আমাকে যেন ভুলে না যাও

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:১৪ পূর্বাহ্ণ
85

অন্য একটা বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। টিভিতে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর সংবাদটি জেনে আর লিখতে মনে চাইলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ছিলাম তখন সিনেমা হলে গিয়ে মূলধারার সিনেমা দেখা কমে এসেছে। মূলধারার ছবির মানে ভাটা পড়তে শুরু করেছে সে সময়। চট্টগ্রামে বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে বিশ্বসেরা চলচ্চিত্রগুলো তখন প্রদর্শিত হতো। দেখতাম। এছাড়া দিনার, রিদম মেলোডি ও আকাশ এই চারটি ছোট প্রেক্ষাগৃহে ওয়েজ আর্নার স্কীমের আওতায় আমদানীকৃত ধ্রুপদী এবং উন্নতমানের নতুন ছবি প্রদর্শন করা হতো। অর্থাৎ ভালো ছবির দেখার অনেক সুযোগ পেয়ে আর তেমন সিনেমা হল মুখী হচ্ছি না।
এসময় একটা দেশীয় ছবি মুক্তি পেল। বেলাল আহমেদের পরিচালনায় ‘নাগরদোলা’। দক্ষিণবঙ্গের ঘূর্ণিঝড়ের একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে ছবিটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই ছবিটির গান নিয়ে চারদিকে আলোচনা হতে থাকে। ছবির সংগীত পরিচালক নতুন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল প্রথম ছবিতেই জমিয়ে দিয়েছেন। ছবিটির কাহিনিতে ও নির্মাণে ভিন্নতা ছিল। সংগীতেও বেশ নতুনত্ব। লোক-সংগীতকে আশ্রয় করে হলেও সুরকারে সুরের নিজস্বতা ছিল। দুর্দান্ত মেলোডিপূর্ণ। ছবিটি বেশ দর্শক সমাদৃত হয়েছিল। নাগরদোলা ছবিটি আমি দেখি ১৯৮০ সালের শেষ দিকে পাবনায়। সেখানেও দেখেছি ছবির গানগুলো দর্শককে যথেষ্ট উন্মাতাল করে তুলেছিল। এছবি আজ আর হয়তো দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু গানগুলির কথা বললে সবাই চিনবেন, রথীন্দ্রনাথ রায়ের কন্ঠে ‘তুমি আরেকবার আসিয়া-যাও মোরে কান্দাইয়া’, সাবিনা ইয়াসমিনের কন্ঠে ‘অন্তর আমার করলাম নোঙর কোন সে বন্দরে, ‘আমার মন কান্দে ও আমার প্রাণ কান্দে।’ এ ছবিতে প্লে ব্যাকের জন্য রথীন্দ্রনাথ রায় ও সাবিনা ইয়াসমিন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ছবির গীতিকার ছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু।
এদেশের আরেকজন অকাল প্রয়াত প্রতিভাধর গীতিকবি।
নজরুল ইসলাম বাবু ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জুটি ছিল অসাধারণ। চমৎকার বোঝাপড়া ছিল দুজনের মধ্যে। এ জুটির অসামান্য কিছু কম্পোজিশন, ‘সবকটা জানালা খুলে দাওনা’ ‘ ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’ ‘উত্তর দক্ষিণ পূর্ব’ পশ্চিম সব ঘুরে এক ব্রহ্মচারী,’ ‘সেই রেল লাইনের ধারে মেঠো পথটার পাশে দাঁড়িয়ে’ ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য’ এরকম আরো কিছু দুর্দান্ত কম্পোজিশন, সবগুলিই সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া। বুলবুল একবার বলেছিলেন সাবিনা ইয়াসমিনই তাঁর উত্তরণের ভিত্তি। বাস্তবেই তাই। দুজনের মধ্যে ছিল সুন্দর বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া তাঁর কম্পোজিশনের ৭/৮টি গান যা বিটিভিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়েছিল, (কোনো এক জাতীয় দিবসে) তাঁকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। এর কয়েকটি গান তাঁর নিজের লেখা। বাকীগুলো নজরুল ইসলাম বাবুর। বিশেষ করে একটি গান এঁদের তিনজনেরই সিগনেচার টিউন হয়ে গেছে, ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না।’
দেশাত্ববোধক গানে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের যে পারঙ্গমতা ও খ্যাতি এর নেপথ্যে যে রয়েছে নিখাদ দেশপ্রেম এ কথা বলাই বাহুল্য। এ কারণেই আমাদের সংগীতের বিশেষ এই ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য দখল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২ নং সেক্টরে মেজর হায়দারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি তার কলম ও হারমোনিয়ামকে রাইফেলের বিকল্প করে তোলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকালে তিনি ছিলেন অন্যতম সাক্ষী। গোলাম আজমের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে গিয়ে তিনি এই পাপিষ্টের কার্যকলাপ বর্ণনার সময় আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এ নিয়ে তাকে জীবন শংকায় পড়তে হয়। আক্রান্ত হন। কিন্তু নিজে বেঁচে গেলেও তার ছোট ভাইকে বাঁচাতে পারেননি। যুদ্ধাপরাধের বিচার চলাকালে তার ছোট ভাই মিরাজ ঢাকায় নির্মমভাবে খুন হন ২০১২ সালে। এভাবেই যুদ্ধাপরাধীরা বুলবুলের উপর প্রতিশোধ নেয়। বস্তুত তখন থেকেই বুলবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১২ থেকে তিনি বাসভবনে পুলিশ পাহারায় নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রহরাধীন ছিলেন। তাই গৃহবন্দিতাই তার অসুস্থতার মূল কারণ বলে মনে হয়।
