ইতিহাস থেকে মুছে যাচ্ছে ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরীর নাম

মীর আসলাম. রাউজান

সোমবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৯:১১ পূর্বাহ্ণ

সঙ্গীত শিল্পী তৈরির প্রয়াত এক গুণি শিল্পীর নাম ইতিহাস থেকে মুছে যাচ্ছে। রাউজানের চিকদাইর ইউনিয়নের ১৯২৯ সালে কবিরাজ ভবনে জন্ম নেয়া এই শিল্পীর নাম ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরী। এই গুণি শিল্পী চট্টগ্রামের প্রাচীনতম সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান সঙ্গীত পরিষদ ও আর্য সঙ্গীত একাডেমিতে তালিম নিয়ে সঙ্গীতাজ্ঞ হিসাবে স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তিনি যাদের কাছে তালিম নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাদের মধ্যে একজন প্রায়ত ওস্তাদ নিরোদ বরণ বড়ুয়া। রাউজানের এক খ্যাতিমান কবিরাজের ঘরে জন্ম নেয়া এই শিল্পীর পরিচিতি এই প্রজন্মের অনেকেই না জানলেও তার কাছ থেকে তালিম নেয়া অনেক শিল্পী এখন দেশে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। শীর্ষদের কেউ কেউ সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে সঙ্গীত শিল্পী সৃষ্টি করে সাংস্কৃতি অঙ্গনকে আলোকিত করছেন।
ব্রিটিশ যুগে জন্ম নেয়া ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরী ছিলেন এদেশে কবিরাজী ওষুধের অন্যতম এক প্রবক্তা নিলকমল কবিরাজ এর পুত্র। এই কবিরাজের প্রতিষ্ঠিত শান্তি ঔষাধালয় এখনো চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত আছে। ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরী সঙ্গীত জগৎকে আলোকিত করার কাজের পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কাজ করেছেন। রাউজানের চিকদাইর গ্রামের নিজেদের ১৩৪৫ বাংলায় প্রতিষ্ঠিত আয়ুর্বেদ ভবনটি ছিল দেশের স্বাধীনতার পূর্ব সময়ে এ অঞ্চলের কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের আড্ডাস্থল। নিয়মিত এই ঘরে আসা যাওয়া ছিল রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নে জন্মগ্রহনকারী তৎকালীন সময়ে কৃষক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুস সত্তারের। আসতেন প্রয়াত কানু ডাক্তার, রবিন্দ্র ডাক্তার, রাম দে, দেবন্দ্র লাল দে, নির্মল দে প্রমুখ কমিনিস্ট নেতৃবৃন্দ।
বর্তমানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শৈলন্দ্র চৌধুরীর স্ত্রী শোভারাণী চৌধুরীর কাছ থেকে জানা যায়, শৈলন্দ্র চৌধুরী বাম ধারার ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলেও তার সাথে বিশেষ সখ্যতা ছিল পাকিস্তান প্রদেশিক পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা মরহুম একেএম ফজলুল কবির চৌধুরী সাথে। এখানে আসা যাওয়া ছিল চৌধুরী সাহেবের। তারা দুজনই ঘোড়া নিয়ে সেই সময়কালে চলাফেরা করতেন। রাজনীতি ও সঙ্গীত এর তালিম নিতে নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল অনেক মুসলিমও। সঙ্গীত জীবনের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রবীণ এই নারী বলেন ১৯৬৮ সালে তিনি রাউজানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একটি সঙ্গীত স্কুল। গহিরা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ওই সঙ্গীত স্কুলটি নাম ছিল সুর মণ্ডল শিক্ষা নিকেতন। সঙ্গীতাঙ্গনে তার সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে আছেন শিল্পী মিহির লালা, নির্মলেন্দু চৌধুরীসহ অনেকেই।
স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সরাজী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকা এই পরিবারটির উপর বিরক্ত ছিল উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠি। যদিও মানবিক ও অস্প্রদায়িকতার গুণাবলীর কারণে এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে নিলকমল কবিরাজ পরিবারের অকৃত্রিম ভালবাসা থাকায় কেউ কোন দিন তাদের ক্ষতি করতে সাহস করেনি। পরিবারটির প্রতি আগে থেকে বিরূপ মনোভাবান্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী এই পরিবারের সদস্যদের উপর আঘাত হানার সুযোগ নেয় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। তারা রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। হানাদার বাহিনী এই পরিবারের সন্তান দুর্গাচরণ ও তার পুত্র ডা. হরিধন চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে।
গুণি শিল্পী ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরীর স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই প্রজন্মের সঙ্গীত শিল্পীদের অনেকের কাছে প্রয়াত এই শিল্পীর নাম পরিচিতি সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও ওস্তাদ শৈলন্দ্র চৌধুরীর শীর্ষ্যদের অনেকেই এখন দেশে খ্যাতিমান শিল্পীর তালিকায় নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন। তাদের কয়েকজনের মধ্যে আছেন চন্দন সিংহা, মিতা পালিত, সুভাষ দাশ, মোহাম্মদ ওসমান, মোহাম্মদ হাসেম, অরুন বিজয় দাশ, ডা, সুভাষ নাথসহ আরো অনেকেই। প্রয়াত এই শিল্পীর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আছেন পুত্র মনোতোষ চৌধুরী, প্রিয়োতোষ চৌধুরী, ভবতোষ চৌধুরী, কন্যা অনিক্ষেত চৌধুরী। মেঝ সন্তান চিকদাইর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রিয়োতোষ চৌধুরী এলাকায় একজন সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে পরিচিত।

x