একজন মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর চলচ্চিত্র : কণ্ঠ

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
13

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোলকাতার বাংলা সিনেমার স্বাদ বদলে গেছে। বিষয় বৈচিত্র্য, কারিগরি নৈপুণ্য, অভিনয় বাস্তবতা, সব মিলে এক অন্য ধরনের সিনেমার সন্ধান দর্শকেরা পেয়ে আসছেন। এই সময়ের মধ্যে উঠে এসেছেন অনেক চৌকষ নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী। দুটি নির্মাতা জুটির কথা এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুদেষ্ণা বসু ও অভিজিৎ গুহ এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। দুই জুটি এমন কিছু স্মরণীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন যা বাংলা সিনেমাকে একটি বিশেষ অবস্থানে দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে।
একটা কথা বললে বোধ করি অতিশয়োক্তি হবে না, এই নির্মাণ প্রবণতা ১৯৮০ এর দশকে অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী প্রমুখের হাতে সূচিত হলেও এর বিস্তৃত বিকাশ ঘটে ১৯৯০-এর দশকে ঋতুপর্ণ ঘোষের হাতে। কাহিনী নির্বাচন ও বিষয় বৈচিত্র্য, চিত্রনাট্য রচনায় অভিনবত্ব, সংলাপের দ্যোতনা, অভিনয়ের নিরাভরণ বাস্তবধর্মিতা, সংগীতের অর্থপূর্ণ ব্যবহার, কারিগরি চৌকষ প্রয়োগ এসবের সমন্বয়ে তিনি বাংলা সিনেমায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চমৎকার এক বাতাবরণ। যার সূত্র ধরে কলকাতার বাংলা সিনেমা প্রতিভাবান অনেক নির্মাতার কর্মতৎপরতায় দীর্ঘদিন ধরে মুখরিত। এঁদের মধ্যে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি প্রথম থেকেই তাঁদের সিনেমার বিষয় বৈচিত্র্যের গুণে অত্যন্ত সমাদৃত।
‘ইচ্ছে’ ছবি থেকে তাঁদের জয়যাত্রার শুরু। প্রথম ছবিতেই তাঁরা তাঁদের জাত চিনিয়ে দিতে পেরেছিলেন। সমসাময়িক বিষয়, বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের জীবনের নানা গল্প, নানান কথা, তাঁদের ছবিতে প্রধান উপজীব্য হয়ে আসে। প্রজন্ম ব্যবধান, ভঙ্গুর মূল্যবোধ, অস্থিরতা, অহেতুক প্রতিযোগিতার নানান চিত্র তাঁদের প্রত্যেকটি ছবিতে একের পর এক উঠে আসে। তবে হতাশার চিত্র শেষাবধি থাকে না এসব ছবিতে। একটা ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী সমাধান প্রতিটি ছবিতেই থাকে।
এসব কিছুর বাইরে ইঁদুর দৌড়ের বর্তমান এই অস্থির জীবন যাত্রার নানান দিক যেমন: সন্ত্রাস, শিক্ষা পদ্ধতি, শিশু পরিচর্যা, পরিবহন অরাজকতা ইত্যাদিও গল্প হয়ে আসে তাঁদের একেকটি চলচ্চিত্রে। আর এসব ছবি কোনো না কোনো সত্য ঘটনা অবলম্বনে আবর্তিত। ফলে আমাদের জীবনের একেবারে কাছাকাছিই চলে আসে শিবপ্রসাদ নন্দিতার ছবিগুলো। যেমন ‘মুক্তধারা’ ছবিটি সন্ত্রাস, অন্ধকার জগৎ এবং কারাগারের শোধন ব্যবস্থাকে নিয়ে নির্মিত। এছবিতে এসব সমস্যার ইতিবাচক সমাধানের পথ বাতলে দেয়া হয়েছে বাস্তব সম্মতভাবে। ফলে ছবিটি ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কারাগার কর্তৃপক্ষ কয়েদী ও কারাকর্মীদের মধ্যে প্রদর্শনের জন্যে নির্বাচন করেছিলেন। তেমনি ‘রামধনু’ ছবিটি, যেটি বর্তমানে প্রচলিত শিশু শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অসার ও কৃত্রিম দিক এবং শিশু পরিচর্যার নানান হাস্যকর প্রক্রিয়ার প্রতি প্রশ্ন তোলে এবং সবশেষে সমাধানের সূত্র দিয়ে যায়, এই ছবিটিও অভিভাবক মহলে যথেষ্ট সচেতনতা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। এই একই বিষয়ে তাঁদের ‘হামি’ ছবিটির প্রসংগও চলে আসে।
