উন্নয়নের ছোঁয়া আছে, তবুও মুক্তি মেলেনি সমস্যা থেকে

যানজটের সাথে যুক্ত হয়েছে জলাবদ্ধতা

সোহেল মারমা

মঙ্গলবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ
194

বস্তি কেন্দ্রিক মাদকের হাট, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বেহাল রাস্তাঘাট, নিত্য যানজট, ফুটপাত কেন্দ্রিক ব্যবসা এনায়েত বাজার ওয়ার্ডবাসীর মাথাব্যথার প্রধান কারণ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাটিতে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে বর্ষামৌসুমে জলাবদ্ধতা। জনগণ আদৌ কি এসব সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করেছে? জনপ্রতিনিধিরা কি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছেন? সেটা নিয়ে রয়েছে পক্ষে বিপক্ষে নানা বক্তব্য।
সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইলে তারা অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা তারা অকপটে স্বীকার করেন। তারা জানান, এলাকায় বিবিধ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসা শুরু হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত জবাব দেবেন সামনে ঘনিয়ে আসা নির্বাচনে। জনপ্রতিনিধি বা এলাকার কাউন্সিলর হতে ইচ্ছুক প্রার্থীরাও বসে নেই। তারা ইতোমধ্যে দৌড়যাপ শুরু করে দিয়েছেন।
বলা হচ্ছে, এলাকাটির কাউন্সিলর নির্বাচনে এবার একাধিক প্রার্থী দাঁড়াতে পারেন। তবে মূল লড়াইটি হবে তিন হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে। এরা হলেন, বর্তমান কাউন্সিলর মো. সলিম উল্লাহ বাচ্চু, সাবেক কাউন্সিলর এম এ মালেক, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য সাব্বির চৌধুরী ও জামশেদুল আলম চৌধুরী।
গত পাঁচ বছরে পুরনো দৃশ্যপটের অনেকটা পাল্টে যাওয়ার দাবি করছেন বর্তমান কাউন্সিলর মো. সলিম উল্লাহ বাচ্চু, যিনি এবারের নির্বাচনেও সরকারি দল আওয়ামী লীগের হয়ে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।
সলিমউল্লাহ বাচ্চু আজাদীকে বলেন, তার আমলে এলাকাটিতে ২৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এলাকার রাস্তাঘাটের সংস্কার ও উন্নয়ন, নালা নির্মাণ, ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থাপনা, বস্তিবাসীর উন্নয়নসহ আরও নানা সংস্কার কাজে এসব টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তার মেয়াদকালীন যেসব উন্নয়ন কাজ হয়েছে বিগত ৪৫ বছরে এই ধরনের কোনো উন্নয়ন এখানে হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো দাবি করে বাচ্চু বলেন, এলাকাটিতে আগের মতো সন্ত্রাস ও মাদক নেই। এক সময় এখানে সন্ত্রাস ও মাদকের কারণে রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচলও করতে পারত না। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে মানুষ হাঁটতে পারত না। এখন সেই পরিবেশ নেই। বিভিন্ন জায়গায় ফুটপাত দখলমুক্ত করেছি। এলাকাটি দিয়ে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারছে।
কাউন্সিলর বলেন, আমার অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতোমধ্যে এলাকায় ৮০ ভাগ উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। জনগণের ভোটে আবার নির্বাচিত হলে বাকি অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে চাই। এলাকাটিকে শতভাগ গ্রিন রোড ও ক্লিন সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
এনায়েত বাজার ওয়ার্ডটিতে চারবার কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এম এ মালেক। বিএনপি থেকে এবারও কাউন্সিলর প্রার্থী হতে ইচ্ছুক মালেক দাবি করেন, এলাকায় যত উন্নয়ন কাজ হয়েছে, তা সবই তার আমলে করা হয়েছে। সেটার সুফল এলাকাবাসী পাচ্ছে। বর্তমান কাউন্সিলরের আমলে উন্নয়ন কাজ তো হয়নি বরং সন্ত্রাস, মাদক বিশাল আকারে বেড়েছে। এলাকায় কখনো জলাবদ্ধতা হয়নি, উনার আমলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নালাগুলো সময়মতো পরিষ্কার করা হচ্ছে না, যানজটসহ নানা সমস্যার মধ্যে মানুষ বসবাস করছে।
এম এ মালেক বলেন, এখানকার জনগণ আমাকে ভালো চেনে। তারা আমাকে ভালোবাসে। তারাই বলবে, এলাকাটিতে যেসব উন্নয়ন কাজ হয়েছে সেসব কার আমলে হয়েছে। আমি সাধারণ মানুষের উন্নয়নে আরও কাজ করতে চাই। আশা করছি, জনগণের সহযোগিতায় আমি আবারো কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হব।
এছাড়া এই ওয়ার্ডে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য সাব্বির চৌধুরী। তিনি গতকাল আজাদীকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবা ও রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। এলাকার তরুণ প্রজন্ম চায় আমি আগামী নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করি। এই ওয়ার্ডের একজন বাসিন্দা হিসেবে এলাকার মানুষের বিপদ আপদে সব সময় পাশে থেকেছি। তবে জনপ্রতিনিধি হলে সেই কাজ আরো বড় পরিসরে করতে পারব।
সাব্বির বলেন, ইতোমধ্যে আবর্জনার স্তূপ অপসারণ করে বাগান নির্মাণ, ডেঙ্গুর প্রকোপ চলাকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত মশকনিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। স্বল্প আয়ের জনগণের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং এটা চলতে থাকবে। আমার এলাকার মূল সমস্যা জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা ও মাদকের সাম্রাজ্য, যেটা আমি তরুণদের নিয়ে সমাধান করতে চাই। আমার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে আমার এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলে একটি আধুনিক ওয়ার্র্ডে এ পরিণত করা।
