উঠতি টেন্ডারবাজরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিআরবি-পাহাড়তলী

ধরপাকড়ে সটকে পড়েছেন পুরনোরা

শুকলাল দাশ

রবিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
897

দেশব্যাপী টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের কারণে চট্টগ্রামে রেলের দাগী টেন্ডারবাজরা কৌশলে সটকে পড়েছেন। কিন্তু তাদের মদদপুষ্ট উঠতি টেন্ডারবাজরা নিয়ন্ত্রণ করছেন রেলের পূর্বাঞ্চলের সকল টেন্ডার কার্যক্রম। তাদের বাইরে গিয়ে কেউই টেন্ডারের সিডিউল ক্রয় ও ড্রপ করতে পারেন না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ও পাহাড়তলীতে গিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার রাতে কোতোয়ালী থানা পুলিশের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারকৃত নগরীর সিআরবির আলোচিত ডবল মার্ডারের আসামি ও তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাং লিডার ফরিদসহ অপর একটি গ্রুপ রেলের পুরো টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছো। তাদের কাজ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা-কে কোন টেন্ডারের সিডিউল কিনবে তারা সেটা নিয়ন্ত্রণ করভ। আর টেন্ডারের কমিশন ভাগ করে জায়গায়-জায়গায় পাঠিয়ে দেয়ার কাজটি করেন বাংলাদেশ রেলওয়ে কন্ট্রাক্টর এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের নতুন আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব নওফেল আহমেদ।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঢাকাসহ সারাদেশের টেন্ডারবাজদের ধরপাকড় শুরু হলে রাতারাতি ভেঙে দেয়া হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে কন্ট্রাক্টর এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের কমিটি। মাত্র ৬/৭ মাসে আগে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চট্টগ্রামে রেলওয়ে ঠিকাদার সমিতির নতুন নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচনে নতুনভাবে সভাপতি হয়েছিলেন কাউন্সিলর মো. হোসেন হিরণ। ধরপাকড়ের পরপরই কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুনভাবে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। যা অনেকটা পুরনো বোতলে নতুন মদের মতো। কমিটির আহবায়ক করা হয় ঠিকাদার আলী আশরাফ মজুমদারকে। সদস্য সচিব করা হয় নওফেল আহমদকে। আগে যারা পূর্বাঞ্চলের সকল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতো এখনো তাদের হয়ে এসোসিয়েশনের সদস্য সচিব নওফেল আহমেদ তার গ্রুপের লোকদের দিয়ে আগের মতোই নিয়ন্ত্রণ করছেন। কোন্‌ টেন্ডার কোন্‌ প্রতিষ্ঠান ড্রপ করবে সব তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন সিআরবি আর পাহাড়তলীতে। আর এর ভাগ চলে যায় আগের মতোই যার যার কাছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ে কন্ট্রাক্টর এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সদস্য সচিব মোহাম্মদ নওফেল আমহেদ আজাদীকে বলেন, নতুন আহবায়ক কমিটি করে আমাদেরকে (আলী আশরাফ মজুমদার ও আমাকে) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদেরকে শুধু পিকনিক করা এবং রুটিন দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দিয়েছে। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছি সেটা ঠিক নয়। পুলিশের হাতে যে ফরিদ গ্রেপ্তার হয়েছে-সে রেলওয়েতে ঠিকাদারি করেনি। সে আমাদের এখনকার কমিটিতে নেই। আগের কমিটিতে ফরিদ সহ-অর্থ সম্পাদক ছিলেন। এ ব্যাপারে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সবুক্তগীন আজাদীকে জানান, যারা ধরা পরেছে তারা হয়তো স্টোরসে টেন্ডার করতে পারে। আমার এখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করে কেউ কিছু করতে পারবে না।