২০১২ সালে তার হৃদযন্ত্রে আটটি ব্লক ধরা পড়লেও তিনি তা জনসমক্ষে জানাননি।২০১৮ সালে এ বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নজরে আসে। তিনি বুলবুলের চিকিৎসার ভার নেন। তবে তখন সময় প্রায় শেষ। চিকিৎসা শুরু হলেও তাতে আর নিরাময়ের অবকাশ হয়নি। নাগরদোলার পর যে দুটি ছবি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে কেবল প্রতিষ্ঠিতই নয়, অতন্ত শ্রোতৃপ্রিয় ও অপরিহার্য করে তোলে ছবি দুটি ‘নয়নের আলো’ (১৯৮৪) ও মেঘ বিজলি বাদল। নয়নের আলোর পরিচালকও বেলাল আহমেদ। এ দুটি ছবির গান এদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের চিরসবুজ কিছু নিদর্শন। এখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও সমাদৃত। নয়নের আলো ছবিতে সামিনা চৌধুরীর কন্ঠে ‘আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে জ্বলবো’ সামিনা ও এন্ড্রুর দ্বৈতকন্ঠে আমার বুকের মধ্যিখানে-মন যেখানে হৃদয় সেখানে এন্ড্রু কিশোরের কন্ঠে, ‘আমার সারা দেহ খেওগো মাটি’, ‘আমার মায়ের কাছে প্রথম যেদিন’ এবং মেঘ বিজলি বাদল ছবিতে রুনা লায়লার কন্ঠে ও বন্ধুরে প্রাণ বন্ধুরে-কবে যাবো তোমার বাড়ি চিবসবুজ সেসব গান।
নজরুল ইসলাম বাবু ছিলেন বুলবুলের প্রিয় বন্ধু। দুজনের রসায়ন ছিল যেন সোনায় সোহাগা। আগে থেকে গান লিখলেও বাবুর অকাল প্রয়ানের পর বুলবুল গীত রচনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। ফলে তার কম্পোজিশন হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত আরো সংহত। কথা ও সুরের যথাযথ মেলবন্ধন। বুলবুলের লেখা গানের বাণী এ মাটির গভীরে মেশা। একাধারে সহজ সরল ও কাব্যময়। তেমনি তার সুরের মূর্ছনা শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের। তবে বাবু ও নিজের লেখা ছাড়াও এদেশের প্রথিতযশা প্রায় সকল গীতিকারের কথায় তিনি সুর করেছেন। সংগীত পরিচালনা করেছেন ২০০-এর বেশি ছবিতে। আধুনিকতা ও আমাদের লোক ঐতিহ্যের সংমিশ্রনে পরিচ্ছন্ন এক ঘরানা তৈরি করেছিলেন বুলবুল যা আমরা তার বেসিক আধুনিক, চলচ্চিত্র সংগীত দেশাত্ববোধক সংগীত, সব ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। অনেকটা নিজভূমে পরবাসী জীবন কাটিয়ে গেলেন দেশের এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ এ তিনি যুদ্ধ করেছেন, পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে অমানুসিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, জেল খেটেছেন, আবার ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে এই বিচারকে শক্তিশালী ও ত্বরান্বিত করেছেন, সাক্ষ্য দেবার কারণে যুদ্ধাপরাধীদের দোসরদের হাতে স্বাধীন দেশে ছোট ভাইটিকে হারিয়েছেন, সেই থেকে শেষ দিন পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় গৃহান্তরীণ জীবন কাটিয়েছেন, এই যে
দুঃসহ জীবন একজন শিল্পীর সমস্ত সৃষ্টিসত্তাকে ধ্বংস করে দেবার জন্য যথেষ্ট। ২০১২ সালের পর থেকে তার জীবন অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। বলতেন, ‘আমি যেন কারাগারে বাস করছি।’ তখন থেকেই হৃদযন্ত্রের মারাত্মক অসুস্থতায় কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু সাধারণ্যে জানানানি মিতভাষী ও মৃদুভাষী এই শিল্পী। হয়তো তার স্বভাবগত কারণে, কিংবা কোনো অভিমানে। রাজউকের কাছে একটি আবাসিক প্লটের জন্যে আবেদন করে সে প্লট পাওয়া দূরে থাক, জমা দেওয়া টাকাটাও হারাতে হয়েছে তাকে। এ দুঃখের কথা বন্ধুদের জানিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে নিজের কোনো বাসগৃহ ছিল না। জীবন কাটিয়ে গেছেন আফতাব নগরের ভাড়া বাসায়। এদেশ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কতটুকু সম্মান দিয়েছে। সেটা তখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, যখন আবার সে মুক্তিযোদ্ধা হন একজন সেরা শিল্পস্রস্টা।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মানিত হয়েছেন। দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০০১ ও ২০০৫), বাচসাস পুরস্কার ১১ বার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তার জীবনের শেষ প্রান্তে চিকিৎসার ভার নিয়েছিলেন। সবই ঠিক আছে। তবে রাষ্ট্র ও জনগণের কাছ থেকে এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী আরো সম্মান আরো মনোযোগ আরো যত্নের দাবীদার ছিলেন নিঃসন্দেহে। বুকভরা অভিমান আর চাপা হাহাকার নিয়ে বিদায় নিলেন ২২ জানুয়ারির ভোরে ভাড়া বাসায় নিভৃতে। জন্ম যার ১ জানুয়ারি ১৯৫৬। ৬৩ বছরের অকাল জীবন। যা তার এবং আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। আমরাকি তাকে ভুলতে বসেছিলাম? তাই কি তিনি তার ফেসবুকে শেষ স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও..তাই একটি ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম। ’

x