ঈদোৎসবের সকল আয়োজন স্বমহিমায় উদযাপিত হোক

ফেরদৌস আরা আলীম

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:২১ পূর্বাহ্ণ
73

ঈদ মুবারক প্রিয় পাঠক, সামনে ঈদ। ঈদের দিনটি কেমন হবেণ্ড রোদেলা না মেঘলা, জানি না। আজ ১১ জুন। সোমবার। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ; ঝড়ো বাতাসে জলভরা মেঘেদের গজেন্দ্রগমন আনাগোনা। জৈষ্ঠ্যের হাতে এখনও দুটো দিন অথচ গত দু’দিন ধরে ভরা বর্ষার দাপটে শহর ভাসছে বৃষ্টি। নিম্ন চাপোত্থিত সৃষ্টি ছাড়া ঝড় বৃষ্টি যাদের যখন তখন নাকাল করে তারা তো বটেই, সামনে ঈদ এমন বৃষ্টি ঈদ বিলাসীদেরও দুর্ভাবনার কারণ হচ্ছে বৈ কি! রোজাদারের কিন্তু এতেই স্বস্তি। হাঁসফাঁস প্রহর নেই, গলা শুকানো তেষ্টা নেই, জবুথবু ঘাম নেই। মেঘে মেঘে বেলা গেলে ইফতারের সময়টা ‘হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন’ বলেই মনে হয়। ঈদ নিয়ে লেখার কথা কিন্তু কি লিখছি? কি করবো, নাগরিক ফ্ল্যাট জীবন; কাঠের দু’পাল্লার সেই জানালা কোথায় যে দুদিক থেকে এঁটে বসিয়ে দেবো সপাটে? বদ্ধ শার্শির বাইরে নীপবনের মাতামাতি মেঘ বৃষ্টি ঝড়ের সঙ্গে। সাঁওতাল গড়নের আঁটো বকুলবীথিরও কেমন এলোমেলো দশা! তা হোক ঈদে ফিরতেই হবে।

রোজার ঈদের সঙ্গে রোজার নিগূঢ় একটা সম্বন্ধ নিশ্চয়ই আছে। এ ঈদ রোজার উপহার। শাওয়ালের নতুন চাঁদ তার খবর নিয়ে আসে। একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল। স্কচদের কিপটেপনার গল্প। ঘুম ভেঙে স্বামী দেখেন পাশে স্ত্রীর দেহে প্রাণের লক্ষণ নেই। তিনি মারা গেছেন। ভাবছেন কর্তা, এখন তাঁর প্রথম কাজটি কি? তিনি ছুটলেন কিচেনে। একটা ডিম সরিয়ে রাখতে হবে। দুটো ডিমের আর প্রয়োজন নেই। শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে ঈদের আনন্দের বার্তাবহ হয়ে কে যেন বলে যায়। আজ আর তারাবিহ নেই। (নিছক কৌতুক; ধর্মপ্রাণ কেউ যেন আঘাত না পান।) শেষ রাতে থাকছে না সাহরির আয়োজন অর্থাৎ ঘুমটা নির্বিঘ্ন হলো।

