উৎসবের অন্তরালে

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

এক
উৎসব বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐতিহ্যের অঙ্গ। কিন্তু উৎসবের অর্থ যদি হয় অপচয়ের মচ্ছব আর অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাত্রাতিরিক্ত প্রদর্শনী তাহলে সে উৎসবকে কী নাম দেওয়া যায়, ভেবে পাই না। আজকাল কোন উৎসব আয়োজনে সামিল হতে গেলে খচখচ করে বুকের ভেতর। চারপাশের সবকিছুকে বড্ড বাড়াবাড়ি মনে হয়। মনে হয় এই উৎসবের খরচ থেকে একটু কাটছাঁট করলে কোটি মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়া যেত।
গেল বৈশাখে নতুন পোশাক নেয়া হয়েছিল পুরো পরিবারের জন্য। এরপর ঈদ-পুজা, জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী, বিয়ের দাওয়াত- নানা উপলক্ষে কেনাকাটা হয়েছে আরও বেশ ক’বার। বিজয় দিবসে এখন নতুন পোশাক লাগে। সেই পোশাকে থাকা চাই লাল-সবুজ। লাগবেই তো। এই লাল সবুজ যে অনেক দাম দিয়ে কেনা। লাল সবুজে মাখামাখি সেই পোশাক দিয়ে অনায়াসেই উদযাপন করা যায় স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু সেটা যে একবার পরা হয়ে গিয়েছে। আবার কি কোন অনুষ্ঠানে পরা যায়! দুয়ের মাঝখানে এসে পড়ে ফেব্রুয়ারি। বইতে, কাগজে শোকের মাস বলা হলেও শহীদ স্মরণের সভা শেষতক রূপ নেয় উৎসবেই। অতএব আবারও চাই নতুন পোশাক। এবার পোশাকে ফুটে উঠবে শোকের ছোঁয়া, সাদা কালোয়। পুরো পরিবারের জন্য একই রকম পোশাক নিয়ে হাজির নামি দামি বিপনিগুলো।
গ্রীষ্ম গেলো, বর্ষা গেলো। ঈদ পার্বণ শেষ না হতেই এসে পড়ে হেমন্ত। হিম হিম আরাম, মিষ্টি মিষ্টি গন্ধে বাংলা সাজে নতুন সাজে। নবান্ন আর পিঠা উৎসবের কথা পড়েছিলাম প্রাথমিক বাংলা বইতে। সে প্রায় তিন যুগ আগের কথা। এখন মেয়ের বাংলা বইতেও আছে নবান্নের কথা। আফসোস! সেই উৎসব দেখার সুযোগ মেলেনা আজকাল। সে কি তবে প্রাগৈতিহাসিক কোন কালের কথা ! বছরের এই সবচেয়ে মিষ্টি আর দারুণ উপভোগের সময়টায় শহুরে নাগরিকদের একটা বিশেষ অংশ মেতে উঠেন ভিন্নধর্মী এক উৎসবে। এই উৎসবের সার্থকতা কুৎসিত আর ভয়ংকর ভাবে নিজেকে উপস্থাপনের প্রতিযোগিতায়। নাম তার ‘হ্যালোইন’। দুই সহস্রাধিক বছর আগের পশ্চিমা এক লোকাচার কেমন করে যেন আমাদের নাগরিক উৎসবে বেশ পাকাপোক্ত ভাবে ঠাঁই করে নিয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল গুলোতে ৩১ অক্টোবরে একবার ঢুঁ মারলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। পুরো অক্টোবর জুড়ে দামি বিপণীগুলো ঠাসানো থাকে ভূত পেত্নি ডাইনি ড্রাকুলা ভ্যাম্পায়ার সাজার সামগ্রীতে। পছন্দের জিনিস কেনার জন্য ছেলেমেয়েদের সে কি উন্মাদনা ! বাবা মায়েদের ঘুম হারাম করে দেবার যোগাড়। সন্তানদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আশায় অনেক বাবা মা-ও একাত্মতা প্রকাশ করেন এই উৎসবের সঙ্গে। এই কি আমার সেই আউল বাউল লালনের দেশ! বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাসযোগ্য শহরে থিতু হবার হাতছানি উড়িয়ে দিয়ে ফিরে এসেছিলাম যার বুকে! অবশ্য ইংরেজি বর্ষ বিদায় উপলক্ষে ‘থার্টি ফার্স্ট‘ আয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছুটা বিধিনিষেধ আরোপিত হওয়ায় আজকাল সাধারণ নাগরিকদের একত্রিশ ডিসেম্বরের রাতের ঘুম মাটি হয়না।
শীতের আমেজ থাকতে থাকতেই ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় আসে বসন্ত। বাণিজ্যের পালে হাওয়া দিতে দিতে পরদিনই এসে যায় ‘ভালোবাসা দিবস’। বাংলাভাষী ভালোবাসার চর্চাকারীদের জন্য এ যেন ‘ডবল পাওয়া, ডবল আনন্দ’। সাজতে হবে রঙিন পোশাকে। ‘থিম’ এক হলেও একই পোশাকে পরপর দুদিন! তা কি করে হয়! ফেইসবুকের বন্ধুরা কি বলবে! তাই দুদিনই চাই নতুন পোশাক। সাথে রঙ মিলিয়ে পাদুকা, বটুয়া-চুড়ি, মালা তো চাইই চাই। মেঘ কালো চুলগুলো হালে বাদামী কি সোনালীতে রাঙানো হলেও খোঁপাতে, বেনিতে চাই রঙ বেরঙের কাঁচা ফুল।
চৈত্র দিনের শেষে আবারও এলো যে বৈশাখ। গ্লানি জরা কিছুই মুছে ঘুচে যায়না। অগ্নি স্নানে ধরাও বুঝি আর শুচি হয়না। মুমূর্ষুরা ধুঁকে ধুঁকে পাড়ি দেয় দিনের পর দিন। আর আমাদের মতো উৎসবপ্রিয় মানুষগুলো ‘ফ্যান্টাসি’তে মাতোয়ারা দিনের পর দিন।
দুই
শুধু কি পোশাক দিয়ে উৎসব হয় ! ভোজন রসিক বাঙালি আমরা। টেবিল জুড়ে পাঁচ দশ পদের ভর্তা না থাকলে কিসের বৈশাখ! মুচমুচে ইলিশের গন্ধ না পেলে পহেলা বৈশাখ যে এ-মুখো হবেই না। লোকে রসিকতা উপহাস যাই বলুক- পান্তা চাই-ই চাই। তা না হলে বাঙালিপনা জমবে না আজকের এই দিনে। সাথে আরও চাই নিরামিষ, লাবড়া, ঘণ্ট…। চাটনি, আচার বাদ গেলে চলবে কি করে! কোর্মা পোলাও কিন্তু বাকি থাকা চলবেনা। পায়েস সন্দেশ সহ নানা পদের মিষ্টান্ন চাই শেষ পাতে । কোমল পানীয়, আইসক্রিমকে বিজাতীয় মনে হলেও বাদ দেই কি করে! এই গরমে!
