এই কান্নার শেষ কোথায়?

শরীফুল হাসান

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
25

সৌদিতে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফেরা মেয়েটার কথা শুনবেন? নাকি পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া মেয়েটার কথা। গরম আয়রণ দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া দগ্ধ মেয়েটার গল্প শুনবেন? নাকি প্রতিবাদ করায় যে মেয়েটার চুল টেনে-টেনে তুলে ফেলা হয় তার কথা। নাকি নির্যাতনের কারণে চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলো যে মেয়েটা তার কথা শুনবেন?
আপনারা কতো শুনবেন? কতোজনের? সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি নারীদের দুর্ভোগ-দুর্দশা নিয়ে অনেককে দেখছি ফেসবুকে আজ সরব। ভালো লাগছে আমার। গত নয়টা বছর ধরে এ নিয়ে লড়াই করছি। ভীষণ অসহায় মনে হয়েছে মাঝে-মধ্যে।
সেই প্রথম ২০১০ সালে সৌদি আরব যখন বাংলাদেশ থেকে মেয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিলো তখন উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশাল রিপোর্ট করেছিলাম প্রথম আলোয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ যখন মেয়ে পাঠাতে রাজি হল তখনো লিখেছি। এরপর মেয়েরা যাওয়ার পর কী কী পরিস্থিতিতে পড়ে তা নিয়ে লিখেছি।
আর ব্র্যাকে যোগ দেওয়ার পর গত আড়াই বছরে এমন সপ্তাহ খুব কমই গেছে যেই সপ্তায় এই মেয়েদের কান্না শুনতে হয়নি। মাঝে-মাঝে নিজেদের ভীষণ একা মনে হয়েছে। রাগ হয়েছে। প্রশ্ন জেগেছে, আমরা ছাড়া এই মেয়েদের জন্য আর কারও কী কোন দায় নেই? কতো রাত যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছি।
আপনারা কতো গল্প শুনবেন? কতোজনের?…আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে পারবো। গত বছরে দেড় হাজার এমন করুণ গল্পের কথা আমরা (বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ) জানি। তাদের পাশে নানাভাবে আমরা থাকার চেষ্টা করেছি। আর এ বছরের সংখ্যা ধরলে আরও নয়শ। শুধু কী এই আড়াই হাজার? গত সাড়ে চার বছরে কতো হাজার মেয়ে ফিরেছে কে রাখে সেই খোঁজ?
আপনারা কী জানেন- এই নারীদের অনেকের বাড়িতে ফেরার মতো পরিস্থিতি থাকে না। ফেরত আসার খবর পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় জানতেও পারেন না। আর সবার মতো নয়, বিমানবন্দরে তারা ফেরেন এক কাপড়ে। তাদের কান্নায় থমকে যায় সবকিছু।
কেন আমরা গৃহকর্মী হিসেবে আমাদের মেয়েদের পাঠাচ্ছি? শুরুটা শুনবেন? বছর আটেক আগে সৌদি আরব প্রথম বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী চায়। ততোদিনে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি জেনেছি জর্ডান, লেবাননসহ আরও কিছু জায়গায় গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি মেয়েরা নির্যাতনের শিকার। ফলে আমি বিরোধিতা করলাম।
আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরব যখন বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী চাইলো তখন এ ঘটনা নিয়ে ২০১১ সালের ৭ মে প্রথম আলোতে ‘সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ, কয়েকটি দেশের তিক্ত অভিজ্ঞতা, সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাস’ শিরোনামে রিপোর্ট করলাম।
ওই রিপোর্টে উঠে এসেছিল, সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া ইন্দোনেশীয়, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তখন বলেছিলাম, নির্যাতনের কারণে এই দেশগুলো যখন তাদের নারীদের সৌদি আরবে পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে দেশটি। কিন্তু নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে বাংলাদেশ সরকারের সেখানে নারীগৃহকর্মী পাঠানো ঠিক হবে না!
