‘ইতিহাসের ক্ষয়’ রুখে দিতে হবে এখনই

মাধব দীপ

শনিবার , ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
50

প্রায় এক দশক ধরে আমি আমার কর্মস্থলে ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ শিরোনামের একটি কোর্স শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছি। অনিবার্যভাবেই এই কোর্সের আওতায় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি টপিক অন্তর্ভুক্ত থাকে। তো, ভাষা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একটি টপিক পড়াতে গিয়ে বলতে গেলে প্রায় প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের কাছে আমার একটা সাধারণ জিজ্ঞাসা থাকে। তা হচ্ছে- আমি তাদের কাছে ভাষা আন্দালনে অবদান রাখা কমপক্ষে দুইজন নারীর নাম জানতে চাই। কিন্তু, কোনোবারই কোনো শিক্ষার্থী এর উত্তর দিতে পারেনি। তারা যে শুধু পারেনি তা নয় বরং আমি বহু সভায় বহু অনুষ্ঠানে এমনকী বহু আড্ডায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই জিজ্ঞাসা করেছি। কিন্তু কখনোই প্রত্যাশিত উত্তর পাইনি। অর্থাৎ, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কোনো সাহসী নারীর নাম কেউ বলতে পারেনি।
তবে হ্যাঁ- সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের নাম ঠোঁটের অগ্রভাগে সবার। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অন্যান্যদের মহান আত্মত্যাগ এবং মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসাকে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে- ভাষা আন্দোলনে নারীদের বীরোচিত অবদানের ইতিহাস কেনো আমাদের এখনও মুখস্ত হয়নি? কেনো, ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা দু’জন নারীর নাম আমরা বলতে পারছি না। আচ্ছা, আমাদের সাত বীরশ্রেষ্ঠের তালিকায় একজনও নারীর নাম নেই কেনো? কেনো আজও এদেশের মাটিতে বীরাঙ্গনাদের বেঁচে থাকার জন্য কঠিন-সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও মনের ভিতর ছাইচাপা দিয়ে রেখেছি।
কী কঠিনই না ছিলো তখন একজন নারীর পক্ষে বাইরে বেরোনো! তার ওপর আবার আন্দোলন-সংগ্রাম! আমাদের ভাষা আন্দোলন কিংবা মুক্তি সংগ্রাম- উভয়েই ছিলো নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। এবং অবশ্যই তা গর্ব করার মতো। অথচ- ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকাগুলোকে গত প্রায় সাত দশকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর অর্থে ছড়িয়ে দেওয়া দেয়া হয়নি। অন্ততঃ আমার জানা নেই। সেইসব মহিয়সী নারীর গৌরবগাঁথা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
আমি মনে করি, পুরুষতন্ত্রের প্রাবল্য ও প্রচলিত ঐতিহাসিক কড়চাই ভাষা আন্দোলনে আমাদের নারীদের বীরোচিত অবদানকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমাদের মেধা ও মননে শক্তভাবে গেঁড়ে বসা পুরুষতন্ত্রই আমাদের বীর নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এবং এ-কাজটি চেতনে-অবচেতনে সম্পন্ন হলেও আমরা তা টের পাইনি।
অথচ একুশের চেতনার জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। পরবর্তীকালে প্রতিটি গণআন্দোলনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে আমাদের ভাষা আন্দোলন। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ একুশের চেতনারই ফসল। আজ যে বাংলা একাডেমির বইমেলা পুরো দেশের জন্য একটি সাংস্কৃতিক-মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে- তাও কিন্তু একুশের চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। খোদ বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাও একুশের চেতনারই অংশ। এই একুশের চেতনায় দেশগড়ার অঙ্গীকার আমাদেরকেই জারি রাখতে হবে। এর অংশ হিসেবে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা নারীদের নামে তাঁদের নিজ-নিজ জেলায় নানান স্থাপনার নামকরণ করা যেতে পারে। রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নামকরণ করা যেতে পারে। কিংবা দর্শনীয় কোনো স্থানে তাঁদের ভাস্কর্যও নির্মাণ করা যেতে পারে। যাতে- এ জাতি, এ দেশ কখনোই তাঁদের ভুলতে না পারে। ভুলতে না পারে তাঁদের বীরোচিত অবদানকে।
সর্বোপরি, ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নারীদের কথা আমাদেরকেই বলতে হবে। বারবার বলতে হবে। একাডেমিকভাবে বলতে হবে। গল্পচ্ছলে শিশুদেরকেও সাহসী সেইসব নারীর কথা শোনাতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই মহান ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখা সংগ্রামী নারীদের ইতিহাস মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মতোই অবশ্যপাঠ্য করতে হবে। নইলে তা হবে তাঁদের মহান অবদানকে অস্বীকার করার সামিল।
দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, শিক্ষামন্ত্রী নারী, নির্বাচিত ও সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত অর্ধশতাধিক নারী সাংসদ, এমনকি বিরোধী দলেও নারী নেতৃত্বের কমতি নেই। কিন্তু তারপরও পুরুষতন্ত্রের প্রাবল্য ও প্রচলিত ঐতিহাসিক কড়চা ভাষা আন্দোলনে আমাদের নারীদের বীরোচিত অবদানকে ছায়াচ্ছন্ন করে রাখবে- এমনটা ভাবা যায় না।যদি এরপরও আমরা উদ্যোগ না নিই- যদি এখনই আমরা সেইসব নারীদের বীরত্বগাঁথা নিয়মিতভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে না ধরি তবে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা কমপক্ষে দুইজন নারীর নাম তাৎক্ষণিকভাবে বলতে না পারা প্রজন্মের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আর তা হবে আমাদের এক ধরনের ‘ইতিহাসের ক্ষয়’। এই ‘ক্ষয়’ রুখে দিতে হবে। আর যদি সেই ‘ক্ষয়’ ধরেই আমরা চলি- তবে এর দায়ভার কে নেবে? এই লজ্জার দায় হবে কার ?