আমরা জানি কি- আমাদের দায়িত্ব?

নীপা দেব

শনিবার , ২৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
53

আমাদেরকে বোঝাতে হবে- একজন ধর্ষিত মেয়ের কোন অপরাধ নেই, তিনি অপরাধের শিকার হয়েছেন এবং সমাজ তাঁর পাশেই আছে। যদি তিনি তাৎক্ষণিক কোন সহায়তা পান, তাহলে তাঁর শরীর এবং পোষাক থেকেই অপরাধী সনাক্তকরণ এবং প্রমাণের জন্য যথাযথ আলামত সংগ্রহ করা যাবে। সেইক্ষেত্রে তিনি যেন কোনভাবেই পানি দিয়ে বা পোষাক পরিবর্তন করে আলামতগুলো নষ্ট না করেন। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেসব প্রতিষ্ঠান- একজন নির্যাতিত নারীর পরিচয় গোপন রেখেই তাঁকে ন্যায়বিচার, ধর্ষণ পরবর্তী শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা এবং আইনগত সুবিধা দেয়ার কাজ করছে।

ধর্ষণ পৃথিবীর প্রাচীনতম অপরাধগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশও ধর্ষক নামক ঘৃণ্য নরপশুদের হাত থেকে মুক্ত নয়। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। মিডিয়াতে আমরা সেই চিত্রই দেখছি হররোজ। তবে এত সব ধর্ষণের ঘটনার তুমুল প্রতিবাদ কই? যত্‌দূর মনে পড়ে- বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল মাত্র দিনাজপুরে পুলিশ সদস্যদের দ্বারা ‘ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং হত্যা মামলা’ নিয়ে কার্যকরী একটি সামাজিক আন্দোলন হয়েছিলো। আর এরপর সেটির মতো কোনো আন্দোলনেই বড় কোনো সাফল্য আসেনি। তবে হ্যাঁ- নিকট অতীতে, তনু ধর্ষণ ও হত্যামামলা নিয়ে জেগে উঠেছিলো সারা দেশ কিন্তু দৃশ্যমান কোনো কূলকিনারা হয়নি আজও। ক্ষমতাশালী অপরাধীরা বোধ হয় পারই পেয়ে যাবে! এছাড়া যে ক’টি হাতেগোনা প্রতিবাদ চোখে পড়েছে- তাও কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে। সময়ের সাথে সাথে সেই ঘটনাগুলোও ধামাচাপা পড়ে গেছে।
তবে একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে বলতে চাই- আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বলি আর দেশের পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বলি আর অনলাইন মিডিয়াই বলি- প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিন্তু মিডিয়া কর্তৃপক্ষ কিংবা সাধারণ সচেতন মানুষ ধর্ষণবিরোধী সেন্টিমেন্ট সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন।
যাঁরা এই বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন করছেন তাঁরা অনেকেই ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই একমাত্র মৃত্যুদণ্ডের কথা বলছেন। আবার অনেকেই বলছেন- ধর্ষণ মামলার সবক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলে ভিকটিমকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রবণতা বাড়বে। সে যাই হোক- চলুন আমরা এবার জানি- এই সংক্রান্ত কী আইন রয়েছে আমাদের দেশে। আমি মনে করি, আইনটি বেশ কঠোর। শুধু দরকার এর কার্যকর হওয়া। যত্‌দূর জানি- এই সংক্রান্ত সকল বিচার স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই হয়। আপনাদের জানার সুবিধার জন্য নিচে ধর্ষণের শাস্তির বিধান হুবহু (ভাষারীতি অক্ষুণ্ন রেখে) তুলে ধরলাম:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) অনুসারে শাস্তির বিধান
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ ধারা অনুযায়ী- ধর্ষণের অপরাধের যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো:
(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার নিষেধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-
(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন;
(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।
