আমাদের একটা পুকুর ছিল

মাহমুদা খানম

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ
40

মহিলা কলেজ চট্টগ্রামে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করি ১৯৭৮ এর অক্টোবরে। সদ্য নির্মিত একটা দোতলা ভবন (বর্তমান মূল ভবনের অর্ধেক) বাঁশের তৈরি একটা ঘর আর পুকুর পারে একটা পুরান সাদা দোতলা ভবন এই ছিল তখনকার কলেজ। নতুন ভবনে মানবিক বিভাগের ক্লাস হত আর পুরান ভবনের নীচ তলায় অধ্যক্ষের কক্ষ, অফিস আর শিক্ষকদের কমনরুম। বাংলা ইংরেজিসহ মানবিকে ছয় বিষয় আর বিজ্ঞানে চার বিষয়ে মনে হয় আমরা ষোল জন ছিলাম। বিজ্ঞানে ছাত্রী খুব কম ছিল। ক্লাসে ২০/২১জনের বেশি থাকতোনা। পুকুরের চারদিকে নারকেল আম গাছ একটু দূরে কাঁঠাল আর অন্যান্য গাছ আর ছিল মাছ। মাঝে মধ্যে নারকেল আম কাঁঠালের ভাগ পেতাম। একবার কলেজে মাছ রান্না করে সবাই মিলে খেয়ে ছিলাম। তো একবার কলেজে মিনাবাজার করা হবে আহ্বায়ক হলেন দিলরুবা আপা। উনি কমিটি করে সবাইকে কাজ ভাগ করে দিলেন। আমার ভাগে পড়ল স্টল বরাদ্দের দায়িত্ব। আমি মহা খুশি স্টল ঠিক করে নির্দিষ্ট দিনে লটারি করে স্টল বরাদ্দ করলেই চলবে। কোন ঝামেলা নেই। খুব শীঘ্রই টের পেলাম ঝামেলা কাকে বলে। লটারির দিন কলেজে উপচে পড়া মানুষের ভীড় বেশির ভাগই স্থানীয়। তাদের দাবী আমাদের এলাকার কলেজ মানে আমাদের কলেজ স্টল দিতেই হবে।এরপর উপাধ্যক্ষের কক্ষ অফিস বারান্দা সিঁড়ির নীচে মাঠের আনাচে কানাচে সব জায়গায় নতুন স্টল করে কোন মতে সামাল দেয়া গেল। মীনাবাজারের আগের দিন বিকেলে সংগীত পরিষদের ওরা এসে ধরল পুকুরটা ওদের দিতে হবে। ওখানে নৌবিহারের ব্যবস্থা করবে। আমার মনে আছে সবার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নৌবিহার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে ভীড় ছিল পুকুর পারে।এরপর ছাত্রী সংখ্যা বেড়ে গেলে পুকুর ভরাটের সিন্ধান্ত নিয়ে মিউনিপ্যালিটিকে এ কাজে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করা হল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য কলেজ বন্ধ আমরা পরীক্ষা কমিটির সদস্যরা কলেজে গেছি পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজ করতে। গেট দিয়ে ঢুকতেই নাকে এল তীব্র দুর্গন্ধ। জানা গেল আগের রাতে শহরের সব আবর্জনা মরা কুকুর বেড়াল সব ফেলা হয়েছে পুকুরে। দোতালার একটা কক্ষের দরজা জানালা বন্ধ করে কাজ করতে বসলাম। কিন্তু দুর্গন্ধে টেকা দায়। উপাধ্যক্ষ হাসনাত রাজিয়া আপা নিচের বাগান থেকে বেলি ফুল আনিয়ে টেবিলে রেখে দিলেন। বাসায় যাওয়ার সময় নিচে নেমে দেখি আবর্জনার জন্য পুকুরের সব মাছ মরে ভেসে উঠেছে আর লোকজন ভীড় করে সেগুলো নিয়ে যাচ্ছে। এটা দেখে অনেক দিন মাছ খেতে পারিনি।এরপর মাটি ফেলে পুকুর ভরাট করা হল। আবর্জনা পচা সার আর বৃষ্টির জন্য অল্প দিনের মধ্যেই সবুজ ঘাসে ভরে গেল ভরাট করা পুকুর। মহিলা কলেজের মানচিত্র থেকে মুছে গেল পুকুরের অস্তিত্ব।

x