একটি অনুপম গল্প : নীল নক্ষত্রের অক্ষভূমি ঘিরে

সমাজবিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সপ্তসপ্ততিতম বর্ষীয়ান (১৯৪০- ২০১৭) প্রফেসর অনুপম সেনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে

মনিরুজ্জামান

শুক্রবার , ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
116

পূর্ব প্রকাশিতের পর

বলছিলাম আমার ভাবনার সামনে তখন অনুপম। সে সময়ে আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলো আমি বাংলায় কিছু করতে পারবো না, সমাজবিজ্ঞানটা মিশিয়ে কিছু করা যায় কি না?কিন্তু কি করবো? ভাবতে লাগলাম কি করা উচিত আমার? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার কাছে শুনে আমি সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর নাজমুল করিমের কাছে গেলাম। করিম সাহেব আমার পরীক্ষা নিলেন,জিজ্ঞাসা করলেন-’ সবচেয়ে কোন বিষয়ের বই বেশি বিক্রি হয়?’ আমি বল্লাম, ‘সেক্স’? তিনি রেগে গেলেন। বল্লেন, ’তুমিসমাজবিজ্ঞানের কিচ্ছু জানো না, আর এসছো এই পুঁজি নিয়ে পিএইচ.ডি. করতে? ধর্ম, ধর্ম,- তোমার শিক্ষকদের শিখিয়ে দিয়ো,- যাও। আর কখনও এসো না বিরক্ত করতে আমাকে।’আমি আমার শিক্ষকদের মাথা হেঁট করেছি। আমার তখন চোখ ফেটে রক্ত আসার দশা। যদিও সমাজভাষার বৈচিত্র্য ও সমস্যা নিয়ে জানার বা কাজ করার ইচ্ছা আমার দমে নি তাতে। কিন্তু এই ধমক খেয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপমের কথাই বারবার মনে হচ্ছিল তখন। ভাবছিলাম তিনি থাকলে বা তাঁর সাথে মিশতে পারলে হয়তো সমাজভাষা ও সমাজতত্ত্বের কিছুটা রহস্য আমি জানতেও পারতাম। আজকের এই লজ্জায় আমাকে পড়তে হতো না। আমার খুব আফসোস হয়েছিল এবং নিজের ওপর রাগও হয়েছিল তাঁর সাথে আমার সেই মেলা মেশাটা হতে পারে নি বলে।

(উল্লেখ্য, পরবর্তী জীবনে সমাজভাষার বৈচিত্র্য, স্থান নাম, ভাষাপরিকল্পনা, নারীভাষা, লোকভাষা, উপভাষাতত্ত্ব ও উপজাতির ভাষাব্যবহার প্রভৃতি নিয়ে বেশ কিছু কাজ রয়েছে আমার। সেগুলো আমার থিসিসের অতিরিক্ত এলাকার কাজ। এটা অনুপমের জন্য না হলেও তাতে প্রাথমিক উসকানিটা তাঁর মত দূরেকাছের নানা বন্ধুদের থাকাও অসম্ভব নয়। আগে উল্লিখিত বা আমার পরের গল্পেও তার আভাস লক্ষ্য করা যেতে পারে। )

