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। যেন সে জেনে গেছে এই বিছানার ওপর মুত্যুর নজরবন্দি ঐ মানুষটার এখন তাকে প্রয়োজন। রতন তার একমাত্র পরিজন টিকটিকিটার দিকে তাকিয়ে শিউলি এবং তার বিয়েসহ যাবতীয় পার্থিবতাকে উপেক্ষা করতে চায়। কানের কাছে হঠাৎ মা বেজে ওঠে :
-গ্যাদা হারিকেনডা দরাইয়া গরে নিয়া রাকছেন। মাগরিবের আযান দিয়া দিল, এহনো তর আব্বা আইলো না! হারিকেন রাইখা বাইরবাড়ি খাড়াইয়া দ্যাকছেন তর আব্বা আহে নাহি।
আহ্‌! আব্বা আহে না, আব্বা আহে না… মাগরিব এশা ফজর কত আযান পইড়া যায় আব্বা তো আর আহে না। আব্বা আইলে কি এহন মাতার কাছে খাড়াইত। কইতো, কী রে রতন কী অইছে? উঠস না ক্যা? বেলা দুফুর অইয়া গেল? জ্বর আইছে নাকি? আব্বা, আব্বা-জ্বর না, আমার কপালের উপুড় দিয়া মরণ আইটা যাইতাছে। আমি মরণের পায়ের শব্দ হুনতাছি আব্বা। আব্বা আব্বা ইট্টু বহো আব্বা। আমার কাছে ইট্টু বহো। না তুমার ভাত আইনা দেওন লাগব না, আমার আর ক্ষিধা লাগে না। খালি তুমি ইট্টু থাকো আব্বা!
অচেতন হতে হতে রতন আবার উৎকর্ণ হয়। বিভ্রম না। এবার সত্যিই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। শিউলি ফুলের ওপর ঝরে পড়া কুয়াশার মতো মিহি নরম একটা গলা :
-বন্দু দরোজা খুলো। তুমার জন্যে ভাত নিয়া আসছি।
-কে? সাগর?
ভুলেই গিয়েছিল টিকটিকি ছাড়াও তার আরো একজন মনুষ্য পরিজন আছে। ছয় বছরের একটা শিশু। তার বরাতেই মাঝে মাঝে দুটো খাওয়া মেলে। রতন বিছানা থেকে শরীরটা তুলতে পারে না। তবু তার কাছে আসা মনুষ্য-পরিজনটাকে তার দেখার সাধ হয়। তাই বহু কষ্টে উঠে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে না। আবার বিছানায় গিয়ে শরীর নুইয়ে দেয়। সাগর বুঝতে পারে না। ও বিছানার পাশে টেবিলে প্লেট-বাটি রেখে বলতে থাকে,
-বন্দু আইজকা মা মুরগির মাংস রান্না করছে তাই তুমার জন্যে নিয়া আসছি। রতন কথা বলতে চায় কিন্তু মুখের গর্ত দখল করে থাকা পাথরের মতো ভারী জিভটা নাড়াতে পারে না। সাগর আরো কিছুক্ষণ দাঁড়ায়, সাড়া না পেয়ে বেরিয়ে যায়। রতন বুঝতে পারে না সে ঘুমিয়ে গেল কিনা, নাকি মরেই গেল! বেশ কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে এখনো মরেনি। তার অবসন্ন মস্তিষ্কে আবারো ঠোকর মেরে যায় শিউলি।
সদ্য বিয়ে করে কাতার চলে গেল রতন। যাবার আগের কদিন দিনরাত যেন তাদের একাকার হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর বাকি সব ভুলে শুধু বউয়ের মুখটাই গেঁথে নিয়েছিল চোখের ভেতর। বাকিরা কানাঘুষা করত, মা-বোন-ভাবী-ভাইয়ের বিরক্তির তোয়াক্কা না করে পাড়া গা’র নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রতন বউ নিয়ে হানিমুন করতে গেল কক্সবাজার। সেই চোখে হারা করতে না পারা বউকেও তার ছেড়ে যেতে হলো জীবিকার তাগিদে। পাঁচ মাসের বিয়ে করা বউ রেখে সে কাতার পাড়ি দিল। যাবার আগের সারারাত শিউলে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল রতনকে। প্রলাপ বকার মতো বলে যাচ্ছিল,
-তুমারে ছাড়া কেমনে থাকুম!
