ইরাবালি

জায়েদ ফরিদ

মঙ্গলবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
14


যমুনা ও পদ্মা পাশাপাশি বহমান, স্বচ্ছ আর ঘোলাজল কেউ মিশছে না কারো সাথে, তবু বয়ে চলেছে নিরবধি নিবিড় এক সঙ্কর নদীর মতো। নদীর শরীরঘেঁষা ডাঙায় বড়সড় আমের বাগান। সেই বাগানের একপ্রান্তে মেলা আর দুর্গাপূজা, আরেক প্রান্তে ‘যাত্রা।’ শহরে যাত্রা নেই, প্রযুক্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কেবল প্রত্যন্ত জনপদে এখনো টিকে আছে তারা।
ইশকুলের ছুটি হতেই হিমানী চাচার হাত ধরে শহর থেকে গ্রামে পৌঁছে গেল রূপম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে চাচার পেছন পেছন ঘোরে। চাচাও তার আদুরে ভাতিজাকে সঙ্গে রাখে, এমন কি মাইলখানেক দূরে পদ্মার ঘাটে ইলিশ মাছ কিনতে গেলেও। নদীর কিনার দিয়ে সেদিন পাল তুলে বেশ কয়েকটি মালবোঝাই বড় নৌকো যাচ্ছে। একটির পাটাতনে চেয়ার নিয়ে বসে আছে সাজগোজ করা এক মহিলা। সেই নৌকার পালের ওপরে বড় করে লেখা ‘ইরাবালি।’
ভাতিজা বানান করে পড়ে, জিজ্ঞাসা করে, ‘চাচা, ইরাবালি কী?’
চাচা বলে, ‘ইরাবালি কুষ্টিয়ার এক নামকরা যাত্রাপার্টির নাম, ক’মাইল ভাটিতে দুগ্‌গাপূজার মেলাতে যাবে এরা।’
— ‘যাত্রা কী চাচা?’
— ‘যাত্রা হলো গাঁও-গেরামের নাটক।’
— ‘তুমি কি যাত্রা দেখছো কখনো?’
— ‘হ্যাঁ, অনেকবার, ওখানে মেলাও হয়।’
— ‘তাইলে আমি যাত্রা দেখবো আর তোমার সাথে মেলায় যাব চাচা। কবে যাব বলো?
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, যাত্রাদলে এবারও এসেছে পারুলবালা, মূলত তার প্রশাসনেই এখনো টিকে আছে ইরাবালি যাত্রাদল। হিমানী চাচাকে অস্থির করে তোলে রূপম। কিন্তু চাচার তাতে বিরক্তি লাগে না, শুধু উদাসভাবে তাকিয়ে থাকে ভাতিজার মুখের দিকে।। ঘাটের ব্যবসায়ী হিসেবে পারুলের সাথে মেলামেশা ছিল হিমানীর, কিন্তু তিন পুরুষের যাত্রাভিনয়ের জীবন ছেড়ে পারুলবালা কারো সাথে ভিড়তে চায় না। গতবার বিজয়া দশমীর পর ইরাবালি-যাত্রা উঠে যাওয়ার আগের দিন সে বলেছিল, নতুন করে ভেবে দেখবে সে। আবার এসেছে সেই পারুল। হিমানী চাচা ভাতিজাকে আদর করে, ‘কালই আমরা যাত্রা দেখতে যাব রূপম।’

তীরে নৌকো ভেড়ার আগেই লাফ দিয়ে ডাঙায় নামে রূপম, চাচা বিরক্ত হয় না। হারনোর কোনো উপায় নেই ভাতিজার, দুদিকে পদ্মা-যমুনা, একদিকে আমবাগান, কোথায় আর যাবে সে! নদীর ঘাটে কপালে তিলক-কাটা এক ঠাকুর বসে আছেন, বিক্রি করছেন মাটির পুতুল। রূপম গভীরভাবে লক্ষ্য করে একটি অদ্ভুত পুতুল, যার ওপরের দিকে হাতির মাথা কিন্তু নিচের দিকটা মানুষের।
হিমানী চাচা পুতুলটা হাতে নিয়ে ঠাকুরকে বলে, ‘গণেশ একটা পুতুল হইল ঠাকুরদা, কেমন যেন দোআঁশলা।’
ঠাকুর হাসেন, ‘মেলায় নানা ধম্মের, নানা রঙের মানুষ আসে বাবা, সঙ্কর মানুষ, এখেনে পদ্মা-যমুনাও তো সঙ্কর নদী, দিব্‌তা দোআঁশলা হলি দোষ কি?’
রূপম পুতুলটা হাতে নেয়, ‘এই পুতুলটা আমি শহরে নিয়ে যাব চাচা, এমন পুতুল জীবনেও দেখি নাই আমি, আমার মারমেড আছে, কিন্তু গণেশ তো নাই।’
রাতে যাত্রা শুরু হয়। যাত্রা-প্যাণ্ডেলের নিচে হোগলা পাটির উপর শুয়ে-বসে যাত্রা দেখে মানুষ। হিমানী চাচা ইচ্ছা করেই কয়েক লাইন পিছিয়ে বসে, বাচ্চাদের মধ্যে শুধুই রূপম। পারুলবালাকে দূর থেকে আঙুল দিয়ে দেখায় হিমানী চাচা। রূপমের খুব ভাল লাগে, ভাল লাগে তার হালকা সাজগোজ আর মিষ্টি হাসি। অনেক রাতে যাত্রা শেষ হয়, এবার ঝলমলে পোশাক পরে নাচ করতে আসে কিছু মেয়ে।
ইতোমধ্যে চাচার পাশে হোগলাপাটিতে এক ঘুম দিয়ে উঠেছে রূপম। মুড়ালি আর নকুলদানার প্যাকেট খালি হলে চাচাকে জানায়, পানি খাবে সে। চাচা আঙুল ঘুরিয়ে বোঝায় তাকে, ‘খেয়াল করো, ঐ যে ঘরের পেছনে খচাকলের শব্দ শোনা যাচ্ছে, ওখান থেকে পানি খেয়ে এসো।’

