উচ্ছেদে বারবার বাধা

আদালত থেকে আদালতে ঘুরপাক ।। কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা

সবুর শুভ

রবিবার , ২৩ জুন, ২০১৯ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
383

কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চলছে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে! উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত। আর নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত। সবখানে ঘুরপাক খাচ্ছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারটি। মাঝখানে শুধু ক্ষণিকের আলোর রেখা দেখা দিয়েছিল পাঁচদিনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার মধ্যদিয়ে। এরপর নানা মারপ্যাঁচেই বন্দি এ উচ্ছেদ অভিযান। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দেয়া এক আদেশের নকল কপি ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে আজকালের মধ্যেই। এরপর আবারো উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে জনস্বার্থে রিটকারী এডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
প্রসঙ্গত: ২০১০ সালের ৮ জুলাই জনস্বার্থে দায়ের করা সেই রিট মামলার শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট উভয় তীরের স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ দিয়েছিলেন। এ আদেশে জেলা প্রশাসককে সংশ্লিষ্ট এলাকা জরিপ করে আর এস ও বিএস শিট অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনার তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালের জুনে এই তালিকা আদালতে জমা দেয়ার পর শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়। শুনানির পর আদালত আর এস শিট অনুযায়ী উচ্ছেদের রায় দেন ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট। এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত বছরের ২৫ অক্টোবর প্রথম চিঠি দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। এরপর আরো কয়েক দফায় চিঠি দেয়া হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভূমিমন্ত্রী কর্ণফুলীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন। উচ্ছেদ কার্যক্রমের খরচ বহন করার ঘোষণা দেয়ার পর জেলা প্রশাসনের তরফে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করার সিদ্ধান্ত আসে। সেই সিদ্ধান্ত মাঠেও গড়ায় মাত্র পাঁচদিনের জন্য। এরপর থমকে দাঁড়ায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম।
নগরের নেভাল অ্যাকাডেমি সংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে মোহরা এলাকা পর্যন্ত অংশে নদীর দুই তীরে দুই হাজারের ২১২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসন। প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে দাখিল করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে ওঠা স্থাপনা সরাতে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দেন। এক্ষেত্রে জনগুরুত্ব সম্পন্ন ৬টি স্থাপনাকে উচ্ছেদের আওতার বাইরে রাখার আদেশও হয় আদালত থেকে।
দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়। চলে ৫দিন। ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর আর শুরু করা যায়নি অভিযান। আইনগত ঝামেলা বাড়তে থাকে দিনকে দিন। আপীল বিভাগের রায়ের পর আইনী ঝামেলা শেষ হওয়ার আশা করা হলেও এরই মধ্যে নিম্ন আদালতের তরফে আসে আরেক আদেশ। এ আদেশের পর আবারও থমকে দাঁড়াল উচ্ছেদ কার্যক্রম।
চট্টগ্রামের ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে (আপীল বিভাগ) কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের করা আপীল খারিজ হওয়ার পর চট্টগ্রামের এ আদালত থেকে আসে স্থিতাবস্থার আদেশ ! কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে এ স্থিতাবস্থা আসার পর এটাকে কেন্দ্র করে আবারও কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম থমকে দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম আদালতের বিচারক গত ২৫ এপ্রিল এ স্থিতাবস্থা দিয়ে বারণ করেছেন সংশ্লিষ্ট দুইপক্ষকে।
এ মামলায় সরকার পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী চট্টগ্রামের জিপি এডভোকেট নাজমুল আহসান খান আলমগীর বলেন, একই বিষয়, একই সিডিউলের জমি নিয়ে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের করা আপীল আবেদন খারিজ করে দেয়া সংক্রান্ত আপীল বিভাগের আদেশসহ বিভিন্ন কাগজপত্র আমরা আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছি। এ নিয়ে বিস্তারিত শুনানীও অনুষ্ঠিত হয়। পরে ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক কর্ণফুলী শিপ বির্ল্ডাসের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। তিনি আরো জানান, এ আদেশের কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ইতোমধ্যে। এ অবস্থার মধ্যেও থেমে নেই কর্ণফুলীর বুক ক্ষতবিক্ষত করে ভরাট। যুগযুগ ধরে অর্থনীতির সৌধ রচনা করে আসা এ কর্ণফুলীর তীর অবৈধ স্থাপনামুক্ত হবে তো? এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট সকলের।
উচ্ছেদ থমকে যাওয়া নিয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানান, কর্ণফুলী নিরাপদ হলে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশও নিরাপদ হবে। তাই যেকোন মূল্যে কর্ণফুলীকে অবৈধ স্থাপনামুক্ত করতে হবে। তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম আদালতে আদেশের আগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত আপীল বিভাগের বেঞ্চে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের করা আপীল খারিজ হয়। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম আদালতে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে এ মামলা (অপর মোকাদ্দমা নং-১৫৪/১৯) দায়েরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা উচ্ছেদ কিংবা ভাঙ্গার বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন (আলাদা দরখাস্তের মাধ্যমে) করা হয়। ‘কর্ণফুলী কোল্ড স্টোরেজের’ পাঁচতলা ভবন (লাল চিহ্নিত অংশ) উচ্ছেদেও একইসাথে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। এ মামলায় বিবাদী করা হয়েছিল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সহকারি কমিশনার সদরকে (ভূমি)। মামলার বাদী হচ্ছেন, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার (আরজি অনুযায়ী) মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। এরই প্রেক্ষিতে বিবাদীদের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দ্বারা কেন বারণ করা হবে না তা নোটিশ প্রাপ্তির ২৪ ঘন্টার মধ্যে কারন দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালতের বিচারক। এর প্রেক্ষিতে সরকার পক্ষে চট্টগ্রামের জিপি এডভোকেট নাজমুল আহসান খান আলমগীর উল্লেখিত আদালতে উপস্থিত হয়ে সরকারের জবাব উপস্থাপন করেন। শুনানী শেষে উভয়পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ হয় ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তরফে।
আদালত, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ চট্টগ্রাম আদালতের আদেশের কপি ঢাকায় হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী এডভোকেট মনজিল মোরসেদ ও এটর্নী জেনারেলের অফিসে পাঠানোর কথা জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন।
তবে আদেশের নকল ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র না পাঠানোয় উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন এডভোটেক মনজিল মোরসেদ। তিনি জানান, চট্টগ্রাম আদালতের আদেশের নকল কপি, মামলার এজাহার ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র পাঠানোর জন্য আমি জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি। এগুলো হাতে পাওয়া মাত্রই উচ্চ আদালতে যাব। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন জানান, আদেশের নকল কপিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঢাকায় পাঠাচ্ছি। গত ৯ বছর ধরে হাইকোর্ট, আপীল বিভাগ ও নিম্ম আদালতে (চট্টগ্রাম) শুধু চক্কর কাটছে কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ পরিচালনার বিষয়টি।

x