উৎপলকান্তি বড়ুয়ার ছড়াসমগ্র

কাঞ্চনা চক্রবর্ত্তী

শুক্রবার , ৫ জুলাই, ২০১৯ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ
33

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে উৎপলকান্তি বড়ুয়া এক উল্লেখযোগ্য নাম। ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক ও প্রবন্ধ- প্রত্যেকটি শাখায় রয়েছে তঝার সমান দক্ষতা। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লিখে আসছেন। তবে ছড়াশিল্পী হিসেবে তঝার খ্যাতি আকাশচুম্বি। মা, মাটি, দেশ ও প্রকৃতি তঝার লেখার মূল উপজীব্য। তঝার লেখনির দক্ষতায় কিশোর মনের ভাবনা ও ভাবাবেগের অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। তঝার প্রথম ছড়াগ্রন্থ ” ‘বাকুম বাকুম বাক’’ প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের শৈলী প্রকাশন থেকে ১৯৯৬ সালে। ‘আমার স্বপ্ন আমার দেশ’’ তঝার নিজ হাতে লেখা একটি গ্রন্থ। এছাড়াও ছড়াগ্রন্থ “ফুলের কুটুম (২০১০)” ও “ছড়াপুর কতদূর (২০১৫) ”এ দুটিও তঝার হাতে লেখা ছড়াগ্রন্থ। এটি একটি বিরল নজির। তঝার প্রকাশিত ১৭টি গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা ছড়াগ্রন্থ “অবুকরে বুক বুক (২০০০)”। তঝার প্রকাশিত অন্য বইগুলি হলো— বুদ্ধের ছড়া (১৯৯৯), ফুলের কুটুম (২০০১), চার বেহারার পালকি (২০০২), দিল্লি ফেরৎ বিল্লি (২০০৮), দুষ্টুবুড়ি কুসুমপুরী (২০১২), ছড়াপুর কতদূর (২০১৫), ছড়াসমগ্র (২০১৮); গল্পের বই : হীরনমতি (২০০১), রাজপুত্রের সাজা (২০১৫), মা কাক বাবা কাক (২০১৭), রাতুলের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া(২০১৮); কিশোরকবিতা গ্রন্থ : আজকে ছুটির দিনে (২০০৯), চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে (২০১৭); ক্লোরিহিউ গ্রন্থ-আলো ঝলমল রঙিন কমল(২০১৬), ধর্মীয় ছড়া ও কবিতার বই : সত্যের আলোকধারা (২০১৬)। ‘ছড়াসমগ্র’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গ্রন্থগুলিই আজকের আলোচনার বিষয়।
উৎপলকান্তি বড়ুয়ার লেখায় স্থান পেয়েছে মা, মাটি ও প্রকৃতি। তঝার ছড়া ও কবিতায় প্রকৃতি ও দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও একুশের চেতনার পাশাপাশি নিসর্গ স্থান পেয়েছে। ” আমার স্বপ্ন আমার দেশ ”গ্রন্থটি মা,মাটি ও প্রকৃতিকে নিয়ে দেশাত্মবোধক কবিতার একটি গ্রন্থ। উল্লেখ্য যে, এটি তঝার নিজ হাতে লেখা একটি গ্রন্থ।বাংলাভাষাভাষীদের মধ্যে শিশু সাহিত্য লেখকের স্বহস্তে লেখা গ্রন্থ একটি বিরল ঘটনা। এই গ্রন্থে মোট ২০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এই কবিতাগুলো এতটাই আবেগমিশ্রিত যা শিশুকিশোরদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলে। প্রথম কবিতা ‘ছুটির দিনে’।এতে তিনি শিশুমনে ছুটির আমেজ অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
যেমনঃ-
“ছুটির দিনে একটানা ছুট বন পেরিয়ে যাওয়া
খুশির উছল হাওয়া
প্রজাপতির ডানায় ভেসে ভেসে
নীল আকাশের মেঘের সাথে মেশে
অসীমে গান গাওয়া,
হীরা মানিক মুক্তো খুঁজে হাতের মুঠোয় পাওয়া।”
আবার “মায়ের হাসি মুখ ” কবিতায় মায়ের প্রতি সন্তানের ভাবাবেগ ও ভালোবাসাকে স্বর্গীয় সৌন্দর্য দিয়ে বর্ণনা করেছেন। সন্তানের কাছে তার মায়ের মুখের হাসি পৃথিবীর সকল কিছুর চেয়ে দামী। এটিকে কাব্যিক ছন্দে বর্ণনা করেছেন—
“রাতের প্রিয় জোনাক জ্বলা
জোছনা আলোর বুক,
আমার কাছে প্রিয়,আমার-
মায়ের হাসি মুখ।”
“যুদ্ধে গেছে মায়ের ছেলে ” কবিতায় সন্তান কখনো ফিরবে না জেনেও মা সন্তানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। যে অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। তা অতি মর্মস্পর্শী ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
” ঝাপসা চোখ অশ্রু শুকায়,
কোমল করে মন
তোর জন্যে আজো বেঁচে আছি
মানিক ধন”।
