ইটভাটায় বিক্রি হচ্ছে টপসয়েল

চন্দনাইশে কমছে আবাদি ভূমির পরিমাণ

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ

মঙ্গলবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২০ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
56

চন্দনাইশ উপজেলার ২ পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের হাজার হাজার একর আবাদি জমির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। শীতের শুকনো মৌসুমে প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন স্থানের সম্পূর্ণ আবাদযোগ্য তিন ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নেয়ার এ দৃশ্য চোখে পড়ছে। ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বরা মাটিগুলো কেটে নেয়ার ফলে জমিগুলো যেমন উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে, তেমনি সমতল আবাদি ভূমিগুলো বছরের পর বছর ধরে পানির নিচে ডুবে থাকছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদি ভূমির পরিমাণ। জমির মালিকদের অসচেতনতা এবং অভাবকে পুঁজি করে একশ্রেণীর ভূমিদস্যুরা জমির উপরিভাগের মাটি অতি স্বল্প মূল্যে কিনে নিয়ে যাচ্ছে বিনা বাঁধায়। এরপর ভূমিদস্যু চক্রটি উচ্চমূল্যে মাটিগুলো উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে করে ৩ ফসলি জমিগুলো দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তার উর্বরা শক্তি। একইসাথে প্রতিবছর জমির উপরিভাগের মাটি তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে জমি নিচু হয়ে যাওয়ায় আবাদযোগ্যতা হারাচ্ছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে জমির মূল উর্বরা শক্তি থাকে জমির উপরিভাগে। উপরিভাগের মাটি তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে জমি যে উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে তা পূরণ হতে কমপক্ষে অর্ধযুগেরও বেশি সময় লাগে।
জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফসলি জমিগুলোর মাটি সংগ্রহে নেমে পড়েন বিভিন্ন দালাল চক্র। চন্দনাইশে স্থাপিত প্রায় অর্ধ শতাধিক ইটভাটার মালিকরা ইট তৈরির মৌসুম শুরুর সাথে সাথে ওই দালাল চক্রটিকে লাগিয়ে দেয় আবাদি জমিগুলোর মাটি সংগ্রহে। এটেল জাতের হওয়ায় এ মাটি দিয়ে তৈরী ইট শক্ত ও সুন্দর হওয়ায় ইটভাটা মালিকদের নজর থাকে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি টপসয়েলের দিকে। সে কারণে ইটভাটার মালিকরা উচ্চমুল্যে দালালদের কাছ থেকে মাটি কিনে নিচ্ছে। স্থানীয় জনগণ মাটি ব্যবসায়ীদের বাঁধা দিলেও তারা তাদের নানাভাবে হয়রানি করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এ সুযোগে জমির মালিক এবং কৃষকদের কাছ থেকে দালালচক্রটি নামমাত্র মূল্যে মাটি কিনে নিয়ে তা উচ্চমুল্যে ইটভাটায় সরবরাহ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
ইটভাটা ছাড়াও রাস্তা নির্মাণ, ভিটে ভরাট, পুকুর ভরাটসহ আরো বিভিন্ন কাজে এসব মাটি উচ্চমুল্যে সরবরাহ করে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় যেসব জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ফেলা হয় সেসব জমিতে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকার করণে এবং উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলায় সামনের ১০ থেকে ১৫ বছর আর কোন ফসলের আবাদ হয়না। তারা আরো জানান, অনেক সময় আশেপাশের জমির মাটি বিক্রি করে দিলে পাশ্ববর্তী অন্যদের জমির মাটিও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। কারণ বিক্রি করা জমির মাটি কেটে নেয়ার ফলে পাশ্ববর্তী অন্য জমিগুলো উচু হয়ে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
গতকাল সোমবার উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের যতরকুল-বড়পাড়া সংযোগ সড়কে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার প্রভাবশালী একটি ভূমিদস্যু চক্র স্কেভেটর দিয়ে সম্পূর্ণ তিন ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি টপসয়েল কেটে পার্শ্ববর্তী ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এসময় এলাকাবাসীরা জানায়, শুধু উপরিভাগের মাটি টপসয়েল সহ ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর করে মাটিও কেটে নিয়ে নিচ্ছে। বিনা বাঁধায় বিগত এক সপ্তাহ ধরে এভাবে মাটি কাটা হচ্ছে বলেও জানান তারা। এসময় দেখা যায় যে সড়ক দিয়ে মিনি ট্রাকযোগে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে সে সড়ক দিয়ে যতরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাতায়ত করছে। এছাড়াও উক্ত সড়ক দিয়ে হাজারেরও অধিক জনগণ চলাচল করে। মাটি পরিবহনের ফলে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ভেঙে গেছে। গাড়ি চলাচলের সময় বালু উড়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। এতে চলাচলরত শিক্ষার্থীরাসহ এলাকার লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গত বছর এ সড়ক দিয়ে মাটি পরিবহনকারী মিটি ট্‌্রাকের ধাক্কায় একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীও গুরুতর আহত হয়েছে বলে জানান তারা।
জমির উপরিভাগ টপসয়েল কাটা প্রসঙ্গে চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানান, সব ধরনের জমিতে উর্বরা শক্তি থাকে মাটির উপরিভাগের এক মিটারের মধ্যে। এই অংশের মাটি কেটে নেয়ায় জমির সব পুষ্টি উপাদানও চলে যায়। যা পুরণ হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিবেদিতা চাকমা বলেন, এব্যাপারে তিনি খবরাখবর নিচ্ছেন। আবাদি জমির টপসয়েল কাটা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।