উৎপাদিত বিদ্যুতের সুফল পেতে হলে সরবরাহ লাইনের সংস্কার দরকার

শনিবার , ৩১ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
59

বিদ্যুৎ আধুনিক জীবন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। কিন্তু চট্টগ্রামে সেই বিদ্যুতের বিপর্যয় ঘটছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলছে লোডশেডিং। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সত্ত্বেও অহরহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য গ্রাহক। গত ২৯ শে আগস্ট ‘নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র -তবুও লোডশেডিং’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, ধীরে ধীরে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ছে। সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। ফলে চাহিদার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এ অঞ্চলে। চট্টগ্রামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রামে লোডশেডিং কমছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভৌগোলিক কারণে সরকারি-বেসরকারিভাবে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে সারাদেশে চলে গেলেও চট্টগ্রাম বঞ্চিত হচ্ছে। লোডশেডিং কমছে না। তবে পিডিবি বলছে, চট্টগ্রামে লোডশেডিং নেই। সঞ্চালন ও সরবরাহ লাইনের জটিলতার কারণেই মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরও এই দুঃসহ গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনায় ক্ষুুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নগরের অনেক মানুষ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা বলেন, ‘ভেবেছিলাম দেশে যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে, সেহেতু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাব। কিন্তু আশায় গুড়েবালি। এই দুঃসহ গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি। রাত নাই, দিন নাই যখন-তখন হচ্ছে লোডশেডিং। দুঃসহ এই গরমে যেখানে ফ্যানের বাতাসও গরম লাগে, সেখানে ঘন ঘন লোডশেডিং হলে কতটা যে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন, এই তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা কতটা পীড়াদায়ক।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘লোডশেডিংয়ের কবলেই যদি পড়তে হবে তাহলে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাভ কী?’। তাঁরা আরো বলেন, ‘দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তার মধ্যে ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এরপরও কেন বারবার লোডশেডিং হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এ অবস্থায় বিদ্যুতের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। প্রশ্ন জাগে, রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের পরও কেন এই অবস্থা? এত বিদ্যুৎ যায় কোথায়?’
এ প্রসঙ্গে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন আজাদীর উক্ত প্রতিবেদনে বলেন, ‘এখন চট্টগ্রামে চাহিদা অপেক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। এখন চাহিদার দেড়গুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। চট্টগ্রামে পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ১৬-১৭শ’ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে চাহিদা থাকে ১২-১৩শ’ মেগাওয়াট। এখন দৈনিক ২১শ’ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে চট্টগ্রামের প্লান্টগুলোতে।’ তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। গত এক মাস ধরে প্রতিদিন একশ’ থেকে দেড়শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় গ্রিডে দেয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে বিদ্যুতের সমস্যা ছিল। কারণ গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারতো না। এখন এলএনজি আসার পর থেকে ওইসব প্লান্টগুলো সচল হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেশ কয়েকটি প্লান্ট উৎপাদনে এসেছে।’
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে লোডশেডিং থাকার কথা না। তারপরও এখানকার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। সঞ্চালন ও সরবরাহ লাইনের জটিলতার সমাধান না হলে এ দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হলে গুণগত ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়্লানোর পাশাপশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় বিদ্যুৎ সমস্যা তিমিরেই থেকে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে বড় রকমের সমন্বয়ের অভাব থাকলে এ ধরনের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যেসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে, তার মধ্যে এ সমন্বয়হীনতা অন্যতম। তাই ওই বিপর্যয়কে দুর্ঘটনা বলা যায় না। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে সুষম সমন্বয় হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় উল্লিখিত তিনটি ব্যবস্থার নিজ নিজ কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে যেমন সমন্বয় জরুরি, তেমনি নিজ নিজ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের মধ্যেও অনুরূপ সমন্বয় জরুরি। কেননা, বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের উন্নয়ন করা না গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদিত বিদ্যুতের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

x