আবারও ডাক্তারের অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ

ফরটিসে বৃদ্ধ, চমেকে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ৪ জুলাই, ২০১৮ at ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ
2419

ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছরের শিশু কন্যা রাইফা খানের মৃত্যুর অভিযোগ। এ নিয়ে সাংবাদিকচিকিৎসক দুই পেশাজীবী গ্রুপের মধ্যে উত্তাপ। এর তিন দিন পর গতকাল মঙ্গলবার আরো দুটি মৃত্যুর ঘটনা। দুটি মৃত্যুতেই চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ। একটি ঘটনা ঘটেছে চমেক হাসপাতালে। মারা গেছেন লাভলী আকতার (২৪) নামে অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূ। পরের ঘটনা এএফসিফরটিস হাসপাতালে। এখানে মারা গেছেন মো. লোকমান চৌধুরী নামে এক বৃদ্ধ।

নগরীর প্রবর্তক মোড়ে বেসরকারি হাসপাতাল এএফসিফরটিসে ডাক্তারের অবহেলায় এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রাত পৌনে ৯টার দিকে চান্দগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. লোকমান চৌধুরী (৭৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এসময় স্বজনরা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শিমুল কুমার ভৌমিককে অবরুদ্ধ করে রাখেন। হাসপাতালের একজন কর্মচারী ডাক্তারের কোনো দোষ নেই বললে রোগীর স্বজনরা তাকে মারধর করেন। এসময় পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পাঁচলাইশ থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিহত লোকমান চৌধুরীর ছেলে মো. জুয়েল দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার বাবাকে গত ২২ জুন ফরটিস হাসপাতালে ভর্তি করি। ওনার অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে শ্বাসকষ্ট ও নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। আজ (গতকাল) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ডা. শিমুল কুমার ভৌমিক বাবাকে দেখতে আসেন। তিনি বাবার মুখে লাগানো অক্সিজেন মাস্কটি খুলে ফেলেন। সাথে সাথে আমার বাবা ছটফট করতে থাকেন। তখন মনিটরে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আমার বাবার অক্সিজেনের লেভেল নিচে নামছে। আমরাও তখন ওখানে ছিলাম। আমরা হয়ত মনে করেছি অন্য কোনো সাপোর্ট আছে ওখানে। ডিউটি ডাক্তাররা বারবার তাকে বলছেন, স্যার মাস্কটা লাগিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তিনি বললেন, না আরেকটু দেখি। এভাবে একসময় অক্সিজেনের লেভেল শূন্যতে নেমে এলে বাবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

তিনি আরো বলেন, ডা. শিমুল কুমার ভৌমিক এসময় চলে যেতে চাইলে আমরা তাকে বাধা দিই। এসময় তার কাছে অবহেলার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে এটি আমি করেছি। অথচ তিনি মনিটরে দেখতে পাচ্ছেন বাবার অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে। এছাড়া আমরা তিন ঘণ্টা ধরে এখানে ঘুরছি, কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত এখানে এসে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। অথচ কয়েকজন কর্মচারী বলছে, ডাক্তারের কোনো দোষ নেই। আমরা অবশ্যই আইনের আশ্রয় নেব।

অভিযুক্ত ডা. শিমুল কুমার ভৌমিক দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা যে অক্সিজেন মাস্কটা লাগিয়েছে এটি কখনো একটানা লাগিয়ে রাখা যায় না। চিকিৎসার প্রয়োজনে এটি খুলে রাখতে হয়। এছাড়া খাওয়াদাওয়া করার সময় খুলতে হয়। আমি ওই পেশেন্টের অবস্থা বোঝার জন্য অক্সিজেন মাস্ক খুলে ডাইরেক্ট অক্সিজেন লাগাই। রোগীকে যখন বলেছি শ্বাস নেন, তখন কিন্তু তিনি রেসপন্সও করেছেন। আমি জাস্ট দেড় মিনিট মতো মাস্ক খুলে রেখেছি। তার পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই রোগী মারা যান।

তিনি আরো বলেন, রোগীর অবস্থা খারাপ, সেটি আমরা দুপুর থেকে স্বজনদের বলেছি। এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়ও নিতে বলেছি। এছাড়া ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়ার কথা বললেও পেশেন্ট পার্টি তাতে কর্ণপাত করেনি। এভাবে যদি আমাদেরকে দায়ী করা হয়, তাহলে এরকম ইমার্জেন্সি রোগীদের চিকিৎসা করাব কি না সেটি আমাদের ভাবতে হবে। আমি বুঝলাম আমার সমস্যাটি কোথায়। কোনো চিকিৎসক তো কোনো রোগীকে ইচ্ছা করে মেরে ফেলতে চায় না। সত্যি আমি খুবই হতাশ।

পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক মো. মোজাম্মেল জানান, ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র এখানে রোগীর স্বজনরা মারমুখী হয়ে ওঠে। আমরা স্বজনদের বলেছি, থানায় একটি জিডি করার জন্য। তারপর ঘটনা তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চমেকে গৃহবধূর মৃত্যু : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি ওয়ার্ডে চিকিৎসকের অবহেলায় লাভলী আকতার (২৪) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত গৃহবধূ হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শার বদি আলম হাট এলাকার রওশন তালুকদার বাড়ির আবুল হাশেমের স্ত্রী।

গৃহবধূর মা রোকেয়া বেগম দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার মেয়ে পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিল। গত সোমবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন আমরা সাথে সাথে হাটহাজারীর চৌধুরীহাটের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরবর্তীতে সেখানকার ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত একজন ডাক্তার বলেন, আমার মেয়ের দ্রুত অপারেশন করা লাগবে। তাই জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন। মেয়ের জামাই রক্ত সংগ্রহ করে আনলেও ওই রাতে অপারেশন করা হয়নি।

তিনি বলেন, আজ (গতকাল) সকাল ৮টার দিকে আমার মেয়েকে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হয়। এসময় ডাক্তাররা বলেন আরো এক ব্যাগ রক্ত লাগবে। রক্ত সংগ্রহ করতে যাওয়ার কিছু ণ পর ডাক্তাররা জানান, সিজারিয়ান অপারেশন করার সময় আমার মেয়ে মারা গেছেন।

তিনি জানান, তার মেয়ের জটিল কোনো রোগ ছিল না। সারা রাত ধরে চিকিৎসা না দিয়ে তাকে বেডে ফেলা রাখা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ডাক্তারের অবহেলার কারণে সে মারা গেছে। আমরা হাসপাতালের পরিচালকের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমি এর বিচার চাই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ডাক্তারের অবহেলায় রোগী মারা গেছেন, এমন একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনা প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

x