উচ্ছেদ চলে, দখলও থামে না এ যেন এক ‘ভানুমতির খেল’

বিভিন্ন সেবা সংস্থার হাজার হাজার একর জায়গা বেহাত

হাসান আকবর

সোমবার , ৭ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
442

উচ্ছেদ হয়, ঘরবাড়িও ভেঙে দেয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে আবারো দখল হয়। কখনো পুরনোরা দখল করেন, কখনো-বা নতুন কেউ এসে দখলে নেন। বছরের পর বছর ধরে চলছে দখল-বেদখলের এই ‘ভানুমতির খেল’। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযানের পর জায়গা ঘিরে সংশ্লিষ্ট সংস্থা উন্নয়ন কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই চলে দখল-বেদখলের এই ‘লুকোচুরি খেলা’। নগরী ও আশপাশের এলাকায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ভূমি নিয়ে বিরাজ করছে এই অবস্থা।
চট্টগ্রামে ভূমিখেকোরা খাল, নদী নালা থেকে পাহাড় পর্যন্ত সবই দখল করেছে। দফায় দফায় দখলে বিপর্যস্ত পরিবেশ। বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ, বন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং গণপূর্ত বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ভূমি উদ্ধারে বিভিন্ন সময় অভিযান চললেও থেমে নেই এই দখলদারিত্ব।
নগরী ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভূমির পরিমাণ সর্বাধিক। নগরীতে রেলওয়ের ভূমির পরিমাণ তিন হাজার একরেরও বেশি। আর বন্দর কর্তৃপক্ষের ভূমির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার একর। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, বন বিভাগ এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেরও বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। এসব সম্পত্তির মধ্যে অনেক জায়গা বছরের পর বছর ধরে ‘বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠি’ দখল করে রেখেছে।
এর মধ্যে ঘরবাড়ি, দোকান কিংবা গোডাউন বানিয়ে বন্দরের ভূমি দখল করা হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের অফিস বানিয়েও দখল করা হয়েছে এসব ভূমি। কিছু ভূমি ইজারা নিয়ে আশপাশের ভূমিও দখল করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থার কোটি কোটি টাকার ভূমি নিয়ে হরিলুট চালিয়েছেন।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তারা বলেছেন, বন্দরের ভূমি এখন আর আগের মতো দখলের সুযোগ নেই। আগে যেমন রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে বন্দরের জায়গা দখল করে নেয়া হতো এখন আর সেই সুযোগ নেই। বন্দরের জায়গাগুলো কর্তৃপক্ষ ঘিরে ফেলছে। তিনি বলেন, লালদিয়া চর ছাড়া আমাদের আর উল্লেখ করার মতো কোনো অবৈধ দখলদার নেই। লালদিয়া চরের ৫০ একর জায়গার মধ্যে ২২ একর উদ্ধার করা হয়েছে। ওইটুকু আমরা বাউন্ডারি ওয়ালে ঘিরে ফেলছি। বাকি ২৮ একর উদ্ধারের ব্যাপারেও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে এগুচ্ছি। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বেশ কিছু জায়গা বিচ্ছিন্নভাবে অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে বলে স্বীকার করে ওই কর্মকর্তা বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এটি রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে চলে। কিন্তু উচ্ছেদের দিন কয়েকের মধ্যে আবারো দখল হয়ে যায়। আবারো রুটিন করে অভিযান চালাতে হয়।
চট্টগ্রামে ভূমি নিয়ে সবচেয়ে বেহাল দশা বাংলাদেশ রেলওয়ের। সংস্থাটির শত শত কোটি টাকার ভূমি অবৈধ দখলে। নানা পন্থায় অবৈধ দখলে নেয়া হয়েছে এসব ভূমি। রেলওয়ে এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রভাবশালীদের অনেকে অবৈধ এই দখলদারিত্বে জড়িত। ভূমি ইজারা নিয়ে প্রাথমিক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে ইজারা মূল্য পরিশোধ না করা কিংবা ইজারা নবায়ন না করে ভূমি দখল করে রাখার মতো ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করা হয়। উচ্ছেদও হয়। আবারো দখল হয়ে যায়।
রেলওয়ের অবৈধ দখলদারিত্ব প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, নানা পন্থায় রেলের জায়গা বেহাত হয়েছে। কোনো ধরনের আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে ভূমি ইজারা দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার জোরে সম্পত্তি ইজারা নেয়ার বহু ঘটনাও ঘটেছে। আবার নানা ধরনের মিথ্যা এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ভূমি হাতিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের শত শত কোটি টাকা দামের জমি দাগী ভূমিদস্যুদের কব্জায় চলে গেছে। এদের কেউ মার্কেট করেছে। কেউ গুদাম করেছে। কেউবা দোকানপাট করে বিক্রি করে দিয়েছে। রেলের জমিতে অবৈধ বস্তি তুলে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে প্রভাবশালীদের অনেকেই। এসব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হলেও তা আবারো বেহাত হয়ে যাচ্ছে।
উদাহারণ দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলোনিতে গত বৃহস্পতিবার অভিযান চালানো হয়েছে। ভেঙেচুরে দেয়া হয়েছে অবৈধ ঘর। কিন্তু গতকাল নতুন করে ওই স্থানে আবারো ঘর তৈরি করতে দেখা গেছে। এছাড়া দিন কয়েক আগে খুলশি রেল লাইনের পাশে গড়ে তোলা একটি অবৈধ মার্কেট গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আবারো তা দখল করে নতুন করে মার্কেট বানানো হয়েছে। জাকির হোসেন রোডে খুলশি রেল ক্রসিংয়ের আশপাশে শত শত কোটি টাকার ভূমি নানা পন্থায় বেহাত হয়েছে। মার্কেট হয়েছে। বাসা বাড়ি হয়েছে। এসব অবৈধ ঘর নানা জনের কাছে বিক্রিও করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে দখল আর পুনর্দখলের ঘটনা ঘটছে রেলের জমিতে।
শুধু বন্দর বা রেলই নয়, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার শত শত কোটি টাকার ভূমি অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার শত শত কোটি টাকার ভূমি নিয়ে হরিলুট চলছে। চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের বহু সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে। এসব ভূমির অনেকগুলোরই কাগজপত্র অবৈধ দখলদারদের নামে তৈরি করা হয়েছে। ভূমি অফিসগুলো থেকে যার তার নামে সরকারি ভূমি রেকর্ড করার অসংখ্য নজির ধরা পড়েছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের বেশ কিছু জমি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো বহু ভূমি বেহাত হয়ে রয়েছে।
বেহাত হওয়া এসব সম্পত্তি উদ্ধারে বিভিন্ন সময় অভিযান চালানো হলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোকে সবকিছু থমকে গেছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। এ ব্যাপারে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে বেহাত ভূমির সবচেয়ে বেশি রেলওয়ের। খোদ সিআরবি ও রেলওয়ে স্টেশনকে ঘিরে অবৈধ দখলদারের যে অপতৎপরতা, তা অবিশ্বাস্য। রেলওয়ের এসব ভূমি উদ্ধারে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া দরকার বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

x