আ্যডভোকেট মো. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

স্মরণ

ডা. আবু মনসুর মো. নিজামুদ্দিন খালেদ

রবিবার , ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ

কে আমাকে বলে দেবে কতদূর/গেলে খাঁটি কোনও/ মানুষের দেখা পাব?/ এখন আমার/আশেপাশে খল, ভন্ড আর/ষোল আনা স্বার্থপর/লোক আসা-যাওয়া করে।/
যে গাছকে ছায়াময় ভেবে/ঠাঁই নিই ওর নিচে, নিমিষেই/সেটি উবে গিয়ে/একরাশ কাঁটা হয়ে/আমাকেই কামড়াতে থাকে।
উদ্ধৃত কবিতাটি প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের। এতে তিনি ইঙ্গিত করেন মানুষের মনুষ্যত্বহীনতার প্রতি। চারপাশে মনুষ্যত্বহীন মানুষ দেখতে দেখতে মানুষ প্রজাতির প্রতি বিশ্বাসে চিড় ধরা স্বাভাবিক। তাইতো কবিকে জীবনে খোঁজ করতে হয় খাঁটি কোন মানুষের। কারণ এরা মানুষের মধ্যেই বিরল প্রজাতি। এদের দেখা পাওয়া কঠিন। এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন তেমনি একজন খাঁটি মানুষ।
কেমন মানুষ ছিলেন এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী? কীভাবে তাঁকে ব্যাখ্যা করব? আমার চেতনায় আমার শ্রদ্ধাভাজন প্রিয় মানুষটির যে ছবিটি ধরা আছে তার বিবরণ দিতে যেয়ে আজ কিছুটা আবেগ তাড়িত হলেও এতে আছে অকপট সত্যের সাবলীল উচ্চারণ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন একাধারে বিদ্ধান ও শিক্ষিত। ১৯৪২সালে তিনি চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়ীয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট এবং ডিগ্রি পরীক্ষায় আবারো কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এবার আলোর বন্যা বয়ে দিয়ে জ্ঞান সাধনার প্রবল ইচ্ছায় ছুটে যান দেশের তৎকালীন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৯ সালে এম,এ এবং ১৯৫১ সালে এল,এল,বি ডিগ্রি লাভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে। এদেশে সাধারণত বিদ্যা ও শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। কিন্তু পার্থক্য আছে এবং তা নির্দেশ করেছেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বলেছেনঃ ‘‘বিদ্যার্জন একজন মানুষকে শিক্ষিত করে না। বিদ্যার্জন সহজ কিন্তু শিক্ষিত হওয়া কঠিন । বিদ্যা অর্জনের, কিন্তু শিক্ষা আচরণের।’’ এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জীবনে বিদ্যা ও কঠিন শিক্ষা উভয়ই অর্জন করেছিলেন যার প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে। সারা জীবন নিজে ব্যাপৃত থেকেছেন জ্ঞান সাধনায় আর দেশে শিক্ষা বিস্তারের মহান ব্রত নিয়ে। চট্টগ্রামের বহু স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর অবদান ছিল চিরস্মরণীয়। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারী গার্লস কলেজ, গাছবাড়ীয়া ডিগ্রী কলেজ, এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। তদানীন্তন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এম,এন,এ, থাকাকালীন সময়ে তাঁর উদ্যোগেই পটিয়া সরকারি কলেজে ডিগ্রি কোর্স চালু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কারো কাছ থেকে কোনরূপ সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই তিনি সম্পূর্ণ নিজ খরচে চটগ্রামের জামালখান সলিমা সিরাজ মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটাই চট্টগ্রামের প্রথম মহিলা মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি ছাত্রী সংখ্যা, পরীক্ষার ফলাফল , শিক্ষার মান প্রভৃতি মানদন্ডে ইতিমধ্যেই দেশের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মহিলা মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে। সারা জীবন