আমাদের এমন পৃথিবীতে থাকা উচিত নয় যেখানে নারীরা ‘না’ বলতে ভয় পায়

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
84

এলি ম্যায় ও’হ্যাগান একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। যিনি মূলত গার্ডিয়ান পত্রিকার জন্যই লিখে থাকেন। নারী পাতার জন্য এই লেখাটি অনুবাদ করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি

কয়েক বছর আগে, আমি এমন এক লোকের অধীনে কাজ করতাম যিনি আমার চেয়ে কয়েক দশক বড় ছিলেন এবং ক্রমাগত আমাদের কার্যক্ষেত্রে আমাকে নিয়ে ও অন্য নারী অল্পবয়সী সহকর্মীদের নিয়ে তেলতেলে ও যৌন সুড়সুড়িমূলক মন্তব্য করতেন। আমরা যে তাঁকে নিয়ে আমাদের বিরক্তি ভাগাভাগি করে নিতাম এ-ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না, তিনি এটাও জানতেন না যে, ভবনে উনার উপস্থিতি আমাদের সঙ্কুচিত করে ফেলত প্রত্যেকটাবার; কারণ প্রতিবার উনি যা-ই বলতেন আমাদের জোর করে হাসতে হত তাঁর এই ভুল ধারণাটা জোরদার করতে যে আমরা আসলে তাঁর আচরণ খুব উপভোগ করছি।
তাঁর কথা এই সপ্তাহে আমার আবার মনে পড়ল যেদিন আমি পড়লাম যে ম্যানচেস্টার-এর কিশোরী গ্যাব্রিয়েল ওয়ালশকে ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছে কারণ সে নাইট ক্লাব থেকে অনুসরণ করে আসা লোকটাকে বলেছিল: ‘আমি দুঃখিত, আমি আগ্রহী নই।’ যদিও ওয়ালশ-এর অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও চরম ও ভয়ানক, দুটো উদাহরণই বোঝায় যে, কোন পুরুষ যখন শারীরিক অথবা আর্থিকভাবে সবল হয় তখন তার অযাচিত অগ্রসর হওয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে নারীরা কতটা অনীহা বোধ করে। মধ্যরাতে মদের ফোয়ারার মাঝে তুমি যদি কোন পুরুষকে না বল সে হয়ত উন্মত্ত হয়ে তোমার শারীরিক কোনো ক্ষতি করতে পারে। সেই মানুষটা যদি তোমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হন, তুমি যদি তাকে জানাও যে তিনি যা নিজের অদম্য যৌনাকর্ষণ ভাবছিলেন, তা আসলে যৌন হয়রানি। তাহলে হয়তো তোমার পক্ষে তোমার কর্মস্থলে কাজ করা কঠিন হতে পারে।
কিন্তু পুরুষদের এই অযাচিতভাবে নারীদের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে নিজেদের কোনো ক্ষমতা থাকার প্রয়োজন নেই। দার্শনিক সান্দ্রা লি বার্টকি পিতৃতান্ত্রিকতাকে বৃত্তাকার সর্বদৃষ্ট কারাগারের সাথে তুলনা করেছেন, এমন এক কারাগার যেখানে সব বন্দীর জন্য একজন পাহারাদার থাকেন আর বন্দী মানুষটি বলতেও পারেন না তিনি পাহারাদারীতে আছেন কি নেই। তাদের মনে হয় তারা সারাক্ষণ নজরদারিতে আছে। পাছে কোন সমস্যা না হয় তাই সারাক্ষণ ভদ্রভাবে থাকতে তারা নিজেদের উদ্বুদ্ধ করে। একইরকম ভাবে, বার্টলি যুক্তি দেখান, বেশিরভাগ মহিলার অবচেতনে একজন ‘পুরুষ সমঝদার’ বাস করে এবং তারা যে পুরুষ শাসিত সমাজে নিয়ত বিচারাধীন থাকে এ-ব্যাপারে সবসময় তারা হুঁশিয়ার থাকে, এমনকী তখনো যখন তারা এ-ধারণা জোরদার করতে কিছু করে না।
অন্যভাবে বললে, তাদেরকে না বলাটা যে ভয়ঙ্কর সেটা বোঝাতে পুরুষদের সরাসরি মহিলাদের শাসানোর দরকার নেই। আমরা জানি যে তাদের অগ্রসর হওয়াটাকে আমাদের খুব বিনীত হয়ে, নমনীয়ভাবে ও কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করতে হবে এবং এই সচেতনতাই আমাদের লাইনে রাখতে পারে। নিশ্চিতভাবে হয়ত সেই লোকটি আপনার গায়ে হাত তুলবে না। কিন্তু আপনাকে হয়ত নিরাসক্ত বলতে পারে, হয়ত অভিযুক্ত করতে পারে এই বলে যে আপনি তাকে প্রলুব্ধ করেছেন, হয়ত এটা আপনারই ভুল ছিল- আপনি কি একটু বেশিই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন? আপনি কি তার কৌতূহলে বেশি হেসেছিলেন? আপনি কি তার সাথে খুব বেশি কথা বলেছিলেন?
