ইতিহাসের আয়নায় সমকালের ছবি

পাভেল আল মামুন

মঙ্গলবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
156

বিনোদিনী দাসীর গল্প নিয়ে নান্দীমুখের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘আমার আমি’। অসীম দাশের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় গত ১০ ফেব্রুয়ারি দর্শক নাটকটি প্রথম উপভোগ করলেন চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে। বাংলা নাটকের ইতিহাসের প্রথম নারী সেলিব্রেটি ‘বিনোদিনী দাসী’ ‘নটি বিনোদিনী’ নামেও পরিচিত। সাহিত্য বা ইতিহাসে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রই তাঁর জীবন ইতিহাস সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞাত। বাংলা রঙ্গালয়ের প্রবাদ প্রতীম অভিনেত্রী শ্রীমতী বিনোদিনী দাসীর জন্ম আনুমানিক ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ১৪৫ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট এ। মাত্র ১১/১২ বছর বয়সে ১৮৭৪ সালে তিনি প্রথম মঞ্চ প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে উদ্ভাসিত করেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে ‘শত্রুসংহার’ নাটকের মধ্য দিয়ে। ক্রমেই তাঁর অভিনয় দক্ষতা মুগ্ধ করেছিল মানুষের হৃদয়। মনীষীজনদের প্রশংসা এবং সেই সময়ের খবরের কাগজের পাতায় পাতায় বড় হেডলাইন করে লেখা হয়েছিলো, ‘Flower of the native stage’; ‘Primadone of the Bengal Stage’ and Emoon of the star company’. এতসবের পরও খ্যাতি ও ক্ষমতার চরম সিদ্ধির লগ্নে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি রঙ্গালয়ে তাঁর অভিনয় জীবনের ইতি টানেন। যার পেছনে ছিল সহকর্মীদের স্বার্থপরতা আর অসহযোগিতার দীর্ঘ উপাখ্যান।

ইতিহাস নির্ভর এই গল্পটিকে কেন্দ্র করেই নান্দীমুখের উপস্থাপনা ‘আমার আমি’। এ নাটকটির প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ একক অভিনয়। নেপথ্য শব্দের ব্যবহারে কিছু চরিত্রের উপস্থাপন থাকলেও প্রায় দুই ঘণ্টার উপস্থাপনে মঞ্চে একাই ছিলেন দীপ্তা রক্ষিত। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বারবার রস বদল করেছেন। নিজেকে ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে পরিপক্ক অভিব্যক্তিতে কখনও হেসেছেন, কখনও কেঁদেছেন। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকেছেন দর্শক পানে আবার আর্তনাদে সহমর্মী করেছেন তাদের। মানবিক অনুভূতির নানামুখী উপস্থাপন দর্শক চিত্তে এমন বিশ্বাস সঞ্চার করেযেন সাক্ষাৎ বিনোদিনী। এই সার্থক উপস্থাপনে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন বাচিক ও শারীরিক অভিনয় উপস্থাপনের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলসমূহের। সাথে নৃত্যকলার উপাদান আর সঙ্গীতের সাবলীল সংযোজন চরিত্রটিকে দৃঢ়তর করেছে। শুরু থেকে শেষ অবধি দীপ্তা রক্ষিত প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে পৌঁছাতে পেরেছেন প্রতিটি দর্শকের কাছে। এই সফলতা নিঃসন্দেহে তার নিরলস চর্চার প্রতিফলন। এক কথায় দিপ্তা রক্ষিত এক পরিপূর্ণ বিনোদিনীকে ধারণ করে উপস্থাপন করেছেন মঞ্চে।

