ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হওয়ার কৌশল

মেহেরাজ আবিদ

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

যদি প্রশ্ন করা হয় এই পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ভাষা কোনটি? উত্তরটি হলো ইংরেজি যা অনায়াসে দেয়া এবং তা মেনেও নেয়া যাবে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় ইংরেজিই কেন আন্তর্জাতিক ভাষা? এই প্রশ্নের উত্তর অন্ততপক্ষে আমাদের ইংরেজিভীতির এই দেশে খুবই হাস্যকর শুনাতে পারে। ইংরেজিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ এবং সাবলীল ভাষা যা এর ব্যাপক ব্যবহার আর সমসাময়িক প্রয়োজনীয়তা থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে কর্পোরেট বিশ্ব কিংবা বিশ্বকোষসহ উচ্চশিক্ষার সমস্ত বইপুস্তক এমনকি দেশীয় ও মাল্টিন্যাশনাল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানেও চলছে ইংরেজির শাসন। এই শাসনে অনেকেই খুব আনন্দের সাথে শাসিত আবার কেউবা চরমভাবে শোষিত। বুঝতেই পারছেন এই শোষিত জনগোষ্ঠী কারা, যারা প্রতিনিয়ত ইংরেজি না জানার কারণে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছেন চাকরির পদোন্নতি থেকে, যথাযথভাবে মিথস্ক্রিয়ার অংশ হতে না পেরে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বিদেশি ডেলিগেটদের সাথে আলোচনার মুহূর্ত থেকে পালিয়ে বাঁচতে হয়, যারা ব্যবসা করছেন অথচ কাস্টমারদেরকে স্মার্টভাবে সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছেন। আরেক শোষিত শ্রেণী আছে যারা ইদানীং সংখ্যায় অনেক বেশি, ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। তারা হলেন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটরা যারা এতদূর পড়াশোনা শেষ করার পরেও আজ দুল’াইন গুছিয়ে ইংরেজি সাবলীলভাবে বলতে অক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেজেন্টেশনগুলো যেন তাদের কাছে এক বিভীষিকা। তারা অনেক সময় একটা সেল্ফ মোটিভেশান নিয়ে থাকেন তাদের অপারগতা আর দুর্বলতাকে পাত্তা না দেয়ার ভান করে। সেটি হলো, পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, আছে অনেক জাতি যারা ইংরেজি ভাষাকে পাত্তাই দেয় না, তারা কি সফল না? একটু ভেবে দেখুন যে জাতিসমূহের কথা আপনি বলছেন প্রথমত আপনি সেই জাতির কেউ নন, দ্বিতীয়ত সেই দেশ ও জাতিগুলি অনেক বেশি স্বনির্ভর এবং উন্নত। কিন্তু আমরা কি স্বনির্ভর ও উন্নত আপাতত? না। তাই আমাদেরকে ইংরেজিতে পারদর্শী হতেই হবে। পৃথিবীর এই প্রান্তে ইংরেজির প্রয়োজন যত বেশি তা আয়ত্ত করার বা শিখানোর ধরণ ঠিক ততটাই উল্টো।
যেকোনো ভাষা শিক্ষার ধরনই সর্বাগ্রে বোধগম্য এবং ধারাবাহিক হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। ইংরেজি ভাষার কথাই যদি বলি দেখবেন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ল্যাংগুয়েজ টিচার কিংবা সেল্ফ লার্নার শুরুটা করেন হয় ঞবহংব বা ক্রিয়ার কাল দিয়ে অথবা ইংরেজি শব্দসম্ভার বা ঠড়পধনঁষধৎরবং কিংবা ঞৎধহংষধঃরড়হং মুখস্থ করার মাধ্যমে। এসমস্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনাকে বইয়ের সংস্পর্শে আসতে হয়, পড়তে হয়, জানতে হয়, বুঝতেও হয়। ফলস্বরূপ আপনি একটি বা একাধিক বই থেকে ভাষা শিখতে