এদিকে নির্বাচনে আরেক হেভিওয়েট কাউন্সিলর প্রার্থী হলেন জামশেদুল আলম চৌধুরী। আওয়ামী লীগ থেকে তিনি এবারের নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি না হয়েও সাধারণ মানুষের কল্যাণে আমি সবসময় পাশে থেকেছি। যেখানে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখেছি, সেখানে ছুটে গিয়েছি। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখে এলাকায় ১২/১৩টি গভীর নলকূপ নিজ উদ্যোগে স্থাপন করেছি। বিভিন্নভাবে তাদের আরো সহযোগিতা করেছি। জনপ্রতিনিধি না হয়েও আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে এসব করে গেছি।
জামশেদুল আলম বলেন, এলাকার মানুষ আমাকে কাউন্সিলর হিসেবে দেখতে চাই। আমিও তাদের উন্নয়নের কাজ করতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে অতীতে যেকোনো সময়ের তুলনায় এলাকায় আরো বেশি উন্নয়ন কাজ করব। তিনি বলেন, এলাকাটি থেকে মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা হবে। এলাকাটির ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে নিয়ে একটি সদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেওয়া হবে। খেলাধুলার জন্য মাঠের ব্যবস্থা করা হবে।
ওয়ার্ডটিতে খেলাধুলার কোনো মাঠ নেই জানিয়ে জামশেদ বলেন, একসময় এনায়েত বাজার ওয়ার্ড থেকে নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় বের হত। যারা জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলেছিল। এখন খেলাধুলার মাঠ নেই। ভালো খেলোয়াড়ও তৈরি হচ্ছে না। খেলাধুলার অভাবে যুবসমাজও বিপথে পা বাড়াচ্ছে। ঐতিহাসিক রাণীর দীঘির পাড় নিয়ে একটি শিশু পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান কাউন্সিলর প্রার্থী জামশেদ চৌধুরী।
সিটি কর্পোরেশনের ২২, ৩০ ও ৩১নং এই তিন ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের বর্তমান মহিলা কাউন্সিলর নীলু নাগ। এবারের নির্বাচনে তিনিসহ অতীতে নির্বাচন করা অনেক চেনামুখ অংশগ্রহণ করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেন যুব মহিলালীগের চট্টগ্রাম মহানগরীর সদস্য ও ৩০নং পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ড যুব মহিলা লীগের সভাপতি জিন্নাত সুলতানা ঝুমা। আসন্ন চসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানিয়ে তিনি আজাদীকে বলেন, এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ চায় আমি মহিলা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করি। এই লক্ষ্যে গত কয়েক বছর ধরে এলাকায় কাজ করছি। দলীয় কর্মসূচি ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশি নিচ্ছি। যেকোনো আপদে-বিপদে মানুষের পাশে আছি। ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই।
তিনি জানান, এই ওয়ার্ড ঘনবসতিপূর্ণ। শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে এখানে। আমার প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলা।
উল্লেখ্য, নগরীর ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ডটির মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। প্রায় এক বর্গকিলোমিটার আয়তনের এলাকাটি গুরুত্ব বহন করে থাকে বৃহত্তম বিপনি কেন্দ্র রেয়াজউদ্দিন বাজার, জুবলী রোডে বৃহত্তম টাইলস, স্যানিটারিসহ বিভিন্ন সামগ্রীর পাইকারি বাজার, উত্তরে কাজীর দেউরি, দক্ষিণে স্টেশন রোড, পূর্বে বৌদ্ধ মন্দির ও পশ্চিমে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবিসহ অন্যান্য এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ নানা কারণে। এতে ওয়ার্ডের উন্নয়নে শুধু কাউন্সিলরের ওপর নির্ভর না হয়ে ওই এলাকায় নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে কাজ করেছে পুলিশ, রেলওয়েসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো।
এলাকাটিতে মাদকের ব্যবসা ও সন্ত্রাস চরমে। এসবের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইতঃপূর্বে খুনের ঘটনা ঘটেছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ফুটপাত দখল, নিত্য যানজট এলাকাবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নানা উদ্যোগের ফলে এলাকাটিতে মাদকের কারবার কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফুটপাত ও যানজট অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নগর পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কর্মজীবী বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অবস্থানের কারণে এনায়েত বাজার একটি গিঞ্জি এলাকা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। এছাড়া রেলওয়ে জায়গার ওপর বিভিন্ন সময় গড়ে উঠেছে বস্তি। এতে বিভিন্ন সময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তবে সম্প্রতি রেলওয়ে ওইসব বস্তির অধিকাংশই উচ্ছেদ করে দিয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সিআরবি ঘিরে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছে। একই স্থাপনা ঘিরে আরও বিবিধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে।