আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান বেরেলভী (রহঃ) এর জীবন ও কর্ম

মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ
69

ইসলাম মহান আল্লাহর মনোনীত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা। পৃথিবী ধ্বংস হওয়া মুহূর্ত পর্যন্ত মানবজাতির জীবন সমস্যা সমাধানের জন্য এই জীবন বিধান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অফুরন্ত অনুগ্রহ হিসেবে অক্ষত থাকবে। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময় থেকে শুরু করে আরবের বিস্তৃত ভূমি অতিক্রম করে স্বর্গীয় বিধান ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দিন দিন ইসলামের অনুসারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ইসলাম যতই বিস্তৃত হয় বিরোধীরা ততই ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। এই উপমহাদেশে একদিকে চলছিল ইংরেজ শাসন। এ অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষগুলোকে নিভৃত রাখার জন্য তাদের চলছিল নানা কুটকৌশল, প্ররোচনা, লোভ দেখানো ফাঁদ ভাগে নেয়ার ষড়যন্ত্র। পূর্বে যেহেতু এ অঞ্চল দীর্ঘদিন মুসলিমরা শাসন করেছিল। তাই ইংরেজরা এই অঞ্চলে তাদের ম্যানফোস্টা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক আগ্রাসনকেই লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করেছিল। ইসলামের ধারক-বাহক আলেম উলামাদেরকে তারা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বশীভূত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল তাদের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল ও হয়েছিলেন। ফলে ফাটল সৃষ্টি হল বৃহত্তর মুসলিম ঐক্যে। মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিল নানা দল উপদল। এমনি এক যুগ সন্ধিক্ষনে ভ্রান্ত মতবাদের মূলোৎপাঠনে জ্ঞানের আকাশে আলোকবর্তিকা হয়ে ডুবন্ত মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি ও সাহস যোগানোর বারতা নিয়ে জেগে উঠল একজন কলাম সম্রাট ইমাম আহমদ রেজা বেরেলভী (রহঃ)।
যিনি ছিলেন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ, অসাধারণ জ্ঞানে জ্ঞানী, নবী প্রেমের খনি, ঈমানের সঠিক বিশ্লেষণকারী এবং কুরআন-সুন্নাহর বিশ্লেষণে ক্ষুরধার কলম সৈনিক। অসাধারণ লেখনির কারণে তাকে বলা হয় “কলমসম্রাট”।
ক্ষনজন্মা এই জ্ঞান তাপস ১৪ জুন ১৮৫৬ খ্রিঃ ১০ শাওয়াল ১২৭২ হিজরী সনে ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরেলী শহরে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মাওলানা নক্বী আলী খান (রহঃ)। মাত্র চার বছর বয়সে কোরআন তিলাওয়াত শিক্ষা গ্রহন শেষ করেন। চৌদ্দ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপনী সনদ অর্জন করেন। এর পরের বছর ১৮৬৯ খ্রিঃ রাদাআত (দুগ্ধদান) সম্পর্কিত বিষয়ে অকাট্য দলিল দিয়ে একটি জটিল মাসআলার সমাধান করে সমসাময়িক বিজ্ঞ আলেম ও মুফতিদেরকে হতবাক করে দেন তিনি। এটা দেখে তার পিতা ফতোয়া প্রদানের জন্য দারুল ইফতার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে তার উপর অর্পণ করেন।
প্রকৃত মুমিন তিনি যার আন্তরে প্রিয় নবী (সা:) স্মরন সদা জাগ্রত থাকে, নবিজীর পবিত্র শিয়রে নিজেকে উৎসর্গ করা অপূর্ব বাসনা যে অমৃত্যু লালন করে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি অধ্যায়ে নবী প্রেমের বাগান সৃষ্টি করতে পারাটাই হলো মানের স্বাদ পাওয়ার উপায়। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, ঐ ব্যক্তি ঈমানের উপভোগ করতে সক্ষম যার মধ্যে তিনটি চরিত্র বিদ্যমান-
১। যার কাছে সকল বস্তু হতে স্বয়ং আল্লাহ ও তার রাসূল (সা:) অধিক প্রিয়।
২। যে কাউকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসে।
৩। যে ঈমান গ্রহণের পর কুফরির দিকে ফিরে যাওয়া এমনভাবে অপছন্দ করে, যেমন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপছন্দ করেন। (সহীহ বুখারী)
অন্য হাদিসে নবীজি (সাঃ) এরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে কেউ পূর্ণাঙ্গ ইমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই। (সহিহ বুখারী)