এদিকে কোতোয়ালী থানা পুলিশের কাছে গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া শেখ ফরিদ আহমেদসহ তার গ্রুপের ছেলেদের প্রায় প্রতিদিনই সিআরবিতে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর ও প্রকৌশলী (ব্রিজ)-এর দপ্তরে দেখা যায়। সরেজমিনে গত এক সপ্তাহে তাদেরকে দলবলসহ সিআরবিতে দেখা গেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি টেন্ডারের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে তাদের নেতার (আত্মগোপনে থাকা) সাথে হোয়াটস্যাপে কথা বলিয়ে দিয়েছেন বলে ঐ প্রকৌশলীর দপ্তরের এক কর্মচারী জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সবুক্তগীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি আজাদীকে জানান, আমার দপ্তরে এরকম কিছু হচ্ছে না। অন্য কোন দপ্তরে হচ্ছেনা কিনা আমি জানি না। বাইরে কেউ কিছু করলে সেটা আমি বলতে পারবো না। নাকি এই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারী গ্রুপের সদস্যদের ভয়ে কিছু বলছেন না-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, কাল-পরশু সিআরবিতে আমার অফিসে আসেন-সাক্ষাতে কথা বলবো।
সমপ্রতি রেলের ঠিকাদারি কাজ ও বাসাবাড়ি দখলে রাখার বিষয়ে তদন্তে নেমেছে দুদক। প্রধান প্রকৌশল দপ্তরের দিদার নামে এক কর্মচারী এ চক্রটিকে সহায়তা করেন। দায়িত্বশীল প্রকৌশলীদের অজ্ঞাতসারে প্রকৌশল দপ্তরের ওই কর্মচারী যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করেন উঠতি ঠিকাদারদের। দীর্ঘ বছর ধরে দিদারই প্রকৌশল দপ্তরে কর্মরত আছেন।
রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের সাথে আলাপকালে জানা যায়, একসময় রেলে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের যারা নিয়ন্ত্রণ করতো তারা এখন আত্মগোপনে চলে গেছে। বর্তমানে রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন কমিটির হাতেই এখন ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। একসময় তাদের অনুসারী থাকা বেশ কয়েকজন উঠতি ঠিকাদার প্রকৌশল দপ্তরের কাজ করছেন। এর মধ্যে দাপটের সাথেই রেলে আধিপত্য বিস্তারিত করেছেন গ্রেপ্তার হওয়া শেখ ফরিদ আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠান আহমেদ এন্টারপ্রাইজ বেশ কিছু কাজ করেছে। একইভাবে এক ছাত্রলীগ নেতার প্রতিষ্ঠান গড়াই করপোরেশন বাসাবাড়ি সংস্কারসহ রেলের ঠিকাদারি করছেন। এছাড়ার মুন্না, জিতু ও তাদের অনুসারী হিসেবে রেলের ঠিকাদারি করছেন। এ ব্যাপারে গড়াই করপোরেশনের মালিক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রবিউল হাসান আজাদীকে জানান, আমি এখন আগের একটি কাজ করছি। গত ২ বছর ধরে আমি কাজ পাচ্ছি না। ক্যাপিটাল কম-তাছাড়া ওদের সাথে পেরে উঠছি না। এখন আমি বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থাকি।
এদিকে গতকাল কোতোয়ালী থানা পুলিশের হাতে অস্ত্র বানানোর সরঞ্জাম ও মাদকসহ ধরা পড়েছেন এ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য শেখ ফরিদ আহমদ। তার বিরুদ্ধে রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, হত্যা, কিশোর গ্যাং তৈরি, রেলের বাসাবাড়ি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শেখ ফরিদের বাসা নগরীর পলোগ্রাউন্ড মসজিদ এলাকায়। টাইগারপাস, পলোগ্রাউন্ড-সিআরবিসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত ফরিদ। রেলের টেন্ডারবাজি নিয়ে আলোচিত বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমনের অনুসারী হিসেবে এখন রেলে দাপিয়ে বেড়ান ফরিদ।

x