উন্মুখ হয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, বই থেকে কখনো একটি ভাষা শেখা যায় না। যদি যেত তাহলে দেখুন গ্র্যাজুয়েটরা কতশত ইংরেজি বই পড়ে এসেছেন। তবে কেন তারা আজ দুই মিনিট সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন না? এবার আরেকটি কথা বলি, পৃথিবীর সমস্ত ভাষাই কিন্তু কারো না কারো নিজস্ব ভাষা। যেমন বাংলা আমাদের নিজস্ব বা মাতৃভাষা। আপনাদের কাছে কতটুকু সহজ মনে হয় আমি জানি না তবে আমার কাছে বাংলা বড়ো জটিল ঠেকে। দেখুন তবে বাংলার মত এতখানি কঠিন ভাষা যেখানে স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিয়ে পঞ্চাশটি অক্ষর রয়েছে, রয়েছে হাজারো জটিল কঠিন আর দুর্বোধ্য ব্যাকরণের নিয়ম সেই ভাষাটি আমরা কতটা অবলীলায় বলে ফেলছি কোন বই পুস্তক না পড়েই, কোন ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ না করেই, কোন শব্দসম্ভার মুখস্থ না করেই। ন্যাচারাল স্পিকিং। কিভাবে সম্ভব হলো? খেয়াল করে দেখুন বাংলা আপনি অল্প সময়ের মধ্যে শিখেননি কিন্তু। জন্মের পর থেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর শুধু শুনেই গেছেন আশেপাশের মানুষ কি বলছে কিভাবে বলছে, কিভাবে মুখ আর ঠোঁট নাড়াচ্ছে ইত্যাদি। এরপর যখনই আধো আধো বুলি ছাড়া শুরু করলেন কি বলতেন তারও কোন ঠিক নেই কিন্তু আপনি এভাবেই ভুলভাল বলে গেছেন একটা দীর্ঘ সময় ধরে, নির্দ্বিধায়। আর তারপর? বাংলা আপনার আয়ত্তে চলে এসেছে আস্তে আস্তে। কখনো একটা শব্দ, কখনো একটা বাক্য কিছুটা শুদ্ধ আর কিছুটা ভুল বলতে বলতে একটা সময় রপ্ত করে নিয়েছেন বাংলা।
ইংরেজি শিখতে আমাদের এর চেয়ে ভিন্ন কোনকিছু করার প্রয়োজন নেই। ঠিক যেভাবে আমরা বাংলা শিখেছি সেভাবে। ইংরেজি শিখার জন্য সর্বপ্রথম ঞবহংব বা ঝবহঃবহপব কিংবা অন্যকোনো গ্রামার এর কিছু নয় বরং নিয়মিত লিসেনিং করতে হবে প্রচুর। যে অনেক বেশি শুনে সে খুব স্বাভাবিকভাবেই খুব ভালো বলে, আর যে অনেক বেশি পড়ে সে খুব ভালো লিখে। আমাদের ইংরেজি শেখার বা শেখানোর পদ্ধতিটা বেজায় অদ্ভুত। চলুন এবার পাল্টে ফেলি আমাদের ইংরেজি শেখার উপায়। খুব স্বাভাবিকভাবে ইংরেজি শেখার জন্য সর্বপ্রথম যেটি আমাদের করতে হবে তা হলো ভুল ইংরেজি বলা, হুম আপনি ঠিকই পড়েছেন। আমরা কেন পারি না অল্প সময়ের মধ্যে ইংরেজি শিখতে? কারণ আমরা ভুল করতে নারাজ, আমরা চাই ইংরেজি শেখার প্রথম মুহূর্ত থেকেই আমরা যা বলবো তা শুদ্ধ হতে হবে। পারফেকশনিস্ট হওয়ার সময় এটা নয়। এটা বাচ্চাদের মতো বিনা টেনশনে ভুল করার সময়। এই ভুলটা এই বয়সে এসে করতে হয়তো একটু অস্বস্তিকর লাগতে পারে কিন্তু বিশ্বাস করুন ন্যাচারালি ভাষাটি বলার দক্ষতা অর্জনের জন্য এটিই হলো প্রথম উপায়। আপনি যতদিন ভুলটাও বলছেন না ততদিন অন্য কেউ, হতে পারে আপনার ল্যাংগুয়েজ ট্রেনার বা কাছের কেউ আপনাকে শুধরে দেয়ার সুযোগটি পাবেন না। মুখ খুলবেন, ভুল হবে, কেউ একজন ভুলটা শুধরে দিবে, অতঃপর আপনি কিভাবে বললে তা শুদ্ধ হবে তা জানতে পারলেন, এরপর সেটা বারবার বলে বলে প্র্যাকটিস করলেন। ব্যাস, সেট হয়ে গেলো মাথায়। এভাবেই করতে হয়। যত ভুল বলবেন তত কনফিডেন্স বাড়বে, তত জড়তা কমবে, তত ভয় কমে যাবে। নির্দ্বিধায় ভুল বলুন। ঝঃধৎঃ রিঃয ৎিড়হম ঊহমষরংয! ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপমেন্ট এর জন্য আগে ফ্লুয়েন্সি প্রয়োজন, অপপঁৎধপু বা সঠিকতা নয়। অপপঁৎধপু সময়ের ব্যাপার। ওটার জন্য অপেক্ষায় থাকলে আপনার এই শতাব্দীতে আর ইংরেজিতে ফ্লুয়েন্ট হওয়া হবে না। আপনার বাংলা শেখার জার্নিটাও কিন্তু আগে ‘দ্বিধাহীন ভুল’ দিয়ে শুরু হয়েছিল। তবে ইংরেজিও তো একটি ভাষা, এটি কেন অন্যভাবে শিখতে হবে? কিছু চিন্তা ধারার কারণে আমরা ইংরেজিতে পারদর্শী হতেই পারছি না। শুধু অজুহাত খুঁজে বের করছি। যেমন ঃ আমরা ভুল করলে তা ভালো দেখায় না, লোকে কি বলবে, আমাদের প্র্যাক্টিস করার পার্টনার নেই, আমাদের ইনভায়রনমেন্ট এর অভাব আরও কত কি! প্রথম অজুহাত থেকে বের হওয়া প্রসঙ্গে ইতোমধ্যে বলেছি। দ্বিতীয়টির ব্যাপারে আমার পরামর্শ হলো প্র্যাকটিসটা আগে নিজের সাথে করুন। যখন এমনকিছু করছেন যাতে শতভাগ মনোনিবেশ করতে হয় না; যেমন ধরুন আপনি রাস্তায় একা হাঁটছেন, বাসে চড়ছেন, কারো জন্য অপেক্ষায় আছেন, শুয়ে আছেন, নাস্তা করছেন তখন চোখে যা দেখছেন বা যা করছেন তা নিয়ে নিজের সাথে কথা বলুন ইংরেজিতে। এটা করতে গেলে দেখবেন আপনার ভোকাবুলারির সমস্যা হচ্ছে। ঠিক তখনই সেটা আপনার স্মার্টফোন কিংবা হাতের কাছে থাকা ডায়েরিতে নোট করে ফেলুন যাতে পরে কারো বা ডিকশিনারির সাহায্য নেয়া যায়। খেয়াল রাখুন আপনার অভিধান বা ডিকশানরিটা যেন English to English হয়, English to Bangla যেন না হয়। যদি হয় তবে তা আপনার মধ্যে একটা Translating Habit তৈরি করবে যা ন্যাচারাল স্পিকিং এর অন্তরায়। English to English হলে ভোকাবুলারি অনেক ন্যাচারালি বাড়তে থাকবে কারণ আপনি একটি শব্দের অর্থ খুঁজতে গেলে আরও কয়েকটি শব্দের সম্মুখীন হতে হবে যা না বুঝলে আপনার আসল শব্দটির অর্থই আপনি বের করতে পারবেন না। আর ইনভায়রনমেন্ট? সেটি আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে আধা ঘণ্টা বা এক ঘন্টা সময় নির্ধারণ করুন যখন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সবাই শুধুমাত্র ইংরেজিতে কমিউনিকেট করবেন। বিশ্বাস করুন আমূল পরিবর্তন আসবে কয়েক মাসেই। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে শুরু করুন, যেমনঃ I am going to office now. I will eat my lunch with colleagues today. You look beautiful. Open the door please. Winter is coming. I need my warm clothes etc. এইভাবে। তাড়াহুড়ো করতে হবে না শুরু থেকেই। আস্তে আস্তে ইংলিশে কথা বলুন, বলতেই থাকুন। বেরিয়ে আসুন প্রথাগত ইংরেজি শেখার ধরণ থেকে। শুরু করুন প্রচুর লিসেনিং আর ভুল ইংরেজি বলা দিয়ে। ভুল হচ্ছে সেটি ভাবার কোন প্রয়োজনই নেই। এই ভুলটাই কালকে শুদ্ধতা পাবে। অনেকেই বলেন, ভোকাবুলারি ছাড়া ইংরেজি বলা অসম্ভব। তাদেরকে বলতে চাই, আপনারা কয়টা ভোকাবুলারি শিখে তারপর বাংলা বলা শুরু করেছিলেন? ইংরেজি শিখার জায়গা থেকে আমরা সবাই শিশু। আর ভাষাটাও আমাদেরকে শিশুদের মত করেই শিখতে হবে। শুনে, দেখে, বলে শিখতে হবে, পর্যাপ্ত জ্ঞান আর দক্ষতা অর্জন করে নয়। আগে ইংলিশ শুনুন, তারপর বলুন, বলতে গিয়ে ভুল হলেও চালিয়ে যান, শুদ্ধটা জানতে পারলে বারবার পুনরাবৃত্তি করুন। আগে ভুল দিয়েই শুরু করুন, পরে শুদ্ধ বলাটা সহজ হয়ে যাবে।

লেখক

আইএলটিএস (ব্যান্ড স্কোর ৮.০)
mrabiid4@gmail.com

x