আমার সময় ও আমার কথা

সিরাজুুল ইসলাম চৌধুুরি

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

গল্প লেখার ক্ষেত্রে আমার আগ্রহটা ছিল, এই আগ্রহটা তৈরি হয়েছে কিশোর বয়সে আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মহফিলের পাতা’ পড়ে। সাহিত্যের শিক্ষকতার আরেকটা অসুবিধা আছে। সাহিত্যের অধ্যাপকরা যা করেন সেটা বিশ্লেষণ করেন, একটা রচনাকে বিশ্লেষণ করছেন, তার মধ্যে কি কি উপাদান আছেন তা দেখছেন। পড়াতে হচ্ছে, আবার তাকে এটা অনুধাবনও করতে হচ্ছে। আর গল্প বা উপন্যাস তারা কিন্তু সংশ্লেষণ করেন, নিয়ে আসেন। নানান জায়গা থেকে উপাদানগুলোকে সংগ্রহ করে এক জায়গায় নিয়ে এসে একটা পরিপূর্ণ রূপ দেন। দু’টো দুই রকমের। একটা বিশ্লেষণ আরেকটা সংশ্লেষণ। এই পার্থক্যের মধ্যেই আমি পড়ে গেছি। আমার চিন্তাধারাগুলো বিশ্লেষণমুখী হয়ে গেছে। এটা অধ্যাপনার একটা অসুবিধা, যারা সাহিত্যচর্চা করেন। সেজন্য যাঁরা সাহিত্যচর্চা করেন তাদের মধ্যে অধ্যাপনা করলে এই অসুবিধাটা দেখা দেয় বলে আমার ধারণা, এবং তারা ভাল করতে পারেন, সুবিধাজনক হলো সাহিত্যচর্চা করা। তাই প্রবন্ধ লেখার দিকেই আমি চলে গেলাম।
আমার গল্প উপন্যাস প্রসঙ্গে, ‘শেষ নেই’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে লেখা। আমি এই উপন্যাস লিখেছিলাম ঈদসংখ্যার জন্য। ঈদসংখ্যার জন্য একটা চাপ থাকে, দ্রুত দিতে হবে। একটা সীমাও থাকে। পরে আমি একটু বাড়িয়েছি কিন্তু এটাকে আরো অনেক বড় করা দরকার ছিল।
এই উপন্যাসের একটা চরিত্র সুমন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ও যখন বড় হয়ে উঠছিল, ও যখন দেখছিল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এই সময়, রাজাকাররা, স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সুমন প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সে হারিয়ে গেল, আমরা সেটা ধরে রাখতে পারলাম না। সে পারছে না, এ জায়গাটা তার জন্য অনুকূল না। সে যে স্বপ্নটা লালন করছিল সে চরিতার্থ করা যাবে না।
এই উপন্যাসের একটা চরিত্র ছিল পারুল, প্রথম দিকে ছিল। সে শহর থেকে গ্রামে গিয়েছিল বেঁচে থাকবার জন্য, রাজনৈতিক কর্মী আফতাবের সঙ্গে তার বিয়ে হলো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারেরা তাকে তুলে নিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পারুলকে আর পাওয়া যায় নি। কিন্তু গোটা উপন্যাসে পারুল একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল, একটা নারীর, একটা লড়াইয়ের। কিন্তু সে যে হারিয়ে গেল, ওটা বাংলাদেশের প্রতীক অর্থে বলা যায়। বিচ্ছিন্নভাবে ধর্ষণ হয়েছে, নারী নির্যাতন হয়েছে, গোটা বাংলাদেশই তো ধর্ষিত ছিল। একটা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। সে হারিয়েই যাবে। তার হারিয়ে যাওয়াটা তবুও বাঁচোয়া যে সে ওদের অধীনে থাকে নি। তাকে বশ্যতা স্বীকার করতে হয় নি। সে অপমানিত হয় নি। এটা বোঝাতে চেয়েছি।