গধহপযবংঃবৎ ঊাবহরহম ঘবংি এর সাথে কথা বলার সময় ওয়ালশ নিজেই মহিলাদের অব্যক্ত চাপ অনুভবের প্রসঙ্গ তোলেন: ‘মেয়েরা ভাবে তারা না করতে পারবে না। তারা অনুভব করে যে তারা যদি না করে তাহলে (পুরুষরা) তারা আঘাতপ্রাপ্ত হবে এবং এ প্রসঙ্গে কথাটা সত্যি।’ এটা যৌনবৈষম্যের একটা দিক যেটা নিয়ে আমরা কথা খুব একটা বলি না যে মহিলাদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা এত বেশি যে পুরুষদের সেটা পূরণ করতে কিছু করতে হয় না। হ্যাঁ মাঝে মাঝে যৌনবৈষম্য খুব চোখে লাগে যেন কোন পুরুষ তোমাকে মুখে ঘুষি মেরেছে কারণ তাকে তুমি নিরাশ করেছ। কিন্তু অন্যসময় এটা এমন একটা জিনিস যা আপনার মস্তিস্কে থাকে এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এটা এমন একটা ব্যপার যা তোমাকে অনুভব করতে বাধ্য করে যে কোনরকম চাপ না আসলে তুমি না করতে পারবে না।
গঊ ঞঙঙ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন যখন আমি আমার বান্ধবীদের সাথে তাদের যৌন হয়রানীর অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলি তখন যেটা আমাকে অবাক করে, সেটা এটা না যে ওরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বরং এটা যে ওরা কত স্বাভাবিক। এটা এ কারণে না যে যৌন হয়রানী তেমন কোন বড় ব্যাপার নয়; বরং এ জন্য যে, মহিলাদের তাদের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে এমন এক বিশ্বে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যেখানে এই ধরনের যৌনবৈষম্য খুবই সাধারণ। আমরা শিখেছি যে, যখন আমাদের অপদস্থ করা হয় তখন মস্তিস্কের যে অংশটা কষ্ট পায় তাকে কীভাবে দুর্বল করতে হয়, কারণ এমন করা না হলে তা অবাস্তব হত। অজস্র মহিলা এই অবস্থা মেনে নিয়েছে দিনযাপনের অংশ হিসেবে। হয়ত আমরা এই বাস্তবতা নিয়ে অতটা কথা বলি না কারণ যৌনবৈষম্য নিয়ে যে একটা ধারণা আছে যে পাকানো গোঁফওয়ালা কেউ দুর্বল নারীদের শিকার বানাবে, এটা তার চেয়েও জঘন্য।
আমি বিশ্বাস করি আমরা সমাজকে ভিন্নভাবে সাজাতে পারি। সেই সাথে নারীরা যেন কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং লৈঙ্গিক অত্যাচার রোধে কঠিন শাস্তির বিধান করতে হবে। আমরা সঠিক মূল্যবোধ এর চর্চা করতে পারি। আমরা ছেলেদের এমনভাবে বড় করতে পারি যাতে তাদের মধ্যে গভীর সহানুভূতি সম্মান ও নম্রতা গড়ে ওঠে। আমরা বহির্জগতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারি ও তাদের গল্প শোনাতে পারি। আমরা স্বীকার করতে পারি যে গ্যাব্রিয়েল ওয়ালশকে কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমন কেউ ঘুষি মারেনি যে জন্মগতভাবেই শয়তান; বরং সে স্বীয় অধিকারবলেই তাকে ঘুষি মেরেছে কারণ সে এমন একটা সমাজে বাস করে যেখানে এই অধিকারকে অনুপ্রাণিত করা হয়। এখনকার বাড়ন্ত বয়সের মেয়েরা যেন ভাল অভিজ্ঞতা অর্জন করে আমরা তা নিশ্চিত করতে পারি, কিন্তু তা করতে আমরা যে সমাজে বাস করছি তা বদলানোর ক্ষেত্রে সাহসের প্রয়োজন।

x