যাইহোক, আমি যে মিশতে পারতাম না, এটা তো ছিল আমারই দোষ বা সীমাবদ্ধতা। আমি গম্ভীর স্বভাবের না হলেও আমার প্রকৃতিটাই হলো গল্প করতে না পারার। আমি কেবল ভালো শ্রোতা। দুই বন্ধু আবু সাঈদ আইয়ুব আর সৈয়দ মুুজতবা আলীর কথা জানি। তাঁদের দুজনের চরিত্রের মধ্যে প্রায় ্‌এই রকম ভাবই ছিল অর্থাৎ একই জ্ঞানানুশীলনতা এবং মানবিক চৈতন্য। তুলনা করা ঠিক হয় না, তবে একটা গল্প মনে পড়লো। ইন্সুরেন্সকর্মী ও ভারতে অভিবাসিত ওস্তাদ অজয় সিংহরায়ের এক বইতে দেখেছিলাম তিনি লিখছেন,আলী সাহেব গল্প করতে ভালবাসতেন এবং গল্প জমাতেও জানতেন কিছুটা ‘তরলপনা’র প্রশ্রয় দিয়ে হলেও। কিন্তু আইয়ুব সাহেবের স্বভাব ছিল তার বিপরীত। একবার ইন্সুরেন্স কোম্পানি আয়োজিত এক রবীন্দ্রজয়ন্তিতে দুজনেই ছিলেন একজন প্রধান অতিথি আর একজন সভাপতি হিসেবে। একজন খুব হাসালেন আর একজন বিদ্বজ্জনদের মুগ্ধ করে বিদায় নিলেন। এই গল্পের উল্লেখ থেকেই মনে পড়লো বহু সভায় আমি আর অনুপম সেন একই মঞ্চে বক্তৃতা করেছি, একই মঞ্চ থেকে পুরস্কারও নিয়েছি এক সাথে। কিন্তু তিনি ছিলেন অসম্ভব বাগ্মী, বক্তব্য বিষয়কে বহুদূর বিস্তৃত করতে পারতেন।সৈয়দ সাহেব এবং আইয়ুবের পাণ্ডিত্যের যেন একটা মিশ্রণ। মুজতবা আলীর রম্যতাকে (তরলপনা’) বক্তৃতায় আনা সহজ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত যে একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠতে দেখেছি তখন বক্তা অনুপমের ভেতরে,তাকে ‘সাধারণ’ বলি কি করে ? আমার মুগ্ধতা ছিল সেখানেই।

.যুদ্ধে ও স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে

ঊনসত্তরের আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনুপম সেনের পরিচয়টা ছিল উজ্জ্বল এবং সংগ্রামী।। বলেছি, অনুপম স্বাধীনতার আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিভাগ ‘সমাজতত্ত্বে’ যোগ দেন (১৯৬৯) ও ১৯৭১(মার্চের আগে,সম্ভবত জানুয়ারিতে)বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হন। অল্পদিনেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হয়। চট্টগ্রামের লালদিঘীর মাঠে মার্চের আন্দোলনমুখী কার্যক্রমের সাথে ও মুসলিম ইন্সটিটিউটের ছাত্রশিক্ষকদের সম্মিলিত সেই অগ্নিগর্ভ সভাতেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হলেন। বিপণিবিতানের সামনের চত্বরে যে সর্বদলীয় পথমহামঞ্চ করা হয়েছিল, তাতেও দেখা গেল তাঁর কর্মকাণ্ড বা সক্রিয়তা। অনুপম শহরের নেতাদের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছিলেন। বন্দর আক্রান্ত হলে শহর নিরাপদ রইলো না।এই সময় বাঙালিসেনাদের তথা সীমান্ত থেকে বিদ্রোহ করে চলে আসা বাঙালি পল্টন বা ফৌজের সকলের সমবেত হওয়ার কেন্দ্র ও ছাত্রশিক্ষকদের ট্রেনিং ক্যাম্পএপরিণত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল (সদ্যনির্মিত আলাওল হল ও অর্ধনির্মিত এফ.আর.হল), মেডিকেল সেন্টার এবং ইউওটিসি অফিস । ২৫শে মার্চের পর ১৭ দিন এই সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যলয়ে পাকসেনাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শহরের সাথে ক্যাম্পাসের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। যারা শহরের সাথে যোগাযোগের দায়িত্বে ছিলেন, শহর ও মাঝখানের সংবাদদি আনাগোনায় তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে পড়লেন।পরে ইনটেলিজেন্সের খবরের ভিত্তিতে আমাদের ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ এলো হাইকমান্ড থেকে। সেই নির্দেশে আমরা (ক্যাম্পাসে থেকে যাওয়া ৩২টি পরিবার) উপাচার্য ড.মল্লিক,সৈয়দ আলী আহসান ও ড. আনিসুজ্জামানদের নেতৃত্বে ক্যাম্পাস ছেড়ে যখন রাউজানকুণ্ডেশ্বরী ও পরে অনেকে আগরতলার দিকে চলে যাই, সে সময় অনুপম ও তার সাথীরা চট্টগ্রাম শহর থেকে ভিন্নপথে সম্ভবত কুমিল্লাক্যান্ট. থেকে বেরিয়ে আসা বাঙালিসেনাদল ও তাঁর মতো পাকিসেনাতাড়িত হাজার হাজার গৃহছুট সীমান্তগামী শরণার্থীদের সাথে ভিড়ে রামগড় হয়ে ভারতে যান। দেশ স্বাধীন হলে আবার দেখা হয়।