কেন বলেছিলাম? কারণ, সেদিন সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশি সায়েদুল হাসান, কুমিল্লার ফরহাদ আহমেদ, চট্টগ্রামের বাবুল আহমেদসহ আরও অনেকেই আমাকে বলেছিল, সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের খাদ্দামা বলে। খাদ্দামাদের কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা সবাই জানে। কাজেই বাংলাদেশি মা-বোনদের এভাবে নির্যাতিত হতে দেয়া ঠিক হবে না। বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবেই যেন নারীদের না পাঠায়।
সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কী করা হবে জানতে চাইলে তখনকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন আমাকে বলেছিলেন, ‘নারীদের নিরাপত্তা বিধান করেই সৌদি আরবে পাঠানো হবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’
ওই নিউজের পর নারীদের বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি বন্ধ না হলেও কিছুটা গতি হারায়। সে অনেক গল্প। এভাবে কাটলো আরও চার বছর। সৌদি আরবে তখনো পুরুষ কর্মী পাঠানো বন্ধ। তারা বারবার চাপ দিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী দিতে হবে। নয়তো বাজার খুলবে না।
অবশেষে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে। এবার তারা নারীদের নেবেই। শ্রম বাজার চালুর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করলো বাংলাদেশ। সেদিনও এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা তুলে ধরে খবর প্রকাশ করেছিলাম। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘৮০০ রিয়ালে নারী গৃহকর্মী, সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানির চুক্তি, শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।
ওই রিপোর্টে বলেছিলাম, ১২০০ থেকে ১৫০০ রিয়াল বেতনের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮০০ রিয়ালেই (১৬ হাজার ৮০০ টাকা) গৃহকর্মী পাঠাতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। এতো কম বেতনে গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি করায় এবং নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সৌদি আরবপ্রবাসী বাংলাদেশি এবং অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো।
সেদিন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিলেন, সৌদি আরব দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে রাজি হয়েছে। কাজেই চাইলেও তাদের প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ ছিল না। আর গৃহকর্মী নেওয়ার পর অন্যান্য খাতেও কর্মী নেওয়ার আশ্বাস দেয় দেশটি।
আমাদের কথা শোনা হয়নি সেদিন। বরং ব্যবসায়ীরা উঠে পড়ে লাগলেন। একটা মেয়েকে পাঠাতে পারলে দুই হাজার ডলার মিলবে, দু’জন পুরুষ পাঠানোর অনুমতি মিলবে এসব ভাবনায় আমরা আমাদের মেয়েদের স্বার্থ বিকিয়ে দিলাম। সারাদেশে নেমে গেল দালালরা।
চুক্তির পর ২০১৫ সালে গেলেন ২১ হাজার নারী শ্রমিক। ২০১৬ সালে গেলেন ৬৮ হাজার। ২০১৭ সালে গেল ৮৩ হাজার, ২০১৮ সালে ৭৩ হাজার। তারপর? সৌদিতে গিয়ে এই মেয়েরা কেমন থাকলেন? আমি থেমে থাকিনি।
সৌদিতে থাকা মেয়েদের দুরবস্থা নিয়ে প্রথম আলোতে ফলোআপ স্টোরি করলাম ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিল। শিরোনাম, ‘মধ্যপ্রাচ্যে নির্মম নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি মেয়েরা’। তখন জানালাম- সংসারে সচ্ছলতার আশায় কুড়িগ্রাম থেকে যাওয়া এক নারী গৃহকর্মীর কথা; যিনি গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নেন রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে। দুই মাস পর তিনি দেশে ফিরেন।
ঢাকার উত্তর বাড্ডার এক নারী আমাকে বলেছিলেন, যে বাসায় তিনি কাজ করতেন, ওই বাসার পুরুষেরা তাঁকে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করত। প্রতিবাদ করলে তাঁর চুল টেনে-টেনে তুলে ফেলা হতো। মানিকগঞ্জের এক মেয়ে বলেছেন, সৌদি আরবের বনি ইয়াসার এলাকায় কাজ করতেন তিনি। নির্যাতনের কারণে চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন। পরে তার স্থান হয় হাসপাতালের আইসিইউতে। কুমিল্লার এক নারীকে নির্যাতন করে মাথা ফাটিয়ে দিলে ১৪টি সেলাই লাগে।