তেমনি ‘প্রাক্তন’ ‘পোস্ত’, ‘বেলাশেষে’ এই ছবিগুলিও আমাদের কাছে অনেক সামাজিক বার্তা রেখে যায়-দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, যৌথ পরিবারের প্রয়োজনীয়তা, পারিবারিক সংহতি এসব বিষয়ে।
তাঁদের সাম্প্রতিক ছবি ‘কণ্ঠ’। এটাও একটি সত্য ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঘটনাটি অত্যন্ত মানবিক, মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও তার অপরিসীম ক্ষমতার দিকগুলো তুলে ধরে। একজন অসহায় মানুষ আরেকজন মানুষের সহযোগিতার গুণে কীভাবে জীবন যুদ্ধে হার না মেনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় তারই এক সফল চলচ্চিত্রায়ন ‘কণ্ঠ’। নতুনভাবে জীবন শুরুর কথা বলে এই ছবি।
কলকাতার একজন রেডিয়োজকি কন্ঠই যার জীবনের সম্পদ ও অবলম্বন সে আকস্মিকভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা ও সুস্থতার প্রয়োজনে তার কন্ঠনালীটা বাদ দিতে হয়। ফলে সে হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। নিজের জীবন, পরিবার সবকিছুর ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। স্ত্রী ও শিশুপুত্র তার পাশে এসে দাঁড়ালেও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনেরা তাকে বোঝা মনে করতে থাকে। এ সময় পাশে এসে দাঁড়ায় ভোকাল কর্ড থেরাপিস্ট বা স্পিচ থেরাপিস্ট বাংলাদেশি চিকিৎসক রমিলা, যে নিজেও তার ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যস্ত। রমিলার অক্লান্ত চিকিৎসা, ধৈর্য ও যত্নের ফলে আর জে অর্জুন মল্লিক ক্রমশ সুস্থতা ফিরে পায়। কন্ঠনালীর পরিবর্তে সে শ্বাসনালীর মাধ্যমে কথা বলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সহকর্মীদের অনুপ্রেরণায় ও সহায়তায় এবং সর্বোপরি রমিলার ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা ও উৎসাহে অর্জুন পুনরায় তার বাচিক শিল্পী ক্যারিয়ার শুরু করে। শুরু করে তার নতুন জীবন। পরিতৃপ্ত রমিলাও তার একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ফিরে যায় ঢাকায়।
খুবই সহজ সরল গল্প। তেমন কোনো মারপ্যাঁচ নেই। চিত্রনাট্যও তেমনি সোজাসাপটা। কাহিনীরেখা সোজা সরলভাবে এগিয়েছে। সূক্ষ্ম অনুভূতির অনেক প্রকাশ দেখা যায়। যেমন অর্জুন, তার স্ত্রী ও রমিলাকে ঘিরে একটি ত্রিভুজ টানাপোড়েন, অর্জুন ও তার স্ত্রীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, শিশুপুত্র ও অর্জুনের বাৎসল্য। কিন্তু কোনো কিছুকে প্রকট হয়ে উঠতে দেননি। সবকিছুই আপাত: সরলভাবে দৃশ্যের পর দৃশ্যে বলে গেছেন পরিচালকদ্বয় তাঁদের দুর্দান্ত চিত্রনাট্যে।