অনুপম আগরতলা থেকে কোলকাতায় আসেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথিকা পাঠক রূপে ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোর্ড ফাউন্ডেশন গবেষণাপ্রকল্পের পরিচালক হিসাবে যুক্ত হন এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখিতে নিজেকে নিযুক্ত করেন। এই সময় বোম্বে থেকে প্রকাশিত ‘দি কোয়েস্ট’ পত্রিকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিশেষ সংখ্যায় তাঁর প্রবন্ধ ‘Social Background of Bangladesh Independence Movement টি বাংলা দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি বুঝতে ভূমিকা রেখেছিল। তিনি কোলকাতার ‘বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধ পরিষদে’র সচিব হিসাবেও কাজ করেন।

স্বাধীনতার পর আমি আমার গ্রামে যে সব কাজ করতাম, সেই ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছু সংগঠনের কাজে লিপ্ত হলাম এবং ড.ইউনূস এ সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগ দিলে দেশ উন্নয়নে তাঁর সাথেও যুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প’ (CURDP) গড়ে তুলি। বলেছি,অনুপম সেন ১৯৭২ পর্যন্ত শিক্ষক সমিতিতেই ছিলেন। ১৯৭৩ সালে আমরা দুজনেই বা্‌ইরে যাই উচ্চ শিক্ষার জন্যে। অনুপম কানাডায়, আমি মহিশূরে।

৭৭এর শেষভাগে আমি ডিগ্রি নিয়ে ফিরি। অনুপম ফেরে ১৯৭৯এ। শেষ দিকে আমি ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব স্পীচ এন্ড হিয়ারিং’এ অতিথি অধ্যাপক হিসাবেও কাজ করেছি দুই টার্ম। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার কিছু কিছুগল্প এবং কবিতাও অনুবাদ করেছিলাম সে সময়। অনুপমও ডিগ্রির কাজ সেরে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াবার (টিউটার) অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরলেন। আমাদের দেখা হলো। জানতাম না কানাডায় তিনি শুধু সোসিওলজির ব্যাকরণই কপচান নি, বিদেশী কবিতারও চর্চা করেছেন। তাঁর জ্ঞানের কৌতূহল এবং শেখার আগ্রহ যে বাস্তবিক বহুগামী ও তীব্র ছিল তা জানতে পেরে একই সাথে ঈর্ষা এবং অন্যতম বন্ধুগৌরবে গর্ব বোধ করলাম।

. তাঁকে যেমন দেখেছি, যেমন দেখতে চাই

থুত্থুরে বয়স হলে লোকে বলে ‘বাহাত্তুরে’; হায় আমরা এখন সাতাত্তুরে । আমাদের বন্ধুদের মধ্যে মিলেঅমিলে আমরা কখন সিঁদুরে মেঘের বেলায় পৌঁছে গেছি বুঝি নি। জীবন পরিক্রমায় তাই নিজেদের আবার ফিরে দেখতে ইচ্ছা করে। এই দেখায় পরিচিতজনের মাঝেই মানুষ নিজেকেও পায়।