‘কণার অনিশ্চিত যাত্রা’ উপন্যাসে কণা প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে। অনিশ্চিত যাত্রা মানে সে জানতো না কিন্তু এটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। যখন সে শুরু করেছিল তখন সে জানতো না। অনিশ্চিত ছিল যাত্রাটা। যাত্রার ধারণাটা এখানে প্রধান ছিল। সাহিত্যে একটু আড়াল তৈরি করতে হয়। ‘কণার যাত্রা’ নামকরণ করলে মনে হবে যেন সাংবাদিকতা। অনিশ্চয়তাটা না থাকলে মনে হয় যেন একটা সাংবাদিক প্রতিবেদন তৈরি করছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল জায়গায় আমার মনে হয় যে জাতিসমস্যার সমাধানটা হওয়া দরকার ছিল। আমাদের দেশে দু’টো সমস্যা ছিল, একটা সমস্যা হলো শ্রেণির, অন্যটা জাতির। শ্রেণি-সমস্যার সমাধানটা আমরা করতে পারিনি। আমার একটা আত্মজৈবনিক লেখা আছে, দুই খণ্ডে বের হয়েছে, ছোট্ট, তার মধ্যে। আমি তার নাম দিয়েছি ‘দুই যাত্রায় এক যাত্রী’, অর্থাৎ দু’বার আমরা স্বাধীন হলাম, যাত্রা হলো, আমি যাত্রী, আমার দেশও যাত্রী। প্রথম যাত্রায় তো আমরা মুক্ত হতে পারলাম না। আবার দ্বিতীয় একটা যাত্রা করতে হচ্ছে কেননা, জাতিসমস্যার সমাধানটা প্রথম যাত্রায় হলো না। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ কোন জাতীয়তাবাদ না। এই উপমহাদেশে কমপক্ষে সতেরোটা জাতি ছিল ভাষাভিত্তিক। পাকিস্তানেও আমরা হিসাব করতে পারি যে ছয়টা জাতি ছিল। এই যে জাতি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, সেই সমস্যা সমাধান করার জন্যই মুক্তিযুদ্ধটা অনিবার্য ছিল।
মুক্তিযুদ্ধকে আমি মূল্যায়ন করি যে এটা অনিবার্য ছিল জাতিসমস্যা সমাধানের জন্য। কেননা পাকিস্তান টিকতো না। পাকিস্তান যদি ১৯৭১ সালে না ভাঙতো তাহলে দশ বছর পরে হলেও ভাঙতো। এটা টিকে থাকার কোন কারণ ছিল না। শুধু এটা নয় দূরত্ব ছিল, আরেকটা কারণ হচ্ছে বৈষম্য। এই বৈষম্যটা জাতিগত রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তানে যারা ছিল পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবিরা শাসন করে এ-যোগ্যতায় তারা সামরিক বাহিনীর। পাকিস্তানের লম্বা ইতিহাস সামরিক শাসনেরই ইতিহাস। ওই সামরিক পাঞ্জাবির যে আধিপত্য তারা কখনো চায় নি যে অন্য জাতিসত্তাগুলো বিকশিত হোক। যেহেতু বাঙালিরা সংখ্য্যয় বেশি, শতকরা ৫৬ জন, তারা মেনে নেবে না, মেনে নিচ্ছিলো না, কিন্তু তাদেরকে ঠাণ্ডা করার জন্য একেবারে সশস্ত্র জায়গাটাতে চলে গেল। ওরাও কিন্তু জাতীয়তাবাদের দ্বারা পরিচালিত, পাঞ্জাবি জাতীয়তাবাদ। ওরা মনে করছে যে আমাদের কর্তৃত্ব চলে যাবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে কেবল যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে তা না, পাঞ্জাবি শাসন মানবে না, সিন্ধিরা মানবে না, বেলুচরা মানবে না, পাঠানরা মানবে না, এমনকি মহাজির যারা উর্দুভাষী তারাও মানবে না। ওই ভীতিটাও ছিল তাদের। মূলত হচ্ছে পাঞ্জাবিভীতি। এবং এর সঙ্গে যে ভুট্টো জড়িত হয়েছিল তার নিজের ক্ষমতার লোভে। ক্ষমতায় আসার জন্য। তাকে আবার পাঞ্জাবির সাথে, সেনাবাহিনীর সাথে আঁতাত করতে হচ্ছে। ভুট্টোর যে প্রতিনিধিত্ব তা কিন্তু দুর্বল, সে কিন্তু বেলুচিস্তানে একটাও আসন পায় নি, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খুব সামান্য পেয়েছে, সিন্ধুতে কিছু পেয়েছে, পাঞ্জাবেই বেশি পেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে আসন সংখ্যা ১৩৮টা। তার মধ্যে ভুট্টো পেয়েছে ৮১টা। তার প্রাধান্য নেই, কিন্তু সে মনে করছে তার ক্ষমতায় যেতে হবে। ক্ষমতায় যাবার জন্য সে সামরিক বাহিনীর লোকগুলোর সাথে আঁতাত করেছে।
আমার কিশোর গল্প, ‘দরজাটা খোলো’ শুরুতে রিংকু দরজা খুলছে না, ওর মা দরজা ধাক্কাচ্ছে, কিন্তু ও দরজা খুলছে না। গল্পের শেষে গিয়ে দেখে দরজাটা খুলে গেছে, মনোজগতের, অন্তরের, বহির্জগতেরও। এখানে দু’রকম প্রতীক, একটা হলো আমার ব্যক্তিগত, আমার মনে হতো আমি বাইরে গেলে হারিয়ে যাবো অথবা বাইরে থেকে এলে দরজাটা বন্ধ পাবো। শৈশব কৈশোরের অনুভূতি ছিল। দরজাটা ধাক্কা দিচ্ছে, দেখছে দরজাটা বন্ধ। সে মুক্তিটা কোথায় পাবে? ভেতরে কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা আছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মুক্তির একটা জায়গা দেখাচ্ছে। প্রতীকটা আমি খুব স্থূলভাবে আনার চেষ্টা করি নি। দরজাটা খুলতে হবে, খুলতে না পারলে আমরা আটকা পড়ে আছি। আমরা বিকশিত হতে পারছি না। কিশোরও বিকশিত হতে পারছে না, আমরা সমষ্টিগতভাবে বিকশিত হতে পারছি না।
‘বাবুলের বেড়ে ওঠা’ উপন্যাসের এই সমস্যাগুলো আমাদের কৈশোরের কালে ছিল, আমরা যখন বড় হচ্ছি তখন যেরকম পরিবেশটা পাচ্ছি, সেই পরিবেশে যে নিষ্ঠুরতা আছে, সেখানে প্রতিযোগিতা আছে, সেখানে সন্তোষ আছে এবং যে জায়গাটা আমি ধরার চেষ্টা করেছি সেটা হলো মধ্যবর্তী মধ্যবিত্ত, তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো, বস্তুগত আকাঙ্ক্ষা বস্তুগত সাফল্যের, বাবা যখন অন্য জায়গায় চলে যায় তখন সন্তানকে তারা যে উপেক্ষা করছে সে সন্তানটা কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে। একাকী হয়ে যাচ্ছে। এই যে একাকিত্ব, যাকে আমরা বিচ্ছিন্নতা বলি। আমার প্রবন্ধে আমি বার বার বলি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। বাবা মার মধ্যেও একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। যখন তারা কম বিত্তবান ছিল বা স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না পরিবারে তখন তাদের মধ্যে একাত্মতা ছিল। তখন তাদের সুখ-দুঃখগুলো পরস্পর ভাগ করে নিচ্ছে। এই বাবা যখন জাহাজ কোম্পানিতে বড় চাকরিতে গেল তখন যে সমৃদ্ধিটা এলো তার দাম দিতে হচ্ছে কিশোরদেরকে। তার উন্নতির যে বোঝা তা কিশোরদেরকে বহন করতে হচ্ছে। এটা আমি সচেতনভাবে সাজিয়ে করি নি।