উপরোক্ত হাদিসদ্বয়ের আলোকে প্রিয় নবীর ভালোবাসাতে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান (রহঃ)। তিনি নিজেই বলতেন আমার হৃদয়কে দুই টুকরো করলে এক টুকরোতে ‘‘লা ইলাহা ইল্লাহাহু’’ আর অপর টুকরোতে ‘‘মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ’’ দেখা যাবে।
উপমহাদেশে যখন ইংরেজ শাসকদের লেজুড়বৃত্তি করে কিছু কিছু লেখক নিজেদের লেখায় মুসলমানদের হৃদয় থেকে নবীর ভালোবাসা, সাহাবাদের মহত্ত্ব, আহলে বায়ত তথা নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, ও বুজুর্গ আওলিয়ায়ে কেরামগণের অবদানে স্মৃতি গুলো নিভিয়ে দিয়ে তাদের পথভ্রষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পাচ্ছিল তখনই আলা হযরত কলম ধরলেন আল কুরআনের সঠিক তরজুমা (অনুবাদ) করতে। ১৩৩০ হিজরিতে শুরু করে মাএ কয়েক মাসের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে উপহার দেন আল
কুরআনের অনবদ্য তরজমা গ্রন্থ ‘‘ কানযুল ঈমান ”। পরবতীতে তারই সুযোগ্য খলিফা সদরুল আফাজিল আল্লামা নঈম উদ্দিন মুরাদাবাদী (রহঃ) সেটার উপর টীকা তাফসির লিখে রচনা করলেন “খাযাইনুল ইরফান”। বহুবিধ বৈশিষ্ট্যের কারণে মুসলিম বিশ্বে ‘‘ কানযুল ইমান ও খাযাইনুল ইরফান ” সর্বোৎকৃষ্ট তরজুমা ও তাফসির রূপে সমাদৃত হয়ে আসছে। এই মহান গ্রন্থটিকে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষার সঠিক তরজমা ও তাফসিরের দীর্ঘ দিনের লালিত চাহিদা পূরন করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক, মুফাসসিরে কুরআন আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল মান্নান সাহেব এই মহান কর্মযজ্ঞটি চট্টগ্রাম থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। ইতোপূর্বে চট্টগ্রাম থেকে কেউ প্রত্যক্ষও পরোক্ষ ভাবে আল কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির করতে সক্ষম হননি। এ পর্যন্ত “কানযুল ইমান ও খাযাইনুল ইরফান গ্রন্থটি বাংলা ভাষা সহ পৃথিবীর সাতটি ভাষার অনুবাদ প্রকাশ পেয়েছে। এই তাফসির গ্রন্থের উপর অনেকেই পিএইচ.ডি ডিগ্রীও সম্পন্ন করেছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় সুফীদের মধ্যে অন্যতম আ’লা হযরত ছিলেন স্বীয় যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ মুফাসসির। ইসলামী ধর্ম-দর্শন বিজ্ঞান সহ জ্ঞানের ৫৫ টি শাখায় অগাধ বিচরণ করে অর্ধ শতাব্দীব্যাপী সময় জুড়ে তিনি দেড় হাজারের অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচনাবলীর মধ্যে বিশ্বব্যাপী জ্ঞানী গবেষক ও সুধী মহলে সাড়া জাগানো রচনা হলো- ‘‘ আল আতায়া আন নবভীয়্যাহ ফিল ফতওয়া আর রজভীয়্যাহ ’’ সংক্ষেপে তাকে ফতওয়ায়ে রেজভীয়্যাহ বলা হয়। লক্ষাধিক ফতওয়ার (সমাধান) বিশাল সম্ভায় নিয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি ফিকহ শাস্ত্রের ইতিহাসে শুধুমাত্র হানাফি মাযহাবের মহান কীর্তিই নয় বরং ফিকহ শাস্ত্রেও ইতিহাসে এক অনবদ্য সৃষ্টি। বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আল্লামা ইকবাল (রহঃ) ফিক্‌াহ শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেজার খান (রহঃ) এর দক্ষতা গবেষণা ও গভীর দৃষ্টিপাতের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন- ‘‘ভারত বর্ষে হযরত আহমদ রেজার মত সুস্থ স্বভাব ও মেধাসম্পন্ন ফকীহ আর পয়দা হয়নি। আমার এ মন্তব্য তার ফতওয়া গ্রন্থ পাঠ-পর্যালোচনা করে স্থির করেছি। যা তার মেধা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, উন্নত স্বভাব অনুধাবন ক্ষমতা ও দ্বীনি জ্ঞানের গভীরতার জ্বলন্ত সাক্ষী। ইমাম আহমদ রেজার মহান জ্ঞানগত প্রচেষ্টা ও সংস্কারমূলক কর্মতৎপরতার প্রতি গভীরভাবে দেখা হলে তাকে ইমাম গাযালি (রহঃ), ইমাম মহিউদ্দীন ইবনে আরবি (রহঃ), ইমাম আবুল হাসান শারানী (রহঃ), হযরত মুজাদ্দীদ-ই-আলফে সাানি (রহঃ) এর মতো জ্ঞানী ও রূহানী সংস্কারক ব্যক্তিবর্গের কাতারেই দেখা যায়’’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মাসউদ আহমদের মতে আ’লা হযরত শুধুমাত্র হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন ৪৬টি গ্রন্থ। ফিক্‌হ শাস্ত্রের উপর তার রচিত গ্রন্থ হলো ২৫৪ টির উপরে। তৎকালীন ইংরেজ শাসক ও তাদের দালালদের বিরুদ্ধে ৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। আধুনিক দার্শনিকরা আ’লা হযরতকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ‘‘এনসাইক্লোপিডিয়া’’ তথা বিশ্বকোষ বলে অভিহিত করেন। কেননা তিনি গণিতের ছাত্রদের জন্য একজন গণিতবিদ, দর্শন শাস্ত্রের ছাত্রদের জন্য তিনি একজন দার্শনিক, সাহিত্যের ছাত্রদের জন্য তিনি একজন বহুমাত্রিক ভাষাবিদ, সাথে তরিকতের জগতে বিচরণকারীদের জন্য তিনি হলেন মহান আধ্যাত্মিক সাধক। যারাই তার সংস্পর্শে গিয়েছে তারা অভিভূত হয়েছে, বিস্মিত হয়েছে, ডুবুরি হয়ে জ্ঞানের মণিমুক্তা আহরণ করেছে। আ’লা হযরতের জীবন, কর্ম, চিন্তা-গবেষণা, ধর্মচিন্তা, ফিক্‌হ শাস্ত্র রচনার উপর বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০টির অধিক এম.ফিল ও পিএইচ.ডি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে এবং যা এখনো চলমান আছে।
শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে থেকে প্রিয় নবী (রহঃ) এর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অনুরাগ দেখিয়ে অতুলনীয় ভাষা শৈলী ও ছন্দের যাদু প্রদর্শন করে নাত-কাব্য রচনা করেছেন আ’লা হযরত। তার প্রতিটি নাত-কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে নবী প্রেমের অসাধারণ প্রকাশভঙ্গী। নাতে রাসূল (সাঃ) কে তিনি এক অনন্যা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। নাতে রাসূল (সাঃ) এর ফুল দিয়ে ইশকে রাসূল (সাঃ) এর বাগানকে সাজিয়েছেন। নবী প্রেমিকরা এগুলো পড়ে পড়ে সূর দিয়ে ইশকে রাসূলের অমীয় সুধা তৃপ্তি সহকারে পান করছে। এ বিষয়ে তার অনবদ্য রচনা ‘‘হাদায়েকে বখশিশ’’। তার রচিত প্রতিটি না’তকেই পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এগুলো কুরআন ও হাদিসের মর্মার্থ। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রফেসর ড. আবদুর রশীদ সাহেবের তত্ত্বাবধানে ‘‘মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর শানে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁন (রহঃ) রচিত না’ত সাহিত্যঃ একটি পর্যালোচনা’’ শিরোনামে প্রায় পাঁচশত পৃষ্ঠার গবেষণা কর্ম সম্পাদন করে পিএইচ.ডি ডিগ্রী নিয়েছেন ড. নাছির উদ্দিন নঈমী।
তার দ্বিপদী পয়ার ছন্দে রচিত অনবদ্য দরূদ ও সালামী যা হলো ‘‘মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম, শময়ে বজমে হেদায়ত পে লাখো সালাম ’’। এ সালামীতে ১৭১ টি শ্লোক বা পংক্তি রয়েছে। বিখ্যাত গবেষক জনাব কাউসার নিয়াজী এ সালামী দরূদ কে ‘‘ উর্দু ভাষার কাসীদায়ে বুরদা ’’ বলে মন্তব্য করেছেন। রাসূল প্রেমে সিক্ত হয়ে তার অমূল্য রচনা ‘‘ সবছে আওলা ও আ’লা হামারা নবী ’’। যেখানে প্রতিটি শব্দমালায় রাসূল প্রেমের অপূর্ব মূূর্ছনা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আ’লা হযরতের না’ত সাহিত্যের উপর দেশ-বিদেশে গবেষণা চলছে অবিরত।
গরিব, দুস্থ-মানবতার কল্যাণে আ’লা হযরতের অবদান ছিল নজিরবিহীন। পৃথিবীতে যারাই ইমামত ও সিয়াদতের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সকলেই অতীব দানশীল ও মানব কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। আ’লা হযরতও ছিলেন ঠিক তেমনি। তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা ধন-সম্পদ আসলে সাথে সাথে তিনি তা দান করে দিতেন। বিশেষ করে গরিব-মিসকিনকে সাহায্য, গরিব মেয়ের বিবাহ, ভাড়াটিয়ার ভাড়া মওকুফ, মাদ্‌রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের ভরণ-পোষণ, মক্কা-মদিনায় গরিব লোকদের মানি অর্ডারের মাধ্যমে টাকা প্রেরণ করে খরচ করতেন। ফলে তার কাছে যাকাত দেয়ার মত টাকা কোনদিন জমা থাকতো না। যেভাবে বলতেন মাওলা আলী শেরে-খোদা (রাঃ)। তিনি বলেন, ‘‘আমার উপর কখনো যাকাত ওয়াজিব হয়নি। বিত্তবান দানশীলদের উপর কি কখনো যাকাত ওয়াজিব হয়’’?