আমার প্রতিবেদনগুলো পড়তে পারেন। দেখতে পারেন আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি কী না। প্রথম আলো ছেড়ে ২০১৭ সালের জুলাইতে যোগ দিলাম ব্র্যাকে। ব্র্যাকের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ ভাই বলেছিলেন, শরিফুল অনেক লিখেছেন। এবার সরাসরি কাজ করেন এদের জন্য।
ব্র্যাকে যোগ দিলাম। ঢাকা ও মাঠপর্যায়ে থাকা আমার সব সহকর্মীকে বললাম, কোন মেয়ের পরিবার যদি আসে আমাদের কাছে এবং বলে তার মেয়ে বা স্ত্রী সৌদিতে বিপদে পড়েছে দয়া করে তাদের কথা শুনবেন। আমাদের জানাবেন। প্রজেক্ট, টাকা এসব নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। …শুরু হলো এরপর আমার লড়াই।
সারাদেশ থেকে এবার আবেদন পেতে লাগলাম। ওমুকের স্ত্রী, ওমুকের মেয়ে সৌদিতে সমস্যায়। কিছু একটা করেন। কিন্তু আমি কী করবো? পরে মনে হলো কিছু করতে না পারি লিখতে তো পারি। সবার আবেদন নিয়ে পাসপোর্ট বা ফোন নম্বর যা পাওয়া যায় সেসব নিয়ে পাঠালাম প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডে। অনেকবার তাদের ধন্যবাদ দিয়েছি। আজ আবার দেই। সাড়ে তিনশ আবেদন পাঠিয়েছি। বোর্ড সেগুলো সব সৌদি দূতাবাসে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে আড়াইশজন ফিরেছেন।
মেয়েরা তো ফিরতে শুরু করলো। এখন? ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে মেয়েরা ফিরতে শুরু করলো। এবার তো তাদের সহযোগিতা লাগবে? বিমানবন্দরে নামলে তাদের খাবার, থাকা, জরুরি চিকিৎসা আরও কতো কী লাগবে? কোথায় পাবো? কোথা থেকে আসবে টাকা? আলামিন নয়ন (বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট আমাদের ব্র্যাকের কর্মকর্তা) ভাইসহ আমার এয়ারপোর্টের টিমকে বললাম- শুরু করেন।
জানি না বলা ঠিক হবে কী না- আমি আমার সব সহকর্মীকে বললাম, নিজেদের বেতনের টাকা দিয়ে শুরু করতে হবে। সত্যি সত্যি তাই করলাম। কিন্তু এভাবে কতোদিন? কাজটা না থামিয়ে একদিন আসিফ ভাইকে বললাম এই মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে চাই। ব্র্যাকের জরুরি তহবিল থেকে টাকা চাই। আসিফ ভাই বললেন- পরিচালকদের মিটিংয়ে আসেন। তুলে ধরেন। এক পৃষ্ঠার একটা কনসেপ্ট দেন। কী করতে চান, বলেন। বললাম। ব্র্যাকের সব পরিচালক সেদিন বললেন, এই মেয়েদের পাশে অবশ্যই আমরা থাকবো। এরপর শুরু হলো আমাদের নতুন লড়াই। সেই গল্প বললে শেষ হবে না।
কতো কতো কান্নার ঘটনা! কতো কতো আহাজারি বিমানবন্দরে। এই কাজে টাকা দিয়ে সহায়তা না করলেও এয়ারপোর্টের পুলিশ, এপিবিএন, নানাবাহিনী যেভাবে আমাদের সহায়তা করেছে সেজন্য তাদের কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ককে। বিমানবন্দরের সবাই সহযোগিতা করেছে। করেছে কারণ প্রত্যেকে দেখেছে করুণ সব ঘটনা। কিন্তু দুঃখের কথা কী জানেন?
দিনের পর দিন ঘুম নেই, রাত নেই, ভোর নেই সবসময় আমরা এই মেয়েদের পাশে দাঁড়াচ্ছি- কোথায় রাষ্ট্র আমাদের কৃতজ্ঞতা দেবে- পাশে দাঁড়াবে- তা নয় উল্টো এক সচিব মহোদয় ক্ষেপলেন। বললেন নয়ন কে? তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি দিলেন। কী বলবো? এই রাষ্ট্রের উচিত- নয়নকে মাথায় করে রাখা, তাঁকে স্যালুট করে রাখা। নয়ন ভাইয়ের গল্প বললে শেষ হবে না। সেদিকে না যাই। আপনারা যারা তাকে চেনেন তারা জানেন।
আমার ভীষণ অভিমান হয়- এই রাষ্ট্রে এতো এতো সংস্থা, এতো এতো মানবাধিকার সংস্থা, এতো এতো মহিলা সমিতি, এতো এতো সিএসআর কাউকে আমরা এই মেয়েদের জন্য পাশে পাইনি। হ্যাঁ, বলতে হবে একটা সংস্থার কথা। লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এঙপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সদস্যরা এই কাজে আমাদের পাশে ছিলেন। আর কেউ না।
আর সত্যি বলতে কী- আমি উন্নয়ন কর্মীদের নতুন করে চিনেছি এই সময়। সাংবাদিক হিসেবে যখন তাদের বক্তব্য নিতে যেতাম কতো বড়-বড় কথা, কাজের সময় দেখলাম কেউ নেই। না, আমার আফসোস নেই। বরং এই বাংলাদেশের ১৭ কোটি লোককে বলতে পারবো সৌদি ফেরত এই মেয়েদের পাশে আমরা ছিলাম। দেশে ফিরে এই মেয়েরা আর কাউকে না পেলেও আমাদের পেয়েছে। কিন্তু এই কান্নার শেষ কোথায়?
নিয়মিতই মেয়েরা ফিরছে। নির্যাতনের যে বর্ণনা দেন তারা, সেগুলো শুনলে গায়ের সব লোম দাঁড়িয়ে যায়। কান্নায় ভিজে যায় চোখ। আমি জানি এই কান্না ইতোমধ্যেই বিমানবন্দর থেকে পৌঁছে গেছে সারাদেশে। এই কান্নার শেষ কোথায়?