এ ভাবেই বুঝি কোনও কোনও বন্ধুর মাঝে যেমন কখনও নিজেকে হতাশ ভাবে খুঁজি,ব্যর্থ হই, তেমনি আবার কারও কারও মাঝে নিজেকে বড় হার্দ্য মনে হয়। তখন মনে হয় তাঁর সাথে এই পরিচয়টা আমার জন্য কতই না লাভজনক, কতইনা সৌভাগ্যেরও। আসলে আমার বন্ধুদের জীবনের ক্ষেত্রে মিলঅমিলগুলি লক্ষ্য করে আমি বিস্মিতই হই। অবশ্য এর আর একটি কারণ তখন ব্যক্তিগত জীবন ছাড়িয়ে একটা বিশেষ কালের জীবন যাপন করেছিলাম আমরা। প্রতিভা এবং ক্ষমতার ও ব্যক্তির সাধ্য বা অনুকুল বিষয়গুলো বাদ দিলে বাকি জায়গাগুলিতে মনে হয় আমরা কেউ আলাদাই ছিলাম না। আমাদের জীবন খাতার পৃষ্ঠাগুলি পাশাপাশি দেখলে মিল এবং অমিল উভয়তই যেন বৈচিত্র্যের মাঝেও কেমন একটা সাযুজ্যই লক্ষ্য করি।

আমার শৈশব কেটেছে মহাবঙ্গের পশ্চিমপ্রান্তে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত। দেশ ভাগের মাসেই ফিরে আসি পূর্ববাংলায় ঢাকা থেকে ৪০ মাইল দূরে নিজ গ্রামে যেখানে ছিল আমাদের তালুক।। সে সময় প্রথমে পশ্চিম বঙ্গের ডায়মন্ডহারবারের বাড়িটা ও উত্ত্‌র বঙ্গের কিছু চা বাগানের শেয়ার হারাই ও ’৪৯এ হারাই বাবাকে। অনুপমের জন্ম পূর্বদক্ষিণের মহা বন্দরে। তাঁদেরও নালাপাড়ার বাড়িটা দাঙ্গার কালে চলে যায় সরকারের হাতে। তিনিও কৈশোরে হারান তাঁর পিতাকে। গ্রামের বাড়ি শহর থেকে দূরে। এই দূরত্বকে তিনি জয় করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গা, এবং আরও নানা প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়েও। মানুষ হন মায়ের মমতাময় অভিভাবকত্বেই।

গ্রামের বাড়িরএই দূরত্বের কথা থেকে আমার কেন যেন টলস্টয়ের কথা মনে পড়ে। মস্কো থেকে বেশ দূরতেই্ব টলস্টয়ের গ্রামের বাড়ি এবং পৈত্রিক জমিদারী।। আরও কয়েকটা কারণে এই প্রতিতুলনের কথা মনে জাগে। টলস্টয়ের ধর্মাচরণ (যা আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের এক সমীকরণ), যুদ্ধে (ক্রিমিয়ান ওয়ার) জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা এবং ভূমিদাস প্রথা ও অভিজাতদের শোষণ বিরুদ্ধ লোকবাদী মানসিকতা। এসব গুণ আমি অনুপমের মাঝেও দেখতে পেয়েছি। তাঁর প্রতি আমার আকর্ষণ লাভের এটাও অন্যতম দিক। যাই হোক, চাটির আলো জ্বালানো সেই ’পোর্টা গ্র্যান্ডো’ চট্টগ্রামেই আমাদের দেখা। অবশ্য দেখার আগে তাঁর নামেও আকর্ষণ বোধ করেছি। আসলে তাঁর ব্যক্তিত্বটা এমনই যে, তাঁর সাথেদেখামাত্রই তাঁর নামের সার্থকতাও ষোলআনাই উপলব্ধি করা যায়।তাই তিনি বাস্তবিকই অনুপম।