রতন ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিল,
-দ্যাকবা দুই বছর দেকতে দেকতে কাইটা গেছে।
দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা রতনের জন্য কথাটা সত্যি না হলেও শিউলির জন্য সত্যিই ছিল। কারণ বছর না ঘুরতেই শিউলিকে পাশের বাড়ির বজলুলের সাথে কথা বলতে দেখা যায় এখানে-সেখানে। দেখা যায় বজলুলের গায়ে হেসে গলে পড়তেও। গ্রাম এম্নিতেই তার স্বভাবগুণে যেকোনো কথাকে ছড়িয়ে দেয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাদের জটলার মাঝে, পাগারে গোসল করতে থাকা নানা বয়সী মানুষদের মুখে, দুপুরে পাটখড়ির মাথায় করে আরেক বাড়ি থেকে আগুন নিতে যাওয়া বউটির কানে, পড়ন্ত বিকেলে বারান্দায় বসে বিলি কাটতে থাকা মা-বউ-ঝিদের আয়েসী আলাপে। সেভাবেই দ্রুততার সাথে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই জায়গা পেয়ে যায় শিউলি-বজলুল। মাঝে মাঝে কেউ কেউ সহানুভূতিশীল হয়ে রতনকেও ঠাঁই দেয় সেখানে। কিন্তু রতন এর কিছুই জানে না। সে নিয়ম করে প্রতি মাসে বউয়ের নামে টাকা পাঠায়। পরিবারের অন্য কারো টাকার প্রয়োজন আছে একথা তার মনে হয় না। কোনো বেলা না খেয়ে বা একবেলা বেশি কাজ করে নিজের কাছে যে টাকা জমে সেটা দিয়ে তার পুতুলের মতো বউয়ের জন্য সোনার গয়না কিনে পাঠায়। গ্রামের জীবনযাপনে শিউলির অতটা টাকার প্রয়োজন হয় না। তাই সদ্ব্যবহারের জন্য মাঝে মাঝে কিছু টাকা বেকার বজলুলকেও দিয়ে থাকে বলে গ্রামের লোকেরা তথ্য বিনিময় করে।
সময়ের হিসেবে যথারীতি রতনের কাতার যাওয়ার দু-বছর পার হয়। অর্থাৎ তার ফেরার সময় হয়। এর মাঝে পরিবারের অন্যদের সাথে তার যোগাযোগটা ছিন্নই হয়ে যায় বলা যায়। বউপাগল ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন অনুভব করে না কেউ। বউয়ের কেলেঙ্কারিতে রতনের মায়ের বাড়িতে থাকা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায় তাই সে বড় ছেলের কাছে চলে যায় স্বামীর ভিটা ছেড়ে। মা বাড়ি নেই বলে বোনও আর বাড়িমুখো হয় না। শুধু লোকমুখে তারা একদিন জানতে পারে বাড়ির ছোটছেলের বউ গয়নাগাটি টাকাপয়সা নিয়ে বজলুলের সাথে ভেগেছে। বউপাগল ভাইকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার সুযোগ হিসেবেই রতনের বড় বোন রানু তাকে প্রথমবারের মত চিঠি লেখে। জানায়- ‘যে বউয়ের জন্য আমাদেরকে ছেড়ে দিলা সেই তো এখন পরপুরুষের হাত ধরে ঘর ছাড়ল।’ অবিশ্বাস্য এ আঘাত না মেনে নিতে পারে রতনের মন, না শরীর। তার শরীর ও মনে এতটা বার্ধক্য জমে গেল যে তার ঘেন্নার জোর হলো না শিউলির জন্য কিনে রাখা সোনার হারটা ছুঁড়ে ফেলার। সে বরং ব্যাগ লাগেজপত্র গোছাতে গিয়ে সবার আগে হারটাই ঢোকায়। তারপর যথানিয়মে তার জীবনের দুই বছর কাতারের রাস্তায় সমর্পণ করে সে ফিরে আসে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক গাঁয়ের শূন্য একটি গৃহে। বাড়ির লোক জানত সে আসবে। কিন্তু বাড়ির বিদেশফেরত ছেলের জন্য অপেক্ষা করার মানুষগুলো তাকে হিসেবের খাতা থেকে একরকম কেটেই দিয়েছে। তাই একটা ভূতের বাড়িতে শুরু হয় রতনের জীবনের শেষ অধ্যায়।