রূপম পায়ে পায়ে যাত্রামঞ্চের পেছনের দিকে চলে যায়, টিউবওয়েল থেকে পানি খায়। এক লাইনে অনেকগুলো ঘর দেখতে পায় সে। হ্যাজাকবাতির আলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না, জায়গাটা ছমছমে অন্ধকারময়। তবু কৌতূহলবশে অন্ধকারকে উপেক্ষা করে ঘুমকাতর চোখে একাএকাই হাঁটতে থাকে রূপম। হঠাৎ অন্ধকার আমগাছের নিচ থেকে হিসহিস্‌ শব্দ আসে কানে। তার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে, সাপ নয়ত! আড়ষ্ট হয়ে একঠায় দাঁড়িয়ে থাকে রূপম। আম গাছের নিচ থেকে কাপড় সংযত করে একজন মহিলা বের হয়ে আসে। তাকে সামনে দেখে চিবুকে একটু আদর করে, জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কার সাথে এসেছ, কী নাম তোমার?’
–‘আমার নাম রূপম, চাচার সাথে মেলা দেখতে এসেছি। আমি তোমাকে চিনি, তুমি তো পারুলবালা, চাচার মুখে অনেকবার তোমার নাম শুনেছি।’
পারুলবালা তাকে ঘরে নিয়ে যায়। মঞ্চের দিককার বেড়ার ছোট এক ফুটোতে চোখ রেখে বলে, এখান থেকে দেখে বলতো, তোমার চাচা কোথায়?’
বেড়ার ছিদ্র বেশ খানিকটা উপরে। পারুলবালা তাকে বুকে তুলে উঁচু করে ধরে। ছেলেটাকে বেশ ভারী মনে হয় তার, শাড়ি নেমে যেতে চায় নিচে, তবু তাকে নামায় না।’ রূপম বলে, ‘দেখেছি, একটু বামদিকে কয়েকসারি পেছনে, ওনার হাতে আমার গণেশ পুতুলটাও আছে, চাচা আমার জন্য মেলা থেকে কিনে দিয়েছে।’
বেড়ার ছিদ্রে চোখ রেখে পারুলবালা লোকটিকে ভাল করে দ্যাখে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তোমার চাচাকে আমি চিনি রূপম, এখন এক কাজ করো, তুমি তার কাছে যাও, গিয়ে তোমার পুতুলটা নিয়ে এসো, কারণ হারিয়ে যেতে পারে, আর বলে এসো চাচাকে, তুমি পারুলবালার ঘরে আছ, একেবারে শেষের ঘরটা।’
— ‘কিন্তু আমি কেনো ফিরে আসব?’
— ‘কারণ তোমার ক্ষিদে লেগেছে, তুমি এখানে খাবে আর ঘুমাবে, ঘুম ভাঙলে চাচা তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।’
— ‘কী খেতে দেবে?’
— ‘প্যারা সন্দেশ, এখানকার খুব নামকরা সন্দেশ, দুটো সন্দেশ একসাথে জোড়া দেয়া, এত্ত স্বাদ যে মুখে দেয়ার আগেই জিভে জল এসে যায়। গুড় দিয়ে বানায় ঘোষেরা, সঙ্গে দুধের ঘ্রাণ, না খেলে বুঝবে না তুমি।’
খাবারের কথা শুনে রূপমের ক্ষিদে বেড়ে যায়। আমতা আমতা করে বলে, ‘আচ্ছা তাহলে চাচাকে বলে আসি।’
— ‘তাড়াতাড়ি আসবে, আমি কিন্তু এই বেড়ার ছিদ্র দিয়ে তোমাকে দেখবো।’

