এইডস-সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ জরুরি

রবিবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
177

জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইডসের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরণব্যাধি এইডসের কারণে মৃত্যুর হারের দিক দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১০ম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৬ সালে এ রোগে প্রায় ১ হাজার জনের প্রাণহানি ঘটে বাংলাদেশে। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত শুক্রবার।

বর্তমান বিশ্বে মানবজাতির জীবন ও সভ্যতার জন্য বড় হুমকি হলো এইডস। এর কোনো চিকিৎসা নেই, নেই কোনো প্রতিষেধকও। পরিণতি অবধারিত মৃত্যু। তাই প্রতিরোধই হলো এর হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। এইডসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। যার সুযোগ নিয়ে এ রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে একজন থেকে বহুজনের শরীরে, মহামারীর রূপ নিচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সারা বিশ্বে এইডসে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষ। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ নতুনভাবে এইচআইভিতে সংক্রমিত অর্থাৎ প্রতিদিন সাড়ে ১৩ হাজার নতুন সংক্রমণ ঘটছে, যাদের অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। তবে নতুন সংক্রমণের শতকরা ৯৫ ভাগই উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। কাজেই এ রোগটা বাংলাদেশে একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনজনের মধ্যে প্রায় একজনের মৃত্যু ঘটে এইডসের কারণে। এ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষের শরীরে এইচআইভি পজিটিভ চিহ্নিত হয়েছে এবং সেখানে মৃত্যুর প্রথম ৯টি কারণের মধ্যে এইডসই এখন এক নম্বর কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি অনেকের শরীরে অনেক দিন থাকতে পারে। তবে শরীরে এইচআইভি থাকলেই এইডস হয়েছে এমন কোনো কথা বলা যাবে না। যাদের রক্ত পরীক্ষায় এইচআইভি পাওয়া যায় তাদেরকে ‘হিভ’ পজেটিভ কেস হিসেবে ধরা হয়। এই পজিটিভ ব্যক্তিদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মানুষ ‘এইডস’এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন, বিশেষ করে যাদের শরীরে ‘টি’ সেলের সংখ্যা যখন প্রতি কিউবিক মিলিমিটারে ২০০ বা এর নিচে নেমে আসে। শরীরে এইচআইভি ঢোকার পর সাথে সাথে কোনো লক্ষণ থাকে না বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। শুধু রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে এই ভাইরাস আছে কি না জানা যায়। এইচআইভি শরীরে ঢোকার পর থেকে কত বছর পর এইডস হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এটা দুই বছর হতে পারে আবার ১৫ বছর পরও হতে পারে (গড়ে ১০ বছর)। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের পদ্ধতির ওপর তা অনেকাংশে নির্ভর করে। তবে একবার এ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে এক সময় এ রোগ দেখা দেবেই, এর হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় নেই অর্থাৎ অবধারিত মৃত্যু।

বাংলাদেশে এইডস পরিস্থিতি বর্তমানে উদ্বেগজনক। কেননা এখানে ঢুকে পড়েছে বহু রোহিঙ্গা। আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে একের পর এক শনাক্ত হচ্ছে এইডস রোগী। এর সংখ্যা শত ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তা নয়; আরো ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাইরাস রয়েছে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। ফলে বাংলাদেশ ফের এইডস ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তা নিয়ে সরকারও অনেকটা চিন্তিত। কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। নতুন আর পুরানো মিলে উখিয়া টেকনাফে এখন প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। উখিয়া টেকনাফ আর ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের একটি বিশাল সংখ্যক নানা রোগে আক্রান্ত। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক এইডস রোগী। এই পর্যন্ত ৯৭ জন রোহিঙ্গার মধ্যে এইডস ধরা পড়েছে। এরাই সবাই অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে এলে পরীক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে এইডস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ বছরের শিশুও পাওয়া গেছে।

আমরা চাই, সরকার এইডসসংক্রান্ত প্রতিটি বিষয় গভীর পর্যবেক্ষণ করুক এবং সে মোতাবেক কার্যকর উদ্যোগ নিক। কেননা এ রোগের মাত্রা বৃদ্ধি হতে থাকলে তা আগামী দিনের জন্য হবে ভয়ঙ্কর। তাই ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ এবং যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এইডসের ঝুঁকি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে।

x