কৌতূহলীরা এক দু’দুদিন আসে। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে, আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে বউপালানো পুরুষের অভিব্যক্তি কীরকমের হয়। তারপর ধীরে ধীরে সকলের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে আসে। রতনের শরীর অসুস্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করে ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। সমস্ত উপার্জন বউয়ের এ্যাকাউন্টে পাঠানো রতনের শূন্য হাতে ওষুধ কেনার বা ডাক্তার দেখাবার মত টাকাও অবশিষ্ট নেই তখন। আর পাশে এমন একজন মানুষও নেই যে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। অবশ্য যখন দু’টো ভাত এনে সামনে দেয়ার মতই কেউ নেই সেখানে ডাক্তার তো অনেক পরের প্রশ্ন। রতনও ধীরে ধীরে নিজের আহারের ব্যবস্থা নিজে করে নেবার সামর্থ্য হারায়। এক দিন দু’দিন হয়তো না খেয়েই কেটে যায়। কেউ যদি দয়া করে দিয়ে যায় তখনই শুধু পেট পূর্তি হয়। জীর্ণ একটি বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার দিন-রাতের হিসেব একাকার হয়ে যায়। শুধু শিউলির অস্তিত্বহীনতার প্রবল উপস্থিতি ওকে ছারপোকার মত ক্রমাগত কামড়ে জাগিয়ে রাখে। যেনবা বাঁচিয়েও রাখে। অবশ্য খুব বেশি দিন না। খুব দ্রুতই ভাবার শেষশক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে রতন। শিউলিও তাকে আর জাগিয়ে রাখতে পারে না।
সেদিন আর তার ছোট্ট বন্ধুটিও খাবার নিয়ে আসে না। আগের দিনও আসেনি। রতন মনে করতে পারে না শেষ কবে একজন রক্তমাংসের মানুষের সাথে তার দেখা হয়েছিল। পানির জন্য তেষ্টা হয়। তারও চেয়ে বেশি তেষ্টা বোধকরি হয় তার পাশে একজন অন্তত মানুষের উপস্থিতির জন্য। এত নিঃসঙ্গ একটা মৃত্যুকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। হঠাৎ তার টিকটিকিটার কথা মনে আসে। চোখের ভারি পাতাদুটোকে টেনে খুলে সিলিং এর ঠিক নিচে যেখানে টিকটিকিটা প্রায়ই জবুথবু হয়ে বসে থাকে সেখানে তাকায়। নেই। তার একমাত্র সঙ্গীটিকেও সে মৃত্যুর আগে একবার দেখতে পাবে না! শিউলি আর তাকে স্পর্শ করছে না। মানুষের সঙ্গও প্রার্থনা করছে না। সমস্ত জীবনের বেদনাকে, সমস্ত নিঃসঙ্গতাকে একীভূত করে সে টিকটিকিটাকে খুঁজছে। একজন-একজন অন্তত থাকুক তার জীবিতকালের শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গী হয়ে! না পায় না। রতন চোখ বুজে নিতে যায়। বুজতে বুজতে হঠাৎ তার খাটের পাশটায় টিনের বেড়ার ওপর চোখ পড়ে। বেদনায় বিহ্বল মানুষের মত স্থবিরতা নিয়ে তার জীবিতকালের শেষ সঙ্গী প্রবীণ টিকটিকিটা স্থির তাকিয়ে আছে।
রতন চোখ বুজে।

x