একটা গল্প আছে, ‘ভালো মানুষের জগত’ নামে, আহমদ আলী, তার জগৎটা তার স্ত্রীকে নিয়ে, তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। আহমদ আলী সৎ থাকতে চায়, ভালো মানুষের জগৎ, সে সৎ থাকে না, নানাজায়গায় পরাজিত, ভালো মানুষরা কেন পরাজিত হচ্ছে? আহমদ আলী কেন ভাল মানুষের জগৎটা পেলো না? কেন তার জগৎটা অন্ধকারে পরিপূর্ণ, কেন সে বারবার পরাজিত হচ্ছে? দু’টো বিষয় আমার অনুভূতির মধ্যে ছিল, একটা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জগৎটা এমনই। কে কাকে জব্দ করতে পারবে। কে কার চামড়া ছিলতে পারে। একই সাথে চাকরিতে ঢুকে ওপরে চলে গেছে, সে কি করে অন্যদের সাথে ব্যবহার করে, এটা এক নম্বর।
দ্বিতীয় হলো, এই যে আমলাতান্ত্রিকতা, এটা কিন্তু আমলাদের জগৎ, এরা কিন্তু আবার স্বাধীন না। এরা একটা ব্যবস্থার মধ্যে আছে। এই ব্যবস্থাটা হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আমি কিন্তু পুঁজিবাদকে ভালোভাবে চিনতে পারি যতই বয়স বাড়ছে ততই আমার কাছে পুঁজিবাদ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। আমি দেখতে পাই পুঁজিবাদ হচ্ছে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা। সবল কেবল নিপীড়ন করবে তা নয়, দুর্বলের যা আছে তা কেড়েও নেবে। শোষণ করবে। শোষণের যে প্রক্রিয়া তা বন্ধুত্বের মধ্যেও চলে আসে। ওর বন্ধু পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল, চাকরি করতো, ফেরৎ এসেছে। শেষে আবার এখানে হাজির হয়েছে। আহমদ আলীর স্ত্রী ওর প্রাক্তন প্রেমিকাও বটে। সে তখন বিয়ে করে নি, পাকিস্তানে আরো ভাল পরিবারে বিয়ে করবে তাই। একথা সত্যি নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যে একটা হীনমন্যতা জেগে ওঠে, কারণ দুই বন্ধু দুই অবস্থানে কাজ করছে একই অফিসে। তার মধ্যে হীনমন্যতার বোধটা তৈরি হয়। এই বোধটা ভেতরে ভেতরে মানুষটাকে খুব দুর্বল করে। তার জীবনটাকে মনে করে কি রকম সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সমাজে সে ভালো মানুষ বলে পরিচিত না, কারণ সে কিছু করতে পারছে না। পরিবারে তার বাবা-মাও তার উপর সন্তুষ্ট না। কারণ সবাই ক্ষমতা দেখতে চায়। ক্ষমতাই সমাজের প্রধান সত্য।
‘সীমান্তে’ গল্পে আমি এটা কিন্তু প্রতীক হিসেবে দাঁড় করাই নি, কিন্তু প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। লেখক যান্ত্রিকভাবে সাজান না, প্রতীক হিসেবে যদি ধরি যে মেয়েটা জার্মানিতে গিয়ে একটা জার্মান ছেলেকে বিয়ে করেছে, ছেলেটা ভালো, কিন্তু মেয়েটির মধ্যে একটা বোধ আছে যে আমার দেশতো এতো দরিদ্র, তাই মেয়েটা জামাইকে এদেশে আনতে চায় নি, জামাই জোর করে আসছে। জামাইটার অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি, সে ভাবছে একটা গণতান্ত্রিক দেশে যাবে। সে এখানে আসতে চেয়েছে, কিন্তু ভয়ংকর রকম বন্যার জন্য সবকিছু