আমাদের শহরটা ভাল নেই

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৩০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
588


প্রিয় শহরটা ভালো নেই। জলজট আর জনদুর্ভোগে কীভাবে ভাল থাকে। কত নামে ডাকতে শুনেছি এ-শহরকে। এই শহরের অসাধারণরূপে মুগ্ধতা সবার দেশি কিংবা বিদেশি। এই শহরের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। নদী সাগর ও পর্বতের এমন বৈচিত্র্যময় সমাবেশ খুব কমই আছে। বর্ষায় নাকাল এই চট্টগ্রামের অবস্থা জানার চেষ্টা করছি কয়েকদিন ধরে। বর্ষায় বৃষ্টি হবে এটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু আমাদের জানা নেই সিটি কর্পোরেশন ও চউক, ওয়াসা আরো যারা সেবা সংস্থাগুলো পরিচালনা করছেন তারা কি করছেন? হাঁটু পানি ছেড়ে কোমর ছেড়ে বুক। স্থবির সবকিছু কেন এমন হবে এত গুরুত্বপূর্ণ শহরটির? অনেক প্রশ্ন মানুষের। একটি পত্রিকার রিপোর্টে দেখলাম জল থৈ থৈ শহরের খাল পানি শূন্যতায় ভুগছে। তার মানে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতিপথগুলো বন্ধ হয়ে আছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাভূমি নিম্নাঞ্চল খালবিল নদী ভরাট ও দখল, খাল ও নালা নর্দমা আবর্জনায় ভরাট। নিয়মিত পরিষ্কার না করা, সংস্থাগুলোর দায়িত্বে অবহেলা, সমন্বয়হীনতা, জনসচেতনতার অভাব সব মিলিয়ে শহরটা অসুস্থতায় ভুগছে। উন্নয়নের ফ্লাইওভারও পানিতে ভাসছে। সমন্বয়হীনতা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা পাশাপাশি জোয়ারের পানি ঠেকানোর মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার কারণে শহরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও, হালিশহর, জোয়ারের পানির সাথে মিশে দক্ষিণ পশ্চিমে বিশেষ করে হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী আকার ধারণ করেছে।
চট্টগ্রাম শহরে এক সময় ১৯০০০-এর ওপর পুকুর ও জলাশয় ছিল। নগরে পাঁচ শতাধিক কুয়া ছিল এখন আর একটাও অবশিষ্ট নেই। নদী দখল, খাল দখল, পুকুর জলাশয় দখল, কুয়া দখলে বৃষ্টির পানি জমে মানুষের জীবন অচল করে দিচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের জন্য আগাম কোন প্রস্তুতি নেই আমাদের সংস্থাগুলোর। চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯২ সালে তিনটি নতুন ১৫টি শাখা খাল খননের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২৭ বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় নি। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার ২০১৭ সালে তিনটি প্রকল্পে ৯ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। এর মধ্যে সিডিএ বাস্তবায়ন করেছে ৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পাউবো ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। এসব প্রকল্পে নালা নর্দমা, খালের পুনঃখনন, বাঁধ নির্মাণ, জোয়ার প্রতিরোধক ফটক খালের দু’পাশে প্রতিরোধ দেয়াল, সেতু কালভার্ট নির্মাণ এবং বালুর বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু নতুন শাখা খাল খননের কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এমনকী যে-সংস্থাটি এক সময় নতুন খাল খননের সুপারিশ করেছিল। সেই সিডিএ কর্তৃপক্ষও কোনো বরাদ্দ রাখেনি। প্রায় শোনা যায় চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার জন্য কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবায়নও হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিশ্বের কোথাও সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার জন্য উদ্দেশ্য সফল হয় না। সবচেয়ে বড় কথা জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সকল সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন খাল ও শাখা খাল খনন এবং জলাধার স্থাপনেরও বিকল্প নেই।
প্রতিটি খাল তার মূল অবয়বে ও আয়তন অনুযায়ী পুনরুদ্ধার, সীমানা খুঁটি বসানো ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং কর্ণফুলীর নাব্যতা সুরক্ষা, নদী রক্ষা কমিশনকে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে। এটা শ্রাবণ মাস। বৃষ্টি এখন বিরতি নিয়েছে। আবারো হবে। আবারো সেই দুর্ভোগে পড়তে হবে নগরবাসীকে।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের বিপুল অবদান থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম পিছিয়ে আছে। বড় বড় ফ্লাইওভার আর ঝলমলে স্থাপনা চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান নয় জনজীবনে শৃঙ্খলা না আনতে পারলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। ভাঙাচোরা রাস্তায় জনপরিবহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা। বিমানবন্দর কিংবা সি-বিচে যাওয়ার পথে লম্বা লম্বা কার্গো লরির সারি রাস্তার ওপরেই পার্ক করা একই রাস্তায় চলে রিকশা, টেঙি, প্রাইভেট কার, বাস সব এক সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে। সি-বিচের পথে যে কন্টেনার ইয়ার্ড এবং জেটি হয়েছে আরো প্রাইভেট ইয়ার্ড হচ্ছে তা নদীকূলের নান্দনিকতা ও বিচের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। কন্টেনার ইয়ার্ডগুলো এখানে করার আগে কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত ছিল। চট্টগ্রামকে পর্যটন উপযোগী শহর গড়ে তোলার বিকল্প নেই। চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের সম্পদ।। খাল, নদী, সাগর, পাহাড় সবকিছু ধরে রাখার উদ্যোগই বাঁচাতে পারে এই অসম্ভব সুন্দর শহরটিকে। প্রকৃতি প্রদত্ত চট্টগ্রামের নান্দনিক সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। নদী-সাগর-পাহাড় জড়িয়ে রাখুক আমাদের প্রিয় শহরকে। প্রাচ্যের রাণী, বাণিজ্যিক রাজধানীতে উন্নয়নের পেরেক ঠুকে আরো রক্তাক্ত হোক তা চাই না।
চট্টগ্রামের স্বকীয় সৌন্দর্য অক্ষত রেখে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ুক সেটাই প্রত্যাশা করি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে হাসপাতাল হলেও কাম্য নয়। তিলোত্তমার তিলের মত পাহাড়গুলো কেটে ইট পাথরের দালান উঠুক তা আমরা চাই না।
আমাদের চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে গ্রাম হয়ে থাকুক। সেবা সংস্থাগুলো সমন্বয় করে নাগরিক সকল সমস্যার সমাধান করুক। আপাতত: বর্ষায় জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে পারার মত ব্যবস্থা নিক। জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে।

x