অনুপম জন্মকালেই নাম পেয়েছেন অনুপম, আজও তিনি অনুপম। তিনি সেন বাড়ির সন্তান, যে বাড়িতে অনেক প্রথিতযশা স্বনামধন্য ব্যক্তিও জন্ম নিয়ে স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ইনি দক্ষিণাগত সেন বংশজাত কিনা জানি না, তবে সম্ভ্রান্ত কুলোদ্ভব নিশ্চিত। তাঁর ভূমিষ্ঠতাওঘটেছিল বিপ্লবী কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মায়ের হাতে। সেও এক অনুপম ব্যাপার। অনুপম নিজেও এজন্য নিজেকে ধন্য মনে করেন। তাঁর পিতা, জ্যেঠা, পিতামহ সকলেই ছিলেন দেশনন্দিত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া (পরে বোয়ালখালি) থানা/ উপজেলার ধলঘাট গ্রামে ইংরেজির অধ্যাপক ( আইনজীবী এবং ব্যবসায়ীও)বীরেন্দ্রলাল সেনের এই সুযোগ্য পুত্র ও বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক সাহিত্যসমালোচক ও মহাকবি মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত কাব্যবিশ্লেষক কবিভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেনএর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং তিব্বত বিশেষজ্ঞ ও পর্যটক বাবু শরৎচন্দ্রের একই গ্রামের এই ছেলে ১৯৪০ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের পৈত্রিক ভবনে জন্মলাভ করেন। দেশে বৈরিকাল উপস্থিত হলে তিনি শৈশবে শহর ছেড়ে কিছুদিন স্বগ্রামে ও পরে কোলকাতায় মাতূলালয়ে অবস্থান করেন ও সেখানে লেখাপড়া করেন। পরে চট্টগ্রাম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করে স্বাধীনতার পর কানাডার ম্যাকমান্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে এম.. ও পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি প্রফেসর হন এবং ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এখন তিনি তাঁর মাতৃভাষায় ‘আটাত্তৈরে’পা রেখেছেন্‌। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলতেন, বয়সটা ৭০এর ভুলরেখার উপর, কিস্তু বড় জ্বলজ্বলে আর ঝরঝরে । সেক্সপীয়ারের ’এন্টোনিও এন্ড ক্লিওপেট্রা’ নাটকের শেষ দিকে ক্লিওপেট্রার প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘Age cannot wither her, nor costume stale her infinite variety আচার্যসুনীতিকুমারও শেষ দিকে এসে নিজেকে উল্লেখ করে বলতেন, Albeit I am on the wrong side of ’70, yet I am in fine fettle.’ অনুপম সেনকেও আমরা তেমনি দেখতে চাই।

. তিনি এমনই, যিনি এক অজাতশত্রু

অনুপম লেখনেবলনে একজন ভার্সেটাইল জিনিয়াস। তিনি শিক্ষক ও গবেষক হিসাবে যেমন ছিলেন উচ্চ মানের, তেমনি সুবক্তা এবং সুলেখকও। ‘ছিলেন’ কেন, এটাইতো তাঁর পরিচয়ের একটি বড় দিক। একজন বিখ্যাত মার্কিন সমালোচক বলেছিলেন, ‘আই স্টিল ফাইন্ড দি পাবলিক লেকচার আ ফ্যান্টাস্টিক্যালি ডিফিকাল্ট জাঁর।’ অনুপম সেই ‘ডিফিকাল্টিজ’ গুলিসহজেই অতিক্রম করে শ্রোতাদের মনে স্থান করে নিতে পারেন। এক সময় তাঁর বক্তৃতার প্রিয় বিষয়গুলির অন্যতম ছিল একটি অত্যন্ত কঠিন ও বিতর্কিত প্রসঙ্গ,-সেটি হলো– ‘রেনেসাঁস’ বা নবজাগরণ। এজন্য তাঁকে তাঁর নিজের বিষয়ের বাইরে গিয়ে প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়েছে ও পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। এবিষয়ে তাঁর লিখিত বইটির নাম ‘বাঙলা দেশ ও বাঙালি রেনেসাঁস : স্বাধীনতা চিন্তা ও আত্মানুসন্ধান’ বুদ্ধিজীবীদের নিয়েও তাঁর গভীর আলোচনা আছে। যেমন, ‘Political Elities of Pakistan and Other Sociological Essays’ বাঙ্গালি সংস্কৃতিও তাঁর একটি প্রিয় বিষয়। (‘বাঙালি মনন, বাঙালি সংস্কৃতি৭টি বক্তৃতা’; ’সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য’: নানা কথা নানা অর্ঘ্য’ ) রাজনীতি, দেশ প্রভৃতি নিয়েও তাঁর অনেক লেখালেখি দেখা যায়। সাহিত্য ভাবনা, কবিতা রচনা, কবিতার অনুবাদ প্রভৃতিও তাঁর সৃষ্টিতালিকার বাইরে নয়।তার নবসমাজবাদী চিন্তা ও তন্বিষ্ট সমালোচনা এবং সৃষ্টির রচনাগত (Textuality) বিচিত্রতা আধুনিক দর্শনবাদী বা চিন্তকদের কথাই মনে জাগায়, — রলাঁ বার্থের ’সমান্তরাল সমালোচনা’ অর্থাৎ তাঁর ত্রিধারার রচনাদি (যাকে বলা হয় ডক্সা, প্যারাডক্সা এবং সহানুভূতিশীল মার্ক্সীয় ধারার আলোচনা) যেমন। অনুপম সেনের রচনাদির হয়তো একদিন বিস্তৃত আলোচনা হবে। সেদিন তার যথার্থ মূল্যায়ন হবে আশা করি।