নোংরা হয়ে যাবে। মেয়েটা ভীষণ লজ্জা পাবে, কারণ দেশের অবস্থা এতোটা খারাপ যে মেয়েটার স্বামী হয়তো কল্পনা করতে পারে না। তাতে করে মেয়েটা অজুহাত পেয়ে গেল দেশে না যাওয়ার। মেয়েটা একলা আসতে চাচ্ছিলো। এটাও একটা প্রতীকের মতো দাঁড়িয়ে যায়। আসলে আমাদের উন্নয়নের জায়গাতে অনেক রকম মাশুল দিতে হচ্ছে। ভাইকে ত্যাগ করতে হচ্ছে, আমার সন্তান আসতে পারছে না, যেহেতু সন্তান অন্যধরনের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
‘হারাবার কিছু নেই’ গল্পটিতে যদি এটা কেউ বিশ্লেষণ করতে চায় তাহলে এখানেও প্রতীক পাবে। যারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছিল, যারা যুদ্ধ করেছিল, যারা আত্মত্যাগ করেছিল,তারা কি করে আত্মসমর্পণে বাধ্য হলো, কি করে তারা নিগৃহীত হলো তাদের হাতে, এই মুক্তিযুদ্ধই সুযোগ এনে দিয়েছে সম্পদ আহরণের এবং এই সম্পদ তারা দ্রুত আহরণ করেছে, অনৈতিকভাবে আহরণ করেছে। করুণ জায়গাটা এখানেই যে যারা আত্মত্যাগ করেছে তারাই অধীনে চলে গেছে। যারা আত্মত্যাগ করেই নাই শুধু না, যারা রাজাকারতন্ত্রকে সহযোগিতা করেছিল, সমঝোতা করে টিকে ছিল, তাদের হাতে ক্ষমতা চলে যায়।
সে তো একজন যাত্রী, সে যাত্রা করছে। আমার ভেতরে কোথাও যাত্রার ব্যাপারটা আছে। সেজন্য এই গল্পটা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। এটারও একটা কাহিনী আছে, কিশোর বাংলা বলে একটা পত্রিকা বের হতো, রফিকুল হক সম্পাদিত, তাতে লেখার জন্য খুব তাগিদ দিচ্ছিলো, তারা ধারাবাহিক চাচ্ছিলো। তখন আমার মনে হলো গল্পটাকে কিশোরদের উপযোগী করে ধারাবাহিকভাবে বলা যায়। এটা আমি ধারাবাহিকভাবেই লিখেছি। কিন্তু আরেকটা গল্প আছে, এই গল্পের উল্টো গল্প হোমারেরই গল্প ‘ ইলিয়ড’, যুদ্ধের গল্প, সেটা আমাকে আকর্ষণ করে নি। এটা আকর্ষণ করলো কেননা এটায় যাত্রা আছে, দীর্ঘযাত্রা, লড়াই আছে, অনিশ্চিত যাত্রা, আবার আনুগত্য আছে, দেশে ফিরতে হবে। নানারকম বিপদের মধ্যেও দেশে ফিরবার কথা ভাবছে। যখন প্রাচুর্য পেয়েছে, সমাদর পেয়েছে তখনও ভাবছে স্ত্রী, সন্তান, দেশ।
প্রবন্ধের বই ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’য়। সেই লাহোরেই, পাঞ্জাবেই, পাকিস্তানের প্রথম অক্ষর হচ্ছে ‘পি’, জিন্নাহ সাহেব সবসময় বলতেন যে ‘চঁহলধন রং ঃযব যবধৎঃ ড়ভ চধশরংঃধহ’. এই জায়গাতে এক বাঙালি গিয়েছিলেন, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। কিন্তু প্রস্তাবটা তারা তৈরি করে রেখেছিল, সেটা শেরে বাংলা বুঝতে পারেন নি, এবং তাকে শেরে বাংলা উপাধিটা তারাই দিয়েছিল। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। লক্ষ্ণৌতে গিয়েছিলেন মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হয়ে, তারপরে ওনার হাতে তুলে দিয়েছে প্রস্তাবটা। উনি শুধু পড়ে দিয়েছিলেন। উনি বোঝেনও নাই প্রস্তাবটি এতো গুরুত্বপূর্ণ হবে। কেউ বোঝে নি। পরে ছেষট্টি সালেরটা বুঝে শুনেই হয়েছিল, বোঝা গেল যে ওই পাকিস্তান প্রস্তাব ভুল ছিল। ওটা আমাদের মুক্তি আনতে পারে নি। আরেক বাঙালিকে যেতে হয়েছিল লাহোর প্রস্তাবকে নাকচ করার জন্য। কিন্তু এর মধ্যে একটা বক্রাঘাত আছে, সেটা হলো, যে প্রস্তাব সেদিন উত্থাপন করা হয়েছিল, লাহোর প্রস্তাব যেটা আমরা বলি, সেখানে কিন্তু এক পাকিস্তান না, ‘স্টেটস’ কথাটা ছিল। আর ছয় দফা দাবি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান যখন গেলেন তখন তিনি লাহোর প্রস্তাবের আলোকেই স্বায়ত্তশাসন-এর কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ একটা স্টেট হবে পশ্চিম পাকিস্তান একটা স্টেট হবে। লাহোর প্রস্তাব কিন্তু ছয় দফার মধ্যেও আছে। ছয় দফার মধ্যে বলা আছে, স্বায়ত্তশাসন হবে লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী। লাহোর প্রস্তাবের যে ধারণা ছিল, সেই ধারণা অনুযায়ী। বক্রাঘাত হচ্ছে ওই পাঞ্জাবিরা স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব মানতে পারছে না। তাদের লাহোর প্রস্তাবকে তারা গ্রহণ করতে পারছে না। ইতিহাসের এই বক্রাঘাতগুলো খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
জাতীয়তাবাদের মূল উপাদান আমি মনে করি ভাষা, এটা স্বীকৃতও বটে। আরো উপাদান আছে, ধর্ম আছে, ইতিহাস আছে, সংস্কৃতি আছে, অর্থনীতি আছে, স্থান আছে, আচার-আচরণ আছে। প্রধান উপাদান আমি মনে করি ভাষা। বাঙালি একটা জাতি, কেননা তারা বাংলাভাষী। এই বাঙালি অনেক জায়গায় ছড়িয়ে আছে, কিন্তু একটা রাষ্ট্রের মধ্যে যে একটা জাতি থাকবে এটা সত্য না। রাষ্ট্র একধরনের গঠন, তার মধ্যে একাধিক জাতি থাকতে পারে। আমাদের এখানে, এই বাংলাদেশও এক জাতি-রাষ্ট্র নয়। কিন্তু আমাদের এখানে ক্ষুদ্র হলেও নৃগোষ্ঠী আছে, আদিবাসী আছে, এমনকি বিহারিরাও আছে। এদেরকে মেনে নিতে হবে। এখানে বাঙালি প্রধান, অন্য জাতি থাকবে। তাদের জাতীয়তা আলাদা, বাঙালিদের জাতীয়তাও আলাদা। তাদের বাঙালি হওয়ার দরকার নেই, তারা তাদের মতো থাকবে। এমনকি আমেরিকাতেও দেখবেন, একটা বিরাট চৌবাচ্চার মধ্যে ঢুকিয়ে সব একসাথে করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সেটা তো টিকছে না এখন। প্রত্যেকেই নিজেদের জাতিসত্তা নিয়ে বেঁচে আছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদটা আনা হয়েছিল ইচ্ছাকৃতভাবে। এটার মধ্যে বাঙালিত্বকে কমিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা একথা বলার জন্যও। লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে যে পাকিস্তান হয়েছে আমরা লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন করেছি। পশ্চিমবঙ্গের লোকদের বলা হয় ভারতীয়। তাদেরও ভয়টা ছিল যে, দুই বাঙালি না আবার এক হয়ে যায়। মনে করেন ভাষাগতভাবে দুই জার্মানি এক হয়ে গেছে। দুই কোরিয়া এক হতে পারছে না বলে খুব কষ্টের মধ্যে আছে। তেমনই তাদের মধ্যে একটা ভয় ছিল, দুই