ইন্টারনেট ব্যবহারের দাম কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রতিবেশীদের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যয় বেশি

বুধবার , ৩০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ
79

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ইন্টারনেট অন্যতম চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসা থেকে শুরু করে অফিস সবখানেই ইন্টারনেট প্রয়োজন। ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করা ছাড়া যেন এক মুহূর্ত চলে না। ইন্টারনেটের ওপর এমন নির্ভরশীলতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয় বাড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের বাড়তি দামে ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনতে হচ্ছে। আমাদের আয়ের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে এর পেছনে। এরপরও ইন্টারনেট ডাটা কেনার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। অ্যালায়েন্স ফর অ্যাফোরডেবল ইন্টারনেটের (এ৪এআই) অ্যাফোরডেবিলিটি ডাইভার্স ইনডেক্স (এডিআই) এ তথ্য উঠে এসেছে। অতি সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এখবর প্রকাশিত হয়।
খবরে আরো বলা হয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১৩৬টি দেশের মানুষের ইন্টারনেট পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এডিআই-২০১৯ প্রকাশ করা হয়েছে। যেসব দেশের মানুষের গড় মাসিক আয়ের ৪ শতাংশের ১ গিগাবাইট (জিবি) ইন্টারনেট ডাটা কিনতে ব্যয় হয় না সেসব দেশকে ইন্টারনেট অ্যাফোরডেবল দেশের তালিকায় এগিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ইন্টারনেটের বিস্তার ও দামের ক্ষেত্রে কার্যকর সরকারি নীতিমালা ও উদ্যোগ এবং ইন্টারনেট অবকাঠামো খাতে অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর র‌্যাংকিং করা হয়। যে দেশ যত বেশি পয়েন্ট অর্জন করেছে, তালিকায় দেশটি তত এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেটের দাম আর গতি নিয়ে অভিযোগের কমতি নেই। অন্যতম বড় অভিযোগ হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যয় বাংলাদেশে বেশি। আয়ের একটা বড় অংশই চলে যাচ্ছে এর পেছনে। একথা ঠিক যে দেশে ইন্টার সেবার সম্প্রসারণে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ব্যান্ডউইডথের দাম কমিয়ে এনেছে সরকার। একই সঙ্গে ওয়াইম্যাক্স ও থ্রিজির মতো তারবিহীন উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। ফলে সেবাটির গ্রাহকও বেড়েছে। আর ইন্টারনেট গ্রাহকের সিংহভাগই সেলফোন অপারেটরদের ইন্টার সেবা ব্যবহার করছে। থ্রিজি প্রযুক্তি চালু অপারেটরদের ডাটাভিত্তিক সেবা আরো সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপারেটররা ব্যবসা করছে। কিন্তু গ্রাহকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান ও ব্যবহার সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির ওপর ভ্যাট সারচার্জ আরোপ করায় ইন্টারনেটের ব্যয় বাড়ার শঙ্কা জোরদার হচ্ছে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এসব কারণে গ্রাহক পর্যায়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে। চলতি বছরের নতুন আইনের ফলে ভ্যালু চেইনের কয়েকটি লেয়ারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকার যেখানে ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, সেখানে ভ্যালু চেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপ সংগতিপূর্ণ নয়। ইন্টারনেট সেবায় ভ্যালু চেইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে এক ধরনের একক নির্ভরশীলতা ও প্রতিযোগিতাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এখাতে সরকারের প্রধান দুটি অগ্রাধিকার, যেমন তৃণমূলে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো, সন্তোষজনক পর্যায়ে যেতে পারছে না।
সুস্থ প্রতিযোগিতা নীতিমালা আর বড়দের ক্ষমতার অপব্যবহার নজরদারিতে নিয়ে এলে অপারেটররা নিজেরাই দাম কমিয়ে আসল দামের কাছে নিয়ে আসবে বলে অনেকে মনে করেন। আসল মানে প্রোডাকশন কস্টের কাছাকাছি। সুস্থ প্রতিযোগিতার নীতিমালা মানলে খরচ কমে আসবে অপারেটরদের।
সুস্থ প্রতিযোগিতা মাপার একটা অংক আছে। নাম হার্সম্যান হারফিন্ডল ইনডেক্স। সংক্ষেপে এইচএইচআই। এর মান শূন্য হলে বোঝা যায়, বাজারে ছোট কোম্পানি আছে অনেক। ১০ হাজার হলে বাজারটা চলছে পুরো মনোপলিতে। ইন্টারনেট সেবাখাতে সরকারি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। এটা সরাসরি জনগণের আর্থিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
টেলিকম সেবাখাতে প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করে দেওয়া, কার্যকর টেলিকম অবকাঠামো নির্মাণ, তরুণদের ডিজিটাল স্কিল উন্নয়নসহ নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সরকার মানুষের ইন্টারনেট ক্রয় ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পাঁচটি বিষয়কে এক্ষেত্রে সাফল্য লাভের মূল চাবিকাঠি হিসেবে ধরা হয়। এগুলো হলো, কার্যকর ইন্টারনেট ব্যবহার নীতিমালা তৈরি, কার্যকর তরঙ্গ ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন, একই ইন্টারনেট অবকাঠামো মিলেমিশে ব্যবহারের সুযোগ এবং স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট সেবার বৈশ্বিক সুযোগ উন্মুক্ত করা। পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে মানুষ যাতে তাদের জীবনের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে পারে এমন উদ্যোগ বেশি করে নিতে হবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এখন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার আরো বাড়িয়ে তুলতে দাম কমিয়ে আনাসহ যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

x