আমাদের ঈদুল ফিতর যেমন ৩০ দিনের ধারাবাহিকতার অংশ ঠিক সেভাবেই চলে আমাদের ঈদের প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতির একটা অংশ জুড়ে থাকে ধর্ম নির্দেশিত দানধ্যান ও ইবাদত। অন্য অংশে থাকে আনন্দআয়োজন। থাকে পরিবারের নানা বয়সিদের নানা ধরনের পোশাকআশাক এবং বিশেষ বিশেষ রান্নার প্রস্তুতি। আমাদের শৈশবে এমন প্রস্তুতিতে পোশাক ও দর্জি বাড়ির কাজ ছিল বাবাভাইদের। মায়েরা খাবার দাবারের আয়োজনে যথার্থই তেতে পুড়ে দিন কাটাতেন। রোজা এলে সেমুইএর মেশিন (হস্তচালিত) চলতো ঘরে ঘরে। প্রায় সব ঘর তখন অধিক সন্তানের; সে যন্ত্রের হাতল ঘোরানো নিয়ে ভাইবোনদের সে কি কাড়াকাড়ি আনন্দ! মাবোনেরা মাখা ময়দা ঠেসে পুরে জল দিতে থাকেন যন্ত্রের শরীরে নির্ধারিত পথে আর হাতল ঘোরানোর চাপে যন্ত্রদেহের লৌহদণ্ডটির প্যাঁচে প্যাঁচে ঘুরে ঘুরে নিচে তারের জালির পথ বেয়ে সরল রেখায় নামতো সেমাই। টানা লম্বা সে সেমাই রোদে শুকিয়ে টিনে ভরা হতো। অন্যদিকে ঘরে ঘরে ডালায় ডালায় নীরবে, নিঃশব্দে হাতের মুঠোয় রাখা ময়দা থেকে তর্জনি ও বৃদ্ধার শব্দবিহীন তুড়িতে ঝরে পড়তো চুটকি সেমাই, বৃষ্টির মতো। রোদে শুকানোর কাজটা সব ধরনের সেমাইয়ের জন্য প্রযোজ্য ছিল। সংরক্ষণের প্রয়োজনে আমাদের মাখালারা রোদে পুড়তেন রোজা রেখেই। অন্যদিকে ফ্রিজ এবং গ্যাসবিহীন জীবনে আগুনের তাপও হাসিমুখে অগ্রাহ্য করতেন তাঁরা। রুটির চাকতির ওপর কাই করা চালের আটায় হাতের তালুর নরম অংশটির আলতো গতিময় চাপে তৈরি হতো হাত সেঁউই। চাঁদ রাতে এর একটা টাটকা সংস্করণও তৈরি হতো যার জন্য রোদ নিষ্প্রয়োজন ছিল। ময়দা এবং চালের গুঁড়োয় তৈরি সেমাইএ রান্নার উপকরণ ও ধরণ বৈচিত্র্যে স্বাদ বদলের প্রয়াস ছিল। খাঁটি ঘন দুধে, তাজা নারকেল কোরায় শুকনো ফল বাদাম এবং গরম মসলার সান্দ্র সুবাসের সেদিনের আয়োজনের ছিঁটেফোঁটাও আজ আর নেই বললেই চলে।

আজ বাজার জুড়ে নানা ধরনের সেমাই পাচ্ছি আমরা। বগুড়ার বিশেষ ‘বুড়ার দাড়ি সেমাই’টি ভিন্ন আর সবই বলতে গেলে ভাজা সেমাই। রান্নায় বিশেষ বেগ পেতে হয় না। আমার মায়ের দুটো কাজ আমি এখনও ধরে রেখেছি ঈদের দিনের জন্য। ভোরে গরম মসলা সেদ্ধ পানি তৈরি করা এবং সরু মোটা দুই ধরনের নারকেল কুড়িয়ে রাখা। বাদাম, বেরেশতা এবং বাটা এবং গুঁড়ো মসলার কাজ আমরা অনেকে রোজার মধ্যেই সেরে রাখি একটু একটু করে। গরুর মাংস এবং মুরগির মাংসের কিমায় কোপ্তা গড়ে মোটামুটি ভেজে তুলে রাখা অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। সেই সঙ্গে সংরক্ষিত মটরশুঁটি যৎসামান্য সেদ্ধ ছোলা এবং গাজর দিয়ে তৈরি কোপ্তা মটর পোলাও এর মতো আনন্দদায়ক রান্না আর নেই। মুরগির রোস্ট (আস্ত কদ্যপি নয়) খাসির রেজালা এবং গরুর ঝাল তো রুচিমতো হতেই পারে।

চটপটি, জর্দ্দা (সেমাই এবং চাল দুটোরই) এবং ফিরনি পায়েস, ফ্রুটস কাস্টার্ড এখনও পছন্দ অনেকের। আজকের তরুণী বা মধ্য বয়সি মায়েরা বেক্‌ড্‌ আইটেম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন বেশি কারণ সন্তানদের পছন্দ এখন ওইখানে, ওই পথে। সেক্ষেত্রে থাকে পিৎজা থেকে পাই। চিকেনের নানা পদ। একটা কথা খুব মনে হয়, বলেই ফেলি। ঈদ ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী উৎসব; সন্তানদের গড়ে তোলার সময়টাতে এমন দিনের খাবারদাবার কি পোশাক আশাকের একটা স্থির ধারণায় বড় করা সম্ভব হলে অনেক বিপত্তি, বিরক্তি ও অশান্তি এড়ানো যায়।

বিশেষ করে কিশোরীতরুণীদের পোশাকের ক্ষেত্রে ইদানীং যা দেখছি তাতে খুব হতাশ বোধ করি। ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক মনে যেন ভারসাম্যহীন, সামঞ্জস্যহীন পোশাক। জামার হয় সামনের না হয় পেছনের পাল্লা নেই। অকারণে কাপড় কেটে নিয়ে হৃদয়াকৃতি ফোটানো বাহু মূল দেখানো পোশাক, পিঠ নেই হয়ে যাওয়া ব্লাউজ, কাঁটাতারে ঝাঁপ দিয়ে উঠে আসা ছেড়াখোঁড়া প্যান্ট, সেমিজ না পরা পাতলা জামাএসব নিয়ে ফ্যাশন শো হতে পারে, তার নানা রকম উদ্দেশ্যও (কর্পোরেট বা জিডিটাল) থাকতে পারে কিন্তু ঈদের দিনে এসব পোশাক; আমাদের বোধ হয় মরে যাওয়াই উচিত।