বাঙালি এক হয়ে গেলে তাদের মধ্যে এক জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠলে তারা আবার বিচ্ছিন্নতা দাবি করবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদকে খাটো করে আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করেছি। এর সমাধান হচ্ছে আমরা নাগরিক বাংলাদেশের, জাতীয়তা বাঙালি। বাঙালি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নেই, সারা পৃথিবীতে আছে। বাঙালি যারা আমেরিকায় আছে ওখানেই রয়ে যাবে, ইউরোপে যারা আছে ওখানেই রয়ে যাবে। তারা ওই রাষ্ট্রেরই নাগরিক থাকবে।
টলস্টয়-এর মূল্যায়ন হচ্ছে আমার কাছে, শেকস্‌পীয়র যেমন নাটকের ক্ষেত্রে টলস্টয় তেমনি উপন্যাসের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ। শেকস্‌পীয়রকে যেমন আপনি পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে মনে করেন নাটকে শ্রেষ্ঠ, তেমনি টলস্টয় উপন্যাসে শ্রেষ্ঠ। সময়কে ও শ্রেণিকেও প্রতিনিধিত্ব করেছে। কোন লেখক তার সময়কে অতিক্রম করে যান কারণ তিনি তাঁর সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তখন আমরা বলি যে সর্বজনীনতা আছে, সময়কে অতিক্রম করা আছে, এই লেখা স্থায়ী হয়ে যায়। তিনি সময়কে অতিক্রম করেন, যে শ্রেণির মধ্যে থাকেন সেই শ্রেণিকেও অতিক্রম করে যান। কিন্তু আবার শ্রেণির মধ্যে থেকে লিখছেন, সময়ের মধ্যে থেকেও লিখছেন। শেকস্‌পীয়রের জীবনীতে তার সমাজে নারীর অধীনস্ততা স্বীকৃত ছিল। এবং অসামান্য নারীও আছে কিন্তু, তারা পুরুষতান্ত্রিক ছায়ার নিচে চাপা পড়ে আছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তাদেরকে অধস্তন করে রাখছে। শেক্‌সপীয়র এই সত্যটাকে উন্মোচিত করেছেন।
পাকিস্তানিরা তো কাউকে চেনে না, ওদের কাছে একটা লিস্ট দিয়েছে এখানকার লোকেরা। কিন্তু লোকগুলো কোথায় থাকে তার ঠিকানা তারা জানে না, আমাদের পুলিশ বাহিনীর স্পেশাল ব্রাঞ্চে তারা তালিকাটা পাঠিয়েছিল, ওই ব্রাঞ্চেই আমার এক আত্মীয় চাকরি করতেন। তিনি দেখলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দশজন শিক্ষকের তালিকায় আমার নাম তিন নম্বর বা চার নম্বরে আছে। তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার নাম আছে’। ইনি এতোটা রিস্ক নিলেন যে, অফিসে নিয়ে আমাকে দেখালেন নামের তালিকাটা। আমি অফিসে গেলাম বিকালে, তখন ওনার কামরার চাবি ছিল ওনার কাছে, উনি দেখালেন। ওরা ঠিকানা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সময় দরখাস্তে যে ঠিকানা ছিল সেটা। আমি বুঝে গেলাম আমি এখানে নিরাপদ নই, সেখানে আর থাকি নি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকি নি। তারপরে দু’টো ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেল, টিক্কা খান যখন গভর্নর হিসেবে চলে যান, মালেক যখন গভর্নর হলেন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য যে ফাইল ছিল, তা সে শেষ করে দিয়ে গেছে। আমাদের ছয়জন শিক্ষককে সতর্কতার চিঠি দিয়ে গেছে যাওয়ার সময়। তখন যিনি ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, তিনি ডেকে আমাদের টিক্কা খানের সতর্ক বার্তার চিঠিটি দেয়া হলো।