অনেকে বলার চেষ্টা করে- এই যে তিন লাখ মেয়ে গেল তার মধ্যে মাত্র তো আট-নয় হাজার ফিরলো। বাকিরা নিশ্চয়ই ভালো আছে। ভালো আছে কী নেই, সেটা আমরা জানতে পারি না। কারণ, সৌদি আরবের সেই বাড়িগুলোতে যাওয়ার অধিকার কারও নেই। আমাদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও দুর্বল। কিন্তু অনেক মেয়েই যে ভালো আছে- সেটা সত্য। আবার অনেক মেয়ে যে নির্যাতিত সেটা কী করে অস্বীকার করা যায়? আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তো সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। সৌদি আরবে যদি একটা মেয়েও নির্যাতিত হয়ে কাঁদে সেই কান্না কী পুরো বাংলাদেশের নয়?
আর আপনারা যারাই সৌদি আরবে মেয়ে পাঠানোর পক্ষে- আপনি সরকারে থাকুন বা যে কোন জায়গায়, আপনাদের কাছে আমার শুধু একটা প্রশ্ন, আচ্ছা আপনারা কী আপনাদের কোন গরিব আত্মীয়কে সৌদি আরবে পাঠাবেন গৃহকর্মী হিসেবে? আচ্ছা, বাদ দেন। বলেন তো, আপনার বাসার কাজের মেয়েটাকে যদি তাকে একটু হলেও মায়া করেন পাঠাবেন তাকে? আজ পর্যন্ত কেউ আমার এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলেনি। আচ্ছা আপনি বা আপনারা যদি আপনার বাসার কাজের মেয়েটাকে সৌদি আরবে না পাঠাতে চান- তাহলে কেন দেশের মেয়েদের পাঠাচ্ছেন?
…দু’দিন আগে সৌদি গেজেটে একটা নিউজ হয়েছে। পড়েন। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মেয়ে কম আসছে বলে তারা চিন্তিত। কারণ, এতো সস্তায় এতো কম বেতনে আর কোন দেশের কাজের মেয়ে পাওয়া যাবে না। আচ্ছা বলেন তো, একদিকে মধ্য আয়ের দেশের কথা বলবেন আরেকদিকে দেশের মেয়েদের কাজের মেয়ে হিসেবে পাঠাতে চাইবেন সৌদি- কেমন হয়ে গেল না বিষয়টা?
না, মেয়েদের বিদেশে পাঠানোর বিপক্ষে আমরা বলছি না। তবে আমার মত হলো, আমাদের মেয়েরা বিদেশে কাজ করতে যাক, তবে সেটা গৃহকর্মী না হয়ে অন্য কিছু হলে ভালো হয়। বিশেষ করে পোশাক খাত বা অন্য কোন কাজে। বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবও তাই বলেছেন ক’দিন আগে। মানুষটাকে ধন্যবাদ। তাকে চিনি এক দশক ধরে। এই খাত নিয়ে তাঁর চেয়ে ভালো আর কে জানেন? বর্তমান মন্ত্রী মহোদয়কেও ধন্যবাদ। তিনি কখনো ঘটনাগুলো এড়িয়ে যান না। সত্য আড়াল করেন না। বরং সমস্যাকে সমস্যা বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমার কথা একটাই। আমি চাই আমাদের মা-বোনেরা নিরাপদ থাকুক।
কিন্তু কথা হলো, আমরা যদি আমাদের মেয়েদের অধিকার রক্ষা না করি সৌদির কি ঠেকা পড়েছে? আচ্ছা বলেন তো, এখন পর্যন্ত একটা ঘটনায়ও কী কোন সৌদি নিয়োগকর্তার সাজা হয়েছে? আমরা কী শক্তভাবে বলতে পেরেছি? নাকি আমাদের বাজার বন্ধ হয়ে যাবে, মেয়েদের না দিলে ছেলেদের কী হবে এই ভয়ে নতজানু?
আবারও বলছি, আমরা চাই না বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের একটা মেয়েও নির্যাতনের শিকার হোক। কারণ, একটা মেয়েও যদি কাঁদে আমার কাছে সেটা পুরো বাংলাদেশের কান্না। চলুন, আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে এই কান্না বন্ধ করি। বন্ধ করি আবিরণ আর নাজমাদের লাশ আসা। বন্ধ করি তাদের আত্মহত্যা। আমার পুরোনো প্রশ্নটাই সবাইকে করি, এই কান্নার শেষ কোথায়?
(লেখাটি শরীফুল হাসানের ‘ফেসবুক পোস্ট’ থেকে নেয়া)

x