আব্দুল হক চৌধুরী : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অনন্য এক লেখক

ড. শামীমা হায়দার

শুক্রবার , ১ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
48

আব্দুল হক চৌধুরী জন্মেছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াজিশপুর গ্রামে ২৪ আগস্ট ১৯২২। “চন্দ্রাবতী” কাব্যের রচয়িতা কোরেশী মাগনের সপ্তম অধস্তন পুরুষ তিনি। তাই তার রক্তের মধ্যে সাহিত্য রস প্রবাহিত। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বাবা আলহাজ সরফুদ্দীন ইঞ্জিনিয়ারের (যিনি ছিলেন রেঙ্গুন পোর্ট কমিশনের দ্বিতীয় ইঞ্জিনিয়ার) মৃত্যু হয়। পৈত্রিক বিষয় সম্পত্তির ঝামেলায় পড়াশোনা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। গ্রামেই পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা করতে করতেই তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় তেমন সুবিধা করতে না পেরে ১৯৬১ সালে ব্যবসা ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। চট্টগ্রামের পুরাতত্ত্ব নিয়ে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করে দেন। জনাব আব্দুল হক চৌধুরী পেশাদার ঐতিহাসিক ছিলেন না, অর্থাৎ ইতিহাসের অধ্যাপক কিংবা বৃত্তিভোগী গবেষক বললে যা বুঝায় তার কোনটিই ছিলেন না। স্বাভাবিক এক অনুসন্ধিৎসার প্রেরণায় তিনি তাঁর জন্মস্থান ও আশেপাশের গ্রাম চট্টলার প্রাচীন স্মারক নিদর্শনাদির জনশ্রুতি, কিংবদন্তীমূলক ইতিকাহিনী, পুরুষ পরম্পরায় শ্রুত পুরনো হাস্তর বা লোকোচারসমূহ, তাঁর ঐতিহ্য আর লুপ্তপ্রায় ইতিহাসের বিচিত্র উপকরণ সংগ্রহে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। একনিষ্ঠ সাধনা, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়, নির্ভেজাল সত্যসন্ধানী, অনুসন্ধিৎসু মন, নিরবচ্ছিন্ন পঠন পাঠন, গভীর দেশপ্রেম এবং অধ্যবসায় আব্দুল হক চৌধুরীকে প্রতিষ্ঠিত করেছে খ্যাতিমান ঐতিহাসিক হিসেবে। এই অসামান্য জ্ঞানী পন্ডিত ড. আহমদ শরীফ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ড. আব্দুল করিম প্রমুখ বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন এবং পরে এঁদের নামে বইও উৎসর্গ করেছেন। আব্দুল হক চৌধুরীর যাবতীয় গবেষণা চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক। সীমিত লেখা নিজস্ব অধ্যয়ন ও অনুসন্ধানের পরিমন্ডলে নিজেকে আমৃত্যু গুটিয়ে রেখেছেন। আব্দুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি’ বইটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করেছে। বইটি পড়তে পড়তে আমি বর্তমান থেকে অতীতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই অতীতের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক সাহিত্য প্রবন্ধে বলেছিলেন, “ভালো বই পড়িবার সময় মনে থাকে না বই পড়িতেছি”। আব্দুল হকের এই বইটি পড়ার সময় আমাদের মনেই থাকে না বই পড়ছি বরং তাঁর তথ্য বর্ণনা উপস্থাপনার গুণে মনে হয় ছবির মিছিল একের পর এক চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে।
আঞ্চলিক বা স্থানিক ইতিহাস রচনা নতুন নয়। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে দেশের পুরাকীর্তি উদ্ধারের একটি জোয়ার এসেছিল। সেই জোয়ারে আঞ্চলিক ইতিহাস বহু পরিমাণে রচিত হয়েছিল। আব্দুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের যে ইতিহাস লিখেছেন তাতে জনপদের ক্রমবিবর্তনে সমাজেরও যে পরিবর্তন হয়েছে তাকেই তিনি তুলে ধরেছেন। ফলে আঞ্চলিক ইতিহাস হলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির সেটি অঙ্গীভূত হয়েছে। চট্টগ্রামকে নিয়ে ইতিহাস রচনা আব্দুল হক চৌধুরীর আগে অনেকেই করেছেন যেমন তারকচন্দ্রগুপ্তের চট্টগ্রামের ইতিবৃত্ত (১৮৯৭), পূর্ণচন্দ্র চৌধুরীর চট্টগ্রামের ইতিহাস (১৯২০), রজনীকুমার বিশ্বাসের চক্রশালার ইতিবৃত (১৯১৬), সুরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চট্টগ্রাম দর্পণ (১৯১৬), মাহবুব উল আলমের চট্টগ্রামের ইতিহাস ১-৩ (১৯৬৫) প্রভৃতি। অধিকাংশ বইয়ের ইতিহাস ক্ষেত্র-গবেষণা করে লেখা হয়নি। একমাত্র আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের ইসলামাবাদ গ্রন্থটি ক্ষেত্র-গবেষণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বইটি দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমভাগে চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, দ্বিতীয়ভাগে চট্টগ্রামের ভাষা ও অন্যান্য ভাষার সঙ্গে তুলনা করে চট্টগ্রামী কথ্য ভাষার একটি ব্যাকরণ তৈরি করে দিয়েছেন যার উপর নির্ভর করে ড. মুহাম্মদ এনামুল হক চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্যভেদ (১৯৩৫) গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। সেজন্য এ পর্যন্ত যা আঞ্চলিক ইতিহাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে সাহিত্য বিশারদের বইটি আঞ্চলিক ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই গ্রন্থের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকসাহিত্য, ছড়া, ধাঁধা, সামাজিক লৌকিক আচারবিচার, বিয়ে শাদী, পালাপার্বণ, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়নি তবে তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধে এইসব বিষয়ের আলোচনা করেছিলেন। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের ইসলামাবাদ গ্রন্থের যা অপূর্ণ অংশ ছিল তা পূরণ করেছেন তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী আব্দুল হক চৌধুরী তাঁর চট্টগ্রাম বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে। আব্দুল হক চৌধুরী চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিলীয়মান অতীতকে ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি’, ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’য় ধরে রেখেছেন। চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি গ্রন্থে চৌদ্দটি অধ্যায়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ধারাবাহিক জীবনযাপন পদ্ধতি অর্থাৎ জন্মের আগে ও পরে, মৃত্যুর আগে ও পরে শ্রাদ্ধ-শান্তি, আচার-অনুষ্ঠান, পালাপার্বণ গার্হস্থ্য বিধি, বাড়িঘর নির্মাণের বিভিন্ন রীতি, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ, বিয়ে শাদী, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধের গোষ্ঠী গোত্র বৃত্তি, চিকিৎসা পদ্ধতি, চট্টগ্রামের প্রাচীন শিল্প, চট্টগ্রামের প্রজাস্বত্ব ও চাষাবাদ নিয়ে আলোচনা, খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ সব বিষয়ে লেখক অত্যন্ত পরিশ্রম করে বিশদ আলোচনা করেছেন। চৌদ্দটি পরিচ্ছদে সমাজ ও সংস্কৃতির প্রায় প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি বিষয় যথেষ্ট দক্ষতার সাথে তিনি আলোচনা করেছেন, ফলে বইটি রীতিমত সামাজিক সাংস্কৃতিক দলিল হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের লোক সমাজে সাংস্কৃতিক জীবনের অসংখ্য তথ্য আমাদের চমক জাগায়। দেশটাকে নতুন করে চিনতে শেখায়। তিনি সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করেছেন চট্টগ্রামে হিন্দুদের মধ্যে কত রকম বর্ণ গোষ্ঠী সমপ্রদায় ও বৃত্তি ছিল যা এখনও টিকে আছে। তেমনি বৌদ্ধ ও মুসলমানদের অসংখ্য গোষ্ঠী-গোত্র-বৃত্তি পরিচয় তিনি দিয়েছেন। মুসলমানদেরও কুলীন অকুলীন ছিল। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম পূজা পার্বণের বিশাল বৈচিত্র্যের পাশে এ তিনটি সমাজের মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহের অনুষ্ঠানসমূহ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন লেখক। মানুষের জীবনে যা কিছু পালনীয়, আব্দুল হক চৌধুরী তার কোনটাই বাদ দেন নি। স্বচ্ছন্দ প্রকাশ ভঙ্গির মাধ্যমে লেখক আচার নিয়ম ও উৎসব অনুষ্ঠানে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানের কথাও হালকাভাবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ জনতার আচার অনুষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উল্লেখ করা হলেও পাশাপাশি বসবাসরত এ তিনটি জাতি গোষ্ঠীর নিয়মের অভিন্নতা, পারস্পরিক গ্রহণ-বর্জন এবং সম্মিলনের প্রসঙ্গ গ্রন্থটির মর্যাদা ও গুরুত্ব অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছে। অনেক লুপ্ত আচার, নিয়মেরও উল্লেখ করেছেন তিনি যা মুসলমান সমাজ এককালে পালন করত, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে যেসব আচার পরিত্যক্ত হয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রামের অধিবাসীরা জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু ও দৈনন্দিন জীবন যাত্রার বহু পুরনো হস্তের বা লৌকিক আচার অনুষ্ঠানের বন্ধনে আবদ্ধ আছে। বিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার লাভ ও চর্চার ফলে তার বাঁধন কিছুটা শিথিল হলেও এখানকার লোকজীবন থেকে তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তাই আজো চট্টগ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত উভয় শ্রেণির জনসাধারণের মধ্যে পুরানা হস্তের বা লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের কম-বেশি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আজো চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রভাব বিদ্যমান। যুক্তি ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে চট্টগ্রামে প্রচলিত লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান সমূহ বিচার ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এর একটি অংশের ভিত্তি হল যুগ-যুগান্তরের চট্টগ্রামের লোক সমাজের ব্যবহারিক জীবনের প্রত্যক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতা যাতে দৈব ও অমঙ্গলের দোহাই দিয়ে সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিধি নিষেধের অনুশাসন বর্ণিত হয়েছে। অপর অংশ প্রাচীনকালের যাদুবিদ্যা সংশ্লিষ্ট অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য দরকার সমাজ বিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতি, ধর্ম, সংস্কার ইত্যাদি থেকে তথ্য আহরণ করা এবং এর জন্য প্রয়োজন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া। আব্দুল হক চৌধুরী গ্রামে গ্রামে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সমাজের প্রতিটি স্তরের লোকের সঙ্গে মিশেছেন এবং সামাজিক আচার-আচরণ, রীতি-নীতি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছেন। চট্টগ্রামে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকল জাতির বাস, তাছাড়া এখানে উপজাতীয়তাও রয়েছে। সকল ধর্মাবলম্বীর সকল সামাজিক রীতি-নীতি, তা যত তুচ্ছই হউক না কেন লেখকের নজর এড়িয়ে যায়নি। প্রকৃতপক্ষে বলা যায়, গ্রন্থটি সমাজতত্ত্বমূলক আলোচনা হলেও এটি প্রধানত ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা হয়ে উঠেছে। তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও ব্যবহারে বস্তুনিষ্ঠতা তথা মূল্যবোধ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর গবেষণা কর্মের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। সহজ ও সাবলীল ভাষা, স্বচ্ছন্দ প্রকাশভঙ্গি, প্রচুর তথ্য ও তথ্যের বৈচিত্র্যের জন্য গ্রন্থখানিকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য মহাজ্ঞান কোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া বলা-ই সমীচীন বলে আমি মনে করি। নির্দ্বিধায় বলা যায়, আব্দুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অনন্য এবং অসাধারণ এক লেখক।

x