যাই হোক, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার বাইরেওঅনুপমের একটি সুন্দর ও ঋদ্ধ জীবনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। সে জীবনটি ছিল সমাজের মধ্যে, সমাজকে নিয়ে। যেমন তিনি শুধু পড়ুয়া বা বইপোকাই নন, খেলাধূলাতেও তাঁর মন সমান আগ্রহী।টিভিতে ক্রিকেট খেলার তিনি একজন উৎসাহী দর্শক। এ সব ছাপিয়ে মানুষ হিসাবেও তাঁকে ছোট করে দেখার কোনও অবকাশই নেই। তাই বলা যায়, যেকোনও পরিচয়েই তিনি অনুপম। অনুপম নিজেই নিজের তুলনা। সমালোচক এমার্সনের কথা ধরে ইংরেজি সাহিত্যে যেমন বলা হয়, ”Shakespeare is the only biographer of Shakespeare

এ যেন ঠিক তেমনি।

সব শেষে যে বিষয়টার কথা বিশেষ করে এখানে উল্লেখ করতে হয় তা হলো তাঁর বন্ধুবাৎসল্য, আড্ডাপ্রিয়তা এবং আপ্যায়নে আনন্দলাভ।এ প্রসঙ্গে কিছু ঘটনার কথা বলে আমার কাহিনী শেষ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময়েই কিছু না কিছু সমস্যা লেগেই থাকতো। সে সময় ক্লাসের পর বা ছুটির দিন শিক্ষক সমিতির সভায় বা ‘অনুপমগ্রুপে’র (সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটিপ্রধান বা অগ্রসরশীল দল এই নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল) সভায় তার সমাধানের চেষ্টা হতো।সভা হতো শহরের শিক্ষক ক্লাবে। এক সময় এই ক্লাব ছিল ২ নং রেল গেটের পাশে একটা ঘের দেওয়া ভাড়া করা বড় দোতালা বাড়িতে । সভা হতো তার ওপর তলায় বারান্দা দেওয়া বড় ঘরটাতে। তাতে এক সাথে জনা পঞ্চাশেক লোক বসতে পারতো। সেদিন বোধ হয় প্রায় তার দ্বিগুণ বা তারও বেশি লোক হয়েছিলো বারান্দা এবং আশেপাশের ফাঁকা জায়গাগুলি মিলিয়ে। কি নিয়ে সভা আজ তা মনে নেই। আমরা ২৫ কিমি দূরের ক্যাম্পাস থেকে অনেকেই এসেছিলাম। সভা শুরু হতে পারছিলো না অনুপম সেন আসে নি বলে। অনুপম প্রায় সভায়ই হতেন লেট লতিফ। শেষে যখন এলেন, সিঁড়িতে হুড়াহুড়ি শোনা গেল। তিনি এসে কোনও কৈফিয়ৎ দিলেন না, বরং আমরা কেন শুরু করি নি সে জবাবদিহি চাইলেন।এবং তারপর তাঁর গাড়ি থেকে বোস ব্রাদার্সের প্যাকেট গুলি নামিয়ে যখারীতি মিষ্টি বিতরণের পালা শুরু হয়ে গেলো। কেউ বললো আরও আনাতে হবে। শোনা গেল লোক পাঠিয়ে দাও। কেউ বললো আমরা কি এখানে খেতে এসেছি নাকি? কেউ বললো, ইটিং ছাড়া আবার মিটিং হয় নাকি? কেউ বললে গৌরী সেন আছেন না, আপনাদের অত চিন্তা কেন?