ঈদুল আজহা : ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হোক মন

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
64

আগামীকাল পবিত্র ঈদুল-আজহা। ঈদুল আজহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরবানি। মুসলমানদের দুই ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ভিন্ন রকম হলেও মূলগত তাৎপর্য একই, মহান সৃষ্টিকর্তার সমীপে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। ত্যাগের আনন্দ ও উৎসবে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সব মুসলমান মিলেমিশে ঈদের আনন্দ সমভাগ করে নেন, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ভুলে খুশিমনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করেন। প্রতিবছর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র হজের পরই গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু কোরবানি দিয়ে ঈদুল আজহা উদযাপন করা হয়।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুসলমানগণ শুধু আনন্দ উপভোগ করেন না, দীন দুঃখীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরবানির গোশত, রুটি ও চামড়া বিক্রয়লব্ধ অর্থ দান করে প্রচুর পুণ্য অর্জন করেন। সমাজের গরীব-দুঃখী মানুষের মন সেদিন আনন্দে আহ্লাদিত হতে থাকে। মানুষের জীবনে সকল জিনিসের চেয়ে আল্লাহ্‌ এবং তাঁর নির্দেশকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে এ কোরবানিতে। আল্লাহ্‌ রাববুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্য জীবনের প্রিয়তম বস্তুকে হারাতে হলেও তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। এ মহান আত্মত্যাগের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোরবানি প্রচলন হয়।
হজরত আদম (আ)-এর সময় থেকেই কোরবানির যে ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে নবী-রাসূলেরাও আল্লাহর নামে কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য কোরবানির পথ দেখিয়ে গেছেন। এ কোরবানি কেবল পশু বিসর্জন নয়, মনের ভেতরের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নিচুতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের কোরবানিই মূলকথা এবং এটাই সব নবী-রাসূলের অনুপম শিক্ষা।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানি পর্ব এবং অপরিহার্য এ ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রবর্তক। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সীমাহীন ভক্তি, সর্বোচ্চ ত্যাগের সদিচ্ছা ও গভীরতম আত্মসমর্পণে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ কোরবানি করার নির্দেশ প্রদান করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রিয়তম বস্তু তথা তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার জন্য স্বপ্নে আদিষ্ট হয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন, যা সর্বকালের মানব ইতিহাসে ত্যাগের সর্বোচ্চ নিদর্শন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ কুদরত ও রহমতে শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হলো। এর মাধ্যমে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ত্যাগের চরম পরীক্ষায় আল্লাহর দরবারে উত্তীর্ণ হয়ে যান। এরপর থেকে বিশ্বের মুসলমানদের জন্য জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে হালাল পশু কোরবানি করার রেওয়াজ চালু হয়।
আরবি শব্দ ‘কুরবাতুন’ বা ‘কুরবান’ থেকে কোরবানি শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতিবছর হিজরি সালের চান্দ্র মাসের ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে কোরবানির অফুরন্ত আনন্দ-সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে উপস্থিত হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানির মাধ্যমে ঈদুল আজহার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ কায়েম করো এবং কোরবানি করো।’ (সূরা আল-কাওছার, আয়াত: ২) রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর কাছে সাহাবিরা আরজ করলেন, ‘এ কোরবানি কী? উত্তরে তিনি বললেন, এটি তোমাদের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ (ইবনে মাজা ও আহমাদ)। নবী করিম (দ.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনে আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত (কোরবানি করা) অপেক্ষা প্রিয়তর কোনো কাজ নেই। অবশ্যই কিয়ামতের দিন (কোরবানিদাতার পাল্লায়) কোরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ হাজির হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। তাই তোমরা প্রফুল্ল মনে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজা)
প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনে দুটো প্রবৃত্তি রয়েছে, একটি পশুপ্রবৃত্তি, অপরটি বুদ্ধিবৃত্তি। পশুপ্রবৃত্তিকে সংযত রেখে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগে মানুষ যখন জীবনকে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুপথে পরিচালিত করে, তখন একে আদর্শ জীবন বলে অভিহিত করা হয়।
আত্মোৎসর্গের এক পরম মহিমার নজির স্থাপন করে গেছেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। ঈদুল আজহা বা কুরবানীর দিনটিতে প্রতিটি মুসলিম পরিবার চেষ্টা করে নিজের অধিকারের কোনও একটি বস্তু উৎসর্গ করার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী হওয়ার, সান্নিধ্য পাওয়ার। নিজেদের প্রিয় ও আপন বস্তুতে উৎসর্গ করার এই প্রথার মাধ্যমে প্রতিটি মুসলমান বস্তুত মানবজাতির প্রত্যেকের মধ্যে সঞ্চারিত করে থাকেন আত্মদান ও আত্মত্যাগের মহিমা, প্রদান করে থাকে সুখী সুন্দর সমাজ গঠনের জন্যে প্রয়োজনে সব কিছু বিলিয়ে দেয়ার এক ঐতিহ্যশীল শিক্ষা। এইভাবে তারা অর্জন করে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার মতো মনোভাব ও সহিষ্ণুতা। বছরের পর বছর ধরে প্রবহমান এই ঐতিহ্য পৃথিবীর মানব সমাজকে শান্তিপূর্ণ, অসমতামুক্ত ও আনন্দময় রাখতে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। এই দিনে কোনও প্রাণিকে কুরবানী দেয়ার ছলে প্রকৃতপক্ষে কুরবানী করতে হয় নিজের প্রবৃত্তি ও অহংকে। এইভাবে সম্ভব হয় নিজেকে মুক্ত করা ও মুক্ত রাখা।
মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে দৈন্য, হতাশা তা দূরীকরণের জন্য ঈদুল আজহার সৃষ্টি হয়েছে। যারা অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের প্রলেপ দেওয়া এবং দারিদ্রের কষাঘাত দূর করা প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানদেরই কর্তব্য। সকলেরই সেসব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। আমাদের মধ্যে বিদ্যমান পশু প্রবৃত্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা জাতীয় নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে সরিয়ে ফেলে সহজ-সরল মানবিক গুণাবলী অর্জন করাই হচ্ছে ঈদুল আজহার তাৎপর্য। পবিত্র ঈদ-উল-আজহায় আমাদের প্রার্থনা, আল্লাহপাক যেন বিশ্ব মুসলিমের জাতীয় জীবনকে মর্যাদাশীল করেন। কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা প্রভৃতি খোদাপ্রেম বিরোধী রিপুগুলোকে আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশ অনুযায়ী বশ ও দমন করার শিক্ষা রয়েছে এ কোরবানিতে। প্রতিবছর ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির ঈমানী দুর্বলতা, চারিত্রিক কলুষতা দূর করে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমায় তাদের ঈমানী শক্তিকে বলিয়ান, নিখুঁত ও মজবুত করে। মুসলমানগণ এ কোরবানির মাধ্যমে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দীক্ষা নেয়। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন। কোরবানির এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা অন্য মানুষের পাশে সাহায্যের হাত প্রসারিত করবে, সাম্য ও সম্প্রীতির অনন্য বন্ধন সৃষ্টি করবে -এটাই হোক এবারের ঈদের প্রত্যাশা।

x