উপরন্তু, একথা বলতেই হয় যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৩২ ধারা মতে- ধর্ষিত নারী ও শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা ধর্ষণ সংঘটিত হবার পর যত শীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এতে অবহেলা করলে আদালত চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রেখেছেন (তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, জাতীয় ই-তথ্যকোষ)।
এখন কথা হচ্ছে- এইসমস্ত বিধানের প্রয়োগ ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু, বিদ্যমান আইনে কেউ বিচার পেতে চাইলে কিংবা এই বিচার প্রক্রিয়ায় যেতে হলে তাকে প্রথমেই কী করতে হবে- সেই ব্যাপারে কি আমরা সচেতন? আপাতভাবে আপনার-আমার সামাজিক দায়িত্ব হলো, এই আইনের প্রয়োগের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা। অর্থাৎ- যদি কেউ ধর্ষণের শিকার হন তাহলে তার করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। যেমন, অধিকাংশ সময়ে আমাদের দেশের মেয়েরা (বিশেষ করে গ্রামের) ধর্ষণের শিকার হলে তারা প্রথমেই যে কাজটি করেন তা হলো বারবার গোসল করে নিজেকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। অথচ এই কাজটি করলে ফরেনসিক রিপোর্টে যে প্রমাণ পাওয়া যাওয়ার কথা তা মুছে যায়। যদিও ধর্ষণের শিকার হওয়া একটি মেয়ে স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে এতোটা শক্ত থাকেন না যে সকল কাজ গুছিয়ে করতে পারবেন। কিন্তু যেহেতু আমরা সচেতনতার কথা বলছি, সেখানে এটা অবশ্যই আমাদেরকে জানাতে হবে। কারণ, প্রমাণের অভাবে অনেক প্রমানিত ধর্ষকই পার পেয়ে যায়। এর উদাহরণ আছে ভুরিভুরি।
আমাদেরকে বোঝাতে হবে- একজন ধর্ষিত মেয়ের কোন অপরাধ নেই, তিনি অপরাধের শিকার হয়েছেন এবং সমাজ তাঁর পাশেই আছে। যদি তিনি তাৎক্ষণিক কোন সহায়তা পান, তাহলে তাঁর শরীর এবং পোষাক থেকেই অপরাধী সনাক্তকরণ এবং প্রমাণের জন্য যথাযথ আলামত সংগ্রহ করা যাবে। সেইক্ষেত্রে তিনি যেন কোনভাবেই পানি দিয়ে বা পোষাক পরিবর্তন করে আলামতগুলো নষ্ট না করেন। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেসব প্রতিষ্ঠান- একজন নির্যাতিত নারীর পরিচয় গোপন রেখেই তাঁকে ন্যায়বিচার, ধর্ষণ পরবর্তী শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা এবং আইনগত সুবিধা দেয়ার কাজ করছে। যেমন- ‘আইন ও শালিস কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, নারী উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশ ফেডারেশন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে এইসব সংগঠনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে (এ ব্যাপারে এই পাতায় গত ১ ও ১৫ সেপ্টেম্বর বিস্তারিত লেখা হয়েছে)।
আমাদের মনে রাখা উচিত- ধর্ষণের প্রতিবাদ করা যেমন আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি এই সংক্রান্ত সকল আইনের কথাও মানুষকে জানানো আপনার আমার সামাজিক দায়িত্ব। আমি বিশ্বাস করি, ভার্চুয়াল এবং বাস্তব দুনিয়া- দুইজায়গায়ই আমাদের সমানভাবে কাজ করতে হবে। যেভাবেই কাজ করি না কেন, তার অবদানকে অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। যাঁরা সকল বাধা-বিপত্তি, ভয় দূর করে নিজের মধ্যকার জড়তা দূর করে রাজপথে সামাজিক অধিকারের আন্দোলন করছেন তাঁদের সবাইকে আমার অনেক আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। কারণ, তাঁরা অগ্রগামী। তাঁরা নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। আমাদের সম্মিলিত আন্দোলন হোক- প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সেইসাথে একজন ধর্ষণের শিকার নারী কীভাবে সঠিক আইনি পরামর্শ পেতে পারেন বা তাঁর করণীয় কী সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করা। আমরা চাই না আমাদের দেশের আর কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হ্ল্লোক। আমরা চাই না- আমাদের দেশের কোন নারী মাথা নিচু করে চলুক। রাস্তায় আতঙ্ক নিয়ে চলুক।

x