- ইত্যাদি। বুঝলাম অনুপম সেনই সেই বিমূর্ত গৌরী সেন । আয়োজনের কারণে তাঁকে আজ একথা বলা হলেও.আসলেই তিনি তাই। শুনেছি সেই ছাত্রজীবনে চিটাগাং কলেজে পড়ার কাল থেকেই তিনি সবসময়ই যেমন সব কাজের অগ্রকাজী, তেমনি কাজটা পরিপূর্ণভাবে সমাধা করার েতে্রও তিনি হাজী মহসিন বা গৌরী সেন।এর জন্য তাঁকে কেউ প্রতিদানের প্রত্যাশী হতেও কখনও দেখে নি। বহু ছাত্র, প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব এর জন্য তাঁর কাছে নানাভাবেই ঋণী। তিনি উত্তমর্ণ কিন্তু মহাজন নন। আমাকেও তিনি অধমর্ণ করেছিলেন একবার এভাবেই তবে অলক্ষ্যে, আমাকে জানতে না দিয়ে। সেও এক মজার কাহিনী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে এসে আমরা পরস্পর যাদের সাথে মিশতাম তাদের বাড়িতেও তখন যাওয়া আসা করতাম। সেভাবেই একদিন আমি ক্যাম্পাস থেকে শহরে এসে অনুপমের নালাপাড়ার বাড়িতে সস্ত্রীক বেড়াতে গেলাম। ক্যাম্পাস থেকে শহরে আসার বা কেনাকাটার জন্য তখন কুম্ভি বলে একটা মাইক্রোবাস দেওয়া হতো আমাদের। অনুপমের বাসায় গল্প করতে করতে ফিরে যাবার টাইম হয়ে গেলো। এদিকে কেনাকাটা বাকি। আমরা তাঁর বাসা থেকে তাড়াতাড়ি নেমে তাঁর বাড়ির নিচেই একটা মুদির দোকান পেয়ে সেখান থেকে সামান্য চাল ডাল আর কিছু প্রয়োজনীয় মশলাপাতি কিনে নিলাম। আমার স্ত্রী স্ত্রীবুদ্ধির কারণে বলতে লাগলো রিয়াজুদ্দিন বাজারে গেলেতো দরদাম করা যেত। আমি বললাম সে আর একদিন হবে, আজ তো সময় নেই। এই বলে দোকানীকে টাকা দিতে গেলে দেখি তিনি হাসছেন এবং পেছনে কার দিকে তাকাচ্ছেন। ফিরে তাকিয়ে আমি তো অবাক। আমাদের তাড়াহুড়োতে অনুপম বাবু কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, আমরা টেরও পাই নি। টাকা দেওয়ার জন্য আমি জোরাজুরি করলেও তাঁর মুখের হাসি থামাতে পারলাম না। বললেন, ও তো নেবে না। দোকানীও ওদিকে জিব বের করে মাথা নাড়তে লাগলেন মেলার পুতুলের মত। পড়লাম এক মহা ফ্যাসাদে। এটা এখানেই শেষ হলো না। একটা রিকসাও উনি ঠিক করে রেখেছেন। বললেন, আপনাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে, মাইক্রোবাস ধরতে হলে এটাতে করে চলে যান। আমরা তো চলে এলাম, কিন্তু সেই দোকানদার আর রিকশাওয়ালার হাসি আর মাথা নাড়া আমাদের চিরঋণী করে রাখলো।

বেশ কিছুদিন পর একদিন ক্যাম্পাসে কার সাথে যেন গল্প করছিলাম এই নিয়ে। তিনি বললেন, অনুপম এই রকমই। সবারই তিনি উপচিকীর্ষু বন্ধু। আর এ জন্যই তিনি অজাতশত্রু। (সমাপ্য)

x