আমার বুড়ির ছেলেবেলা

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ১০ মার্চ, ২০২০ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
106

আমার মেয়ে স্কুলে যেতে শুরু করে সাড়ে তিন বছর বয়সে। কোনদিন মা, কোনদিন বাবা ওকে স্কুলে নিয়ে যায়। ঠাণ্ডা, বৃষ্টি, ঝড়, গরমে হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসা যাওয়া করে। বিরামহীন কথার খৈ ফোটে সারা পথ। ছুটির শেষে বাড়ি ফেরার পথে পাতা কুড়োয়, ফুল কুড়োয়। গাছের ডাল, পাথরের টুকরাও নিয়ে নেয় চলার পথে। সব বোঝাই করে ঘরে নিয়ে আসে।
স্কুলে বন্ধুদের সাথে খেলায় মাতে ধুলো-বালি, কাদা-পানি- এসব দিয়ে। গাছে চড়ে। দোল খায়। বানরের মতো ডিগবাজি দেয়। খাবার সময় হলে সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে হাত ধুয়ে বাড়ি থেকে আনা খাবার খায়। পানি খায়। তারপর আবার শুরু খেলা। এবার হয়তো স্কুল ঘরের ভেতর। ছবি আঁকা, পুতুল খেলা, গান গাওয়া, নাচ করা, বই পড়া, কাগজ কেটে ফুল পাখি লতা পাতা তৈরি করা, রান্না করা… হরেক রকমের কাজ। শেষের পনের বিশ মিনিট সবাই মেঝেতে বসে পড়ে। শিক্ষক একটা ছবিওয়ালা রঙিন বই নিয়ে ওদের পড়ে শোনান। এরপর গান গায় সবাই মিলে। বাদ্যযন্ত্র থাকে অনেকের হাতে।
প্রতিদিন দু’তিন জন বাবা-মা স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেন; স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে। ওদের তত্ত্বাবধান করা, দেখে শুনে রাখা- এই আর কি। শেষ বাচ্চাটাও বাড়ি চলে গেলে স্কুল পরিষ্কারে হাত লাগাতে হয়। বিশেষ কোন দিবস এলে পাঁচ সাতজন এসে কাজে লেগে যান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্কুলের মাঠ, দরজা জানালা পরিষ্কার আর রঙ করার কাজও বাবা মায়েরা করে দেন হাসিমুখে।
মাঝে মাঝে খামার থেকে পশু পাখি নিয়ে আসা হয়। গরু, ছাগল, ভেড়া, খরগোশ, হাঁসমুরগি চড়ে বেড়ায় স্কুলের মাঠে। ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে খেলায়, পশুপাখিদের সঙ্গে। ওদের ডাক নকল করে। হ্যাট বুট পরা কৃষক আর কিষাণি ওদের দেখান কেমন করে খাবার খাওয়াতে হয়, যত্ন নিতে হয় পশুপাখিদের। আরও শিখিয়ে দেন কেমন করে দুধ দুইতে হয়, মাখন বানাতে হয়। তাইনা দেখে কতো জনে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে; বড় হয়ে আমি কৃষক হবো।
স্কুল ঘরের ভেতরে কাঁচের বাক্সে হাঁস মুরগির ডিম রেখে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়। বাচ্চাদের চোখের সামনেই ডিম ফুটে বের হয়ে আসে নরম পেলব হাঁসের বাচ্চা, মুরগির ছানা। জন্মেই হাঁটতে শুরু করে ওরা। ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা ওদের ছুঁয়ে দেখে সীমাহীন বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে। আলতো করে কোলে তুলে নেয় কেউ কেউ।
চিড়িয়াখানা থেকে ভয়ঙ্কর জন্তু জানোয়ারও আসে স্কুল সফরে। শান্ত শিষ্ট সাপ; করেনাকো ফোঁসফাস, মারেনাকো ঢুষঢাষ। জলজ্যান্ত কুমির, কোয়ালা, এচিন্দা, গিরগিটি, সজারুও আসে। আরও আসে কুকাবারা, লরিকিটসহ নানান জাতের পাখি। চিড়িয়াখানার রক্ষক সাবধানে ওদের খাঁচা থেকে বের করেন। বাচ্চারা কেউ ভয়ে, কেউ নির্ভয়ে ওদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। সবার পালা শেষ হলে আবার ওদের খাঁচায় পুরে রাখেন তিনি। দুঃসাহসীদের কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে; আমি না হয় চিড়িয়াখানার রক্ষকই হবো।
স্কুলে থেকে একবার শিক্ষাসফরে ওদের নিয়ে যাওয়া হয় বাজার পরিদর্শনে। শিক্ষকগণ ও স্বেচ্ছায় অংশ নেয়া বাবা মায়েদের তত্ত্বাবধানে আধা কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ওরা বাজারে যায়। সবার হাতে দেওয়া হয় খুচরো পয়সা। তবে চার টাকার বেশি নয়। যে যার পছন্দের জিনিস দাম দেখে বেছে নেয়। তারপর সারিবেঁধে হেঁটে যায় দোকানির দিকে। তাঁকে পয়সা বুঝিয়ে দিয়ে নিজেদের জিনিস বুঝে নেয় তিন চার বছর বয়সী ক্ষুদে ক্রেতাগণ। দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কী পরিতৃপ্তি একেকজনের চোখে মুখে ! মনে হল এই বুঝি বিশ্ব জয় করে এলেন তাঁরা ! দোকানদার মানুষটার কি মজা ! পুরো দোকানটা তার কব্জায়। ওর মতো দোকানি হলে কেমন হয় ! স্বপ্ন দেখতে শুরু করে কোন কোন শিশু।