খাবার ঘরের বিশাল টেবিলটায় তিল ধারনের ঠাঁই নেই। অতিথিরা সব সেজে এসেছেন বৈশাখের সাজে। আপনার সাজও পরিপূর্ণ হলো ফরাসী সৌরভ ছড়িয়ে দিয়ে। আচ্ছা, প্রতিটা মুহূর্তকে ধরে রাখছেন তো- ডিএসএলআর ক্যামেরা কিংবা আইফোন, স্মার্টফোনের মেমোরিতে? খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে আগত অতিথিদের। আপনার নিজেরও কি নয়? কিন্তু এখনই পরিবেশন নয়। টেবিলের থালাবাটি পেয়ালাগুলোকে একটু নেড়েচেড়ে পরিপাটি করে সাজিয়ে, নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করে সবার আগে ‘এক্সক্লুসিভ’ কিছু ছবি তুলে নিতে হবে। এতো কষ্ট করে রাত জেগে রান্না করা খাবারগুলোর প্রতিকৃতি রেখে না দিয়ে হাপুস করে দেবে সবাই মিলে! তা কি করে হয়! ফেইসবুকে আপলোড করতে হবে না! এরই মধ্যেই অনেক ভাবী, আপা, বন্ধু অলরেডি বৈশাখের ছবি আপ করে ফেলেছে। আপনারই দেরি হয়ে গেল বাড়তি কিছু পদ রাঁধতে রাঁধতে। আর সবার চেয়ে বেশি আইটেম টেবিলে থাকলে আপনার মান মর্যাদাযে আকাশে গিয়ে ঠেকবে। সেই খুশিতে আর গর্বে সব কষ্ট পানি হয়ে যায়। তাই ছবি তুলে রাখা ভীষণ জরুরি বৈকি। অতিথিরাও সম্মতি দেন। অপেক্ষা করেন ধৈর্য নিয়ে।
ফটোসেশন শেষ। এবার খাওয়া চলে। খাও তবে কব্জি ডুবিয়ে যার যত খুশি। কাকডাকা ভোর থেকে যে গৃহকর্মী ঘেমে নেয়ে একাকার, সে না হয় সবার পরেই বসুক। ওর পাত পড়বে রান্নাঘরের মেঝেতে। ছবিতে থাকবে না সে। এখনও তার স্নান হয়নি। নতুন পোশাকও নেই তার। গেলবারের পুরনো পোশাকটা দেই দেই করেও শেষমেশ দেওয়া হয়নি ওকে। এতো দাম দিয়ে কেনা! একবারই মাত্র পরা হয়েছিল। এখনও নতুনের মতো। ওকে দেবার মতো যথেষ্ট পুরনো হয়নি।
এতো গেলো বৈশাখের দুপুরের কথা। শবেবরাত, ঈদ, বারো মাসের তের পার্বণ ছাড়া বছর জুড়ে পারিবারিক নানা উৎসবে মঞ্চায়ন হয় অনেকটা একই রকম দৃশের। উৎসব উদযাপনে নতুন সংযোজন ‘সেহরি পার্টি’। ইফতার পার্টির প্রচলন অনেক দিনের হলেও জাঁকজমকের হার বেড়েছে ব্যাপক হারে ইদানীং, সেই সাথে জনপ্রিয়তা। পারিবারিক গণ্ডির বাইরে অভিজাত রেস্তোরাঁয় আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানেও চলে অপচয়ের ছড়াছড়ি। কি সিয়াম, কি সাধনা সবকিছুর সঙ্গেই আড়ি। এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দিয়ে এই রচনার কলেরব আর বাড়াতে চাইনা।
দিনে দিনে বাড়ছে এমন উৎসবপ্রিয় মানুষদের সংখ্যা। দিনে দিনে আসছে নতুন নতুন চমক, ঠমক, জাঁকজমক। কেন যে অন্য দেশের কাগজে, টেলিভিশনে আমাদের দেশটাকে গরিব দেশ বলে, বুঝিনা। এসব নিশ্চয় পশ্চিমা গণমাধ্যমের ষড়যন্ত্র! ফেইসবুকের ছবি বলে ভিন্ন কথা।
তিন
প্রবাসে বসবাসকারী বাংলা মায়ের সন্তানেরা অন্য কোন মহাদেশ থেকে দেখেন রঙবেরঙের সব ছবি। ভাবেন- দেশের মানুষদের কতো আরাম, কতো আনন্দ! কতোইনা সুখে আছে ওরা! আমরাই বা কম কিসে! এসো। আমরাও করি উদযাপন। ডেকে আনি বৈশাখ কে। ঈদ, পুজা আর একুশ, বিজয়কেও। একদিনের জন্য ইংরেজি হরফে লেখা বাংলা কবিতা শেখাই শেকড় ছেঁড়া ছেলেমেয়েদেরকে। ওদের গায়ে চাপিয়ে দেই রঙ বেরঙের বাংলা পোশাক।
