ঈদুল ফিতর : মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব

ড. আ. ম. কাজী মুহাম্মদ হারুন উর রশীদ

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ
169

আমরা দীর্ঘ একমাস রোজা পালনের পর আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এ ঈদ মুসলিম মননে সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব। আমাদের মুসলিমগণের বছরে দু’টি উৎসব রয়েছে। একটি হচ্ছে ১ শাওয়াল তারিখে ঈদুল ফিতর এবং অপরটি হচ্ছে ১০ জিলহজ্ব দিবসে ঈদুল আজহা। মুসলিম মিল্লাতের কাছে এ উৎসব প্রতিবছর আনন্দের দিন হিসেবে আসে।

ঈদ আরবি শব্দ। এর অর্থ খুশি। আর ফিতর মানে ভঙ্গ করা। অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দারা তাঁর নির্দেশ মেনে চলে চরম পরীক্ষায় লিপ্ত ছিলো একমাস। তারা সাওম পালন, তারাবিহ আদায়, ইতিকাফে অংশগ্রহণ, ইবাদত থেকে অব্যাহতির আনন্দই হলো ঈদুল ফিতরের আনন্দ। ঈদুল ফিতরের এ পবিত্র দিনটি একমাস সিয়াম সাধনার পর এসে থাকে।

ঈদুল ফিতর ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ী ধর্মীয় দায়িত্বসমূহ পালন করার মধ্যেই প্রকৃত শান্তি নিহিত রয়েছে। ঈদুল ফিতর মুসলিমদের ব্যবহারিকভাবে সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য এবং ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দেয়। এভাবে ঈদুল ফিতরের উৎসব ইসলামি জীবন পদ্ধতির ভিত্তিতে একটি বিশ্বজনীন নীতির উপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। এ আনন্দের দিনে প্রতিটি মুসলিম তার সামাজিক অবস্থান ভুলে যায় এবং ভ্রাতৃত্ববোধের পর তৃপ্তিতে একে অপরকে আলিঙ্গন করে। পার্থক্য থাকে না ধনীদরিদ্র, শিক্ষিতঅশিক্ষিত, সবলদুর্বল, বংশ গৌরব, কৌলিন্য ও মানমর্যাদা। ঈদগাহে ময়দানে সারিবদ্ধভাবে জামাতের সঙ্গে ঈদুুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই সাম্যের অতুলনীয় বাস্তব দৃশ্যের চিত্র ফুঠে ওঠে।

এ ঈদুল ফিতরের আগমনের পেছনে নাতিদীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। তাহলো হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) হিজরতের পর দেখতে পেলেন মদীনার অধিবাসীরা বছরে দু’টি আনন্দ উৎসব পালন করছে। তখন রাসুল (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনতোমাদের এ দু’টি দিন কিসের? তখন তারা বললোআমরা জাহেলী যুগেও এ দিনেও খেলাধুলা ও রং তামাশা করতাম। তখন তাদের এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেনআল্লাহতায়ালা তোমাদের এ দু’টি দিবসের বিনিময়ে আরো উত্তম দু’টি আনন্দপূর্ণ দিবস দান করেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো ঈদুল আজহা এবং অপরটি হলো ঈদুল ফিতর।– (আবু দাঊদ)

এ ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের কাছে নেমে আসে এক অনুপম ও অনাবিল আনন্দের জোয়ারধারা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেছেনঈদুল ফিতরের রাতে ফিরিশতাদের মাঝে অনন্দ ও খুশির হিল্লোল বইতে থাকে। এক পর্যায়ে আল্লাহপাক ফিরিশতাদের জিজ্ঞেস করেনযারা আমার কাজ করেছে তাদের কি পুরষ্কার দেয়া যেতে পারে? তখন ফেরেশতারা বলেনওহে আল্লাহতায়ালা! তাদেরকে পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করছি। তখন আল্লাহতায়ালা বলেনতোমরা সাক্ষী থেকো, আমি সকলকে ক্ষমা করে দিলাম।

সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে ঈদের ফজিলত সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। তাই এ খুশি ও আনন্দের রাতে ইবাদত ও নফল নামায আদায় করা খুবই প্রয়োজন। সুতরাং যে ব্যক্তি এ ঈদের রাতে ইবাদত করবে তার অন্তরকে আল্লাহতায়ালা রহমত ও বরকতের বারিধারা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেবেন।

এ উৎসবের দিন মুসলিম সমাজে সার্বজনীন সালাত ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ নামাজ ওয়াজিব। এতে শুধু দু’রাকাত সালাতের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অন্যান্য নামাজ থেকে এ নামাজের আদায় পদ্ধতি ভিন্ন ও পৃথক। এ নামাজের প্রথম রাকাতে তকবীরে তাহরীমার পর সুবাহানাকা পাঠ করে তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর দিতে হয়। তারপর সুরা ও কিরাত পাঠ করে রুকু ও সিজদা আদায় করে দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়াতে হয়। এ দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ও কিরাত পাঠ করে অতিরিক্ত তিনটি তাকবীর দিতে হয় এবং এর পরই তাকবীর বলে রুকুতে যেতে হয়। তারপর সিজদা শেষে নামাজ যথারীতি শেষ করতে হয়। উল্লেখ্য যে, ঈদের নামাজে এ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরে হাত ছেড়ে দিতে হয় এবং সর্বশেষ তাকবীরের পর যথারীতি হাত বাঁধতে হয়। আর দ্বিতীয় রাকাতে অতিরিক্ত তিন তাকবীর আদায় করার পর হাত না বেঁধে রুকুতে তাকবীর বলে যেতে হয়। এ নামাজের পর ইমাম সাহেব দু’টি খুৎবা দেন। সালাতুল ঈদের আগে কোনো আজান বা ইকামত নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলে উন্মুক্ত স্থানে ঈদগাহে এ নামাজ পড়া উত্তম। সূর্যোদয় ও সূর্য মধ্যগগণে হওয়ার মধ্যবর্তীকালীন এ নামাজের সময়।