ঈদ একে ধর্মীয় তার ঘরোয়া উৎসব। প্রাণে প্রাণে মিলনের উৎসব। সেখানে জরিজহরতে, মুক্তোচুমকিতে, লেসঝালরে, সোনার সুতোয় শাড়ি লেহেঙ্গা দেহে মনে কোন আনন্দ নিয়ে আসে কে জানে! বিকিকিনির রাজ্যে, বিজ্ঞাপনের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া বা বলি হওয়ার নাম কি ঈদোৎসব? আবার চাহিদা তো শুধু একদিনের নয়। দিনের ৪ প্রহরের জন্য কমপক্ষে ৪ ধরনের পোশাকসেই সঙ্গে বাড়তি আরো দুদিনের হিসেব কত পোশাক চাই ঈদের জন্য? দেশটা তো শুধু ঋণ খেলাপি, মাদক ব্যবসায়ী আর নানা পথে অঢেল আয় করা বিত্তশালীদের নয়!

ঈদ মানে আনন্দ। এমন একটা স্লোগানপ্রসূত (অথচ আরবি শব্দ ঈদের আক্ষরিক অর্থ তা নয়) মাথা খারাপ করে দেওয়া প্রজন্মের চাহিদার কাছে হাজার হাজার মাবাবা অক্ষমতার কারাগারে বন্দী। এ থেকে মুক্তির পথ কোথায়?

এই সেদিনও আবরণে আভরণে, মেহেদিতে বা চুলচোখনখের সাজের সবটুকুই ছিল ঘরোয়া আয়োজন। আজ বিজ্ঞাপনের তাড়ায় ঈদের আগের চারচারটি দিন ধরে চলছে তরুণীদের ত্বকচুলচোখের পরিচর্যা। চলবে পার্লারে পার্লারে রূপ চর্চা। আমাদের সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অঢেল ঝণৎকারের খেলা আমরাও দেখেছি। কিন্তু মধ্যবিত্ত চলেছে দাপটে, নিজেদের মতো, সমুন্নত মস্তকে। আজ বিজাতীয় উৎসবের আগাছায় ভরে গেছে স্বদেশ। সেসব উদযাপনের ঘটা ও ছটার কুপ্রভাব পড়ছে আমাদের পবিত্র উৎসবে। সংস্কৃতিবিবর্জিত, শিক্ষা ও সুরুচিহীন, মূল্যবোধরিক্ত, মানবতাবর্জিত একটা নপুংশক শ্রেণির দাপটে আমাদের সুকুমার, সুকোমল কিশোরকিশোরী ও তরুণতরুণীরা দিশাহারা। অভিভাবক অসহায়, নিরুপায়।

ঈদঅর্থনীতির দোহাই দেন অনেকে। ঈদঅর্থনীতি কি, এতে লাভবান কারা তার অনুধাবন চোখ বন্ধ করে হবার নয়। এদেশ যদি তার লক্ষ লক্ষ কোটিপতির জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদার আসন পেয়ে থাকে তবে এমন একটা উৎসব উপলক্ষে তাঁদের কল্যাণে লক্ষ লক্ষ হতদরিদ্র একটা ঈদের দিন অন্তত পেতে পারে। কিন্তু আমরা জানি এঁদের দানের যজ্ঞে মানবতা পদপিষ্ট হয়। ঈদঅর্থনীতির চাকায় কারা পিষ্ট হয়, তাও জানতে হবে।

একটা কথা বারবার বলেছি, বলছি হয়তো বাড়াবাড়ি রকম বলছি তবু বলব ঈদ মুসলমানদের পবিত্র উৎসব। আমার ধর্ম কিন্তু আমার ভাষা বা সংস্কৃতি কেড়ে নেয় নি। মানি যে দিন বদল স্বাভাবিক। কিন্তু স্বদেশে, স্বজাতি ও সম্প্রদায়কে মাথায় রাখতে হবে সমান গুরুত্বে। একটা দিনের জন্য আমাদের আপাদমস্তক বদলে যেতে হবে কেন? কেন দিশাহারার মতো পথে পথে ঘুরতে হবে? আমরা কি আমাদের সন্তানদের, স্বজনআপনজনদের নিয়ে অকৃত্রিম, শান্ত, সমাহিত, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, গভীর একটা ঈদ পালন করতে পারি না?

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ

x