দ্বিতীয়টা হলো আল-বদরদের তালিকার মধ্যে, পরে যে তালিকা পাওয়া গেল আল-বদরের ডাইরির মধ্যে অনেকের নাম পাওয়া গেছে। যে তালিকা রাওফরমান আলীর তৈরি। তাতে যাদের নামের পাশে ঠিকানা আছে তাদের ধরে নিয়ে গেছে। সেটা পরে প্রকাশিত হয়েছে সংবাদপত্রে, সেখানে আমার নাম আছে কিন্তু নামের পাশে ঠিকানা নেই। তখন আমি আগের ঠিকানায় থাকি না। আমি নানান জায়গায় থাকি তখন। আমার তখন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। একাত্তরের পুরো সময় এখানে ওখানে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেই ছিলাম। আত্মীয়-স্বজনরাও একধরনের বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তো, তা বুঝতে পারতাম। তারা নিজেরাই বিপদে আছে আর উটকো একটা ঝামেলা এসে ভর করেছে। তখন এমন ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তারা মারবেই। আমরা আল-বদরদের হাত থেকেও বেঁচেছি, আবার জেনারেল নিয়াজী যে আত্মসমর্পণ করলো সে জন্যও বেঁচেছি। অথচ আমাদের অনেক শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ওই ঠিকানার কারণেই তাঁদের প্রাণহরণ করা সম্ভব হয়েছিল।
মানুষ মুক্তির জন্য লড়াই করছে, মুক্তির সংগ্রামটাতো চলবেই। মুক্তির সংগ্রাম আছে বলেই তো আমি পুঁজিবাদকে ভালোভাবে বুঝতে পারি, অনুধাবণ করতে পারি। পুঁজিবাদের সম্পর্কটা একটা জায়গায় এসে পড়েছে যখন সে ফ্যাসিবাদের রূপ নেয়। এখন পৃথিবীময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ছে। এমন সব লোক নির্বাচিত হয়ে আসছে যারা ওই সমাজের নিকৃষ্ট প্রতিনিধি। গৃহযুদ্ধের জায়গা আসছে, আগে যেমন বিশ্বযুদ্ধ ছিল এখন দেশের ভেতরেই যুদ্ধটা হচ্ছে। এটা ভাঙবে, নতুন একটা সম্পর্ক তৈরি হবে, মানবিক সম্পর্ক, যে সম্পর্কটা প্রভু এবং ভৃত্যের না, মানুষের সাম্যের সম্পর্ক। অধিকারের এবং সুযোগের সাম্য থাকবে। সে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্য এখন বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম চলছে। সব দেশের মানুষ জ্ঞাতে অজ্ঞাতে লড়ছে সেজন্য। এই ব্যবস্থাটা পৃথিবীতে আসতে হবে, কিন্তু সেখানে যেটা প্রধান সমস্যা সেটা হলো যে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা নাকি সামাজিক মালিকানা? এই ব্যক্তিগত মালিকানাতে পুঁজিবাদ বিশ্বাস করে, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গাতে এখন আর থাকতে পারছে না। অল্প কয়েকজন লোকের হাতে এত সম্পত্তি, বাকি সবলোক বঞ্চিত, এটা টিকবে না। কাজেই সামাজিক মালিকানার দিকে যাবে, আমরাও যাবো। ওই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের কোন মুক্তি নেই।

x