ঈদের দিনের আগেই সাদাকাতুল ফিতরা আদায় না করলে ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। এ সাদকা দুঃস্থগণকে ঈদ উৎসব যোগদানের সুযোগ দেয় এবং তা সিয়ামকে ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে পবিত্র করে। সাদাকাতুল ফিতরকে সাধারণত ‘ফিতরা’ বলা হয়। এটা প্রকৃতপক্ষে রমজান মাসেরই নির্ধারিত সদকা। রমজান মাস শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে মাথাপিছু যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সাহায্য গবিরমিসকিনকে সাদকা করা হয় তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলে। রমজানে পুরো একটি মাস মু’মিনগণ রোজা পালন করেন এবং ইবাদতবন্দেগিতে মশগুল থাকেন। রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার ফরজ ইবাদতগুলো যথাসাধ্য আদায় করার চেষ্টা করেন। তারপরও এ দায়িত্বগুলো পালনের ক্ষেত্রে অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা এ ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণের জন্যে শরিয়তে রমজানের শেষে সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন।

সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা রোজার মধ্যে ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণও হবে এবং গরিবমিসকিন মুসলিমগণ খাওয়াপরার জিনিসপত্র সংগ্রহ করে অন্যান্য মুসলিমদের সঙ্গে ঈদের জামাতে শরিক হতে পারবে। এর মাধ্যমে ধনীগরিবদের ব্যবধান কমে আসে এবং সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেনসাদাকাতুল ফিতর দ্বারা রোজা পালনের সকল ভুলত্রুটি দূরীভূত হয় এবং গরিবদের পানাহারের ব্যবস্থা হয়। -(আবু দাউদ)। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসঊদ ও হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা.) বলেছেনরাসুল (সা.) সাদকাতুল ফিতর এ জন্যে নির্ধারণ করেছেন যাতে ভুলক্রমে অনর্থক কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে রোজা পবিত্র হয় এবং গবিরমিসকিনদের খাওয়াপরার ব্যবস্থা হয়।

যে ব্যক্তির কাছে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ছাড়া সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সমমূল্যের সম্পদ থাকে তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এ সব সম্পদ বা অর্থ যদি কারও হাতে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময়ও আসে তাকেও ফিতরা দিতে হয়। ছোটোবড়ো, স্ত্রীপুরুষ প্রত্যেকের পক্ষে এ সাদকা আদায় করা ওয়াজিব। নিজের ও নাবালেগ সন্তানাদির পক্ষ থেকেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। গৃহকর্তা এবং তার পোষ্যদের সংখ্যাকে হিসাব করে প্রতিজনের বিপরীতে নির্ধারিত মূল্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। প্রধান খাদ্য গম, আটা, খেজুর প্রভৃতি এক ‘সা’ পরিমাণ অর্থাৎ, ২ সের ১২ ছাঁক অথবা এর স্থানীয় বাজারমূল্যের সমান ফিতরা দিতে হবে। এবার ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরা জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৩১০ টাকা নির্ধারণ করেছেন।

এ ঈদের দিনে কিছু কাজ করা মুস্তাহাব। সেগুলো হচ্ছে. ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে আসা। ২. বাড়ি থেকে বের হয়ে আস্তে আস্তে তাকবীর পাঠরত অবস্থায় ঈদগাহে যাওয়া। ৩. নিম্নদৃষ্টিতে ও পদব্রজে ঈদগাহে যাওয়া। ৪. শিগগিরই ঈদগাহে গমন করা। ৫. গোসল করা। ৬. দানখায়রাত করা। ৭. উত্তম ও পরিষ্কার জামাকাপড় পরা। ৮. সুগন্ধী (আতর) ব্যবহার করা। ৯. মহল্লায় ফজরের নামাজ আদায় করা। ১০. লোকজনের সাতে মোসাফাহা করা। ১১. মিসওয়াক করা। ১২. উন্মুক্ত আকাশের নিচে খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করা।

ঈদের নামাজের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন-‘যারা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্যে দুই ঈদের নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করবে আল্লাহতায়ালা তাদের অশেষ পুরষ্কার দান করবেন।’ রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহের দিকে বের হতেন এবং প্রথমে নামাজ আদায় করতেন। তারপর নামাজ শেষ করে মুসল্লিগণের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন। আর মুসল্লিগণ তাদের নামাজের কাতারে বসে থাকতেন। তিনি তাদের ওয়াজনসিহত করতেন। ভালো কাজের আদেশ দিতেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।

বিশ্বের প্রায় একশ’ কোটি মুসলিম হিজরি দ্বিতীয় সাল থেকে ১৪ শত বছর ধরে রমজানের রোজা ও ঈদুল ফিতর পালন করে আসছে। রমজানের রোজা পালন করে মুসলিমগণ আল্লাহর কাছে তাকওয়ার সর্র্বোচ্চ পরীক্ষা দেয়। রমজান মাসেই কুরআন, ইঞ্জিল, তাওরাত ও যাবুর কিতাব নাযিল হয়েছে। তাই রমজানের পর শাওয়ালের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর বয়ে আনে সর্বোচ্চ আনন্দ।

আসুন, এবারের ঈদের নামাজের মুনাজাতে নিজের জন্যে, দেশ ও জাতির জন্যে এবং বিশ্বের সকল মু’মিনমু’মিনাত ও মুসলিমমুসলিমাতের জন্যে দোয়া করি। আল্লাহপাক আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন॥

লেখক: অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x