রূপমের ফিরে আসার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে বেড়ার ছিদ্র থেকে চোখ নামিয়ে পারুলবালা সুরদাসীকে ডাকে। সুরদাসী প্রণাম জানিয়ে দাঁড়ায়, ‘কি জন্যি ডাকিছেন দিদি?, আপনের জন্যি রোজানি দুধ তোলা আছে, আর কিছু লাগবি?’
— ‘হ্যাঁ, একটা ঘুরানি পাখা দাও, বিছানার চাদর পালটে দাও, আর একটা কথা, এক বাটি সন্দেশ দিতে পারবে?’
— ‘পারবো না মানে, আপনি যা চাবেন তা যদি মন থিকে বুঝতি না পারি তো কুষ্টের লক্ষণদাস আমারে ইরাবালিতি রাখপি নাকি!’
রূপমের হাত থেকে পুতুলটা হাতে নিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করে পারুলবালা, তারপর তুলে রাখে বাঁশের তাকে, উপরের দিকে। সুরদাসীর দেয়া প্যারা সন্দেশের বাটি আর ফেরোঘট ভর্তি দুধ নামিয়ে আনে বিছানার উপর। গল্পে গল্পে সন্দেশগুলো শেষ হয়ে যায়, চোখদুটো ঢুলুঢুলু হয়ে আসে রূপমের। পারুলবালা তাকে বালিশে শোয়ায়, মাথার চুলে বিলি কেটে দেয়।
বীভৎস গরম পড়েছে। প্যান্ডেলের কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে শীতল হওয়ার জন্য। পারুলবালা কিউটিকুরা পাউডারের কৌটাটা সারা গায়ে আর বুকের উপর ভাল করে ঝাঁকিয়ে নেয়। ঘুরানি পাখাটা হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ে রূপমের পাশে। সুরদাসী একবার দরোজায় খুটখুট করে নিচু গলায় খবর দেয়, ‘হিমানী মহাজন এসেছে জরুরি দেখা করতি, কী বলবো?।’
— ‘বলে দাও, এখন নয়, রূপম ঘুমাচ্ছে, ঘুম ভাঙলে পরে দেখা যাবে।’
ভোর রাতে ছোট্ট জানালা দিয়ে নিঃশব্দ ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া ঢোকে। পারুলবালা পাখা ফেলে দিয়ে রূপমকে বুকে টেনে নিবিড় করে ঘুমায়। ঘুমের দেশে চোখ বুঁজে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় টের পায় রূপম। কিউটিকুরার গন্ধমাখা নরম বুক থেকে কিছুতেই মুখ বের করতে ইচ্ছা হয় না তার, হাতটাও সরাতে ইচ্ছা করে না কোমর থেকে। ভাবে, একবার মুখ বের করে নিলে আর সে মুখ গুঁজতে পারবে না লজ্জায়।
আমবাগানে দোয়েল পাখিরা ডাকে, ডেকে ডেকে হালকা করে ফ্যালে পাতার আড়ালে আস্তানা করা জমাট অন্ধকার। এই ডাক রূপমও শোনে। কিন্তু শুয়ে থাকতেই মন চায় তার। পারুলবালা ভাবে, হিমানীর সাথে রূপমের কতটা তফাৎ। তবু হিমানীর জন্য মন খারাপ হয় তার, এভাবে তাকে ফিরিয়ে দেয়া কি ঠিক হয়েছে!’ রূপমের চোখের পাপড়ি তার বুকের ভিতর পিটপিট করে। পারুলবালা মিষ্টি হেসে বলে, ‘তুমি তো জেগে গেছ রূপম!’
রূপম অগ্রাহ্য করে, কোমরটা আরেকটু জড়িয়ে ধরে, ‘না আমি জাগিনি, এখনো ঘুমাচ্ছি, আরো অনেক ঘুমাব।’

লগি ঠেলে ঠেলে কিনার ঘেঁষে একটু একটু করে এগুচ্ছে মহাজনের নৌকোটা। পদ্মার স্রোতকে উপেক্ষা করে উজানে যাওয়ার জন্য পাল তোলার আয়োজন করছে পানসি। একজন মাল্লা তীরের দিকে আঙুল দিয়ে বললো, ‘ঐ যে দ্যাখেন কাকু, মনে হয় যাত্রার নটী হবে, পাড়েলের উপর পড়িমড়ি করে দৌড়োচ্ছে, হাতে মাটির পুতুল।’ রূপম চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাঝি, নৌকা ভিড়াও, আমার গণেশ পুতুলটা পারুলবালা নিয়ে আসছে।’
হিমানী মহাজন দৃঢ়ভাবে বলে, ‘নটী যতই দৌঁড়াক, এখন বাইর-দেয়া নৌকাটা স্রোতের ভিতর চলে এসেছে, পাল তোলা নৌকো কখনো ফিরানো যায় না রূপম, তোমাকে অন্য মেলা থেকে পুতুল কিনে দেবো আমি।’

x