আসামি খোকনকে আত্মসমর্পণের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের

ভান্ডারি হত্যা মামলা

আজাদী প্রতিবেদন

রবিবার , ১৭ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
479

প্রথমে চাঞ্চল্যকর জিল্লুর রহমান ভান্ডারি হত্যা মামলায় অন্যতম প্রধান আসাামি খোকনের জামিন হয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে। চট্টগ্রাম কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি মেলে ‘দ্রুততার’ সাথে। এরপর চেম্বার জজ আদালতের বিচারক আসামির জামিন আদেশ ২ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট চেম্বার জজ আদালতের সেই আদেশ বহাল রাখার আদেশ দেন। একইসাথে ২ সপ্তাহের মধ্যে খোকনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পনের আদেশও দেন। এ আদেশের মধ্যদিয়ে আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গতি আসল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে গত ৩০ মাসেও হয়নি আলোচিত এ মামলার অভিযোগ গঠন। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থায় খোকন চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে (বিচারিক আদালত) গত ২০ জানুয়ারি জামিনের আবেদন করেন। বিচারক মুন্সি আবদুল মজিদ তার জামিনের আবেদন ফিরিয়ে দেন। একদিন পর ২১ জানুয়ারি জামিন চেয়ে হাইকোর্টে পিটিশন দাখিল করা হয় তার পক্ষ থেকে। ২২ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাকে ৬ মাসের জামিন দেন। জামিন আদেশের কপি ২৪ জানুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম আদালতে চলে আসে। একইদিন বিকেল ৫টায় তিনি চট্টগ্রাম কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ২৪ জানুয়ারি খোকনের জামিন বাতিলের জন্য ‘চেম্বার জজ’ আদালতে পিটিশন দাখিল করেন। কিন্তু আসামির আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে এ পিটিশনের উপর শুনানী একদিনের জন্য ‘নট টুডে’ করেন। শেষে চেম্বার জজ আদালতের বিচারক খোকনের জামিন আদেশ ২ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে দেন গত ২৭ জানুয়ারি এক আদেশে। এরই মধ্যে জামিন স্থগিতের এ আদেশ চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুন্সি আবদুল মজিদের আদালতে উপস্থাপন করেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট আবদুস সাত্তার। আবেদনে তিনি আসামি খোকনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট চাইলে আদালতের বিচারক তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট প্রদান করেন।
তথ্য অনুযায়ী, এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে এসেছে ৩০ মাস হতে চলল। গত ২১ জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের ৪ বছর পূর্ণও হয়েছে। কিন্তু আলোচিত এ মামলায় আদালতে অভিযোগও গঠন হয়নি এখনো। এ কারণে মামলার বিচারও শুরু হয় না। বিচারের এ অবস্থায় মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মোহাম্মদ আবু প্রকাশ ধামা আবু বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুইদিন আগে ২৮ ডিসেম্বর তিনি কাতার পাড়ি জমান বলে ভিকটিম জিল্লুর ভান্ডারির ছোট ভাই ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন। জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এ হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে আসে। এরপর শুধু তারিখের পর তারিখ পড়ে। সর্বশেষ তদন্ত সংস্থা সিআইডির তরফে মামলার ১৩ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
জিল্লুর হত্যাকাণ্ডের বিবরণে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে রানিরহাট প্রাথমিক বিদ্যালয় গেটের সামনে ভিকটিম জিল্লুর রহমান ভন্ডারিকে আসামিরা এলোপাতাড়ি মারধর ও উপর্যুপরি গুলি করে মারাত্মকভাবে জখম করেন। ভিকটিমের ভাই মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বাবলুকে ঘটনার তিনমাস আগে কাতারে নেন আসামি ইসমাইল প্রকাশ পিস্তল ইসমাইলের ভাই মোহাম্মদ জব্বার। কিন্তু জব্বার বাবলুকে কাতারে পতাকা লাগিয়ে না দেয়ায় বাবলুর সাথে জব্বারের কথা কাটাকাটি হয়। এ অবস্থায় বাবলুর ভিসা বাতিল করে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেন জব্বার। এ অবস্থায় একই বছরের ২০ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে ইসমাইলকে রানিরহাট বাজারে পেয়ে ভিকটিম জিল্লু রহমান ভান্ডারি তার ছোট ভাই বাবলুকে দেশে ফেরত পাঠানোর কারণ জানতে চান। একইসাথে ভিসা বাবত দেয়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলেন জিল্লুর। এসময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি। পরেরদিন (২০ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় আসামিরা রানিরহাট সিএনজি টেঙি স্টেশনে জিল্লুরকে পেয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাকে উল্লেখিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটের সামনে নিয়ে পায়ে গুলি করা হয়। এঘটনায় গুরুতর জখম হন জিল্লুরু রহমান ভান্ডারি। তাকে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমল্লেঙে নেয়া হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরেরদিন ২২ জানুয়ারি রাত ৯টা ৫মিনিটে ভিকটিমের ছোট ভাই মোহাম্মদ আজিম উদ্দিন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন রাঙ্‌গুনিয়া থানায়। এজাহারে ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত হিসেবে দেখানো হয় আরো ৪/৫ জনকে।
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন সন্ত্রাসীরা জিল্লুর রহমান ভান্ডারিকে বাজার থেকে জোর করে ধরে রানীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটের সামনে নিয়ে যায়। এখানে আসামি খোকন তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে জিল্লুরের বাম পায়ের রানে গুলি করে। এরপর দুই নং আসামি মোহাম্মদ ইসমাইল ওরফে পিস্তল ইসমাইল তার হাতের এলজি দিয়ে জিল্লুরের ডান রানে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয়। মামলাটি প্রথমে রাঙ্‌গুনিয়া থানার এসআই শুভ রঞ্জন চাকমা মামলাটি তদন্ত করেন। তিনি তিনমাস তদন্ত করে অন্যত্র বদলি হয়ে গেলে তার স্থলে ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল তদন্তে আসেন এসআই হায়দার আলী আকন। এরপর হায়দার আলী আকন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন একই বছরের ২৩ জুলাই। প্রতিবেদনে অন্যতম প্রধান দুই আসামিসহ চারজনকে বাদ দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
বাকী ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগপত্রে। বাদ যাওয়া আসামিরা হচ্ছে, মোহাম্মদ খোকন, মোহাম্মদ ইসমাইল ওরফে পিস্তল ইসমাইল, মোহাম্মদ আজিম ও শাফু। মামলা তদন্তের এক পর্যায়ে বাদী মোহাম্মদ আজিম উদ্দিন কাতারে চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর তার ভাই মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাবলু পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রের উপর নারাজি আবেদন জমা দেন। এরপর ১৬ মাসের তদন্তে সিআইডির পরিদর্শক মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ঘটনার সাথে জড়িত সন্ত্রাসীদের তদন্তের আওতায় নিয়ে আসেন। তাঁর নিবিড় তদন্তে উঠে আসে মোহাম্মদ খোকনসহ ১৩ আসামির নাম। এর মধ্যে নতুনভাবে আসামি হিসেবে উঠে এসেছে মোহাম্মদ সুমন ওরফে সিএনজি সুমনের নাম। গত ১১ র্মাচ চেম্বার জজ আদালতের বিচারকের স্থগিতাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্ট। এ আদেশের ফলে খোকনকে নিম্ম আদালতে আত্মসর্মপন করতেই হবে বলে জানান বাদীর আইনজীবী এডভোকেট আবদুস সাত্তার।