সহজ সরল চিত্রনাট্যই শিবপ্রসাদ নন্দিতার বড় বৈশিষ্ট্য। তার মানে তাঁদের চিত্রনাট্য কখনোই একরৈখিক নয়। অনেকগুলো পরত থাকে সে চিত্রনাট্য। আর চলচ্চিত্রের ভাষার পুরোমাত্রার প্রয়োগ লক্ষণীয় তাঁদের ছবিতে কারিগরি উৎকর্ষে, সাংগীতিক অর্থপূর্ণতায় এবং অবশ্যই অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততায়।
‘কণ্ঠ’ ছবিতেও এর কোনো ব্যত্যয় নেই। শুভংকর ভড়ের দৃষ্টিনন্দন চিত্রগ্রহণ, মলয় লাহার দ্রুতিময় সম্পাদনা, অনুপম রায়ের কন্ঠসংগীত ও প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবহসংগীত প্রায় আড়াই ঘন্টার এই ছবিকে ছিলেটান করে রেখেছে।
অভিনয় ‘কণ্ঠ’ ছবির বড় সম্পদ। পরিচালক জুটির অন্যান্য ছবির মতো এই ছবির অভিনয়াংশ পুরোপুরি চলচ্চিত্রানুগ। শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই একজন তুখোড় অভিনেতা। তাঁর তরুণ (একুশে পা টিভি সিরিয়াল) বয়স থেকে আমরা তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে আসছি। ‘কণ্ঠ’ ছবির অর্জুন চরিত্রের নানারকমের শেড তিনি চমৎকার দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন। তাঁর অভিনয়ের সঙ্গে সমান তাল মিলিয়ে গেছেন পৃথা চরিত্রে পাওলি দাম। চিত্রা সেন, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছন্দা চট্টোপাধ্যায় এঁরাও অত্যন্ত সাবলীল তাঁদের নিজ ক্ষমতায়। তবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জয়া আহসানের অভিনয়। রমিলা চরিত্রটিতেও অনেকগুলো শেড রয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে হৃদয়স্পশী অভিনয় করেছেন জয়া এই চরিত্রে।
শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালক জুটির সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তাঁদের শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। শিল্পকে তাঁরা কেবল শিল্প হিসেবে নেননি। সিনেমাকে তাঁরা সামাজিক নানান অসংগতির বিপক্ষে জনসচেতক মাধ্যম হিসেবে আত্মস্থ করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
আর এই দায়বদ্ধতা থেকেই জীবনের ইতিবাচক মূল্যবোধ, জীবনের প্রতি ভালোবাসার কথাগুলো বারবার তাঁদের প্রতিটি চলচ্চিত্রে গল্পচ্ছলে উঠে আসে।
শেষে ভিন্ন প্রসংগে। সিনেমা হল মালিকদের সঙ্গে আমরা দর্শকেরাও এতদিন বলে এসেছি ভালো ছবি প্রদর্শিত হলে দর্শকেরা হলমুখী হবেন। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে না। ‘কণ্ঠ’ দেখলাম আলমাস সিনেমা হলে প্রায় শূন্য অবস্থায়। দেশের বড় বড় হলগুলিতেও একই অবস্থা। এর কারণ একটাই। হলের জঘন্য পরিবেশ। সিটে বসাই যায় না। প্রজেকশনের মানও অত্যন্ত খারাপ। কিছুই ভালো করে দেখা ও শোনা যায় না। অথচ একই ছবি যখন সিনেপ্লেক্সগুলোতে চলছে কিংবা চলছে মধুমিতার মতো নবায়ন করা পরিচ্ছন্ন প্রেক্ষাগৃহে তখন দর্শকেরা সারি বেঁধে সে ছবি ঠিকই দেখছেন। সিনেপ্লেক্সের টিকিটের উচ্চমূল্য দর্শকেরা মেনে নিচ্ছেন উন্নতমানের পরিবেশের কারণে। কাজেই যেটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে, সেটা হলো কেবল ভালো ও নতুন সিনেমা আমদানি করলেই হবে না বা তৈরি করলেই হবে না, যে কয়টা সিনেমা হল অবশিষ্ট আছে, সেগুলি অবিলম্বে সংস্কার করা জরুরি এবং জরুরি বিভিন্ন দেশের ভালোমানের নতুন ছবি নিয়মিত আমদানি করা, যেমনটি ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

x