এমনি করে দলবেঁধে একদিন ওরা যায় হাসপাতাল পরিদর্শনে । এরপর খামার, চিড়িয়াখানা, পাড়ার গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে বাদ থাকেনা আগুন নির্বাপণি কার্যালয়, এমনকি পুলিশ ফাঁড়িও। পুলিশের গাড়িতে বসে ছবি ওঠায় ওরা। পুলিশ সদস্যরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ওদের গান শোনায়, নাচ দেখায়। ওদের কেউ কেউ সামিল হয় নাচে গানে। কেউবা কেবল হাততালি দিয়েই উচ্ছ্বাসটা প্রকাশ করে। আগুনকর্মীদের সাথে তাঁদের ট্রাকে উঠেও ছবি তোলে বাচ্চারা। উহ ! উত্তেজনায় টগবগ করতে থাকে ছেলেমেয়েরা।
স্কুলের ছোট্ট মাঠ ছাড়িয়ে মাঝে মাঝে ওদের নিয়ে যাওয়া হয় বড় খেলার মাঠ বা বিশাল কোন উদ্যানে। দূরের পথ হলে খাবার আর পানি সাথে নিয়ে যেতে বলা হয়। যার ঝোলা তাকেই বহন করতে হয়। যাওয়া আসার পথে ওদের বলা হয় কেমন করে রাস্তা পার হতে হয়, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হয়, নিজের ডাক আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়।
একবার স্কুলঘরেই বানানো হয় সৌরজগত। রঙ বেরঙের, সোনালি রূপালি কাগজ দিয়ে গ্রহ নক্ষত্ররাজী বানিয়ে সাজানো হয় সবকিছু। ছেলেমেয়েরা কেউ গ্রহের সাজ নেয়, কেউ চাঁদ, কেউ সূর্য, আবার কেউবা জ্যোতির্বিদের। কেমন করে গ্রহরা ঘুরে, দিন শেষে রাত আসে; মাস, বছর পাড়ি দেয় আমাদের প্রিয় পৃথিবী নামের গ্রহটা- সব ওদের জানানো হয় নাচে গানে। সমুদের তলদেশে বাস করে লক্ষ কোটি প্রাণী। রঙ বেরঙের পোশাক আর নাচে গানে ওদের অনেকের সাথেও পরিচয় হয় ছেলেমেয়েদের।
এই স্কুলে নানান দেশের নানান রঙের ছেলেমেয়েরা আসে। স্কুলে সবাই ইংরেজি বললেও বাড়িতে সবাই কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়। খাবার পোশাক সবকিছুই আলাদা ওদের। সাংস্কৃতিক সমপ্রীতির এক অনুষ্ঠানের জন্য বেশ মহড়া হল কদিন ধরে। নানান ভাষার বাবা মায়েরা এসে বর্ণমালা আর পতাকা আঁকা শেখান ওদের। বাচ্চাদের হাতের লেখা আর আঁকা ছবি দিয়ে সাজানো হয় স্কুল। শেষদিনে সবাই আসে দেশের পোশাকে। মায়েদের হাতে হাতে থালিভরা দেশের খাবার। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে আমারই শেখানো নানান ভাষার, নানান রঙের বাচ্চাদের হাতে লেখা ‘অ’, ‘ক’ আর ‘লাল-সবুজ পতাকা’। শাড়িতে সেজে আমরা মা-মেয়েতে মিলে গাইলাম- সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভুমি।
খেলতে খেলতে হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে শেষ হল আমার মেয়ের প্রথম স্কুলের পাঠ। দুবছরে অক্ষরজ্ঞান কিছুই শেখা হয়নি ঐ স্কুলে। অথচ বছর শেষে বাচ্চাদের সবাইকে নিয়ে রচনা লিখে কুল পান না প্রধান শিক্ষক। সবাই ভালো, সবাই মেধাবী, সবাই ‘স্পেশাল’ মূলকথা এই-ই। তবুও তাঁর যেন দম ফেলার সময় নেই। ডিসেম্বরের তীব্র গরমে দিনরাত খেটে তিনি তৈরি করেন সবার জন্য সনদ আর ছাড়পত্র। যারা বিদায় নিচ্ছে দু’বছরের কোটা শেষ করে তাদের জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলেন। তাঁর জন্য কেঁদে বুক ভাসায় বাচ্চারা। মায়েদেরও চোখ ভেজা।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাসযোগ্য শহরের এক শিশু বিদ্যায়তনে কাদা- মাটি, ফুল-পাখি, লতা-পাতা, আর বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এমন অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশে বছর দুই কাটানোর পর মেয়ের আমার সময় হল বড় স্কুলে যাবার। এরপর গন্তব্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সে গল্প না হয় তোলা থাক অন্য কোন একদিনের জন্য।