উত্তরের বাসিন্দারা বসন্তেই নিয়ে আসেন বৈশাখী আমেজ। কৃষ্ণচুড়া, জারুল, পারুল, সোনালু ফোটেনি তো কি হয়েছে! চেরি ব্লসম, টিউলিপ তো আছে। দক্ষিণে তখন শরৎ। পাতারা রঙ বদলে ফেলেছে। ঝরে ঝরে পড়তে শুরু করে করেছে পথে ঘাটে। দেখে মনে হয় যেন পাতার বিছানা। কাবার্ডেও ওপরের দিকে তুলে রাখা ভারী কাপড়গুলো নামানোর সময় এসে গেছে। কিন্তু মাতৃভূমি মেতেছে বৈশাখে। কম্বল চাদর মুড়ি দিয়ে সেই বৈশাখ এসে ধরা দেয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে। বাঙালি পোশাক আর খাবারের পসরা বসে উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে। থেমে থাকে না সবকিছু ফ্রেমবন্দী করে রাখার আয়োজন। সেই সাথে দ্রুততম সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব ছড়িয়ে দেবার নিদারুণ প্রতিযোগিতা।
দেশের মাটিতে উৎসবের আমেজ দু চারদিনে শেষ হয়ে গেলেও বিদেশে তা চলে মাসব্যাপী। মাসাধিক কাল ধরেও চলে। কাজের দিনে উৎসব করার জো নেই। উন্নত বিশ্ব বলে কথা। কাজ ফাঁকি দিয়ে মজা করা চলবেনা। ছুটির দিনের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় ওদের। এক ছুটির দিনের আনন্দে মন ভরেনা। তাই পরপর কয়েকটা সাপ্তাহিক ছুটির দিন জুড়ে চলে দাওয়াত খাওয়া; ‘ভর্তা পার্টি’, ‘ওয়ান ডিশ’ কিংবা ‘পটলাক’ ভূরিভোজন। একইসাথে পোশাক, প্রসাধন, গহনা আর র‌্যাফেল ড্র’র ঝকমারি। প্রবাসীদের সেইসব ছবি ফেইসবুক কি অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে রাস্তার ধুলাবালি, গাড়ি আর কারখানার কালো আর বিষাক্ত ধোঁয়া খাওয়া, দেশে পড়ে থাকা মানুষগুলো ভাবে- আহা, কি সুখেই না আছে ওরা ! সব সুখ বুঝি সীমানার ওপারে। থাকবোনা আর এই পোড়া দেশটায়।
চার
প্রিয় পাঠক, বাংলা মায়ের সন্তানদের জন্মদিন ও বিয়েবার্ষিকী উদযাপন এবং যাবতীয় জাতীয় দিবস ও উৎসব আয়োজনের চলমান ছবি (ভিডিও) ছড়িয়ে আছে অন্তর্জালে। কি দেশী কি প্রবাসী, ধনবান থেকে সাধারণ মধ্যবিত্তদের ঐসব ছবি ও গল্প দেখে বিল গেটস, জাকারবার্গসহ বিশ্বসেরা ধনকুবেরগণও বোধ করি লজ্জায় মুখ লুকোবেন।
ভাবছেন – এ কেমন ধারার কথা বাপু ! তাই বলে উৎসব হবেনা? বিশেষ বিশেষ দিনে একটু ভালো মন্দ খাওয়া চলবেনা? সুন্দর পোশাক পরা যাবেনা? আনন্দ ফূর্তি করা যাবেনা? কোটি কোটি মানুষ অভুক্ত আছে বলে আমাকেও না খেয়ে, না দেয়ে, বৈরাগ্য সাধন করতে হবে?- তা নয় কিন্তু। ঐযে শুরুতে বলেছিলাম- একটুখানি কাটছাঁট করার কথা। সেই একটুখানি কাটছাঁটেই পাল্টে যায় কোটি মানুষের জীবন। আমাদের কেবল ভাবতে হবে, একটুখানিই। মানুষ যে আমরা। কবে কোথায় যেন পড়েছিলাম- একটা ইংরেজি বাক্য। কিছুতেই তাড়াতে পারছিনা মন থেকে। উপসংহারে তাই তুলে ধরছি-
For every drop of water you waste, you must know that
Somewhere is DESPERATELY looking for A DROP of WATER (Mehemet Murat Ildan)

x