“মুজিব “কবিতায় তিনি জাতির পিতাকে আমাদের বাঙালি জাতির আদর্শ ও ন্যায়ের প্রতীক হিসাবে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।আমাদের চিন্তা চেতনা ও জাতীয়তাবোধে বঙ্গবন্ধুকে অতি সহজ ও সরল ভাষায় আদর্শিত করেছেন।
“নদীর সাথে ঢেউয়ের সাথে
হাওয়ায় কথা বলা
মুজিব দীপ্ত রাঙা বুকে সাহসে পথচলা।”
” আমার স্বপ্ন আর দেশ “কবিতায় আমাদের মাতৃভূমির অপরূপ রূপটি প্রাঞ্জলভাষায় বর্ণনা করেছেন। উৎপলকান্তি বড়ুয়ার ছড়াসমগ্রে গ্রন্থিত হয়েছে : (১) বাক বাকুম বাক, (২)দুষ্টু বুড়ি কুসুমপরী, (৩) চার বেহারার পালকি, (৪)দিল্লী ফেরত বিল্লি, (৫)ফুলের কুটুম, (৬)ছড়াপূর কতদূর (৭)বুদ্ধের ছড়া। এছাড়াও তঝার অগ্রন্থিত ছড়া সমূহ নিয়ে তিনি ছড়াসমগ্র সমৃদ্ধ করেছেন।
এই সাতটি ছড়াগ্রন্থকে একই মোড়কে আবদ্ধ করেছেন। এই ছড়াগ্রন্থটি শিশু কিশোরদের অত্যন্ত ভালোলাগার একটি গ্রন্থ। শিশুদের ভালোলাগার আবেশে তিনি যেন বিমোহিত করে রেখেছেন। “বাকুম বাকুম বাক” এ মোট ২৮টি ছড়া রয়েছে। প্রতিটি ছড়ায় যেন একেকটি ভালোলাগার আবেশ।
যেমন :
“বাক বাকুম বাক,
খুঁটে খুঁটে খাক,
খড় কুটো খুঁজে
বেঁধে ঠিকঠাক। ”
“দুষ্টু বুড়ি কুসুমপরী”এই গ্রন্থটিতে মোট ২১টি ছড়া স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থের ছড়াগুলির মাধ্যমে শিশুরা নিজেদেরকে রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যেতে পারবে। যেমনঃ “পরীর মেলায়”-
“চল না ওরে ধ্‌রুব শ্যামা
চল না পরীর দেশে
অনেক কিছুই কুড়িয়ে নিয়ে
ফিরবো অবশেষে। ”
“চার বেহারার পালকি” ছড়াগ্রন্থে মোট ২৬টি ছড়া রয়েছে। এই ছড়াগুলো পাঠ করে শিশুমন আনন্দে মেতে থাকতে পারবে। লেখাপড়ার মাঝেও শিশুরা এই ছড়াগুলো অনায়াসে আত্মস্থ করতে পারবে। ” দিল্লি ফেরৎ ঝিল্লি”ছড়াগ্রন্থে মোট ১৪টি ছড়া রয়েছে।”ফুলের কুটুম ” ছড়াগ্রন্থে মোট ২৩টি ছড়া রয়েছে। “একুশ ছড়াতে তিনি বলেছেন-,
“একুশ আমার আপন শেকড়
খোঁজার আদি পর্ব ,
মায়ের ভাষা মুখের বুলি
কী করে হয় খর্ব।”
একটি শিশু এই ছড়াটিতে মাতৃভাষার প্রতি যে ভালোলাগা ও ভালোবাসা তা অতি সহজেই বুঝতে পারবে। দেশপ্রেমের আদর্শ শিশু মনে অতি সহজেই ছড়ার মাধ্যমে প্রভাব ফেলবে।
“ছড়াপুর কতদূর” ছড়াগ্রন্থে মোট ৩৫টি ছড়া রয়েছে। “বুদ্ধের ছড়া ” গ্রন্থে সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভসহ বৌদ্ধ ধর্মের ত্যাগ ও ধর্মীয় চেতনা শিশু মনে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন: “বুদ্ধ মানে” ছড়াতে
“মলিনতা দূর হয়ে যায়
চন্দ্রালোকের গৌরবে
বুদ্ধ মানে পরিপূর্ণ
মহাজ্ঞানের সৌরভে।”
এছাড়াও ছড়াসমগ্রে রয়েছে অগ্রিন্থত অসংখ্য ছড়া। শুধু শিশুকিশোরদের জন্য নয় প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও উপযোগী এই ছড়াসমগ্র গ্রন্থটি। উৎপল কান্তি বড়ুয়ার লেখার সবচাইতে বড় দিক বিষয়বস্তুর নতুনত্ব ও বৈচিত্রতা। তঝার কবিতায় শিশুকিশোর মনের অকৃত্রিম আকুলতা, দুরন্তপনা, উচ্ছ্‌বলতা, ভাবলুতা স্থান পেয়েছে। তঝার লেখার অনন্য বৈশিষ্ট্য সাধারণ বিষয়কে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন।
উৎপলকান্তি বড়ুয়া একাধারে জনপ্রিয় ছড়া লেখক অন্যধারে তিনি কিশোর কবিতায় প্রাজ্ঞ, রুচিশীল ও পরিমিত। তঝার ছড়া ও কবিতায় সুর – ধ্বনি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মত টানে। ভাল লাগার রেশটুকুথেকে যায় পাঠকের মনে।
এই বিরল প্রতিভার অধিকারী তঝার সৃষ্টির জন্য বেশ উল্লেখযোগ্য কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তার মধ্যে সবুজ আসর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, আমরা দশজন সাহিত্য পুরস্কার, কথন শিশু সাহিত্য পুরস্কার, আমাদের পাঠশালা শিশু সাহিত্য সম্মাননা, কিডস শিশু সাহিত্য সম্মাননা ও হাবিবুর রহমান খান স্মারক সম্মাননা উল্লেখযোগ্য। তঝার শিশুসাহিত্য আরও সমৃদ্ধ ও সফল হোক- এ প্রত্যাশা আমাদের। [ ছড়াসমগ্র : উৎপলকান্তি বড়ুয়া। প্রচ্ছদ : উত্তম সেন। প্রকাশকাল : ২০১৮। প্রকাশক : শৈলী প্রকাশন। মূল্য ৩৩ টাকা]

x