আয়বৈষম্য কমানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে

শুক্রবার , ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
36

গতকাল ছিল আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস আজ। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও মানুষের মাঝে অসমতা দূর করাই এর মূল লক্ষ্য। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এখনো প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশও দারিদ্র্য-সংকট মোকাবিলা করছে। বিগত এক দশকে দেশে দারিদ্র্যের হার অনেকটাই কমেছে।
বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে সব ধরনের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি প্রকাশিত ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স ২০১৯’ এ উঠে এসেছে বাংলাদেশের সাফল্যের এই চিত্র। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজিতে যে ১৭টি লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, তার প্রথমটি হল দারিদ্র্য বিমোচন। ২০৩০ সালের মধ্যে সব জায়গা থেকে ‘বহুমাত্রিক’ দারিদ্র্য দূর করার কথা বলা হয়েছে সেখানে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো কতটা এগোতে পারল, তা বোঝার একটি কৌশল এই ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স’ বা এমপিআই। কেবল মাথাপিছু আয়কে দারিদ্র্যের নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচনা না করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মোট দশটি মানদণ্ডে দারিদ্র্যকে পরিমাপ করা হয় এই সূচকে। দশটি মানদণ্ডের মধ্যে কোনো পরিবারে যদি এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকে, তাহলে ওই পরিবার বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে বলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর হার, জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, সম্পদের মালিকানা ও বিছানা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কুলে উপস্থিতি ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হারকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই গবেষণায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ১০১টি দেশের ১৩০ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে জর্জরিত। এই সংখ্যা দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ২৩.১ শতাংশ। তাদের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মানুষের বসবাস মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে থাকা এই ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে, এক তৃতীয়াংশের বয়স ১০ বছরের কম। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের রূপটি আরও স্পষ্ট বোঝার জন্য ১০টি দেশের তথ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সবগুলো অঞ্চল, সবগুলো অর্থনৈতিক শ্রেণি থেকে বাছাই করা এ দেশগুলোতে ২০০ কোটি মানুষের বসবাস।
এদিকে, ২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বনন্দিত হলেও দেশের মানুষের মধ্যে আয়বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৮ সালে প্রতিবেদনটির প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আর গত ২৪ সেপ্টেম্বরে ওই প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা হয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, গিনি সহগের মাধ্যমে আয়বৈষম্য চিহ্নিত করা হয়। ২০১০ সালে গিনি সহগ ছিল দশমিক ৪৫৮। ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায় দশমিক ৪৮৩। অবশ্য প্রাথমিক প্রতিবেদনে এটি ছিল দশমিক ৪৮২। এর মানে, গত ছয় বছরে বাংলাদেশের মানুষের আয় ও সম্পদবৈষম্য বেড়েছে। কোনো দেশের গিনি সহগ দশমিক ৫০-এর বেশি হলে সে দেশকে উচ্চ বৈষম্যের দেশ হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ এর কাছাকাছি আছে। বিবিএস বলছে, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৯৩ লাখ ২৯ হাজার পরিবার আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ বা ১৯ লাখ ৭২ হাজার ৩২টি পরিবারে সাড়ে ৬১ লাখ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে উপার্জনকারীর সংখ্যা সাড়ে ১৫ লাখ। এই দরিদ্র শ্রেণির প্রতি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৭৪৬ টাকা। এই হলো দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষের আয়ের চিত্র। অবশ্য এটি ওই সব পরিবারের প্রকৃত আয় নয়। ওই সব পরিবারের মোট আয়কে পরিবারপ্রতি ভাগ করে এ হিসাব করা হয়েছে।
ভিন্ন চিত্রও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবিদনে। বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে ধনী ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১১০টি পরিবারের প্রায় ৩২ লাখ সদস্য উপার্জন করেন। এই শ্রেণির বিত্তবান পরিবারের মাসিক গড় আয় ৮৯ হাজার ৬ টাকা। দেশের মানুষের মোট আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ যায় এই ধনিকশ্রেণির কাছে। আর সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের অংশ মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশ।
অতএব, দারিদ্র্য নির্মূলকরণ ও আয় বৈষম্য কমানোর জন্য ধনিক শ্রেণির ওপর প্রগতিমূলক করের চাপ বাড়াতে হবে। এতে করে সমাজে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগণ অধিক সুবিধা পাবে। বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও জোরদার করতে হবে।

x