প্রিয় নবী রাসূলে করিম (সঃ) বলেন,- প্রত্যেক শতাব্দীর শেষে এ উম্মতের জন্য আল্ল্লাহ তায়ালা একজন মুজাদ্দিদ অবশ্যই প্রেরণ করবেন, যে উম্মতের জন্য তার দ্বীনকে সজীব করে দিবেন (আবু দাউদ)। পাক ভারত উপমহাদেশে যখন পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়েরা দ্বীন-মাযহাব এবং সঠিক ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে চতুর্মুখী হামলা চালাতে লাগল, তখনি আল্লাহর একনিষ্ট বান্দা, প্রিয় নবীজীর অকৃত্রিম প্রেমিক মিল্লাত ও মাযহারের নিষ্ঠাবান দরদী একজন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান বেরেলভী (রহঃ)। বাস্তবিকই আ’লা হযরতের সংস্কার কার্যক্রমের দিকে তাকালে আমরা দেখি মোসলেহ বা সংশোধনকারী হিসেবে তিনি তরিকতের নামে প্রবৃত্তি পূজারী ও ভণ্ডসুফীর অপতৎপরতা থেকে রক্ষা করে মুসলিম মিল্লাতকে রক্ষা করতে পেয়েছিলেন। শরীয়তের চুলছেরা বিশ্লেষণ, চিন্তাশীল কর্মকাণ্ডের বিশালতা, গবেষণার গভীরতা তাকে একজন সত্যিকারের মুজাদ্দিদের ভূমিকায় উন্নীত হতে দেখা যায়।
অনুরূপভাবে শিরক বিদ’আত প্রতিরোধের নামে প্রিয় নবী (সাঃ) এর শানে অবমাননা তার পুতঃ পবিত্র চরিত্র নিয়ে কুৎসা রচনা, সর্বোপরী ঈমানী চেতনাকে ধ্বংস করার নানাধিক প্রয়াস থেকে মুসলিম মিল্লাতকে রক্ষা করার কারণে তাকে মুজতাহিদ হিসেবেও দেখা যায়।
১৯১৯ সালে ১৮ অক্টোবর আমেরিকার জ্যোতিষী ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ১৯১৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর কয়েকটি গ্রহ সূর্যের সামনে চলে আসার কারণে পৃথিবীতে মহাপ্রলয় ঘটবে। আ’লা হযরতকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কুরআন সুন্নাহর আলাকে মহাকাশ বিজ্ঞানীর এ ভবিষ্যৎবাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, মুমিন কাফিরদেরকে বন্ধু বানাতে পারে না মুমিনকে বাদ দিয়ে। অতঃপর যে (কোন মুমিন) এরকম করবে, অর্থাৎ কাফিরদেরকে বন্ধু বানাবে আল্লাহর সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকবে না (সূরা- আলে ইমরান-২৮)। এজন্য আ’লা হযরত ইংরেজদের শোষণ তাদের কর্মকাণ্ডকে জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে ঘৃণা করতেন। ঐ আমলে ডাকটিকেটে রানী ভিক্টোরিয়ার ছবি ছিল। আ’লা হযরত চিঠি পোস্ট করার সময় ঐ ছবি যুক্ত ডাকটিকেটকে উল্টো করে লাগাতেন। তিনি প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন ইংরেজদের মানব সৃষ্ট আদালতে কোনোদিন হাজিরা দেবেন না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইমাম আহমদ রেজা (রহঃ) এর মসলক অনুসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম জামেয়া আহমাদিয়া ছুন্নিয়া আলীয়াকে এর প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আউলিয়া আওলাদে রাসূল (সাঃ) সৈয়দ আহমদ শাহ ছিরিকোট (রহঃ) মসলকে আ’লা হযরতের উপর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুদীর্ঘ কাল ধরে প্রতিষ্ঠানটি দ্বীনের খেদমতে যোগ্য ও সাচ্চা আলেম তৈরির মিশন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আ’লা হযরত ২৫ শে সফর ১৩৪০ হিজরি মোতাবেক ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯২১ সালে জুমার দিন ইহকাল ত্যাগ করেন।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামী গবেষক

x