ভেবেছেন শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষা নিয়ে তাঁর অনেক ভাবনার সহযাত্রী হয়েছি। তাঁর বৈদগ্ধ্য আমাকে মুগ্ধ করত। তিনি কখনো আমার শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু সারা জীবন তাঁকে শিক্ষক মেনেছি। তাঁর সঙ্গে সব সাক্ষাতে, সময় কাটানোতে, পাঠ গ্রহণ করেছি নানান বিষয়ে। কত যে তিনি জানতেন! আইনশাস্ত্র ছাড়াও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাগুলোতে তাঁর বিচরণ ছিল অবাধ এবং বিস্ময়কর রকমের স্বচ্ছন্দ। তাঁকে দেখে মনে হতো তিনি যেন যুগের আরাধ্য এক সম্পূর্ণ পুরুষ। তাঁর চিত্তের প্রসন্নতা, তাঁর উন্নত রুচি, তাঁর সততা, সুনীতির প্রতি তাঁর বিশ্বস্ততা তাঁকে যেকোন ভিড়ের মাথায় তুলে ধরত। তাই একটি মহিরুহ হঠাৎ হারিয়ে গেলে, তার ছায়া দেয়া বন্ধ করে দিলে যেমনটি হয় তাঁর চলে যাওয়াটাও আমাদের মাঝে তেমনি এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
৭১ বছরের সমৃদ্ধ জীবনের দীর্ঘ একটা সময় তিনি কাটিয়েছেন আইন পেশায়। আইন পেশায় যোগ দেয়ার অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে সর্বত্র পরিচিতি লাভ করেন। আইনজীবী মহলে তিনি ছিলেন এক প্রিয়মুখ। তিনি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদে দুই দুইবার নির্বাচিত হবার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কেবলমাত্র স্বীয় প্রতিভা বলেই সম্মান এবং খ্যাতির এমন উচ্চাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সৎ, নির্ভীক, মানবতাবাদী এবং অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ এই ব্যক্তি দেশের মানুষের কাছেও ছিলেন এক প্রিয় মুখ। ১৯৬৫ সনে তদানীন্তন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কোতোয়ালী, ডবলমুরিং, পাঁচলাইশসহ সমগ্র পটিয়া আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এম,এন,এ নির্বাচিত হয়ে প্রমাণ করেন এদেশের মানুষের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা জায়গা দখল করে ছিলেন সেটা আমরা আবারো বুঝতে পারি ১৯৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বরের সেই ভয়াল দিনে যেদিন বিশাল এক বর্ণিল, কর্মময় সফল জীবন সামনে রেখে তিনি চলে যান অসীম পরপারে। এ যেন ছিল এক প্রস্ফুটিত লাল গোলাপের হঠাৎ বৃন্তচ্যূত হবার মতো ঘটনা। তাঁর মৃত্যু সংবাদ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সমগ্র চট্টগ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। চট্টলার এই কৃতি সন্তানকে শেষ বারের মতো তাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেদিন অসংখ্য মানুষের ঢল নেমেছিল তাঁর জামালখানস্থ বাসভবনের দিকে। আরেক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল গাছবাড়ীয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত-গুণগ্রাহীরা সেদিন একত্রিত হয়েছিল তাঁদের এই প্রিয় মানুষটাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য।
তাঁর সময়কালে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর মতো এমন ব্যক্তিত্বপূর্ণ রূপবান মানুষ অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি। এ রূপময়তার প্রকৃত উৎস তাঁর গাত্রবর্ণের উজ্জ্বলতা কিংবা শিশুদের মতো তাঁর লাবণ্যমন্ডিত মুখাবয়ব নয়। অন্যরকম এক আলো তাঁকে জড়িয়ে থাকতো সর্বক্ষণ। এ কি প্রতিভার আলো? এমন প্রশ্ন অনেকের মতো আমার মনেও জেগেছে। তার যথার্থ উত্তর সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তবে আমার মনে হয়েছে, এ তার অন্তরের আলো। তাঁর ভেতরে সৌন্দর্যের আশ্চর্য এক খনি ছিল। এ হলো অন্তর্নিহিত সেই সৌন্দর্যের আলো। এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য যারা পেয়েছেন তারা তাঁর অন্তরের এ সৌন্দর্যের স্বাদ ও স্বরূপ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন। তার ভেতরটা ছিল আলোকিত আর তরবারির মতো শানিত। কোন ধরনের কলুষতা, ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার প্রবেশাধিকার ছিল না সেখানে। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, অকপট এবং খোদাভীরু। ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর অবিচল আস্থা। সারাজীবন তিনি চট্টগ্রামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। একাধিকবার পবিত্র হজ্বব্রত পালন ছাড়াও আমৃত্যু তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের সেক্রেটারী হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং মসজিদটির সংস্কার এবং পুনঃ নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেন। তিনি জমিয়তুল ফালাহ্‌র পরিচালনা কমিটিরও সদস্য ছিলেন। মসজিদটির নির্মাণে সে সময় তিনি প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
কিছু কিছু মানুষ থাকে নিজেকে কোথাও তুলে ধরেন না, নিজের জন্য সেলস্‌ম্যানশীপও করেন না তারা। নিরহংকার, অনুচ্চারিত, আজীবন প্রচার বিমুখ, কিছুটা নিভৃতচারী এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন এ ধরণেরই মানুষ। তাঁর আসল পরিচয় আদর্শের সাথে জীবনের সেতুবন্ধে, ভাবনা আর কর্মে অভিন্নতায়। অকপট, অত্যন্ত সাদামাটা সহজ সরল জীবন যাপন করে গেছেন আমৃত্যু। চিন্তার সাথে কাজের, উচ্চারণের সাথে যাপনের সুষম ঐক্যই তাঁর পরিচয়। তাঁর চরিত্র আর নৈতিক শক্তির উৎসও ছিল এখানেই। তাঁর ভেতরে উচ্চতম মানবীয় আদর্শের এক সুষম সমন্বয় ঘটেছিল। মানবকল্যাণ আর প্রবল এক নীতি ও শ্রেয়োবোধ একাকার হয়ে ছিল তাঁর জীবনে। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন স্নিগ্ধ, সম্ভ্রান্ত এবং রুচিবান। সকল অর্থেই পরিশীলিত ও উচ্চমাত্রার মানবিক গুণসম্পন্ন মননশীল এক ভদ্রলোক । অসাধারণ এক সম্মোহন ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে। আধুনিক জীবনদৃষ্টি, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি, উপলব্ধি ও বাকভঙ্গির ভিন্নতায় তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও শুদ্ধাচারী একজন মানুষ। সমকালের ইঁদুর দৌড় ও কোলাহল থেকে থাকতেন দূরে। তিনি ভিড় করতেন না আবার কখনো ভিড়ের মাঝে থাকতেনও না। একবারেই সহ্য করতে পারতেন না শঠতা, কপটতা ও নীচতা। মানুষের মাঝে এ ধরণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তাঁকে প্রবলভাবে পীড়িত করত। বুদ্ধির বখাটেপনার অবারিত সুযোগের সময়েও তিনি ছিলেন একবারে নীতিবান মানুষগুলোর কাতারে। বিজ্ঞাপিত হওয়ার সুলভ সুযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন সচেতনে। অমানুষের সঙ্গকে কখনোই শ্রেয় জ্ঞান করেননি। মানুষকে ভালোবেসে, মানুষকে ধ্যান-জ্ঞান করে পথের ক্লান্তি ভুলে অবিরাম পথ চলেছেন এডভোকেট মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমার ভাবতে খুব ভালো লাগে, তাঁর মতো খাঁটি মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা ও সাহচর্য পাওয়ার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এ ক্ষুদ্র জীবনে এই অসামান্য প্রাপ্তিকে আমি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখি। সাথেসাথে বলব দুঃখ নয়, শোক নয়, ঋণ স্বীকার করি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীদের মতো মানুষদের প্রতি। কারণ তাঁরাই আমাদের জীবনের রাস্তা চেনা শিখিয়েছেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক এবং বিশেষজ্ঞ ভাইরোলজিষ্ট

x