আশুরা শিক্ষা দেয় আদর্শিক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
43

আজ মহররমের দশ তারিখ, পবিত্র আশুরা। মুসলমানদের ইতিহাসে মর্মন্তুদ, গভীর শোকের দিন আজ। যদিও পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা হতে এ যাবৎ অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার দিন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কারবালার মর্মন্তুদ সকরুণ শোকগাথা এ দিবসকে গভীর কালো রেখায় উৎকীর্ণ করে রেখেছে। ৬১ হিজরি সালের এই দিনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার ময়দানে শহীদ হন। পবিত্র আশুরা তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাৎপর্যময় ও শোকাবহ দিন। দিনটি মুসলমানদের কাছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। মহররম মাস এলেই কারবালার সেই বেদনাবিধুর স্মৃতি জেগে ওঠে, প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কারবালা প্রান্তরে নৃশংস ঘটনা যখন ঘটে, তখন মুসলিম জাহানে চরম অরাজকতা চলছিল। ইসলামের চার খলিফার স্বর্ণযুগ তখন অতীত। হযরত আমীরে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ তখন রাজতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর। প্রিয় নবীর (দ) দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা) এ অন্যায় মেনে নিতে পারেননি। ন্যায় ও সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সুদৃঢ় শপথ নিতে তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সে যুদ্ধ ছিল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার। ইয়াজিদ যুদ্ধের সব রীতিনীতি ভেঙে হত্যা উৎসবে মেতে ওঠে। কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নির্মমভাবে শহীদ হন রাসুল (দ) দৌহিত্র। সত্যের পথে অসীম সাহসী বীর হযরত ইমাম হোসাইন (রা) এবং তাঁর স্বজন ও সহযোদ্ধারা মৃত্যু অবধারিত জেনেও আপসহীন যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ইয়াজিদ বাহিনী ফোরাতের তীর অবরুদ্ধ করে ইমাম হোসাইন (রা) ও তার সহযোদ্ধাদের দিনের পর দিন এক বিন্দু পানিও পান করতে না দিয়ে তাদের নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে। পিপাসায় কাতর হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু ইসলামের মহান শিক্ষা ঈমানের পথ থেকে তারা মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হননি। আশুরার এ দিনটি মূলত মুসলমানদের জন্য কারবালার সেই দুঃসহ স্মৃতিই বহন করে আনে। এ শোকাবহ স্মৃতিকে মানসপটে রেখে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগির নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ন্যায় প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে অসীম সাহসের সঙ্গে আপসহীন লড়াই করে কীভাবে প্রয়োজনে আত্মবিসর্জন দিতে হয়, সে শিক্ষা আমরা লাভ করতে পারি কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা থেকে। কারবালার এই মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনা দিবসটিকে আত্মোৎসর্গ আর ন্যায়-নীতির, সত্য-সুন্দর প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চেতনায় সমুজ্জ্বল করে রেখেছে। অন্যায়-অনাচার-অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে দিবসটি।
শুধু মুসলিম নয়, সকল মানুষের কাছে দিনটি অবিস্মরণীয়। ইতিহাসে বিশাল জায়গা অধিকার করে আছে পবিত্র আশুরা। এই আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক অসামন্য তাৎপর্যে উজ্জ্বল। ইবাদত-বন্দেগীর জন্যও এ দিবস অতুলনীয়। বিশ্ব ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনে সংঘটিত হয়েছে। সেগুলো যুগে যুগে মুসলমানদের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন মহররমের ১০ তারিখে। এ দিনেই তিনি তা ধ্বংস করবেন। এ দিনেই হযরত আদমের (আ) সৃষ্টি, জান্নাতে প্রবেশ, পৃথিবীতে প্রেরণ ও আল্লাহ তাআলার দরবারে তার তওবা কবুল হয়। আশুরার দিনে হযরত নূহ (আ) ও তাঁর অনুসারীদের জাহাজকে মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি দিয়েছেন, হযরত ইব্রাহীম (আ) এর জন্ম হয়েছিল এবং আল্লাহ তায়ালা এ দিনেই তাঁকে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে নাজাত দিয়েছিলেন। হযরত মুসা (আ) ফিরাউনের কবল হতে মুক্তি, এবং ফিরাউন ও তার দলবলকে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন, হযরত ইউনুচ (আ) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ, হযরত দাউদ (আ) এর তাওবা কবুল, হযরত আইয়ুব (আ)কে কঠিন রোগের কষ্ট থেকে মুক্তি সব কিছুই সংঘটিত হয়েছিল এ দিনে। তাই এটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এ দিনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে খুবই প্রিয়। তাই তিনি এ দিনে রোযা পালনের সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে। মুসলমানদের কাছে বিগত বছরের গোনাহ এর কাফফারা হিসেবে মহররমের দুটি রোজা রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন: রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হল আল্লাহর প্রিয় মহররম মাসের রোযা এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হল রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ (সহিহ মুসলিম)।
প্রতি বছরই আশুরা আমাদের এ যুগের ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখায়। প্রয়োজনে বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আদর্শিক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় লোভ-লালসা ত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরের বিরুদ্ধে সব ধরনের চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হতে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে অসীম সাহসের সঙ্গে আপসহীন লড়াই করে কীভাবে প্রয়োজনে আত্মবিসর্জন দিতে হয়, সে শিক্ষা রয়েছে কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনায়। এটি সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতিতে খুবই প্রাসঙ্গিক। লোভ ও হিংসার ব্যাপকতায় আজ বিশ্বের দেশে দেশে মানবতা হয়ে পড়ছে বিপন্ন। মুষ্টিমেয় মানুষের লোভের কাছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শান্তিতে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। আমরা মনে করি, আশুরার শিক্ষাই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে সব সংকট থেকে।
সারা বিশ্বে মুসলমানরা আজ নানাভাবে নিগৃহীত। নানা ধরনের ভ্রান্তি ও চক্রান্তের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে সহিংসতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় আশুরার এই দিনে মুসলমানদের নতুন করে শপথ নিতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং সত্য ও সুন্দরের আলোকে নিজেকে আলোকিত করতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের জয় হোক।

x