উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ নিশ্চিত করুন

শনিবার , ১১ জানুয়ারি, ২০২০ at ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ

দেশে বোরোর হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৫ দশমিক ৮৫ টন। যদিও উন্নত বীজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হলে ফলন ১১ দশমিক ৭টন উন্নীত করা সম্ভব। প্রায় একই হারে ফলন বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে আমন আউশ ভূট্টা এবং গমের ক্ষেত্রেও। এ জন্য কোন ধরনের উদ্যোগ না থাকায় সম্ভাব্য ফলনের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার কারণে একদিকে জমির প্রয়োজন বাড়ছে বেশি, অন্য দিকে কৃষকের উপকরণ ব্যয় বা উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। শস্যের ফলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট (এফপিএমইউ)। মনিটরিং রিপোর্ট-২০১৯ অব দ্য বাংলাদেশ সেকেন্ড কান্ট্রি ইনভেস্ট প্ল্যান শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ধানের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার সঙ্গে ফলনের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বোরো ধানে হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ৫ দশমিক ৮৫ টন যা ১১ দশমিক ৭ টনে উন্নীত করা সম্ভব। আমন ধানে হেক্টর প্রতি উৎপাদন হচ্ছে ৩ দশমিক ৪ টন, যা ৬ দশমিক ৫ টনে উন্নীত করা সম্ভব। আউশে হেক্টর প্রতি উৎপাদন ২ দশমিক ৯টন যা ৭ দশমিক ৮ টনে উন্নীত করা সম্ভব। সে হিসেবে বোরোতে উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেক, আউশে ৬৩ এবং আমনে প্রায় ৪৫ শতাংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ মূলত কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের অর্থনীতি প্রধানত কৃষি নির্ভর। অথচ শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে কৃষি জমি কমছে গত বছরই। সরকার কৃষি জমি রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আর শিল্প বা ভবন নির্মাণ করা যাবে না। এরপরও কৃষি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে অকৃষি কাজে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে স্বল্প জমিতে আবাদ করে বিপুল মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো ক্রমেই এ ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একর প্রতি উৎপাদন বাড়ানোই এর একমাত্র সমাধান হতে পারে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিংয়ের প্রতিবেদনেও এটা প্রকাশিত হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে সম্ভাব্য সম্ভাবনার চেয়ে ৫০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, মানহীন বীজ ও সঠিক পদ্ধতি চাষাবাদ না হওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের দামের চেয়ে কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় সেচ ব্যয়ও উৎপাদন খরচ প্রতিবেশি দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কৃষি গবেষণা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই। কৃষিকে লাভজনক করতে হবে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যার চাপ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণই এখন সবপক্ষের প্রধান তাগিদ। পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি ও জলবায়ু এ তাগিদকে অনেক বেশি উসকে দিচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের সংশয়ে ফেলছে বৈশ্বিক উষ্ণতাও যা সবচেয়ে ভয়ের কারণ। আমরা পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে ও উপরে দু’দিকেই বিপদের সামনে এগুচ্ছি। আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান বন্যার ঝুঁকিতে প্রথম, সুনামিতে তৃতীয় এবং ঘূর্ণিঝড়ে ষষ্ঠ। এটাই বাংলাদেশের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা আবাদি জমি নষ্ট করছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশ। স্বভাবতই এ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্যই দেশটিকে কৃষির দিকে বহুমুখী দৃষ্টিপাত করতে হবে। বিশ্বের কৃষি-উন্নত দেশগুলো তাদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তি, কলা-কৌশল এবং তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে এ দৌড়ে আমাদেরও সামিল হওয়া দরকার।
এটা স্বীকার করতে হবে যে, গ্রামীণ জীবনে উৎপাদন বৃদ্ধির এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এর ভেতর দিয়ে কিন্তু একটি পরিবর্তন সৃষ্টি হচ্ছে। এ পরিবর্তনটি আমাদের চোখেই পড়ছে না। পরিবর্তনটি হলো কৃষি বা চাষ-বাস থেকে কৃষক পরিবারগুলো সরে আসছেন। ভূমির মালিকানার পরিবর্তন হচ্ছে। ভূমির মালিক কৃষক তার জমি স্থানীয় দিনমজুরদের কাছে বিক্রি করে বা ইজারা দিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। কৃষি থেকে মুখ ফিরাচ্ছেন। তারা বাণিজ্য বা চাকরির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোগ বালাই ও লোকসানের ঝুঁকির কারণে কৃষিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। নতুন এক কৃষক শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, যারা ছিলেন ভূমিহীন দিন মজুর। তারা জমি থেকে বেশি লাভ তুলতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছেন। এতে জমি হারাচ্ছে উর্বরা শক্তি ও জৈব কণা। কৃষির অগ্রগতির পিছনে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ, বাইরে থেকে আনা ফসলের উন্নয়নশীল ও হাইব্রিড বীজের সহজলভ্যতা, বাণিজ্যিক কৃষিতে কৃষকের মনোনিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সবজি ও মাছ উৎপাদনে আমাদের সাফল্যের পেছনে ব্যক্তি উদ্যোগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সময়ের কৃষি উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক সাফল্যের স্বার্থে যে কোন নতুন উদ্যোগ নিতে আগ্রহী, তারা শুধু চান সরকারের নীতিগত সহায়তা। আমাদের প্রত্যাশা সরকার জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে কৃষকদের সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।

x