অসীম দাশের নাটকের সাথে যারা পরিচিত তাদের মাথায় হল রুমে ঢোকার আগেই কাজ করে ভারী সেট এর কল্পনা। এই নাটক তার ব্যতিক্রম। ঊনিশ শতকের ডিজাইনের কয়েকটি আসবাব এর একপাশে মঞ্চের আদলে একটি প্ল্যাটফর্ম। আসবাব পত্রের মাঝে ডিম্বাকৃতির একটি ড্রেসিং টেবিল অন্যান্য সেট প্রপস এর সাথে সমন্বিত ব্যবহারে হয়ে উঠে বিনোদিনীর গভীর আবেগ আর অন্তর্গত মনস্তত্ব এর অন্যতম প্রকাশক। মঞ্চের একপাশে প্ল্যাটফর্মটি গৃহ সজ্জার খাটের পাশাপাশি নাট্য মঞ্চরূপেও প্রকাশ পায়, যা খুব সহজেই অভিনেত্রী বিনোদিনী এবং মানুষ বিনোদিনীর দুটো বাস্তবতাকে আলাদা সত্তায় উপস্থাপন করে। চট্টগ্রামের নাটকে নেপথ্য শব্দের ব্যবহার বলতে প্রধানত আবহ সঙ্গীত এর চর্চাটিই প্রচলিত। এই নাটকে তার পাশাপাশি পাওয়া গেছে নেপথ্য সংলাপের ব্যবহার। যান্ত্রিক নেপথ্য সংলাপের সাথে মঞ্চের অভিনেত্রীর কথোপকথনদর্শক মনে মঞ্চে আরেক জনের উপস্থিতির বিশ্বাস সৃষ্টি করে। কল্পিত চরিত্রটির সাথে বিনোদিনীর কথোপকথনে অদৃশ্য চরিত্রটিকে দর্শক যেন দেখতে পায় চোখের সামনে। নেপথ্য শব্দের মাধ্যমে চরিত্র সৃষ্টির এই কৌশল নিঃসন্দেহে অভিনব। তদুপরি বিনোদীনির জীবনের নানা পর্যায়ের উপস্থাপনে রাগ সঙ্গীতের ব্যবহার যেমন দৃঢ় করেছে অনুভূতিতেমনি দর্শককে নিয়ে গেছে ঊনিশ শতকের বাস্তবতার। নেপথ্য শব্দ, সেট এর সাথে আলোর শৈল্পিক সমন্বয় নান্দনিক মাদকতায় দর্শককে ধরে রাখে প্রতিক্ষণে নতুন মাত্রায়। যে কথাটি না বললেই নয়পুরো উপস্থাপনাতে অভিনেত্রী কখনই আলোর সাথে সমন্বয়হীন ছিলেন না। পাশাপাশি মঞ্চে আলোর Gimic সৃষ্টির চাইতে আলোক পরিকল্পনায় গল্পের মনস্তত্ত্ব উপস্থাপনের প্রচেষ্টাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে। অভিনেত্রীর পোশাকে খুব বেশি চেষ্টা করা হয়েছে ঊনিশ শতক আর বিনোদীনিকে পেতে। সময়টা পুরোপুরি না পেলেও অভিনয়শৈলীতে বিনোদীনিকে পুরোপুরিই পাওয়া গেছে।

নির্দেশক অসীম দাশ এই প্রযোজনায় বিনোদিনীর জীবন উপস্থানকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন থিয়েটার এর সাথে তাঁর সম্পর্ককে। থিয়েটার এর জন্য তাঁর নিশ্চিত জীবন, প্রেম, প্রভৃতি ত্যাগ এর উপস্থাপনই ছিল ‘আমার আমি’র প্রধান উপজীব্য। পাশাপাশি ঁ সময়ের নারী অভিনেত্রীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী এখনও অনেকখানি বিদ্যমানএই নির্মম সত্যটির প্রতিও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। থিয়েট্রিকাল ভাষায় এই উপস্থাপন যেন ভিন্নমাত্রায় দৃশ্যমান করে এখনকার অনেক অভিনেত্রীর ত্যাগকে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় এখনকার মঞ্চের বিনোদিনীরা। যারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন আমাদের মঞ্চ। অসীম দাশকে ধন্যবাদ এই দারুণ অনুভবএর সেতু তৈরি করার জন্য।

বিনোদিনী দাসীর গল্প নিয়ে মঞ্চের উপস্থাপন নতুন নয়। ভারতের নানা প্রান্তে এটি নিয়মিত প্রযোজনা। বাংলাদেশে ঢাকা থিয়েটারেরও একটি প্রযোজনা রয়েছে শিমুল ইউসুফের একক উপস্থাপনায়। চট্টগ্রামে অসীম দাশ এর আগেও অ্যাভাগার্ড এর হয়ে মঞ্চে এনেছিলেন ‘নটি বিনোদিনী’। তবে সেটি একক উপস্থাপনা নয়। সর্বোপরি এই প্রযোজনাটি অতীতের সকল উপস্থাপনকে ছাড়িয়ে এক অনন্য স্বাতন্ত্রের দাবিদার। নিয়মিত মঞ্চায়ন এটির গুণগত মান আরও উৎকর্ষ করুক।

x